English
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-০৭-২৭ ২০:৫৩:১০
আপডেটঃ ২০২৬-০৭-২৮ ০৪:১০:৩৩


বুবু প্রসঙ্গে

বুবু প্রসঙ্গে


ফাহমিদা মঞ্জু মজিদ

 

মা বাবা ছাড়া জন্মেই যাকে পেয়েছিলাম সে হলো আমার একমাত্র বোন ফরিদা মজিদ। জ্ঞান হওয়ামাত্র তাকে ‘বুবুবলে ডাকি। মা বলেছেন ফরিদাও খুব খুশি হয়েছিল ছোট ‘পুতুল বোন পেয়ে। মাত্র আড়াই বছর বয়স, যখন যা পেতো দৌড়ে এসে আমার মুখে রেখে যেতো। একদিন আমার ঠোঁটের উপর মা একটা মটরশুটি দেখে একটু সচেতন হয়ে গেলেন। বুবু খুব চঞ্চল প্রকৃতির দুষ্টু বাচ্চা ছিল। আমি বরাবরই শান্ত। টুকরো টুকরো করে এই বইয়ের নানান জায়গায় ইতোমধ্যে অনেক কথা লিখেছি। ছোট থেকেই সাংঘাতিক কল্পনাপ্রিয় ও সৃজনশীল মানুষ ছিল। ওকে পুতুল কিনে দেওয়া হয়নি, তারপরেও রান্নাঘরের পাশে দুটো ইট নিয়ে খেলা করেছে। আসলে শিশুদের কল্পনার কোন শেষ নেই।

খুব গরমকালে দিল্লিতে একবার ঘটিবাটি সবকিছু লুকিয়ে রাখা স্বত্তেও গায়ে পানি দেওয়ার জন্য এ ধরনের গর্তওয়ালা জিনিষ খুজে বেড়ায়। একবার ফুফা জুতো খুলে ঘরে ঢুকেছেন, বুবু তখন জুতো দুটি নিয়ে গোসলখানায় ডুবাচ্ছে আর গায়ে পানি ঢালছে। এরকম নানান দুষ্টুমির বুদ্ধির গল্প আমি শুনেছি। আরও একটু বড় হলে পড়তে বলা হলে, বুবু পড়তে লাগলো,

ঘন্টা বেজে গেল কখন, অনেক হলো বেলা

তোমায় মনে পড়ে গেল, ছেড়ে এলাম খেলা।

মা ডেকে বললেন, ওরে ফরিদা তোকে তো যুক্তাক্ষর শিখাইনি। ঘন্টা পড়লি কি করে? বুবু অবলিলাক্রমে বলে গেল, বা দিকে ‘ঘ আছে, আর ডান ‘বেজে গেল আছে। তাহলে কি বাজবে? ঘন্টাই তো বাজবে? এরকম সব উপস্থিত বুদ্ধিতে ভরপুর ছিল ওর মাথা।

এরপরে তো গাছেপাছে চড়ার কোন বিরতি ছিল না। খুব ডানপিঠে ছিল, অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি গল্পের ‘ফটিক চরিত্রের মতো। এরপর তো অনেক কথা লিখেছি আমার উপর মাতবরি করার গল্প। ও আমাকে নাম দিয়েছিল ‘গদাই। যা হুকুম করবে, আমাকে তাই করে দিতে হবে। এরপরে তো নিজেই ব্যস্ত হয়ে গেছে কবিতা লিখতে। আমাকে ক্ষেপানোর জন্য হাজারো কবিতা। রূপু মামা ও খোকনকে নিয়ে গুলতি ছোড়ার ঘটনা। আমাকে ক্ষেপানোর জন্য যেসব ছড়া লিখতো তা ‘সত্যযুগ নামক পত্রিকায় সম্পাদক বেতাল ভট্টকে পাঠিয়ে দিতো এবং সেগুলো ছাপা হতো।

একবার চিটাগাং থাকতে মা ওকে মেরেছিল। বুবু সঙ্গে সঙ্গে লিখলো-

 ‘আমি যখন চলে যাবো অনেক অনেক দূরে

 গানের সুরে সুরে

 ভেসে যাবে আমার কথা সবার মনের থেকে

 কেউ পাবে না ডেকে।

এই কবিতা বড়মামা কাগজে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে মাকে চিঠি লিখলেন, ‘জোছনা, ফরিদাকে যখন তখন শাসন করো না। খেয়াল করে করো, আদর করে বুঝিয়ে বলো। বারান্দায় বসে চিঠিটা পেয়ে আমার মাও কেঁদেছিলেন। তারপরে অন্য ধরনের কবিতা লিখলো বুবু। ‘সন্ধা নামক কবিতাটি এমন ছিল:

দিনের আলো পালিয়ে গেল

রাতের কালো ঘনিয়ে এলো

ঘরে ঘরে জ্বললো আলো

দেখতে আমার লাগলো ভাল।

এবার তো নানার বন্ধুরা নানাকে চেপে ধরেছে বলেছে, নিশ্চয়ই আপনি লিখে দিয়েছেন। নয়/দশ বছরের মেয়ে কি এমন গভীরভাবে লিখতে পারে? উত্তরে নানা বলেছেন, ও স্কুল পালায়, ও-ই স্কুল পালানোর শব্দ চয়ন করতে পারে। তবে, ‘রাতের কালো ঘনিয়ে আসাএকটু রক্তের প্রভাব বলতে পারো।

খুব সুন্দর সুন্দর চিঠি নানা বুবুকে লিখতেন। একজন কবি আরেকজন কবিকে লিখছেন তেমনই গভীর ছিল প্রতিটি চিঠি। এক আধটা চিঠি এই বইতে আমি ছেপে দেবো। নানার সেই অপূর্ব সুন্দর হাতের লেখায় চিঠিগুলো আজও অমর হয়ে আছে। আমাকে আদর করতেন নানা, কিন্তু কাব্য আলোচনা হতো বুবুর সাথে। বুবু এক জায়গায় লিখেছে-

কবি গোলাম মোস্তফা

কার্যে তিনি ইস্তেফা

দিলেন কিন্তু ইস্তফা

দেখছি বাহ্ সাবাস তোফা

তারপরে মহাকাব্যের অতলতলে তল নেন

আমায় শুধু নাক সিঁটকে বললেন,

নাতনি তোমার পদ্য বড় মন্দ

আমি বললাম কাব্যে তোমার আমারও হয় সন্দ

দেখাও দেখি কোথায় তেমন মিল আছে আর ছন্দ

মুচকি হেসে বলে নানা বলে শুনেই দেখো ভাষা কি সুশ্রাব্য

নানায় আমায় বেজে গেল রাম-রাবনের যুদ্ধ

আমি বলি উঠি নানা, অন্য একদিন আসবো

তখন না হয়, শোনা যাবে তোমার মহাকাব্য

সেই সময় নানা ‘বনি আদম কাব্য লিখছিলেন। আমি তখন নানার কাছে বাংলা পড়া শিখতাম। তখনই অমিত্রাক্ষর ছন্দ সন্বন্ধে নানা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।

বুবু আমাকে ক্ষেপানোর জন্য অনেক ছড়া কবিতা লিখেছিল। যেমন, এরকম একটি হচ্ছে ‘মঞ্জুর আদর। লাইনগুলো হচ্ছে-

তার মাটিতে পা পড়ে না

সে লেখাপড়া করে না

এত আদর পায় তবু মন তার ভরে না

মাটিতে পা পড়ে না

এমনি সে জালিয়াত খুশি হলে ফেলে ভাত

ধুলো বালি ধরে না

মাটিতে পা পড়ে না।

এরপর সেই অসামান্য ছড়া, যা নিয়ে হুলস্থুল, আমি তো কান্নাকাটি। সেটা হলো-

মঞ্জুর ঘর গুছানো-

ঘরটা ছিল এলোমেলো

মঞ্জু সেটা দেখতে পেলো

বললো সে রেগেমেগে

তোমরা সব গেছ কি ভেগে?

কষ্ট করে ঘর গুছাবে

তা না, শুধু বসেই খাবে

বলেই সে তাড়াতাড়ি

গুছায় যেন সাড়া বাড়ি

চেয়ার টানে টেবিল টানে

এটা আনে ওটা আনে

মঞ্জুর সেই ঘর গুছানো

 কেমন হলো শেষটা জানো?

এমন করেই ঘর গুছালো

এলোমেলোই ছিল ভাল

ঐ ছড়া কাগজে পড়ে নানার বন্ধুরা আবার নানাকে বিরক্ত করলো। এরপরে অন্যান্য কিছু স্মরনীয় ছড়া লিখেছে। একবার ইডেন কলেজে ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠানে মা আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন। সবাই লিখছে দেখে বুবু জিজ্ঞেস করলো ওরা কি লিখছে? একটা মেয়ে বুবুর উৎসাহ দেখে বললো, তুমি লিখবে? তখন বুবু তাৎক্ষণিকভাবে লিখলো-

ছোট্ট খাতাখানি

দিলে তুমি আনি

বললে তুমি নাও

একটু লিখে দাও

বন্ধু, আমি প্রথম

লিখছি তাই কম

এইটুকুতেই হবে

এতেই মনে রবে।

অতটুক মেয়ে এভাবে লিখতে পারে দেখে সবাই তো অবাক।

তখন মাত্র ১১ বছর বয়স বুবুর। স্কুল থেকে আসার পর লিখলো-

লাল গাছ

ঐ ওখানে মাঠের কাছে

ইস্কুলের ঐ পথের পাশে

ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে গাছটি

নাই কো পাতা একটি

চেয়ে কেবল দেখি আমি

পাইনা খুঁজে কোন নামই

মনে ভাবি, ঠিক হবে নাম কোনটা?

উড়ে বেড়ায় মনটা

দুপুরের ঐ রোদের আঁচে

মনটারে যা টানে কাছে

মনে ভাবি ওরা সত্যি ফুল কি?

নাকি আগুনের ফুলকি?

গ্রীষ্মকালে গেল ছুটি

অনেক রকম মজা লুটি

ইস্কুলেতে গিয়ে দেখি তাই তো

লাল ফুল আর নাই তো!

শুন্য শাখা মেলে ধরে

গাছটি তেমনি আছে পড়ে

নাইকো তাতে লালে আগুনের নাচটা

নি:শ্ব যে ফুল গাছটা

ফুরিয়ে গেছে লালের বাহার

রেখে গেছে মনে আমার

লাল রঙেরই একটি গাঢ় দাগ যে

তাই তো মনে লাগছে।

এরপর বুবু একদিন নানাকে বললো, নানা আমার চিরুনী ছন্দের কবিতাটা পড়েছো? নানা বললেন, চিরনী ছন্দ? না তো আমি কিছু জানি না। ‘দুপুর নামে এই কবিতাটা নানাকে বুবু দেখালো। নানা বললো ঠিকই তো ফরিদা এটা তো চিরনী ছন্দ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। কবিতাটা ছিল এইরকম-

দুপুর

নির্জন দুপুরে

পাখি যেন ডাকে অতি করুণ সুরে

বেলা দ্বিপ্রহর

আকাশে রবির তাপ দারুন প্রখর

পথ চলা দায়

ঘরের বাহিরে তাই কেউ নাহি যায়

যারা পথে আছে

তাদের বাড়ি তো নয় খুব কাছে

গরু ও ছাগল

মাঠে মাঠে ঘুরে তারা হয়েছে পাগল

ফেরিওয়ালা হাঁকে

কাকগুলো খালি খালি কা-কা রবে ডাকে

স্কুল আজ নাই

দুপুরের দৃশ্য আমি বসে দেখি তাই।

এবার কবিতাটার দিকে তাকাও? কার না মনে হবে এটা চিরুনী ছন্দ? আমার নানা কবি গোলাম মোস্তাফা বলেছেন, ফরিদার কাছে আমি কত যে শিখছি। এরপর বুবু লিখেছে বিষ্ণু দের মতো করে আরেকটি নতুন কবিতা। তার মধ্যে একটা কথা স্পষ্ট ছিল-‘নিউটন যদি বলে থাকেন যে জ্ঞান সমুদ্রের শুধু নুড়ি কুড়াচ্ছেন, বুবু বললো আমরা তো তাহলে জ্ঞান সমুদ্রের বালুকা রাশিতে চলে এসেছি।

নিজেকে খুব জ্ঞানী মনে করতো বুবু এবং মহামতি আলেকজান্ডারের অনুকরনে নিজের নাম  লিখতো ‘ফরিদা মজিদ, দি গ্রেট। বুবু পাখি ও পশু পুশতো। প্রত্যেকটা পাখির নাম বড় সুন্দর ছিল। পাখির নাম ছিল ‘বিথোফেন, পিকাসো এসব। একটা সাদা ইঁদুর ছিল পোসা। চুই চুই করতো। তাই ওর নাম ছিল চাইকোপস্কি। এছাড়া ফুলের বাগান করা তার নেশা ছিল। আমাদের বাগানে ঝলমল করতো বেগুনি আর সাদা কসমস।  আমার মা-বাবা এসব কাজে খুব উৎসাহ দিতেন। আব্বা একবার বুবুর জন্মদিনে একটা ছোট মাইকো্রস্কোপ উপহার দিলেন। তার মেধ্য দিয়ে আমার ফুলের পাপড়ি, পিয়াজের আঁশ এসব দেখতাম। আব্বার ইচ্ছা ছিল বুবুকে ক্যামেস্ট্রি পড়াবেন। বুবু করলোও তাই। ক্যামেস্ট্রি অনার্স। কিন্তু তার আগে ইডেন কলেজে পরীক্ষার হলে ইংরেজিতে  একটা রচনা লিখেছিল। সেখানে খুব স্টাইল করে ‘ইন দ্যা একজামিনেশন হল লিখেছিল, ‘এ পিন ফেল ফ্রম সামওয়ান ডেস্ক, এন্ড ইউ কুড অল হেয়ার ইট’। সেই রচনা পড়ে ইডেন কলেজের প্রিন্সিপাল ম্যাগাজিনে ছাপিয়ে দিলেন এবং নিচে লিখলেন, ‘ফরিদা রোট ইট ইন দ্যা একজামিনেশন হল, এন্ড আই ফিল প্রাউড অব সাচ স্টুডেন্ট।

তারপরে বুবু ঢাকা ইউনির্ভাসিটিতে পড়তো ক্যামেস্ট্রিতে অনার্স।

বুবুর বিয়ের পরে পরেই আমাদের পরস্পরের জন্য মমতা অনেক বেশি পরিমান উদ্বেলিত হলো। আমি অনেক কেঁদেছিলাম ওর বিয়ে হয়ে যাওয়া পরে। আমার বিয়ের সময়ও বুবু ঢাকায় ছিল। অদ্ভূত সুন্দর এক ছড়া লিখে বুবু মানুষের প্রশংসা পেয়েছিল। ডক্টর হাফিজের বর্ননা বড়ই প্রযোজ্য হয়েছিল। বুবু লিখেছে-

চশমা পরা নাড়ি গোপাল এক যে ছিল ডাক্তার

নামের পরে লম্বা লেজুড় তাই যত নাম-ডাক তার

এর সাথে মন্টু মামার আঁকা কার্ুন আর বড় মামীর হাতের লেখা বড় মিষ্টি হয়েছিল। একটা নমূনা আজও রেখে দিয়েছি।



মামা মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে ফরিদা মজিদ ও ফাহমিদা মঞ্জু মজিদ


এরপর থেকে বুবু আরও অনেক কার্যক্রমের সাথে জড়িত হয়। একটা হচ্ছে ১৯৬৫ সালে কবি রবীন্দ্রনাথের জন্ম শত বাইর্ষকী। মা আমাদের সাথে সাথে নিয়ে যেতেন সব জায়গায়। আমরা  মন্দিরা নন্দীর সাথে ‘শ্যামা নৃত্যনাট্যতে অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেখানে বুবু আমার সাথে নেচেছিল। ভয়েস অব আমেরিকায় রেড্রি প্রগ্রোমে বুবু পাশ করলো। আমি ফেল করলাম। আমাকে বলা হলো ‘যুবিনাইল ভয়েস। এই সময় আমাদের বাড়ির উল্টো দিকে ‘স্নেহনীড় নামক বাড়িতে এক মহিলা মারা গেলেন। তার মেয়ে রত্না রুকসানা আমাদের খুব বন্ধু হয়ে গেল। তাদের খালাতো ভাই-রুমি ভাই ও খালেদ ভাইয়ের সাথে আমরা পরিচিত হলাম। একটা খুব সুন্দর ফটো আছে সেই সময়কার। ঢাকায় জাপানী কনসুলেটে আমাদের অনেক এ্যাকটিভিটিস হতো। তখন রুমি ভাই এমসবেসিডার হয়ে গেছিলেন। এদিকে খালেদ সালাউদ্দিন বিটিভির শুরু থেকেই ক্যামেরা বিভাগের প্রধান ছিলেন। একটা ‘এডুকেশন উইকে একটা বড় অনুষ্টানে উনি আমার একটা চমৎকার ফটো তুলে দিয়েছিলেন, যার জন্য আমি চিরজীবন কৃতজ্ঞ। তখন আমার বয়স ষোলো। বুবু তখন ঢাকা স্টেডিয়ামে  ইংরেজি ও বাংলা দুটো ভাষাতেই ধারা বিবরনী দিতে পারতো। এই সময় ‘পিস কোর বলে আমেরিকান একটা সংস্থার সাথে বুবুর খুব হৃদত্যা ঘটলো। মিস্টার এন্ড মিসেস খত্রি পিস কোরের ঢাকায় অবস্থি হর্তাকর্া ছিলেন। আমার মায়ের সাথে মিসেস খত্রির খুবই একটা বন্ধুত্ব ঘটে গেল। আমাদের তাঁরা মেয়ের মতোই স্নেহ করতেন। এর মধ্যে বুবুর ইউনির্ভাসিরি কিছু বন্ধুদের সাথে আমাদের পরিবারের ঘনিষ্ট সম্পর্ হলো। তারমধ্যে ছিলেন নিয়াজ আলী, রেজা আলী, টবি ওবায়দুল্লাহ, সিদ্দিকুর রহমান প্রমুখ। এরা সবাই মিলে ব্রিটিশ কাউন্সিলের উদ্যোগে থেসপিয়ানস নামক গ্রুপ থেকে একটা ইংরেজি নাটক মঞ্চস্ত করেছিল। তখন পিস কোর থেকে বুবুকে আমেরিকা যাওয়ার নির্বাচিত করেছিল। বুবুকে কোলোরোডর ডেনবার্গের একটা পরিবারের সাথে তিন মাস থাকতে হবে। মাত্র দুইজনকে ইস্ট পাকিস্তান থেকে সিলেক্ট করা হয়েছিল। বুবু আমেরিকায় গেলে নিয়মিত চিঠি লিখতো। ইতোমধ্যে একটি আমেরিকান মেয়ে বাংলায় আমার মা-বাবাকে চিঠি লিখলো। পিস কোর সিলেক্ট করা এই মেয়ের নাম জেনিস মার্কস। সে খুব সুন্দর বাংলায় একটা চিঠি লিখেছিল। সেই থেকে সে আমার ‘জেনিস বুবু। এই সময় বুবুর পুরো গ্রুপটি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন কেনেডির সাথে নিউইয়র্কে একটি সাক্ষাৎ হয়। তখন জন এফ কেনেডি ইস্ট পাকিস্তান থেকে আগত আমার বোন সাদেক আলীর সাথে বেশি কথা বললেন প্রেসিডেন্ট। বুবু সুষ্ঠ সাবলীল ইংরেজিতে প্রেসিডেন্টের সাথে কথপোকথন করেছিলেন। সেই সময়কার একটা ছবিও আছে। (ছবিটা যাবে বইতে)

এরমধ্যে বদলে আসা জেনিস বোনটি আমাদের সাথে প্রায় দুই বছর ছিল। উনি সাংবাদিক ছিলেন। উনি পিস কোর অফিসে গিয়ে খত্রি সাহেবদের সাথে কাজ করতেন। তাঁর কাজের বিষয় ছিল নিউট্রেশন বিষয়ক। সেই সময় মন্টু (মুস্তফা মনোয়ার) মামার বিয়ে হলো। সেই বিয়েতে জেনিসও ছিল। এমনকি মন্টু মামার সাথে বরযাত্রীও গিয়েছিল। আমার মা জেনিসকে এত স্নেহ করতেন যে , ওর বিয়ের জন্য মা আগের থেকে অনেক যত্ন করে বিয়ের সব সরঞ্জাম গুছিয়ে দিয়েছিলেন-লাল বেনারসি, মুক্তার গয়নার সেট, সোনার চুড়ি ইত্যাদি। এইসব গহনাগাটি জেনিস সত্যিকারের বিয়ের রিয়ারসেলে পরেছিল।

বুবু বিয়ের পরে ওর আমেরিকান আর্কিটেক্টস বরের সাথে আমেরিকায় চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে থাইল্যান্ডে চলে গিয়েছিল। সেখানে বুবু মডেলের কাজ করেছিল। আমার যখন বাচ্চা হবে তখন ব্যাংকক থেকে বুবু একটা সুটকেট পাঠিয়েছিল। এই সুটকেসে ন্যাপি থেকে শুরু করে নতুন বাচ্চার জন্য এমন কিছু নেই, যা ছিল না। আমার প্রথম সন্তান মিতি জন্মেই বড় খালার দেয়া এইসব পরেছিল। আমাকেও অনেক সুন্দর সুন্দর শাড়ি পাঠাতো বুবু।

আমার ছেলে আবরার ও মেয়ে মিতিকে খুবেই স্নেহ করতো। বড়দের কবিতা অজস্র লিখেছে ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষাতেই। তিনি বিখ্যাত অনুবাদক ছিলেন। বহুজনের বহু লেখা অনুবাদ করে দিয়েছেন। আটটি ভাষায় কথা বলতে এবং লিখতে পড়তে পারতেন। খুবই পন্ডিত মানুষ ছিলেন। কলম্বিয়া ইউনিভাসিটিতে শিক্ষিকতা করেছেন। বই লিখেছেন একটি। নাম

শিক্ষাজীবনের শুরু বাংলাদেশে। তিনি ইডেন মহিলা কলেজে রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। পরে মার্কিন স্থপতি রবার্ট বাউঘেকে (Robert Boughey) বিয়ে করে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখানে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে (New York University) ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর তিনি ১৯৭১ সালে লন্ডনে স্থায়ী হন। এই সময় থেকেই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক অধ্যায় শুরু হয়।



দুই বোন ফাহমিদা মঞ্জু মজিদ ও ফরিদা মজিদ


লন্ডনের সাহিত্যজগতে ফরিদা মজিদ দ্রুতই এক পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন। চেলসির বাসভবনে প্রতি সপ্তাহে তিনি কবি, সাহিত্যিক, সম্পাদক ও শিল্পীদের নিয়ে সাহিত্যসভা আয়োজন করতেন। এই আড্ডাগুলো ছিল কবিতা পাঠ, সাহিত্য আলোচনা ও নতুন চিন্তার এক প্রাণবন্ত কেন্দ্র। ব্রিটিশ সাহিত্যিক জর্জ ম্যাকবেথ একে "Farida's is the last salon" বলে উল্লেখ করেছিলেন। তার এই সাহিত্যসভায় সে সময়ের বহু খ্যাতিমান কবি ও সাহিত্যিক অংশ নিতেন। কবি টেড হিউজ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন ছিলেন, যদিও দূরে থাকার কারণে নিয়মিত উপস্থিত থাকতে পারতেন না।

ফরিদা মজিদের অন্যতম বড় অবদান ছিল Salamander Imprint নামে একটি স্বাধীন প্রকাশনা উদ্যোগ প্রতিষ্ঠা করা। এই প্রকাশনা সংস্থা থেকে তিনি সমকালীন বাংলাদেশি কবিদের ইংরেজি অনুবাদ সংকলন Take Me Home, Rickshaw (১৯৭৪) প্রকাশ করেন। এতে শামসুর রাহমানসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের কবিতা স্থান পায়। বইটির বিক্রয়লব্ধ অর্থ ঢাকার একটি বিদ্যালয়ের জন্য দান করা হয়েছিল। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি বাংলা কবিতাকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।

শুধু অনুবাদক হিসেবেই নয়, একজন দক্ষ সম্পাদক ও সাহিত্য-সংগঠক হিসেবেও তার পরিচিতি ছিল। তিনি Thursday Evening Anthology নামে একটি সংকলন সম্পাদনা করেন, যেখানে আঠারোজন কবির রচনা প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি তিনি ভিক্টর ওয়েস্ট, জ্যাক কেরি, জিম বার্নস এবং কিট রাইটের মতো কবিদের কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করে নতুন সাহিত্যিকদের সামনে আসার সুযোগ করে দেন। তার প্রকাশিত কিছু বই ব্রিটেনের Poetry Book Society-এর স্বীকৃতিও লাভ করে।

ফরিদা মজিদের নিজের কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতি, দর্শন, আধ্যাত্মিকতা, পরিচয়বোধ এবং নারীর অভিজ্ঞতা গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বাংলা ও ইংরেজিউভয় ভাষায় লিখতেন। তার লেখায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভাবধারার এক অভিনব সংমিশ্রণ দেখা যায়। সমালোচকদের মতে, তিনি বাংলাদেশের ইংরেজি ভাষার প্রথম প্রজন্মের লেখকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে লন্ডনে অবস্থান করে পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গঠিত নির্মূল কমিটির সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। সাহিত্য তার কাছে শুধু নান্দনিক চর্চা ছিল না; এটি ছিল ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার একটি মাধ্যম।

১৯৭৭ সালে তিনি কমনওয়েলথ পোয়েট্রি প্রাইজের বিচারকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। কিন্তু সাহিত্যজগতে তার উজ্জ্বল যাত্রা হঠাৎই বাধাগ্রস্ত হয়, যখন যুক্তরাজ্যের হোম অফিস অভিবাসন-সংক্রান্ত কারণে তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। বহু খ্যাতিমান সাহিত্যিক তার পক্ষে কথা বললেও সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়নি। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং নিউইয়র্কে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কে (CUNY) ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে অধ্যাপনা করেন।

প্রায় চার দশক বিদেশে কাটানোর পর তিনি ২০০৫২০০৬ সালের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে আবার সাহিত্যচর্চায় সক্রিয় হন। বাংলা কবিতা রচনা, অনুবাদ এবং কোরআনের ব্যাখ্যাগ্রন্থ নিয়ে কাজ করছিলেন। নতুন প্রজন্মের কবি ও সাহিত্যিকদের সঙ্গে তার ছিল নিবিড় যোগাযোগ। সাহিত্যকে তিনি কখনো নিছক পেশা হিসেবে দেখেননি; বরং একে তিনি জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছিলেন।

লেখক: ফাহমিদা মঞ্জু মজিদ : কবি, শিশুসাহিত্যিক, চিকিৎসা বিজ্ঞানী

তার আত্মজীবনীর অংশবিশেষ থেকে।


ক্যাটেগরিঃ শিল্প ও সংস্কৃতি, লেখালেখি,


আরো পড়ুন