বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা এক অগ্রগামী কণ্ঠ
খালেদ ইমতিয়াজ
বাংলা ভাষা
ও
সাহিত্যের ইতিহাসে এমন
কিছু
ব্যক্তিত্ব আছেন,
যাদের
অবদান
কেবল
তাদের
প্রকাশিত রচনার
মধ্যেই
সীমাবদ্ধ নয়;
বরং
তারা
সাহিত্যচর্চার পরিবেশ,
আন্তর্জাতিক সংযোগ
এবং
নতুন
প্রজন্মের সৃজনশীল বিকাশেও গভীর
প্রভাব
রেখে
গেছেন।
কবি,
প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও
অধ্যাপক ফরিদা মজিদ (১৯৪২–২০২১) ছিলেন তেমনই
এক
বিরল
ব্যক্তিত্ব। তিনি
শুধু
একজন
কবি
ছিলেন
না;
তিনি
ছিলেন
বাংলা
ও
বিশ্বসাহিত্যের মধ্যে
এক
গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন।
ফরিদা মজিদের
জন্ম
১৯৪২
সালের
২৭
জুলাই
কলকাতায়। তার
মা
জোছনা
ছিলেন
প্রখ্যাত কবি এবং বিশ্বনবী বইয়ের লেখক গোলাম
মোস্তফার জ্যেষ্ঠ কন্যা।
বাবা মহিবুল মজিদ ছিলেন একজন প্রখ্যাত
সেতু প্রকৌশলী। তার একমাত্র ছোট বোন লন্ডন প্রবাসী শিশুসাহিত্যিক ও মনোবিজ্ঞানী
ফাহমিদা মঞ্জু মজিদ। সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার ফলে
ছোটবেলা থেকেই
কবিতার
প্রতি
তার
গভীর
অনুরাগ
তৈরি
হয়।
তার
নানা
গোলাম
মোস্তফা তার
সাহিত্যপ্রতিভাকে উৎসাহ
ও
দিকনির্দেশনা দেন।
মাত্র
দশ
বছর
বয়সে
একটি
বাংলা
পত্রিকায় তার
প্রথম
কবিতা
প্রকাশিত হয়,
যা
তার
সাহিত্য জীবনের সূচনা
করে।
তার এক মামা বরেণ্য শিল্পী ও
বাংলাদেশের পাপেট ভুবনের স্রষ্টা মুস্তাফা মনোয়ার।
শিক্ষাজীবনের শুরু
বাংলাদেশে। তিনি
ইডেন
মহিলা
কলেজে
রসায়ন
নিয়ে
পড়াশোনা শুরু
করেছিলেন। পরে
মার্কিন স্থপতি
রবার্ট
বাউঘেকে (Robert Boughey) বিয়ে করে
যুক্তরাষ্ট্রে চলে
যান।
সেখানে
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে (New York University) ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে
নানা
পরিবর্তনের মধ্য
দিয়ে
যাওয়ার পর
তিনি
১৯৭১
সালে
লন্ডনে
স্থায়ী হন।
এই
সময়
থেকেই
তার
জীবনের
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক অধ্যায় শুরু
হয়।
লন্ডনের সাহিত্যজগতে ফরিদা
মজিদ
দ্রুতই
এক
পরিচিত
নাম
হয়ে
ওঠেন।
চেলসির
বাসভবনে প্রতি
সপ্তাহে তিনি
কবি,
সাহিত্যিক, সম্পাদক ও
শিল্পীদের নিয়ে
সাহিত্যসভা আয়োজন
করতেন।
এই
আড্ডাগুলো ছিল
কবিতা
পাঠ,
সাহিত্য আলোচনা
ও
নতুন
চিন্তার এক
প্রাণবন্ত কেন্দ্র। ব্রিটিশ সাহিত্যিক জর্জ
ম্যাকবেথ একে
"Farida's is the last salon" বলে উল্লেখ
করেছিলেন। তার
এই
সাহিত্যসভায় সে
সময়ের
বহু
খ্যাতিমান কবি
ও
সাহিত্যিক অংশ
নিতেন।
কবি
টেড
হিউজ
তার
ঘনিষ্ঠ
বন্ধুদের একজন
ছিলেন,
যদিও
দূরে
থাকার
কারণে
নিয়মিত উপস্থিত থাকতে
পারতেন
না।
ফরিদা মজিদের
অন্যতম
বড়
অবদান
ছিল
Salamander Imprint নামে একটি
স্বাধীন প্রকাশনা উদ্যোগ
প্রতিষ্ঠা করা।
এই
প্রকাশনা সংস্থা
থেকে
তিনি
সমকালীন বাংলাদেশি কবিদের
ইংরেজি
অনুবাদ
সংকলন
Take Me Home, Rickshaw (১৯৭৪) প্রকাশ
করেন।
এতে
শামসুর
রাহমানসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের
কবিতা
স্থান
পায়।
বইটির
বিক্রয়লব্ধ অর্থ
ঢাকার
একটি
বিদ্যালয়ের জন্য
দান
করা
হয়েছিল। এই
উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি
বাংলা
কবিতাকে আন্তর্জাতিক পাঠকের
কাছে
পৌঁছে
দেওয়ার এক
নতুন
দিগন্ত
উন্মোচন করেন।
শুধু অনুবাদক হিসেবেই নয়,
একজন
দক্ষ
সম্পাদক ও
সাহিত্য-সংগঠক
হিসেবেও তার
পরিচিতি ছিল।
তিনি
Thursday Evening Anthology নামে একটি
সংকলন
সম্পাদনা করেন,
যেখানে
আঠারোজন কবির
রচনা
প্রকাশিত হয়।
পাশাপাশি তিনি
ভিক্টর
ওয়েস্ট, জ্যাক
কেরি,
জিম
বার্নস
এবং
কিট
রাইটের
মতো
কবিদের
কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ
করে
নতুন
সাহিত্যিকদের সামনে
আসার
সুযোগ
করে
দেন।
তার
প্রকাশিত কিছু
বই
ব্রিটেনের Poetry Book Society-এর স্বীকৃতিও লাভ
করে।
ফরিদা মজিদের
নিজের
কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতি, দর্শন,
আধ্যাত্মিকতা, পরিচয়বোধ এবং
নারীর
অভিজ্ঞতা গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি
বাংলা
ও
ইংরেজি—উভয় ভাষায় লিখতেন। তার
লেখায়
প্রাচ্য ও
পাশ্চাত্যের ভাবধারার এক
অভিনব
সংমিশ্রণ দেখা
যায়।
সমালোচকদের মতে,
তিনি
বাংলাদেশের ইংরেজি
ভাষার
প্রথম
প্রজন্মের লেখকদের অন্যতম
গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও
তিনি
সক্রিয় ভূমিকা
পালন
করেন।
১৯৭১
সালে
লন্ডনে
অবস্থান করে
পাকিস্তানি সামরিক
শাসনের
বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে
জনমত
গঠনে
অংশ
নেন।
পরবর্তী সময়ে
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে
গঠিত
নির্মূল কমিটির
সঙ্গেও
তিনি
যুক্ত
ছিলেন।
সাহিত্য তার
কাছে
শুধু
নান্দনিক চর্চা
ছিল
না;
এটি
ছিল
ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও
স্বাধীনতার পক্ষে
অবস্থান নেওয়ার একটি
মাধ্যম।
১৯৭৭ সালে
তিনি
কমনওয়েলথ পোয়েট্রি প্রাইজের বিচারকমণ্ডলীর সদস্য
ছিলেন।
কিন্তু
সাহিত্যজগতে তার
উজ্জ্বল যাত্রা
হঠাৎই
বাধাগ্রস্ত হয়,
যখন
যুক্তরাজ্যের হোম
অফিস
অভিবাসন-সংক্রান্ত কারণে
তাঁকে
দেশত্যাগে বাধ্য
করে।
বহু
খ্যাতিমান সাহিত্যিক তার
পক্ষে
কথা
বললেও
সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়নি।
পরে
তিনি
যুক্তরাষ্ট্রে চলে
যান
এবং
নিউইয়র্কে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও
সিটি
ইউনিভার্সিটি অব
নিউইয়র্কে (CUNY) ভাষা ও
সংস্কৃতি বিষয়ে
অধ্যাপনা করেন।
প্রায় চার
দশক
বিদেশে
কাটানোর পর
তিনি
২০০৫–২০০৬ সালের দিকে
বাংলাদেশে ফিরে
আসেন।
দেশে
ফিরে
আবার
সাহিত্যচর্চায় সক্রিয় হন।
বাংলা
কবিতা
রচনা,
অনুবাদ
এবং
কোরআনের ব্যাখ্যাগ্রন্থ নিয়ে
কাজ
করছিলেন। নতুন
প্রজন্মের কবি
ও
সাহিত্যিকদের সঙ্গে
তার
ছিল
নিবিড়
যোগাযোগ। সাহিত্যকে তিনি
কখনো
নিছক
পেশা
হিসেবে
দেখেননি; বরং
একে
তিনি
জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশে
পরিণত
করেছিলেন।
২০২১ সালে
খাদ্যনালীর ক্যানসারে আক্রান্ত হন
ফরিদা
মজিদ।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৮
সেপ্টেম্বর ঢাকায়
তার
মৃত্যু
হয়।
তার
প্রয়াণে বাংলা
সাহিত্য এক
স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরকে হারায়। কবি
রাজু
আলাউদ্দিন তাঁকে
"সময়ের
চেয়ে
অনেক
এগিয়ে
থাকা"
একজন
লেখক
ও
বুদ্ধিজীবী হিসেবে
স্মরণ
করেন।
আর
কবি
কায়সার হক
তার
স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ফরিদা
মজিদ
ছিলেন
এমন
এক
সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব, যিনি
মানুষের মনে
তার
প্রাণবন্ত উপস্থিতি, সাহসী
চিন্তা
এবং
সাহিত্যপ্রেমের জন্য
চিরস্মরণীয় হয়ে
থাকবেন।
ফরিদা মজিদের
জীবন
আমাদের
স্মরণ
করিয়ে
দেয়
যে
একজন
লেখকের
প্রভাব
শুধু
তার
বইয়ের
পাতায়
সীমাবদ্ধ থাকে
না।
সাহিত্যিকদের জন্য
পরিবেশ
তৈরি
করা,
নতুন
কণ্ঠকে
সামনে
আনা,
ভাষা
ও
সংস্কৃতির মধ্যে
সংযোগ
স্থাপন
করা
এবং
বিশ্বদরবারে বাংলা
সাহিত্যকে মর্যাদার সঙ্গে
উপস্থাপন করাও
একজন
সাহিত্যসাধকের বড়
দায়িত্ব। এই
দায়িত্ব তিনি
নিষ্ঠা,
সাহস
এবং
অসামান্য আন্তরিকতার সঙ্গে
পালন
করেছিলেন। বাংলা
সাহিত্য ও
সংস্কৃতির ইতিহাসে তার
নাম
তাই
একজন
কবি,
অনুবাদক, শিক্ষক
এবং
আন্তর্জাতিক সাহিত্য-সংযোগের অগ্রদূত হিসেবে
দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে
উচ্চারিত হবে।
কবি ফরিদা মজিদের একটি কবিতা
এখানে প্রকাশিত হলো:
আমি
এমন করে
ফরিদা
মজিদ
আমি এমন করে ধ্বংস হয়ে যেতাম
না
যদি হলুদ চন্দ্রমল্লিকার বঙ্কিম
পাপড়ির
মুঠোর অন্ধকারে ঘুমোতে পারতাম।
আমি কোনোদিন বিলীন হয়ে যেতাম
না
যদি পারথেননের ভাঙা শ্বেতপাথরের
ওপর
ঘন পাইনের ছায়ায় কালো কালো ডাঁইপিপড়ের
সঙ্গে
এক সারিতে হাঁটতে পারতাম।
চিন্তাহীন শূন্যমনে চোখ বুঁজে
ঝিম ধরে থাকি যখন
তখন কখনও আনমনে আমার তর্জনী ধীরে
কুঁকড়িয়ে
বুড়ো আঙ্গুলের মাথা ছুঁয়েছে আলতো
ভাবে।
সেই স্পর্শের ক্ষণে আমি অবাক
আনন্দে অনন্ত হয়ে যাই।
তখন পারথেননের সিঁড়ির পিঁপড়ে
কিছু নয় আমার কাছে।
পিরামিডের গরম বালিতে যে বিরাট
নীল গুবরে পোকা পড়ে থাকতে দেখেছিলাম
সেটাও কিছু নয়।
কি যে ভয় পৃথিবীর আর সব অন্ধকার।
শুধু যদি হলুদ মল্লিকার চন্দ্রবঙ্কিম
পাপড়ির
মুঠোর ছায়ায় নিশ্চিন্ত মনে
ঘুমিয়ে পড়তে পারতাম তবে
আমি এমন করে ধ্বংস হয়ে যেতাম
না।
ড. বিজন কুমার শীল বিস্তারিত
বিপরীত স্রোত প্রতিবেদন বিস্তারিত
ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরী বিস্তারিত
যারিন মালিয়াত অদ্রিতা বিস্তারিত
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান বিস্তারিত
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান বিস্তারিত
তিনদিনব্যাপী ডাকটিকিট প্রদর্শ.. বিস্তারিত
বোন ফরিদা মজিদকে নিয়ে ফাহমিদা.. বিস্তারিত
বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে তুল.. বিস্তারিত
শশাঙ্ক সাদী বিস্তারিত