ড. বিজন কুমার শীল
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগীয় প্রধান, অধ্যাপক ড. বিজন কুমার শীল (৫৯) দেশে এবং বিদেশে একজন বিজ্ঞানী ও গবেষক হিসেবে পরিচিত। প্রচারবিমুখ এই ভাইরোলজিস্ট নব্বইয়ের দশকে ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের কালো ছাগলের সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেন। যা বর্তমানে দেশ জুড়ে ছাগল উৎপাদনের ব্যাপকতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০০২ সালে ডেঙ্গু শনাক্তকারী কুইক টেস্ট পদ্ধতি তিনি আবিষ্কার করেন। একজন সার্বক্ষণিক গবেষক ড. বিজন কুমার শীল ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাস শনাক্তের কিট আবিষ্কার করে পৃথিবী জুড়ে আলোচনায় আসেন। সিঙ্গাপুরে তার নামে এটি প্যাটেন্ট করা হয়। এই কাজে সিঙ্গাপুর সরকার তাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দান করে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়া থেকে সার্স প্রতিরোধে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন। কোভিড-১৯ সংক্রমণের শুরু থেকেই তিনি গবেষণায় নেমে পড়েন। করোনা ভাইরাস মানবদেহে কী ক্ষতি করতে পারে এবং এর থেকে পরিত্রাণের উপায় নিয়ে তিনি কাজ শুরু করেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর উৎসাহ ও সহযোগিতায়। যার ফল হিসেবে ১৭ মার্চ ২০২০ তিনি ও তার গবেষণা টিম বাংলাদেশে করোনা শনাক্তের র্যাপিড টেস্ট কিট ‘জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লট’ আবিষ্কারের ঘোষণা দেন পৃথিবীর অনেক দেশ এ নিয়ে কিছু করার আগেই। সুস্থ হয়ে ওঠা করোনা রোগীর প্লাজমা দিয়ে করোনা চিকিৎসায় ‘হাইপার ইমিউন সিরাম থেরাপি’-র বিষয়টি তিনি প্রকাশ করেন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, আর আমেরিকা এর প্রথম প্রয়োগ শুরু করে ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
ড. বিজন কুমার শীল জন্মেছেন ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১ সালে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার কালিকাপুর গ্রামে এক কৃষক পরিবারে। বাবা রসিক চন্দ্র শীল এবং মা কিরণময়ী শীলের ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি পঞ্চম। বনপাড়া সেন্ট জোসেফ হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করে ভর্তি হন ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভেটেরিনারি সায়েন্স বিভাগ থেকে অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। মাস্টার্স করেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে। কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে নিয়ে বৃটেনের ইউনিভার্সিটি অফ সারে-তে পড়াশোনা করতে যান। সেখানে তার পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায় নিয়ে ‘ডেভেলপমেন্ট অফ মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিজ’। ইমিউনোলজির ওপর পোস্ট ডক্টরাল পড়াশোনা করেন জাপানের কিটাসাটো ইউনিভার্সিটিতে। তার নামে চোদ্দটি আবিষ্কারের প্যাটেন্ট রয়েছে। গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে অনেক জার্নালে। গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছেন বিশ্বের বহু দেশে। শিক্ষা জীবন থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠা ড. বিজন কুমার শীল কর্মজীবনেও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। কিন্তু সব সময়ই তিনি কাজের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন এবং দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনে কখনোই অবহেলা করেন নি। যার ফলে দেশের বাইরে অনেক সুযোগ সুবিধা স্বীকৃতি ফেলে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং বর্তমানে শিক্ষকতার পাশাপাশি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গবেষণাগারেই তার বড় সময় কাটে। স্ত্রী অপর্ণা রায় একজন প্রাণী চিকিৎসক। তাদের এক ছেলে অর্ণব কুমার বৃটেনের ম্যানচেস্টার ও এক মেয়ে অরুন্ধতী সিঙ্গাপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়েছেন। বর্তমান করোনা পরিস্থিতি ও ভবিষ্যতে করণীয় নিয়ে ড. বিজন কুমার শীলের সঙ্গে সম্প্রতি কথা বলেছেন বিপরীত স্রোত সম্পাদক মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান।

৭ মার্চ ২০২০
গণ
বিশ্ববিদ্যালয়ে
‘সুপ
টু
সিক
বেড’নামে
এক
সেমিনারে
ড.
বিজন
কুমার
শীল
করোনা
ভাইরাসের
গতি
প্রকৃতি
ও
বাংলাদেশে
এর
সম্ভাব্য
প্রভাব
নিয়ে
আলোচনা
করেন
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান:
কোভিড-১৯ বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ার শুরুর সময় থেকেই এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন ও সতর্ক করার চেষ্টা করেন আপনি। ৭ মার্চ ২০২০ গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সুপ টু সিক বেড’ নামে এক সেমিনারে জানিয়েছিলেন, দুটি কারণে করোনা ভাইরাস বাংলাদেশের মানুষের ওপর পশ্চিমি বিশ্বের মতো ক্ষতি করতে পারবে না। বিষয়টি যদি একটু বলতেন।
ড. বিজন কুমার শীল: ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাস নিয়ে আমি কাজ করি সিঙ্গাপুরে। সার্সের সঙ্গে বর্তমান করোনা ভাইরাসের শতকরা আশি ভাগেরও বেশি মিল রয়েছে। সে সময় গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলের মানুষের দেহে এসিই-টু এনজাইমের পরিমাণ কম থাকায় ভাইরাসটি কম আক্রমণ করছে বা তারা আক্রান্ত হলেও কম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কিন্তু চায়নিজ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসিই-টু এনজাইমের পরিমাণ বেশি থাকায় তারা সহজেই আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের কারণে ইমিউন সিস্টেম সক্রিয়। এই দুটো বিষয় বাংলাদেশের মানুষকে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি সুরক্ষিত রেখেছে। ইটালির মানুষের এসিই-টু এনজাইমের পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকলেও তাদের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল থাকায় তারা বেশি অক্রান্ত হয়েছেন।
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান:
বাংলাদেশের মানুষের ইমিউন সিস্টেম কীভাবে আমাদের রক্ষা করছে?
ড. বিজন কুমার শীল: অনেকে বলেছিলেন বাংলাদেশে মৃত্যু এতো বেশি হবে যে পথে ঘাটে লাশ পড়ে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় নি। এদেশের মানুষের ইমিউন সিস্টেম এই প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছে। মানব দেহের প্রতিরক্ষার কাজ করে ইমিউন সিস্টেম। অনেকটা সীমান্তে বাইরের শত্রু মোকাবেলায় বর্ডার গার্ডের মতো। বাংলাদেশের আবহাওয়া, খাবার, নানা রোগ বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে এদেশের মানুষের ইমিউন সিস্টেমকে সব সময়ই সক্রিয় থাকতে হয়। ভাইরাস বা অন্যান্য বাইরের আক্রমণ থেকে সব সময়ই দেহকে রক্ষা করতে তা সজাগ থাকে। আমি ল্যাবরেটরিতে কারো কারো দেহে ভাইরাসের আধিক্য দেখে বিস্মিত হয়ে পড়ি! নানা রকমের ভাইরাসের সঙ্গেই এদেশের মানুষ বসবাস করে। ফলে নতুন কোনো ভাইরাস যদি শরীরে ঢুকতে চায় তখনও এই সিস্টেম তাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। ইটালি বা পশ্চিমি দেশের মানুষের ইমিউন সিস্টেম নিষ্ক্রিয় থাকে। কারণ তাদের সাধারণ জীবনে এই চ্যালেঞ্জগুলো কম। তারা অনেক রোগের প্রতিষেধক তৈরি করেছে। আমাদের মতো হাজারো ভাইরাসের মুখোমুখি তাদের হতে হয় না। তাদের