অধ্যাপক ড. আসিফ মিজান
রাষ্ট্রনীতি,
প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন এবং রাজনৈতিক অপরাধবিজ্ঞানের
(Political Criminology) গবেষণায়
আমরা প্রায়শই লৌকিক বৈধতা এবং কাঠামোগত নৈতিকতার
মধ্যে একটি বিপজ্জনক দূরত্ব
লক্ষ্য করি। বাংলাদেশের মতো
গভীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে
বিশ্বাসী একটি সমাজে, ব্যক্তিগত
ধার্মিকতা (যার প্রতীক 'প্রার্থনা')
এবং জনসমক্ষে আচরণের (যার প্রতীক 'মুখের
ভাষা বা জিহ্বা') মধ্যকার
বৈপরীত্যটি রাজনৈতিক সুস্থতা পরিমাপের একটি অন্যতম মাপকাঠি।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন একদিকে নৈতিক
বা আদর্শিক বার্তা দিয়ে নিজেদের বৈধতা
জাহিরের চেষ্টা করে, আর অন্যদিকে
প্রতিপক্ষকে নির্মূল, মেরুকরণ ও ধ্বংস করতে
মুখের ভাষাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন মূলত
সামাজিক চুক্তিটিই ভেঙে পড়ে।
লৌকিক
ধার্মিকতার কোনো প্রদর্শনই একটি
রাষ্ট্রকে সেই প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়
ও কাঠামোগত সহিংসতা থেকে বাঁচাতে পারে
না—যা জন্ম নেয়
মুখের ভাষার ধ্বংসাত্মক রূপ থেকে।
তাত্ত্বিক
রূপরেখা: বক্তৃতার অপব্যবহার ও অস্ত্রায়নঃ
কীভাবে
একটি ‘ধ্বংসাত্মক জিহ্বা’ প্রাতিষ্ঠানিক গুণ বা ‘প্রার্থনা’র পুণ্যকে নস্যাৎ
করে দেয়, তা বুঝতে
আমাদের জার্মান দার্শনিক য়ুর্গেন হাবেরমাসের ‘কমিউনিকেটিভ অ্যাকশন থিওরি’র (Theory of Communicative
Action) দিকে তাকাতে হবে। হাবেরমাস উল্লেখ
করেছেন, একটি কার্যকর গণতন্ত্র
‘আদর্শ বাক-পরিস্থিতি’র
(Ideal Speech Situations) ওপর
নির্ভর করে, যেখানে রাজনৈতিক
সংলাপ পারস্পরিক সমঝোতা, সত্যসন্ধান এবং গণতান্ত্রিক ঐকমত্যের
ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।
বিপরীতভাবে,
রাজনৈতিক বক্তব্য যখন উসকানি, অবমাননা
এবং চরম মেরুকরণের দিকে
ধাবিত হয়, তখন তা
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর বর্ণিত ‘ডিসকার্সিভ পাওয়ার’ বা ‘বক্তৃতার ক্ষমতা’য় (Discursive Power) রূপান্তরিত হয়। এখানে ‘জিহ্বা’
বা ভাষা কেবল যোগাযোগের
মাধ্যম থাকে না; এটি
এমন এক মারণাস্ত্র হয়ে
ওঠে যা ভিন্নমতকে অপরাধ
হিসেবে গণ্য করার জন্য
এক ধরণের ‘সত্যের শাসন’ (Regimes of Truth) তৈরি করে। রাজনৈতিক
এলিটরা যখন এই ধ্বংসাত্মক
রাজনৈতিক বক্তৃতায় মেতে ওঠেন, তখন
তারা একটি ‘শূন্য-সমষ্টির’ (Zero-sum) রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করেন। এমন
পরিবেশে, উপরিস্তরের গণতান্ত্রিক আচার বা ব্যক্তিগত
উপাসনা (‘প্রার্থনা’) কোনোটিই রাষ্ট্রকে ভাষাগত সহিংসতার হাত থেকে রক্ষা
করতে পারে না।
রাজনৈতিক
অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ: রাষ্ট্রীয় অপরাধ ও কাঠামোগত ক্ষতিঃ
প্রচলিত
অপরাধবিজ্ঞান যেখানে কেবল ব্যক্তি-পর্যায়ের
দৃশ্যমান অপরাধ নিয়ে আলোচনা করে,
সেখানে ‘রাজনৈতিক অপরাধবিজ্ঞান’ ক্ষমতার টিকিয়ে রাখার স্বার্থে রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান
এবং এলিট নেটওয়ার্কের সংঘটিত
অপরাধের দিকে আলোকপাত করে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে, একটি ‘ধ্বংসাত্মক জিহ্বা’ কেবল শিষ্টাচারের অভাব
নয়- এটি মূলত কাঠামোগত
এবং প্রতীকী সহিংসতার (Symbolic Violence)
একটি সুপরিকল্পিত রূপ।
‘টেকনিকস
অব নিউট্রালাইজেশন’ (Sykes and
Matza): রাজনৈতিক চরিত্রগুলো প্রায়শই তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঢাকতে নৈতিক বা আদর্শিক বয়ানকে
(‘প্রার্থনা’) একটি মনস্তাত্ত্বিক ঢাল
হিসেবে ব্যবহার করে। নিজেদের পরম
ধার্মিক বা ন্যায়পরায়ণ প্রমাণ
করে তারা নিজেদের কৃত
অপরাধের গ্লানিকে আড়াল করতে চায়।
তাদের ‘জিহ্বা’ তখন প্রতিপক্ষকে এমনভাবে
কলঙ্কিত করে, যেন তাদের
অধিকার হরণ, যথেচ্ছ গ্রেফতার
বা পদ্ধতিগত বর্জন সমাজে বৈধ বলে মনে
হয়।
রাষ্ট্র-সংগঠিত বিচ্যুতি (State-Organized
Deviancy): যখন শাসক এলিটদের ভাষা
নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘অস্তিত্বের জন্য
হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন তা
প্রকারান্তরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা
ও নিম্ন আদালতকে এই বার্তা দেয়
যে, ওই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর
জন্য সাধারণ আইনি সুরক্ষা প্রযোজ্য
নয়। ফলে এই ধ্বংসাত্মক
ভাষা রাষ্ট্রীয় অপরাধের পথ প্রশস্ত করে,
যেখানে আইনকে সুরক্ষার বদলে নিপীড়নের হাতিয়ার
করা হয়।
বাংলাদেশের
প্রেক্ষাপট: লৌকিক ধার্মিকতা বনাম বক্তব্য-সহিংসতাঃ
বাংলাদেশের
রাজনৈতিক ইতিহাস এই তাত্ত্বিক সংকটের
একটি জীবন্ত উদাহরণ। বিশেষ করে ২০২৪ সালের
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের আগের ও পরের
উত্তাল রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,
রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের জন্য দুটি পরস্পরবিরোধী
পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
একদিকে দৃশ্যমান পুণ্য বা 'প্রার্থনা'র
রাজনীতি, যেখানে রাজনৈতিক দল ও কুশীলবেরা
সবসময়ই প্রতীকী ধার্মিকতা বা নৈতিকতার পেছনে
ব্যাপক বিনিয়োগ করেন। এর মধ্যে রয়েছে
ধর্মীয় অনুভূতির প্রকাশ, জাতীয়তাবাদী বয়ান এবং আইনের
শাসনের প্রতি আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি- যা জনগণের সাথে
একটি লৌকিক সংযোগ তৈরির প্রয়াস।
এর
সমান্তরালে, রাজনীতির কার্যকর ভাষাটি দাঁড়িয়ে আছে চরম অমানবিকীকরণের
(Dehumanization) ওপর। প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ‘প্রতিযোগী’ ভাবার বদলে ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ হিসেবে চিত্রায়িত করতে শব্দকে রীতিমতো
অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই
বিষাক্ত ভাষা ক্ষমতার প্রতিটি
রূপান্তরকে করে তোলে সহিংস
ও অনিশ্চিত, কারণ প্রতিটি পক্ষই
ক্ষমতা হারালে অপর পক্ষের ‘জিহ্বা’
দ্বারা সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কায় ভোগে।
তৃণমূল
স্তরে প্রভাব: স্থানীয় সরকার নির্বাচনঃ
জাতীয়
এলিটদের এই বিষাক্ত ভাষা
কেবল রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি
ক্রমান্বয়ে নিচে নেমে আসে
এবং ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশন
নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার
নির্বাচনে সরাসরি শারীরিক সহিংসতায় রূপ নেয়। বাংলাদেশে
স্থানীয় নির্বাচনকে তৃণমূলের গণতন্ত্র এবং নাগরিক সেবা
নিশ্চিতের মূল ভিত্তি ধরা
হয়। তবে জাতীয় রাজনীতির
ভাষা যখন কলুষিত হয়,
তখন স্থানীয় নির্বাচনে এর মারাত্মক অপরাধবৈজ্ঞানিক
ও প্রশাসনিক প্রভাব পড়ে:
তৃণমূল
প্রচারণার অপরাধীকরণঃ
জাতীয়
নেতাদের বক্তব্য থেকে যখন স্থানীয়
প্রার্থীরা ধারণা নেন যে প্রতিপক্ষের
কোনো অস্তিত্ব থাকার অধিকার নেই, তখন তারা
একে ভোটারদের ভয় দেখানো এবং
ভোট কেন্দ্র দখলের পরোক্ষ লাইসেন্স হিসেবে ধরে নেন। স্থানীয়
নেতার ‘ধ্বংসাত্মক জিহ্বা’ সরাসরি নির্বাচনী সহিংসতা এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অপব্যবহারকে উসকে দেয়।
সামাজিক
সম্প্রীতি বিনষ্টঃ
বাংলাদেশের
গ্রামীণ ও শহরতলি এলাকার
সমাজ ব্যবস্থা অত্যন্ত সুসংহত ও পারস্পরিক সম্পর্কের
ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যখন নির্বাচনী প্রচারণা
চরম মেরুকরণ ও মানহানিকর ভাষায়
পরিচালিত হয়, তখন তা
স্থায়ীভাবে সামাজিক সুতো ছিঁড়ে ফেলে।
প্রতিবেশী পরিণত হয় শত্রুতে, এবং
স্থানীয় বিরোধগুলো রক্তক্ষয়ী কোন্দলে রূপ নেয়।
স্থানীয়
সুশাসনের পতনঃ
যে
জনপ্রতিনিধি বক্তব্য এবং শক্তির জোরে
প্রতিপক্ষকে উচ্ছেদ করে নির্বাচিত হন,
তার পক্ষে পরবর্তীতে অন্তর্ভুক্তিমূলক সুশাসন নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে
পড়ে। একজন ইউনিয়ন পরিষদ
চেয়ারম্যান বা পৌর মেয়র
যিনি তার ‘জিহ্বা’ দিয়ে
অর্ধেক নাগরিককে শত্রু বানিয়েছেন, তিনি কখনোই সরকারি
সম্পদ বা সামাজিক নিরাপত্তা
বেষ্টনীর সুষম বণ্টন করতে
পারেন না। ফলে স্থানীয়
সরকার তার নাগরিক চরিত্র
হারিয়ে একটি দলীয় দুর্গে
পরিণত হয়।
রাজনৈতিক
ভাষার মাধুর্য ও পরমতসহিষ্ণুতার আহ্বানঃ
রাষ্ট্রবিজ্ঞান
এবং অপরাধবিজ্ঞানের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ এটাই বলে যে,
ক্ষমতার প্রতিদিনকার চর্চা যেখানে পদ্ধতিগত ধ্বংসযজ্ঞের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে
কেবল লৌকিক আচার বা প্রতীকী
প্রার্থনা দিয়ে কোনো ব্যবস্থার
মুক্তি আসতে পারে না।
বাংলাদেশের একটি টেকসই গণতান্ত্রিক
ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সরকারি দল কিংবা বিরোধী
দল—উভয় পক্ষকেই ভাষা
ব্যবহারে চরম সংযম ও
ইতিবাচকতার পরিচয় দিতে হবে। মনে
রাখতে হবে, রাজনৈতিক বিরোধিতা
মানেই ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়। এমনকি তীব্র
সমালোচনা বা মতবিরোধ প্রকাশের
ক্ষেত্রেও গ্রহণযোগ্য শব্দচয়ন ও শালীন ‘বডি
ল্যাংগুয়েজ’ বা শারীরিক ভাষার
ব্যবহার নিশ্চিত করা আবশ্যক।
বিশেষ
করে, পরমতসহিষ্ণুতা (Tolerance for
dissent) যে বহুদলীয় গণতন্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য- এই সত্যটি কেবল
রাজনৈতিক বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি
রাজনৈতিক কর্মীকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে
এবং দৈনন্দিন আচরণে তার প্রতিফলন ঘটাতে
হবে। প্রকৃত সুশাসন সংস্কার কেবল কাগজের আইন
পরিবর্তন বা রুটিনমাফিক নির্বাচনের
মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর সূচনা
হতে হবে রাজনৈতিক ভাষার
মার্জিত রূপ ও পারস্পরিক
শ্রদ্ধাবোধের মধ্য দিয়ে। জিহ্বাকে
বর্জনের হাতিয়ার না বানিয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যম করতে হবে। যতদিন
না এই রূপান্তর ঘটছে,
ততদিন কোনো প্রতীকী পুণ্য
বা ‘প্রার্থনা’ রাষ্ট্রকে তার নিজস্ব ভাষার
তৈরি করা অন্তহীন অস্থিরতা
থেকে রক্ষা করতে পারবে না।
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।
ড. বিজন কুমার শীল বিস্তারিত
বিপরীত স্রোত প্রতিবেদন বিস্তারিত
ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরী বিস্তারিত
যারিন মালিয়াত অদ্রিতা বিস্তারিত
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান বিস্তারিত
অধ্যাপক ড. আসিফ মিজান বিস্তারিত
রোবট তৈরি করি প্রযুক্তি দিয়ে,.. বিস্তারিত
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান বিস্তারিত
স্বদেশের মাটিতে চ্যালেঞ্জ নেও.. বিস্তারিত
It was once called the King of.. বিস্তারিত