English
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-০৮-০৩ ১৮:৪০:২৬
আপডেটঃ ২০২৬-০৮-০৬ ০০:৩৯:১৮


জামদানিতে জীবনের গল্প

জামদানিতে জীবনের গল্প

জামদানি বুনে যে নারী, পরে না সে শাড়ি

জামদানি তো শুধু শাড়ি নয়, জীবনের গল্প গাঁথাও


নজরুল ইসলাম লিখন

কথায় বলে শাড়িতেই নারী, আর তা যদি হয় জামদানি, তবে তো মজেছেন নারী| প্রতিটি নারীরই শখ জীবনে একবার হলেও জামদানি শাড়ি পরার| জামদানি শাড়ি বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতীক| সূক্ষ্ম নকশা, মসৃণ বুনন এবং নান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য এই শাড়ির কদর সবসময়ই বেশি| সূতার মান কাজের সূক্ষ্মতার ওপর নির্ভর করে একটি জামদানি শাড়ির দাম সাধারণত আড়াই হাজার টাকা থেকে দেড় লাখ টাকা কিংবা তারও বেশি হতে পারে|

ইতিহাস বলে, হাওয়ার মতো ফুরফুরে আর জলের মতো স্বচ্ছ এই শাড়ির জন্ম মোগল আমলে| জামদানি খাঁটি হ্যান্ডলুম এবং এর বুননে তাঁতের টানাপড়েনে সত্যিই মুনশিয়ানা লাগে| তাঁতে বসেই আড়ের দিকের বুনটে তৃতীয় একটি সুতোয় হাতে নকশা তুলতে হয়, আগে থেকে আঁকার কোনো ব্যাপারই নেই| বেশির ভাগই ফ্লোরাল এবং জ্যামিতিক মোটিফ|



দক্ষতা এবং সময়, দুই- জরুরি হাতে বোনা এই অত্যাশ্চর্য বুনন পদ্ধতিতে| ইউনেস্কো ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ অফ হিউম্যানিটি আখ্যায় ভূষিত করেছে এই জামদানি বুননকে! বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবেও তা আজ স্বীকৃত| বুটিদার, তেরছা, ঝালর... নানা নাম, নানা ডিজাইন জামদানি ক্যানভাসে, মসলিন এবং সুতিতে|

জামদানি তো শুধু শাড়ি না গো বাজান, এতে মিশে আছে আমাগো জীবনের গল্পকাহিনী| অভাবের তাড়নায় লাখ টাকার শাড়ি বুনলেও পড়ার ভাগ্য আমাগো অয় না| পেটের খোড়াকই জোগার করতে পারি না| আবার শখের জামদানি পরুম কেমনে| জামদানি বুনে যা পাই তা দিয়ে কোনো রকমে সংসারের খরচ চালাই| মাস শেষে ঋণ হয়ে যায়|’ এমনি করে কথাগুলো বলেন জামদানি কারিগর আলেয়া বেগম।

রূপগঞ্জের জামদানি পল্লীর হাজারো নারী প্রতিনিয়ত অভাবের তাড়নায় পরতে পারেন না বিলাসী, বহুকাঙ্খিত জামদানি শাড়ি| আছিয়া নামের এক কারিগর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, জামদানি বুনে যে নারী, পরতে পারে না সে শাড়ি| জামদানির প্রতি পরতে পরতে (ভাজে) রয়েছে আমাগো জীবনের দুঃখ গাঁথা গল্প কাহিনী|”

রূপসী গ্রামের এক সাধারণ নারী মাসুদার জীবনের গল্প যেন জামদানি শাড়ির মতোই সূক্ষ্ম আর আবেগে ভরা| প্রায় ১১ বছর ধরে স্বামী সন্তানদের সঙ্গে তিনি জামদানি শাড়ি বুনেছেন| নিজের হাতের নিখুঁত কারুকাজে তৈরি অসংখ্য শাড়ি দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হয়েছে| কিন্তু জীবনের প্রায় ৬০ বছর পার হলেও নিজের তৈরি একটি জামদানি শাড়ি পরার সুযোগ তার হয় নি| সংসারের অভাব-অনটনের কারণে তৈরি করা প্রতিটি শাড়িই বিক্রি করে দিতে হতো|



ছেলের দেয়া শাড়ি পরে মাসুদা বলেন, তিনি খুব খুশি| শাড়িটি তার খুব পছন্দ হয়েছে| এত যত্ন করে রাখবেন যে সহজে পরবেন না| তিনি বলেন,‘অনেক খুশি হইছি| এই শাড়ি আলগা (খুব যত্ন করে) করে পরন লাগব| পানিও লাগান যাইব না| আলমারিতে তুইল্যা রাখমু| আবার কোনো বড় অনুষ্ঠান হইলে পরমু|’

মাসুদা বেগমের জীবনভর তাঁতবুনার কাহিনী দীর্ঘ কষ্ট আর ত্যাগের সঙ্গে জড়িত| মাত্র ২৩ বছর বয়সে স্বামীর কাছ থেকে পুটি বোনা শিখেছিলেন তিনি| ভাতের অভাবে বাধ্য হয়ে তিনি ১১ বছর ধরে পুটিতে বসে শাড়ি বুনেছেন, কখনো নিজের সন্তানদের কোলে নিয়ে, কখনো তাদেরই পুটিতে বসিয়ে| তিনি বলেন, “পোলাপানকে লেখাপড়া শেখাতে পারি নি, শুধু বুনেছি|”

বয়োবৃদ্ধ রফিকুল ইসলাম বলেন, আধুনিকতার যুগে জামদানি ধ্বংসের পথে| হাজারও সমস্যার সমাধান করে একে রক্ষা করতে হবে| বাংলার ঐতিহ্য মসলিনের রূপান্তর জামদানিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে|

ব্যাপারে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, জামদানি শুধু একটি শাড়ির নাম নয়| এটা বাঙ্গালীর ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে জড়িত| সরকার শিল্পকে রক্ষায়  বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে|

 

 

 লেখক পরিচিতি:

 

নজরুল ইসলাম লিখন

রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ থেকে 



ক্যাটেগরিঃ জীবনধারা,


আরো পড়ুন