উন্নয়নের যাতাকলে পিষ্ট জনজীবন, বিপন্ন শিল্প-বাণিজ্য
নজরুল ইসলাম লিখন
৫৫
বছরের নাসিমা বেগম| ভাড়ায় থাকেন বরইতলায়| স্বামী অসুস্থ| সড়কের পাশে চা-রুটি
আর পান বিক্রি করে
আসছেন গত এক যুগ
ধরে| এ আয়ের টাকা
দিয়েই চলতো তার সুখের
সংসার| সড়কের কারণে তার কপালে ভাঁজ
পড়েছে| এখন আগের মতো
বেচা বিক্রি নেই| নাসিমা বলেন,
দেশান্তরি অইয়া বাজান এহানে
আইছিলাম বাঁচবার লেইগ্যা| অহন আরো মরার
অবস্থা অইছে| দোহানে আগে ৪ হাজার
টেকা বেচবার পারতাম| অহন ১৫শ-র
বেশি বেচাকেনা অয় না| সংসার
চালানই কষ্ট অইয়া গেছে|
আবার বুড়ার ওষুধ খাওয়ার টেকা
লাগে| নাসিমা বেগমের মতো এশিয়ান হাইওয়ে
সড়কের দুপাশে গড়ে উঠা শত
শত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর এখন মাথায় হাত|
এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের উন্নয়ন কাজ কচ্ছপ গতিতে
চলায় এর নেতিবাচক প্রভাব
এখন জনজীবনে বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে| ঠিকাদারি
প্রতিষ্ঠানের চরম অবহেলা এবং
প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতায় থমকে গেছে রূপগঞ্জসহ
সংশ্লিষ্ট এলাকার চাকা| একদিকে ধুলাবালিতে অতিষ্ঠ জনজীবন, অন্যদিকে লোকসানের ভারে পথে বসেছে
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা| কাঞ্চন সেতুর
পূর্বপাশে সড়কের বেহাল দশা হলেও কাজ
চলছে ধীরগতেতে| অথচ থেমে নেই
টোল আদায়| শুধু যে এশিয়ান
হাইওয়ে সড়কের এ অবস্থা তা-নয়| ঢাকা-সিলেট
মহাসড়কের কাঁচপুর অংশ থেকে পাঁচরুখী
পর্যন্ত ৬ লেনের কাজ
চলছে শামুকের গতিতে| দুই বছওে শেষ
হওয়ার কথা কাজ চলছে
দশ বছরে|
সরেজমিনে
ঘুরে দেখা গেছে, উন্নয়নের
জোয়ারে ভাসার কথা থাকলেও এশিয়ান
হাইওয়ে সড়কের নারায়ণগঞ্জের মদনপুর থেকে গাজীপুরের ভোগরা
পর্যন্ত ৪৮ কিলোমিটার এখন
হয়ে দাড়িঁয়েছে জনদূর্ভোগের এক মরণফাঁদ| পিচঢালা
পথের বুক চিরে ধুলার
কুয়াশা আর কচ্ছপ গতির
নির্মাণকাজে থমকে গেছে এ
অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা| একদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম উদাসীনতা, অন্যদিকে
জেলা প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা-এই দুইয়ের যাঁতাকলে
পিষ্ট হয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন ক্ষুদ্র
ব্যবসায়ীরা| দিশেহারা হয়ে পড়ছেন বড়
বড় শিল্পোদ্যোক্তারা| একটি মহাসড়ক সংস্কারের
দীর্ঘসূত্রতা কীভাবে একটি সমৃদ্ধ জনপদকে
দেউলিয়ার পথে ঠেলে দিচ্ছে,
তার আদ্যেপান্ত নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধানী
প্রতিবেদন|
নারায়ণগঞ্জ
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর
সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর
জেলার জয়দেবপুর ভোগড়া
মোড়) থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলার
মদনপুর(ঢাকা-চট্রাগ্রাম মহাসড়ক)
পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৮ কিলোমিটার সড়কটি
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তরের কাজ চলছে| ২০১৮
সালে চুক্তি স্বাক্ষরের
পর ২০১৯ সাল থেকে
কাজ শুরু হয়| প্রাথমিক
লক্ষমাত্রা ছিলো ২০২৪ সালের
মধ্যে কাজ শেষ করা|
তবে জমি অধিগ্রহণ ও
নানা জটিলতার কারণে মেয়াদ আরো বাড়ানো হয়েছে|
শুরুতে এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত
ব্যয় ছিলো প্রায় ৩
হাজার ৫০০ কোটি টাকা|
মূলত বেসরকারি বিনিয়োগের বাইরেও সরকারের নিজস্ব ব্যয় এক হাজার
কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে| যা ২৫
বছওে পরিশোধ করবে সরকার| প্রকল্প
বাস্তবায়নে রয়েছে চীনের সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ
গ্রুপের পক্ষে মি. জোফাং এবং
স্থানীয় অংশীদার হিসেবে আছে শামীম এন্টারপ্রাইজের
ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল হক
ও ইউডিসি কনস্ট্রাকশন লিমিটেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কালাম হোসাইন|
প্রকল্পের আওতায় গাজীপুরের ভোগড়া, মীরেরবাজার, বস্তুল, ধীরাশ্রম ও
কাঞ্চন সেতুর আগে নিমার্ণ করা
হবে ৫ টি ফ্লাইওভার
ও ২৫ টি আন্ডারপাস|
রোববার
সকালে কাঞ্চন সেতুর পূর্বপাশে গিয়ে দেখা যায়,
সড়কের কাজ চলছে ঢিমেতালে|
সড়কের বেহাল দশার কারণে মায়ারবাড়ির
আশপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হোটেল-রেস্তোরা, ক্ষুদ্র ব্যবসা লাটে উঠেছে| বড়
শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাঁচামাল বোঝাই ট্রাক লোড-আনলোড করতে
পারছে না| এখানকার জমজম
ও তিন কন্যাসহ তিনটি
হোটেল বন্ধ হয়ে গেছে|
চা, মুদি-মনোহরী দোকানগুলোতে
আগের মতো বেচাকেনা হচ্ছে
না| মায়ার বাড়ি এলাকায় বসবাস
করেন হাবিবুর রহমান| তিনি একজন চাকুরীজীবি|
তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, সেতুর অংশটুকু প্রায় আধা কিলোমিটার| অথচ
এখানকার নির্মাণ কাজ চলছে থেমে
থেমে| কেউ কিছু বলাল
নেই| ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠেছে| বেশ
কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে
এর আশপাশে| সড়কের বাজে অবস্থার কারণে
বড় ট্রাকগুলো আসতে সমস্যা হচ্ছে|
অথচ টোল আদায় ঠিকই
হচ্ছে|
অনুসন্ধানে
জানা গেছে, সড়কের এই বেহাল অবস্থার
পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত সিন্ডিকেট| পিচ ও পাথরের
মিশ্রণে কারিগরি মান বজায় না
রেখে অতি নিন্মমানের বিটুমিন
ব্যবহার করা হচ্ছে| গ্রেডের
পাথরের বদলে নিম্মমানের লোকাল
খোয়া এবং বালু ব্যবহার
করা হচ্ছে| বেশ কিছু স্থানে
গার্ডার ভেঙ্গে পড়ার দৃশ্য দেখা
গেছে| পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য
বৃষ্টিতেই গাউসিয়া থেকে মদনপুর পর্যন্ত
পানি জমে থাকে| কাজ
সমাপ্ত হওয়ার আগেই ভুয়া ভাউচারের
মাধ্যমে বিল তুলে নেওয়ার
অভিযোগ উঠেছে| প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের প্রতি কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ ব্যয় ৫ থেকে
১০ গুণ বেশি, যার
বড় একটি অংশই অপচয়
ও দুর্ণীতির পকেটে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে
করছেন| অভিযোগ রয়েছে, সড়কের উন্নয়ন কাজ ধীরগতিতে চললেও
টোল আদায়ে কোনো ঘাটতি নেই|
স্থানীয়রা অভিযোগ তুলে বলেন, সংস্কারের
নামে আগের রাস্তার পিচ
ও খোয়া তুলে ফেলে
না দিয়ে, তা-ই আবার
নতুন স্তরে মিমিয়ে দেওয়ার প্রমাণ রয়েছে কালের কণ্ঠের হাতে| স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী মাটির কম্প্যাকশন না করেই তড়িঘড়ির
করে পিচঢালাই দেওয়া হয়| নাম প্রকাশে
অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন,
এসব কাজ সব করা
হয় রাতের আঁধারে|
সরেজমিনে
ঘুরে দেখা গেছে, এশিয়ান
হাইওয়ে সড়কের চার লেনের কাজের
মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও
এখনো অনেক জায়গায় কেবল
খুঁড়োখুঁড়ির মধ্যেই সীমাবব্ধ| গোলাকান্দালের নীল ভিটা এলাকা
থেকে শুরু করে মদনপুর
পর্যন্ত এখনো এবড়ো-থেবড়ো
অবস্থা| সড়কের বিভিন্ন অংশে পিচ ঢালাই
না থাকায় প্রতিদিন শত শত যানবাহন
ধুলার কুয়াশা ভেদ করে চলাচল
করছে| ধুলার কারণে আশপাশের বাসিন্দারা শ্বাসকষ্ট ও সর্দি-কাশিসহ
নানা চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন| গোলাকান্দাইলের শীলপাড়া এলাকার শশী রাণী সাহা,
কমলা রাণী সাহা বলেন,
অনেক কষ্টে আছি| দিনরাইত বালু
উড়ে| ভাতও খাইবার পারি
না| বালু লাগে| কবে
যে এই কাম শেষ
অইবো ভগবানে জানে ?
সরেজমিনে
ঘুরে দেখা গেছে, ভোগরা
থেকে মদনপুর পর্যন্ত সড়কের ধারে কয়েক হাজার
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এখন নিঃস্ব| ধুলার
কারণে দোকানের মালামাল নষ্ট হচ্ছে| আবার
সড়কের দুরাবস্থার কারণে ক্রেতারাও দোকানে আসছে না| বরইতলা
এলাকায় কথা হয় পঞ্চার্ধ্বো
নারী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নাসিমা বেগমের সঙ্গে| তিনি বলেন, বাজান
রাস্তায় আমাগো কফালডা শেষ কইরা দিছে|
আগে বেচবার পারতাম দিনে ৪ হাজার
টেকা| আর অহন বেচবার
পারি ১৫শ টেকা| তা-ও অনেক কষ্ট
হয়| কাষ্টমার আহে না| রাস্তা
খারাপ| আবার বালু ওড়ে|
পলখান এলাকার বিসমিল্লাহ হোটেলের মালিক রবিউল মিয়া আরো এক
বছর আগে হোটেল বন্ধ
করে এখন অটো চালান|
খুঁজে বের করে কথা
হয় তার সঙ্গে| তিনি
ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, বলেনতো ভাই এই সড়কটা
অইতে এতো বছর লাগে
ক্যান| হেরা কি করে
? রাস্তার কারণে কাষ্টমার নাই| হোটেলডা বন্ধ
করছি এক বছর অইছে|
আগে ধুমছে বেচাকেনা অইতো| যেই রাস্তার কাম
শুরু অইলো হেরপরতে কাষ্টমার
নাই| এহন হোটেল বন্ধ
কইরা অটো চালাই| এটা
শুধু নাসিমা কিংবা রবিউল
মিয়ার ক্ষোভ নয়| তাদেও মতো
হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ক্ষোভ|
বেহাল সড়কের কারণে শুধু যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নিঃস্ব হয়েছেন তা নয়, বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন| সড়কের পাশে গড়ে উঠা বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠিগুলো এখন বড় ধরণের লোকসানের মুখে পড়েছে| ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে কাঁচামাল বহনকারী ট্রাক ও কন্টেইনার যখাসময়ে কারখানায় পৌঁছাতে পারছে না| যেখানে এক ঘন্টার পথ, সেখানে সময় লাগছে চার থেকে পাঁচ ঘন্টা| যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অনেক উদ্যোক্তা বিদেশি বা স্থানীয় বড় অর্ডার হারাচ্ছেন| উৎপাদন খরচ বাড়লেও সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বড় শিল্পকারখানাগুলো এখন দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম| কথা হয় পূবাইল মনীষা এপারেলের নিরাপত্তা কর্মকর্তা জহিরউদ্দিনের সঙ্গে| তিনি বলেন, রাস্তা মেরামতের কারণে দীর্ঘদিন ধইরা ট্রাক ঢুকবার পারে না| বাড়তি খরচ লাগতাছে| কবে যে ঠিক অইবো আল্লাহই জানে| স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, সড়কের এই খারাপ অবস্থার কারণে পণ্য পরিবহনের সময় বেশি লাগছে এবং খরচ বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর|

স্থানীয়রা
অভিযোগ তুলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার
কোন তাগিদ নেই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি
প্রতিষ্ঠানের| কাজ চলাকালীন বিকল্প
রাস্তার ব্যবস্থা কিংবা ধুলা নিরারণে নিয়মিত
পানি ছিটানোর কথা থাকলেও তা
নামমাত্র করা হচ্ছে| সড়কের
নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিতো আছেন
৬০ বছর বয়সী পানজোড়া
এলাকার নিরাপত্তা প্রহরী কফিল কাজী| তিনি
ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, হেরা এহান দিয়া
একটু কাম করে| আবার
যায়গা পলহান| আবার রাতুরা| ইঞ্জিনিয়ার
তো কয়েকটা| রাস্তা প্রথমতেই খারাপ করছে| আগের রাস্তা বাদ
দিয়ে অন্য দিয়া রাস্তা
নিছে| হেরা কিয়ের লেইগা
করলো হেরাই জানে| বরইতলার কালভার্টটা কয়েকবার ভাঙছে, কয়েকবার করছে|
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এশিয়ান হাইওয়ে কেবল একটি সড়ক নয়, এটি আঞ্চলিক বাণিজ্যের অন্যতম ধমনী| কিন্তু গত এক যুগের পরিসংখ্যান বলছে, এই ধমনী এখন সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত| রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ও যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যানুযায়ী, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে গত এক যুগে ছোট-বড় প্রায় ১২শর উপড়ে দূর্ঘটনা ঘটেছে| এতে এক যুগে অন্তত ৭৫০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন