English
ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-১৫ ২১:৩৮:৩০
আপডেটঃ ২০২৬-১১-০৩ ১৮:৪১:২৬


এশিয়ান হাইওয়েতে কচ্ছপ গতি

এশিয়ান হাইওয়েতে কচ্ছপ গতি


উন্নয়নের যাতাকলে পিষ্ট জনজীবন, বিপন্ন শিল্প-বাণিজ্য

নজরুল ইসলাম লিখন

৫৫ বছরের নাসিমা বেগম| ভাড়ায় থাকেন বরইতলায়| স্বামী অসুস্থ| সড়কের পাশে চা-রুটি আর পান বিক্রি করে আসছেন গত এক যুগ ধরে| এ আয়ের টাকা দিয়েই চলতো তার সুখের সংসার| সড়কের কারণে তার কপালে ভাঁজ পড়েছে| এখন আগের মতো বেচা বিক্রি নেই| নাসিমা বলেন, দেশান্তরি অইয়া বাজান এহানে আইছিলাম বাঁচবার লেইগ্যা| অহন আরো মরার অবস্থা অইছে| দোহানে আগে ৪ হাজার টেকা বেচবার পারতাম| অহন ১৫শ-র বেশি বেচাকেনা অয় না| সংসার চালানই কষ্ট অইয়া গেছে| আবার বুড়ার ওষুধ খাওয়ার টেকা লাগে| নাসিমা বেগমের মতো এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের দুপাশে গড়ে উঠা শত শত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর এখন মাথায় হাত| এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের উন্নয়ন কাজ কচ্ছপ গতিতে চলায় এর নেতিবাচক প্রভাব এখন জনজীবনে বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে| ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম অবহেলা এবং প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতায় থমকে গেছে রূপগঞ্জসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার চাকা| একদিকে ধুলাবালিতে অতিষ্ঠ জনজীবন, অন্যদিকে লোকসানের ভারে পথে বসেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা| কাঞ্চন সেতুর পূর্বপাশে সড়কের বেহাল দশা হলেও কাজ চলছে ধীরগতেতে| অথচ থেমে নেই টোল আদায়| শুধু যে এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের এ অবস্থা তা-নয়| ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাঁচপুর অংশ থেকে পাঁচরুখী পর্যন্ত ৬ লেনের কাজ চলছে শামুকের গতিতে| দুই বছওে শেষ হওয়ার কথা কাজ চলছে দশ বছরে| 

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসার কথা থাকলেও এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের নারায়ণগঞ্জের মদনপুর থেকে গাজীপুরের ভোগরা পর্যন্ত ৪৮ কিলোমিটার এখন হয়ে দাড়িঁয়েছে জনদূর্ভোগের এক মরণফাঁদ| পিচঢালা পথের বুক চিরে ধুলার কুয়াশা আর কচ্ছপ গতির নির্মাণকাজে থমকে গেছে এ অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা| একদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম উদাসীনতা, অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা-এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা| দিশেহারা হয়ে পড়ছেন বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তারা| একটি মহাসড়ক সংস্কারের দীর্ঘসূত্রতা কীভাবে একটি সমৃদ্ধ জনপদকে দেউলিয়ার পথে ঠেলে দিচ্ছে, তার আদ্যেপান্ত নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন|

নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর  ভোগড়া মোড়) থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলার মদনপুর(ঢাকা-চট্রাগ্রাম মহাসড়ক) পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৮ কিলোমিটার সড়কটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তরের কাজ চলছে| ২০১৮ সালে চুক্তি  স্বাক্ষরের পর ২০১৯ সাল থেকে কাজ শুরু হয়| প্রাথমিক লক্ষমাত্রা ছিলো ২০২৪ সালের মধ্যে কাজ শেষ করা| তবে জমি অধিগ্রহণ ও নানা জটিলতার কারণে মেয়াদ আরো বাড়ানো হয়েছে| শুরুতে এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিলো প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা| মূলত বেসরকারি বিনিয়োগের বাইরেও সরকারের নিজস্ব ব্যয় এক হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে| যা ২৫ বছওে পরিশোধ করবে সরকার| প্রকল্প বাস্তবায়নে রয়েছে চীনের সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপের পক্ষে মি. জোফাং এবং স্থানীয় অংশীদার হিসেবে আছে শামীম এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল হক ও ইউডিসি কনস্ট্রাকশন লিমিটেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কালাম হোসাইন| প্রকল্পের আওতায় গাজীপুরের ভোগড়া, মীরেরবাজার, বস্তুল, ধীরাশ্রম  ও কাঞ্চন সেতুর আগে নিমার্ণ করা হবে ৫ টি ফ্লাইওভার ও ২৫ টি আন্ডারপাস|

রোববার সকালে কাঞ্চন সেতুর পূর্বপাশে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের কাজ চলছে ঢিমেতালে| সড়কের বেহাল দশার কারণে মায়ারবাড়ির আশপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হোটেল-রেস্তোরা, ক্ষুদ্র ব্যবসা লাটে উঠেছে| বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাঁচামাল বোঝাই ট্রাক লোড-আনলোড করতে পারছে না| এখানকার জমজম ও তিন কন্যাসহ তিনটি হোটেল বন্ধ হয়ে গেছে| চা, মুদি-মনোহরী দোকানগুলোতে আগের মতো বেচাকেনা হচ্ছে না| মায়ার বাড়ি এলাকায় বসবাস করেন হাবিবুর রহমান| তিনি একজন চাকুরীজীবি| তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, সেতুর অংশটুকু প্রায় আধা কিলোমিটার| অথচ এখানকার নির্মাণ কাজ চলছে থেমে থেমে| কেউ কিছু বলাল নেই| ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠেছে| বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে এর আশপাশে| সড়কের বাজে অবস্থার কারণে বড় ট্রাকগুলো আসতে সমস্যা হচ্ছে| অথচ টোল আদায় ঠিকই হচ্ছে| 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সড়কের এই বেহাল অবস্থার পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত সিন্ডিকেট| পিচ ও পাথরের মিশ্রণে কারিগরি মান বজায় না রেখে অতি নিন্মমানের বিটুমিন ব্যবহার করা হচ্ছে| গ্রেডের পাথরের বদলে নিম্মমানের লোকাল খোয়া এবং বালু ব্যবহার করা হচ্ছে| বেশ কিছু স্থানে গার্ডার ভেঙ্গে পড়ার দৃশ্য দেখা গেছে| পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই গাউসিয়া থেকে মদনপুর পর্যন্ত পানি জমে থাকে| কাজ সমাপ্ত হওয়ার আগেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে| প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের প্রতি কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ ব্যয় ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি, যার বড় একটি অংশই অপচয় ও দুর্ণীতির পকেটে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন| অভিযোগ রয়েছে, সড়কের উন্নয়ন কাজ ধীরগতিতে চললেও টোল আদায়ে কোনো ঘাটতি নেই| স্থানীয়রা অভিযোগ তুলে বলেন, সংস্কারের নামে আগের রাস্তার পিচ ও খোয়া তুলে ফেলে না দিয়ে, তা-ই আবার নতুন স্তরে মিমিয়ে দেওয়ার প্রমাণ রয়েছে কালের কণ্ঠের হাতে| স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী মাটির কম্প্যাকশন না করেই তড়িঘড়ির করে পিচঢালাই দেওয়া হয়| নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, এসব কাজ সব করা হয় রাতের আঁধারে|

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের চার লেনের কাজের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও এখনো অনেক জায়গায় কেবল খুঁড়োখুঁড়ির মধ্যেই সীমাবব্ধ| গোলাকান্দালের নীল ভিটা এলাকা থেকে শুরু করে মদনপুর পর্যন্ত এখনো এবড়ো-থেবড়ো অবস্থা| সড়কের বিভিন্ন অংশে পিচ ঢালাই না থাকায় প্রতিদিন শত শত যানবাহন ধুলার কুয়াশা ভেদ করে চলাচল করছে| ধুলার কারণে আশপাশের বাসিন্দারা শ্বাসকষ্ট ও সর্দি-কাশিসহ নানা চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন| গোলাকান্দাইলের শীলপাড়া এলাকার শশী রাণী সাহা, কমলা রাণী সাহা বলেন, অনেক কষ্টে আছি| দিনরাইত বালু উড়ে| ভাতও খাইবার পারি না| বালু লাগে| কবে যে এই কাম শেষ অইবো ভগবানে জানে ?

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ভোগরা থেকে মদনপুর পর্যন্ত সড়কের ধারে কয়েক হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এখন নিঃস্ব| ধুলার কারণে দোকানের মালামাল নষ্ট হচ্ছে| আবার সড়কের দুরাবস্থার কারণে ক্রেতারাও দোকানে আসছে না| বরইতলা এলাকায় কথা হয় পঞ্চার্ধ্বো নারী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নাসিমা বেগমের সঙ্গে| তিনি বলেন, বাজান রাস্তায় আমাগো কফালডা শেষ কইরা দিছে| আগে বেচবার পারতাম দিনে ৪ হাজার টেকা| আর অহন বেচবার পারি ১৫শ টেকা| তা-ও অনেক কষ্ট হয়| কাষ্টমার আহে না| রাস্তা খারাপ| আবার বালু ওড়ে| পলখান এলাকার বিসমিল্লাহ হোটেলের মালিক রবিউল মিয়া আরো এক বছর আগে হোটেল বন্ধ করে এখন অটো চালান| খুঁজে বের করে কথা হয় তার সঙ্গে| তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, বলেনতো ভাই এই সড়কটা অইতে এতো বছর লাগে ক্যান| হেরা কি করে ? রাস্তার কারণে কাষ্টমার নাই| হোটেলডা বন্ধ করছি এক বছর অইছে| আগে ধুমছে বেচাকেনা অইতো| যেই রাস্তার কাম শুরু অইলো হেরপরতে কাষ্টমার নাই| এহন হোটেল বন্ধ কইরা অটো চালাই| এটা শুধু নাসিমা কিংবা  রবিউল মিয়ার ক্ষোভ নয়| তাদেও মতো হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ক্ষোভ|

বেহাল সড়কের কারণে শুধু যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নিঃস্ব হয়েছেন তা নয়, বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন| সড়কের পাশে গড়ে উঠা বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠিগুলো এখন বড় ধরণের লোকসানের মুখে পড়েছে| ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে কাঁচামাল বহনকারী ট্রাক ও কন্টেইনার যখাসময়ে কারখানায় পৌঁছাতে পারছে না| যেখানে এক ঘন্টার পথ, সেখানে সময় লাগছে চার থেকে পাঁচ ঘন্টা| যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অনেক উদ্যোক্তা বিদেশি বা স্থানীয় বড় অর্ডার হারাচ্ছেন| উৎপাদন খরচ বাড়লেও সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বড় শিল্পকারখানাগুলো এখন দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম| কথা হয় পূবাইল মনীষা এপারেলের নিরাপত্তা কর্মকর্তা জহিরউদ্দিনের সঙ্গে| তিনি বলেন, রাস্তা মেরামতের কারণে দীর্ঘদিন ধইরা ট্রাক ঢুকবার পারে না| বাড়তি খরচ লাগতাছে| কবে যে ঠিক অইবো আল্লাহই জানে| স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, সড়কের এই খারাপ অবস্থার কারণে পণ্য পরিবহনের সময় বেশি লাগছে এবং খরচ বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর|



স্থানীয়রা অভিযোগ তুলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার কোন তাগিদ নেই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের| কাজ চলাকালীন বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা কিংবা ধুলা নিরারণে নিয়মিত পানি ছিটানোর কথা থাকলেও তা নামমাত্র করা হচ্ছে| সড়কের নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিতো আছেন ৬০ বছর বয়সী পানজোড়া এলাকার নিরাপত্তা প্রহরী কফিল কাজী| তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, হেরা এহান দিয়া একটু কাম করে| আবার যায়গা পলহান| আবার রাতুরা| ইঞ্জিনিয়ার তো কয়েকটা| রাস্তা প্রথমতেই খারাপ করছে| আগের রাস্তা বাদ দিয়ে অন্য দিয়া রাস্তা নিছে| হেরা কিয়ের লেইগা করলো হেরাই জানে| বরইতলার কালভার্টটা কয়েকবার ভাঙছে, কয়েকবার করছে|

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এশিয়ান হাইওয়ে কেবল একটি সড়ক নয়, এটি আঞ্চলিক বাণিজ্যের অন্যতম ধমনী| কিন্তু গত এক যুগের পরিসংখ্যান বলছে, এই ধমনী এখন সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত| রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ও যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যানুযায়ী, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে গত এক যুগে ছোট-বড় প্রায় ১২শর উপড়ে দূর্ঘটনা ঘটেছে| এতে এক যুগে অন্তত ৭৫০