English
ঢাকা, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-১৫ ২১:৩৮:৩০
আপডেটঃ ২০২৬-০৯-১৯ ০৮:৪৬:২৪


এশিয়ান হাইওয়েতে কচ্ছপ গতি

এশিয়ান হাইওয়েতে কচ্ছপ গতি


উন্নয়নের যাতাকলে পিষ্ট জনজীবন, বিপন্ন শিল্প-বাণিজ্য

নজরুল ইসলাম লিখন

৫৫ বছরের নাসিমা বেগম| ভাড়ায় থাকেন বরইতলায়| স্বামী অসুস্থ| সড়কের পাশে চা-রুটি আর পান বিক্রি করে আসছেন গত এক যুগ ধরে| আয়ের টাকা দিয়েই চলতো তার সুখের সংসার| সড়কের কারণে তার কপালে ভাঁজ পড়েছে| এখন আগের মতো বেচা বিক্রি নেই| নাসিমা বলেন, দেশান্তরি অইয়া বাজান এহানে আইছিলাম বাঁচবার লেইগ্যা| অহন আরো মরার অবস্থা অইছে| দোহানে আগে হাজার টেকা বেচবার পারতাম| অহন ১৫শ- বেশি বেচাকেনা অয় না| সংসার চালানই কষ্ট অইয়া গেছে| আবার বুড়ার ওষুধ খাওয়ার টেকা লাগে| নাসিমা বেগমের মতো এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের দুপাশে গড়ে উঠা শত শত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর এখন মাথায় হাত| এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের উন্নয়ন কাজ কচ্ছপ গতিতে চলায় এর নেতিবাচক প্রভাব এখন জনজীবনে বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে| ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম অবহেলা এবং প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতায় থমকে গেছে রূপগঞ্জসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার চাকা| একদিকে ধুলাবালিতে অতিষ্ঠ জনজীবন, অন্যদিকে লোকসানের ভারে পথে বসেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শিল্পোদ্যোক্তারা| কাঞ্চন সেতুর পূর্বপাশে সড়কের বেহাল দশা হলেও কাজ চলছে ধীরগতেতে| অথচ থেমে নেই টোল আদায়| শুধু যে এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের অবস্থা তা-নয়| ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাঁচপুর অংশ থেকে পাঁচরুখী পর্যন্ত লেনের কাজ চলছে শামুকের গতিতে| দুই বছওে শেষ হওয়ার কথা কাজ চলছে দশ বছরে

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসার কথা থাকলেও এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের নারায়ণগঞ্জের মদনপুর থেকে গাজীপুরের ভোগরা পর্যন্ত ৪৮ কিলোমিটার এখন হয়ে দাড়িঁয়েছে জনদূর্ভোগের এক মরণফাঁদ| পিচঢালা পথের বুক চিরে ধুলার কুয়াশা আর কচ্ছপ গতির নির্মাণকাজে থমকে গেছে অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা| একদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম উদাসীনতা, অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা-এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা| দিশেহারা হয়ে পড়ছেন বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তারা| একটি মহাসড়ক সংস্কারের দীর্ঘসূত্রতা কীভাবে একটি সমৃদ্ধ জনপদকে দেউলিয়ার পথে ঠেলে দিচ্ছে, তার আদ্যেপান্ত নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন|

নারায়ণগঞ্জ সড়ক জনপথ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর  ভোগড়া মোড়) থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলার মদনপুর(ঢাকা-চট্রাগ্রাম মহাসড়ক) পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৮ কিলোমিটার সড়কটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তরের কাজ চলছে| ২০১৮ সালে চুক্তি  স্বাক্ষরের পর ২০১৯ সাল থেকে কাজ শুরু হয়| প্রাথমিক লক্ষমাত্রা ছিলো ২০২৪ সালের মধ্যে কাজ শেষ করা| তবে জমি অধিগ্রহণ নানা জটিলতার কারণে মেয়াদ আরো বাড়ানো হয়েছে| শুরুতে এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিলো প্রায় হাজার ৫০০ কোটি টাকা| মূলত বেসরকারি বিনিয়োগের বাইরেও সরকারের নিজস্ব ব্যয় এক হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে| যা ২৫ বছওে পরিশোধ করবে সরকার| প্রকল্প বাস্তবায়নে রয়েছে চীনের সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপের পক্ষে মি. জোফাং এবং স্থানীয় অংশীদার হিসেবে আছে শামীম এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল হক ইউডিসি কনস্ট্রাকশন লিমিটেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কালাম হোসাইন| প্রকল্পের আওতায় গাজীপুরের ভোগড়া, মীরেরবাজার, বস্তুল, ধীরাশ্রম  কাঞ্চন সেতুর আগে নিমার্ণ করা হবে টি ফ্লাইওভার ২৫ টি আন্ডারপাস|

রোববার সকালে কাঞ্চন সেতুর পূর্বপাশে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের কাজ চলছে ঢিমেতালে| সড়কের বেহাল দশার কারণে মায়ারবাড়ির আশপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হোটেল-রেস্তোরা, ক্ষুদ্র ব্যবসা লাটে উঠেছে| বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাঁচামাল বোঝাই ট্রাক লোড-আনলোড করতে পারছে না| এখানকার জমজম তিন কন্যাসহ তিনটি হোটেল বন্ধ হয়ে গেছে| চা, মুদি-মনোহরী দোকানগুলোতে আগের মতো বেচাকেনা হচ্ছে না| মায়ার বাড়ি এলাকায় বসবাস করেন হাবিবুর রহমান| তিনি একজন চাকুরীজীবি| তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, সেতুর অংশটুকু প্রায় আধা কিলোমিটার| অথচ এখানকার নির্মাণ কাজ চলছে থেমে থেমে| কেউ কিছু বলাল নেই| ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠেছে| বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে এর আশপাশে| সড়কের বাজে অবস্থার কারণে বড় ট্রাকগুলো আসতে সমস্যা হচ্ছে| অথচ টোল আদায় ঠিকই হচ্ছে

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সড়কের এই বেহাল অবস্থার পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত সিন্ডিকেট| পিচ পাথরের মিশ্রণে কারিগরি মান বজায় না রেখে অতি নিন্মমানের বিটুমিন ব্যবহার করা হচ্ছে| গ্রেডের পাথরের বদলে নিম্মমানের লোকাল খোয়া এবং বালু ব্যবহার করা হচ্ছে| বেশ কিছু স্থানে গার্ডার ভেঙ্গে পড়ার দৃশ্য দেখা গেছে| পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই গাউসিয়া থেকে মদনপুর পর্যন্ত পানি জমে থাকে| কাজ সমাপ্ত হওয়ার আগেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে| প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের প্রতি কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ ব্যয় থেকে ১০ গুণ বেশি, যার বড় একটি অংশই অপচয় দুর্ণীতির পকেটে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন| অভিযোগ রয়েছে, সড়কের উন্নয়ন কাজ ধীরগতিতে চললেও টোল আদায়ে কোনো ঘাটতি নেই| স্থানীয়রা অভিযোগ তুলে বলেন, সংস্কারের নামে আগের রাস্তার পিচ খোয়া তুলে ফেলে না দিয়ে, তা- আবার নতুন স্তরে মিমিয়ে দেওয়ার প্রমাণ রয়েছে কালের কণ্ঠের হাতে| স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী মাটির কম্প্যাকশন না করেই তড়িঘড়ির করে পিচঢালাই দেওয়া হয়| নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, এসব কাজ সব করা হয় রাতের আঁধারে|

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের চার লেনের কাজের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও এখনো অনেক জায়গায় কেবল খুঁড়োখুঁড়ির মধ্যেই সীমাবব্ধ| গোলাকান্দালের নীল ভিটা এলাকা থেকে শুরু করে মদনপুর পর্যন্ত এখনো এবড়ো-থেবড়ো অবস্থা| সড়কের বিভিন্ন অংশে পিচ ঢালাই না থাকায় প্রতিদিন শত শত যানবাহন ধুলার কুয়াশা ভেদ করে চলাচল করছে| ধুলার কারণে আশপাশের বাসিন্দারা শ্বাসকষ্ট সর্দি-কাশিসহ নানা চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন| গোলাকান্দাইলের শীলপাড়া এলাকার শশী রাণী সাহা, কমলা রাণী সাহা বলেন, অনেক কষ্টে আছি| দিনরাইত বালু উড়ে| ভাতও খাইবার পারি না| বালু লাগে| কবে যে এই কাম শেষ অইবো ভগবানে জানে ?

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ভোগরা থেকে মদনপুর পর্যন্ত সড়কের ধারে কয়েক হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এখন নিঃস্ব| ধুলার কারণে দোকানের মালামাল নষ্ট হচ্ছে| আবার সড়কের দুরাবস্থার কারণে ক্রেতারাও দোকানে আসছে না| বরইতলা এলাকায় কথা হয় পঞ্চার্ধ্বো নারী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নাসিমা বেগমের সঙ্গে| তিনি বলেন, বাজান রাস্তায় আমাগো কফালডা শেষ কইরা দিছে| আগে বেচবার পারতাম দিনে হাজার টেকা| আর অহন বেচবার পারি ১৫শ টেকা| তা- অনেক কষ্ট হয়| কাষ্টমার আহে না| রাস্তা খারাপ| আবার বালু ওড়ে| পলখান এলাকার বিসমিল্লাহ হোটেলের মালিক রবিউল মিয়া আরো এক বছর আগে হোটেল বন্ধ করে এখন অটো চালান| খুঁজে বের করে কথা হয় তার সঙ্গে| তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, বলেনতো ভাই এই সড়কটা অইতে এতো বছর লাগে ক্যান| হেরা কি করে ? রাস্তার কারণে কাষ্টমার নাই| হোটেলডা বন্ধ করছি এক বছর অইছে| আগে ধুমছে বেচাকেনা অইতো| যেই রাস্তার কাম শুরু অইলো হেরপরতে কাষ্টমার নাই| এহন হোটেল বন্ধ কইরা অটো চালাই| এটা শুধু নাসিমা কিংবা  রবিউল মিয়ার ক্ষোভ নয়| তাদেও মতো হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ক্ষোভ|

বেহাল সড়কের কারণে শুধু যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নিঃস্ব হয়েছেন তা নয়, বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন| সড়কের পাশে গড়ে উঠা বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠিগুলো এখন বড় ধরণের লোকসানের মুখে পড়েছে| ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে কাঁচামাল বহনকারী ট্রাক কন্টেইনার যখাসময়ে কারখানায় পৌঁছাতে পারছে না| যেখানে এক ঘন্টার পথ, সেখানে সময় লাগছে চার থেকে পাঁচ ঘন্টা| যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অনেক উদ্যোক্তা বিদেশি বা স্থানীয় বড় অর্ডার হারাচ্ছেন| উৎপাদন খরচ বাড়লেও সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বড় শিল্পকারখানাগুলো এখন দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম| কথা হয় পূবাইল মনীষা এপারেলের নিরাপত্তা কর্মকর্তা জহিরউদ্দিনের সঙ্গে| তিনি বলেন, রাস্তা মেরামতের কারণে দীর্ঘদিন ধইরা ট্রাক ঢুকবার পারে না| বাড়তি খরচ লাগতাছে| কবে যে ঠিক অইবো আল্লাহই জানে| স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, সড়কের এই খারাপ অবস্থার কারণে পণ্য পরিবহনের সময় বেশি লাগছে এবং খরচ বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর|



স্থানীয়রা অভিযোগ তুলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার কোন তাগিদ নেই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের| কাজ চলাকালীন বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা কিংবা ধুলা নিরারণে নিয়মিত পানি ছিটানোর কথা থাকলেও তা নামমাত্র করা হচ্ছে| সড়কের নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিতো আছেন ৬০ বছর বয়সী পানজোড়া এলাকার নিরাপত্তা প্রহরী কফিল কাজী| তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, হেরা এহান দিয়া একটু কাম করে| আবার যায়গা পলহান| আবার রাতুরা| ইঞ্জিনিয়ার তো কয়েকটা| রাস্তা প্রথমতেই খারাপ করছে| আগের রাস্তা বাদ দিয়ে অন্য দিয়া রাস্তা নিছে| হেরা কিয়ের লেইগা করলো হেরাই জানে| বরইতলার কালভার্টটা কয়েকবার ভাঙছে, কয়েকবার করছে|

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এশিয়ান হাইওয়ে কেবল একটি সড়ক নয়, এটি আঞ্চলিক বাণিজ্যের অন্যতম ধমনী| কিন্তু গত এক যুগের পরিসংখ্যান বলছে, এই ধমনী এখন সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত| রোড সেফটি ফাউন্ডেশন যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যানুযায়ী, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে গত এক যুগে ছোট-বড় প্রায় ১২শর উপড়ে দূর্ঘটনা ঘটেছে| এতে এক যুগে অন্তত ৭৫০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন