English
ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-১০-১৫ ১৭:২২:০৭
আপডেটঃ ২০২৬-১০-১৬ ০৪:০০:৩১


প্রেমের টানে বাংলাদেশ পানে

প্রেমের টানে বাংলাদেশ পানে


 আনোয়ার কবির খান

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, হাজার মাইল পেরিয়ে বিয়ে

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, নিয়মিত কথোপকথন, ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা, তারপর প্রেম। সেই সম্পর্কের টানে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় হাজির হচ্ছেন বিদেশি নাগরিকেরা। কেউ আসছেন চীন থেকে, কেউ ফিনল্যান্ড থেকে। তাদের কেউ বিয়ে করছেন, কেউ বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আবার কারও ক্ষেত্রে নানা জটিলতায় সম্পর্কের পরিণতি হচ্ছে না বিয়েতে।

 

২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এমন কয়েকটি ঘটনা প্রেম, প্রযুক্তি ও আন্তদেশীয় সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে দুই পরিবারের সম্মতি, ধর্ম পরিবর্তন, বয়সের ব্যবধান, পরিচয় যাচাই এবং বিয়ের আইনি আনুষ্ঠানিকতার মতো বিষয়। ব্যক্তিগত ভালোবাসার এসব গল্পের পাশাপাশি উঠে আসছে বদলে যাওয়া সামাজিক সম্পর্কের প্রশ্নও।

 

জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে ৩৮ বছর বয়সী ফিনল্যান্ডের নাগরিক সিমোলা মিকা বিয়ে করেছেন ২৮ বছর বয়সী শান্তিনা জাহান সিমিকে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিনল্যান্ডে বসবাসরত এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তাদের পরিচয় হয়। পরে মুঠোফোনে নিয়মিত যোগাযোগের মধ্য দিয়ে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। দুই পরিবারের সম্মতির পর মিকা বাংলাদেশে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

গত ২ অক্টোবর বাংলাদেশে এসে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নিজের নাম রাখেন মিকাইল। এরপর তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। সিমির আগের সংসারের পাঁচ বছর বয়সী সন্তানকেও নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছেন মিকাইল। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, স্ত্রী ও শিশুটিকে ফিনল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভিসার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিয়ের খবর প্রকাশিত হলেও সরিষাবাড়ী থানার পুলিশ জানিয়েছিল, এ বিষয়ে তাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ তথ্য দেয়নি।

 

বরিশালের বাকেরগঞ্জেও চীনা নাগরিক জিয়াংয়ের সঙ্গে জান্নাতুল ইসলাম ইভার বিয়ের ঘটনা আলোচনায় এসেছে। কালবেলার ১২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের জিয়াংসি প্রদেশের ৩৫ বছর বয়সী জিয়াংয়ের সঙ্গে ইভার পরিচয় হয়েছিল মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে। ইভার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ঢাকার একটি বিপণিবিতানে কয়েকজন চীনা নাগরিকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তাদের মাধ্যমেই জিয়াংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু। পরে উইচ্যাটে নিয়মিত কথোপকথন থেকে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

প্রায় দেড় বছর যোগাযোগের পর গত ৩ আগস্ট জিয়াং বাংলাদেশে আসেন। পরদিন তাদের প্রথম সরাসরি দেখা হয়। এরপর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। ইভা জানান, ভাষার ব্যবধান থাকলেও অনুবাদ অ্যাপ ব্যবহার করে তারা কথা বলেন। বিয়ের পর স্ত্রীকে চীনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথাও জিয়াং জানিয়েছেন। তবে তার বাংলাদেশে অবস্থান ও বিয়ের বিষয়ে পুলিশ আগে অবগত ছিল না বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পাসপোর্ট ও অবস্থানের বৈধতা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার কথাও জানিয়েছিল পুলিশ। তদন্তের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

 

জুলাই মাসে যশোরে চীনা নাগরিক লি বিংয়ের সঙ্গে তন্দ্রা খাতুনের বিয়ের খবর প্রকাশিত হয়। জাগো নিউজ২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হ্যালোটক অ্যাপে পরিচয়ের পর উইচ্যাটে তাদের যোগাযোগ চলতে থাকে। পরে লি বিং বাংলাদেশে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তন্দ্রাকে বিয়ে করেন। একই মাসের শেষ দিকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে চীনা নাগরিক ওয়্যাং সুলিনের সঙ্গে নাজমিন আক্তার লিজার বিয়ের খবর প্রকাশিত হয়। ঢাকা পোস্ট জানায়, ফেসবুকে তাদের পরিচয় হয়েছিল। পরে সুলিন বাংলাদেশে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাদের বিয়ে হয়।

 

এ ধরনের সব সম্পর্ক অবশ্য বিয়েতে পরিণত হয় না। সেপ্টেম্বরে চীনা নাগরিক ডং লিয়াং টাঙ্গাইলের সখীপুরে এসেছিলেন আশিতা নামের এক তরুণীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে। জাগো নিউজ২৪-এর ৬ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিসার মেয়াদসংক্রান্ত জটিলতায় তাকে ঢাকায় চীনা দূতাবাসে পাঠানো হয়। পরে ফিরে এসে বিয়ের চেষ্টা করার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। আবার জুন মাসে কুষ্টিয়ায় এক চীনা নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রেমিকার বয়স কম হওয়ায় বিয়ে সম্পন্ন হয়নি বলে ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব ঘটনা দেখায়, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বয়স, পরিচয়, প্রয়োজনীয় নথি এবং প্রযোজ্য আইনও গুরুত্বপূর্ণ।

 

প্রযুক্তি যখন সম্পর্কের সেতু

এসব ঘটনার মধ্যে একটি সাধারণ সূত্র রয়েছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল যোগাযোগ। ফেসবুক, উইচ্যাট, হ্যালোটক কিংবা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে এমন মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠছে, যাদের বসবাস দুই ভিন্ন দেশে। ভিডিও কল, তাৎক্ষণিক বার্তা এবং অনুবাদ প্রযুক্তি যোগাযোগের বাধা কমাচ্ছে। ভৌগোলিক দূরত্ব আর পরিচয়ের ক্ষেত্রে আগের মতো বড় বাধা হয়ে থাকছে না।

তবে অনলাইনে দীর্ঘদিন কথা বলা মানেই একজন মানুষের পরিচয়, পারিবারিক অবস্থা কিংবা উদ্দেশ্য সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া নয়। ভুয়া পরিচয়, প্রতারণা, আর্থিক শোষণ এবং ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে। তাই সম্পর্ককে বিয়েতে রূপ দেওয়ার আগে পরিচয় ও প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করা, আর্থিক লেনদেনে সতর্ক থাকা এবং ভিসা, বিয়ের নিবন্ধন ও অভিবাসনের নিয়ম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানা জরুরি।

 

প্রেমের পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতা

বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বাংলাদেশের কারও বিয়ে নিজে থেকেই অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক নয়। প্রাপ্তবয়স্ক দুই মানুষের স্বাধীন সম্মতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধই সম্পর্কের মূল ভিত্তি। কিন্তু এ ধরনের বিয়েকে কেবল রোমান্টিক গল্প হিসেবে দেখলেও এর সামাজিক তাৎপর্যের বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়।

 

প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচিত সামাজিক পরিসরের বাইরে জীবনসঙ্গী খোঁজার সুযোগ তৈরি করছে। আগে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা কর্মক্ষেত্রের মাধ্যমে পরিচয় গড়ে ওঠা তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান ছিল। এখন ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠছে। তবে কয়েকটি আলোচিত ঘটনা দিয়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক বিবাহপ্রথায় কতটা পরিবর্তন এসেছে, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

 

দ্বিতীয়ত, এসব বিয়ে পরিবার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। কোথাও পরিবার সম্মতি দিচ্ছে, কোথাও বয়সের ব্যবধান, আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা বিদেশি পাত্রের পরিচয় নিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। পারিবারিক সম্মতি সম্পর্ককে সামাজিক সমর্থন দিতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দাম্পত্যের ভিত্তি হওয়া প্রয়োজন দুই পক্ষের স্বাধীন সিদ্ধান্ত ও পারস্পরিক আস্থা।

 

তৃতীয়ত, ধর্ম ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নও সামনে আসছে। কয়েকটি ঘটনায় বিদেশি পাত্রের ইসলাম গ্রহণের কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু ধর্ম পরিবর্তনকে বিয়ের সাফল্য বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখা যায় না। দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্বাধীনতা, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, উৎসব এবং পারিবারিক রীতিনীতির প্রতি সংবেদনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ।

 

চতুর্থত, বিয়ের পরের জীবন অনেক সময় বিয়ের সিদ্ধান্তের চেয়েও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। দুই দেশের নাগরিকের সংসারে বসবাসের অধিকার, কাজের সুযোগ, ভাষা শেখা, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্কের মতো বিষয় সামনে আসে। বয়স, অর্থনৈতিক সক্ষমতা কিংবা নাগরিকত্বের পার্থক্য কোনো সম্পর্ককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অসম করে না; তবে এসব পার্থক্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও নির্ভরতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একজন সঙ্গী অন্য দেশের আইন, ভাষা ও সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কে কম জানলে তার অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

 

বিয়ের খবরের পরেও যে অনুসন্ধান প্রয়োজন

এই ঘটনাগুলো থেকে বাংলাদেশে আন্তদেশীয় বিয়ের সংখ্যা বাড়ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলো আলোচনার সূত্র হতে পারে, কিন্তু এগুলো সামগ্রিক প্রবণতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়।

সম্পর্কগুলোর প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে হলে বিয়ের দিনের ছবি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গল্পের বাইরেও তাকাতে হবে। দাম্পত্যজীবন কেমন চলছে, দুই দেশের আইনি ব্যবস্থার সঙ্গে দম্পতিরা কীভাবে খাপ খাওয়াচ্ছেন, ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যবধান কীভাবে সামলাচ্ছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁদের অভিজ্ঞতা, পরিবারের প্রতিক্রিয়া এবং বিয়ের পরের জীবনের বাস্তবতা নিয়েও অনুসন্ধান জরুরি।

 

প্রেমের টানে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আসা মানুষের গল্প তাই একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও সামাজিক পরিবর্তনের সম্ভাব্য ইঙ্গিত বহন করে। এই গল্পগুলোর মূল্যায়নে আবেগের জায়গা থাকবে, কিন্তু তার পাশাপাশি প্রয়োজন তথ্যের যাচাই, আইনি সচেতনতা এবং মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা।

 

 

 

লেখক পরিচিতি

 

আনোয়ার কবির খান

সমাজবিজ্ঞানী ও লেখক

 


ক্যাটেগরিঃ জীবনধারা,


আরো পড়ুন