English
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-১০-১৪ ১৪:৫১:৩২
আপডেটঃ ২০২৬-১০-১৫ ০৪:১৩:০৬


বিএনপি-আওয়ামী লীগ সমীকরণ : এক রাজনৈতিক চক্রান্ত

বিএনপি-আওয়ামী লীগ সমীকরণ : এক রাজনৈতিক চক্রান্ত

 

প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান

বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক পর্যালোচনায় একটি পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান মাঝেমধ্যেই লক্ষ্য করা যায়—‘আওয়ামী লীগ ও বিএনপি আদতে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ’। সুশাসন, অপরাধবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন গবেষক হিসেবে আমার সুচিন্তিত মত হলো, এই সমীকরণ টানা কেবল তাত্ত্বিকভাবে অসার ও রাজনৈতিকভাবে ত্রুটিপূর্ণই নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত মনস্তাত্ত্বিক চক্রান্ত। পরাজিত ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগী এবং রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়, রাজনৈতিক ধূম্রজাল সৃষ্টি করতে চায়, সমাজে এমন এক বিভ্রান্তিকর ধারণা ছড়িয়ে দিতে চায়, যেন জনগণের কাছে রাজনৈতিক বিকল্পের স্থান সংকুচিত হয়ে পড়ে। অথচ বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতা হলো—আওয়ামী লীগ আজ একটি রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে নিষিক্ত (devoid of political legitimacy and moral substance) শক্তি, যার সঙ্গে জনগণের অধিকার রক্ষায় সংগ্রামরত গণতান্ত্রিক দলের কোনো তাত্ত্বিক বা বাস্তব তুলনা চলতে পারে না।

 

তাত্ত্বিক পর্যালোচনা: কর্তৃত্ববাদী বনাম গণতান্ত্রিক শক্তির আচরণিক পার্থক্য

অপরাধবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, কোনো রাজনৈতিক দলের চরিত্র নির্ভর করে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা ও নাগরিক অধিকারের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।

১. প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞ বনাম প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন: ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ একটি ‘হাইব্রিড রেজিম’ থেকে পূর্ণাঙ্গ ‘কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিবাদে’ পর্যবসিত হয়েছিল। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, অর্থব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পুরোপুরি দলীয়করণ ও অকার্যকর করে রাষ্ট্রকে একটি চরম দুর্নীতিগ্রস্ত ও অপরাধপ্রবণ কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো হয়েছিল। গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থ পাচার ছিল তাদের শাসনব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য।

২. জনগণের সম্মতি বনাম দমনপীড়ন: জঁ-জাক রুশোর ‘সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব’ (Social Contract Theory) অনুযায়ী, সরকারের বৈধতা আসে জনগণের সম্মতির ওপর ভিত্তি করে। আওয়ামী লীগ ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে জনসম্মতির অস্তিত্বই মুছে ফেলেছিল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাদের পতন ঘটে। ফলে রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতার দিক থেকে আওয়ামী লীগ একটি বিলুপ্ত ও নিষিক্ত সত্তায় পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে, বিএনপি দীর্ঘ দেড় দশক রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থেকে ক্রমাগত নির্যাতন, কারাবরণ ও রাজনৈতিক নিপীড়ন সহ্য করেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা বজায় রেখেছে। সম্প্রতি দেশে গণতান্ত্রিক আবহ ফিরিয়ে আনা, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাব পেশ এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে দলটির উদ্যোগ স্পষ্ট। মহামান্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যথার্থই বলেছেন—“আওয়ামী লীগ-বিএনপি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ—এটি একটি পরিকল্পিত অপপ্রচার। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র ধ্বংসকারী দল, আর বিএনপি গণতন্ত্রকে পুনঃজীবিত করার দল।”

 

নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক বৈপরীত্য

রাজনীতিতে দুটি দলের তুলনা কেবল তাদের অতীত ভুলত্রুটির ওপর দাঁড়িয়ে হতে পারে না; দেখতে হয় তাদের আদর্শিক ভিত ও দূরদর্শিতা।

রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও ত্যাগ: ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অন্তত ৪২২ জন নেতাকর্মী প্রাণ দিয়েছেন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ভোটাধিকার ও সুশাসন পুনরুদ্ধারে দলটির দীর্ঘ সংগ্রামের প্রাতিষ্ঠানিক প্রমাণ। 

জনকল্যাণমুখী সুশাসন ও নীতি: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তারা একটি আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মতো জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরানোর ক্ষেত্রে সরকারের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার আলো সঞ্চার করেছে।

একটি সরকার মাত্র কয়েক মাস ধরে কাজ শুরু করলে, তার সঙ্গে ১৫ বছরের একটি প্রতিষ্ঠিত ফ্যাসিবাদী কাঠামোর তুলনা টানা তাত্ত্বিক বিচারে অযৌক্তিক। নতুন সরকারের অর্থনৈতিক জটিলতা ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ কাটাতে সময়ের প্রয়োজন। তবে শুরুর পদক্ষেপ ও সদিচ্ছাই নির্দেশ করে দেশ সঠিক অভিমুখে চালিত হচ্ছে কিনা।

 

মনস্তাত্ত্বিক চক্রান্ত ও দেশবাসীর করণীয়

সীমান্তের ওপার থেকে অপতথ্য (Disinformation) ছড়ানো, অডিও কন্টেন্ট ফাঁসের মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা উসকে দেওয়ার নেপথ্যে পরাজিত ফ্যাসিবাদের মদদ পরিষ্কার। যখন কোনো দল রাজনৈতিকভাবে নিষিক্ত হয়ে পড়ে, তখন তারা প্রতিপক্ষকে নিজের মতো কালিমালিপ্ত করে একটি ‘রাজনৈতিক শূন্যতা’ তৈরির চেষ্টা চালায়। "সব দলই সমান"—এই বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরি করার পেছনের মূল উদ্দেশ্যই হলো জনগণকে হতাশ করা এবং গণতান্ত্রিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করা।

অতএব, ইতিহাস কোনো দলের রাজনৈতিক ইশতেহার বা ফাঁপা আশ্বাস দেখে চূড়ান্ত রায় দেয় না; রায় দেয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সুশাসন, জবাবদিহি এবং মানুষের জীবনে তার ধনাত্মক প্রভাব দেখে। আওয়ামী লীগ তার দীর্ঘ রেকর্ডে স্বৈরাচার ও সুশাসনের চরম বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ঠাঁই নিয়েছে। অপরদিকে, বিএনপি ও তাদের রাজনৈতিক মিত্ররা রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনে গুণগত পরিবর্তন আনার এক ঐতিহাসিক সুযোগের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

বাংলাদেশের আপামর জনগণের চাওয়া কেবল ক্ষমতার মুখবদল নয়, বরং শাসনকাঠামোর পূর্ণ সংস্কার। যারা চক্রান্তমূলকভাবে এক নিষিক্ত শক্তির সঙ্গে একটি সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক দলকে তুলনা করে জলঘোলা করতে চান, তাদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে, বর্তমান সরকারের সুশাসন ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপের পাশে দাঁড়ানোই আজ দেশের সচেতন নাগরিক সমাজের মূল দায়িত্ব।



ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি, কলাম,


প্রফেসর ড. আসিফ মিজান

উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।



আরো পড়ুন