English
ঢাকা, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-০৪ ০১:২৮:৫০
আপডেটঃ ২০২৬-০৯-০৪ ১০:৩৯:৪৪


ব্রাহ্মা: চট্টগ্রামের নাম জড়িয়ে থাকা এক রাজকীয় মুরগির জাত

ব্রাহ্মা: চট্টগ্রামের নাম জড়িয়ে থাকা এক রাজকীয় মুরগির জাত

মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান


বিশাল দেহ, ঘন পালক, পালকে ঢাকা পা আর গম্ভীর ভঙ্গিব্রাহ্মা মুরগিকে দেখলে সাধারণ মুরগির সঙ্গে এর পার্থক্য সহজেই চোখে পড়ে। আকার সৌন্দর্যের কারণে একসময় এই জাতকে বলা হতোমুরগির জাতগুলোর রাজা কিন্তু ব্রাহ্মার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক শুধু তার বিশাল আকৃতি নয়; এর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চট্টগ্রাম, ব্রহ্মপুত্র এবং বাংলা অঞ্চলের নাম

 


ব্রাহ্মা মুরগি

 

ব্রাহ্মাকে বর্তমানে মূলত একটি আমেরিকান জাত হিসেবে বর্ণনা করার চেষ্টা করা হলেও  এর বংশগঠনের ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৮৪০-এর দশকে চীনের সাংহাই বন্দর থেকে বড় আকারের পালকযুক্ত কিছু মুরগি আমেরিকায় পৌঁছায়। একই সময়ে পূর্ব বাংলার চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে পাওয়াগ্রে চট্টগ্রামবা Grey Chittagong ধরনের মুরগিরও ব্রাহ্মার বিকাশে প্রভাব ছিল বলে মনে করা হয়।

এই কারণেই ব্রাহ্মার পুরোনো নামগুলোর মধ্যে ‘Chittagong’, ‘Grey Chittagong’, ‘Shanghai’ এবং ‘Brahmapootra’ পাওয়া যায়। অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের চট্টগ্রামের নামটি এই মুরগির ইতিহাসে নিছক কাকতালীয়ভাবে আসেনি।

 

চট্টগ্রাম থেকে ব্রাহ্মার গল্প

ব্রাহ্মার উৎপত্তি নিয়ে উনিশ শতক থেকেই নানা মত প্রচলিত ছিল। কেউ মনে করতেনমুরগিগুলো সরাসরি বাংলা অঞ্চল থেকে আমেরিকায় গিয়েছিল। আবার অন্য মত ছিল, চীনের সাংহাই থেকে আসা বড় মুরগির সঙ্গে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মালয়-ধরনের মুরগির সংকরায়ণের ফলেই পরবর্তীতে আমেরিকায় ব্রাহ্মা গড়ে ওঠে

পুরোনো একটি ঐতিহাসিক বিবরণে ব্রহ্মপুত্র নদপথের কাছাকাছি লাকিপুর (Luckipoor) নামের একটি স্থানের কথাও পাওয়া যায়। সেখানে দাবি করা হয়েছিল, ব্রাহ্মার পূর্বপুরুষসদৃশ মুরগি ব্রহ্মপুত্র নদপথের কাছাকাছি ওই অঞ্চল থেকে জাহাজে আমেরিকায় গিয়েছিল। যা মূলত লক্ষীপুরের কথাই প্রমাণ করে।

বাংলার পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রামের মুরগির বংশগত বৈশিষ্ট্য ব্রাহ্মার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ব্রাহ্মার মাথার আকৃতি, ছোট মটরদানার মতো ঝুঁটি এবং চোখের ওপর এগিয়ে থাকা ভ্রুর মতো বৈশিষ্ট্যগুলো চট্টগ্রামের Grey Chittagong-এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ব্রিড-ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়।

আর এখানেই বাংলাদেশের জন্য ব্রাহ্মার ইতিহাসটি বিশেষ আকর্ষণীয়। আজ যে জাতটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শৌখিন প্রদর্শনী মুরগি হিসেবে পরিচিত, তার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র এসে মিশেছে ঐতিহাসিক পূর্ব বাংলা চট্টগ্রামে

 

 

১৮৫২: ব্রাহ্মা নামের প্রতিষ্ঠা

উনিশ শতকের মাঝামাঝি আমেরিকায় এই বিশাল আকারের মুরগি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। তখন একই ধরনের মুরগিকে বিভিন্ন নামে ডাকা হতো। ‘Shanghai’, ‘Chittagong’, ‘Brahmapootra’—এমন একাধিক নাম প্রচলিত ছিল

১৮৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে ব্রিডারদের মধ্যে আলোচনার পর ‘Brahmapootra’ নামটি গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে নামটি সংক্ষিপ্ত হয়ে ‘Brahma’ হয়। নামটির সঙ্গে বাংলার ব্রহ্মপুত্র নদীর সম্পর্ক ছিল।

একই বছর ব্রাহ্মা ব্রিটেনেও পৌঁছে যায়। এর পর ইওরোপে জাতটি দ্রুত পরিচিতি লাভ করে এবং বৃহৎ আকারের এশীয় মুরগির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

বিশাল দেহই এর প্রধান আকর্ষণ

ব্রাহ্মার সবচেয়ে সহজে চোখে পড়া বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশাল ভারী দেহ ঘন, পূর্ণাঙ্গ পালক এর আকারকে আরও বড় করে তোলে। দেহভঙ্গি খাড়া হলেও পা তুলনামূলকভাবে নিচু হওয়ায় মাটির কাছাকাছি একটি ভারী দৃঢ় অবয়ব তৈরি হয়

দেহ প্রশস্ত, পূর্ণ গভীর। পিঠ অপেক্ষাকৃত ছোট এবং সেখান থেকে লেজের দিকে মসৃণ ঢাল তৈরি হয়। লেজ ছোট, তবে ভালোভাবে বিস্তৃত। পেছন থেকে দেখলে এর লেজ অনেকটা ঘোড়ার খুরের মতো মনে হয়, যা সাধারণ V-আকৃতির লেজের তুলনায় আলাদা

ডানাগুলো শরীরের সঙ্গে বেশ আঁটসাঁটভাবে গুটিয়ে থাকে। ঘাড় তুলনামূলকভাবে ছোট এবং ঘন পালকে আবৃত। এত বিশাল দেহের তুলনায় মাথা ছোট হওয়ায় ব্রাহ্মার চেহারায় এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ অথচ রাজকীয় ভাব তৈরি হয়

 

মাথা পায়ের বৈশিষ্ট্য

ব্রাহ্মার মাথার খুলি প্রশস্ত। চোখের ওপর সামান্য এগিয়ে থাকা অংশটি এর মুখে একটি স্বতন্ত্রভ্রু’-এর মতো আকৃতি তৈরি করে। ঝুঁটি ছোট এবং মটরদানার মতো (pea comb) ঝুঁটিতে তিনটি নিচু, দৈর্ঘ্য বরাবর উঁচু রেখা থাকে

গলার ঝুল বা লতিকা তুলনামূলকভাবে ছোট। গলার নিচে পালকযুক্ত চামড়ার ভাঁজ বা dewlap- দেখা যায়

তবে ব্রাহ্মার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর পালকযুক্ত পা হলুদ পা পায়ের আঙুল পর্যন্ত পালকে ঢাকা থাকে। ফলে পা দেখতে বড়, নরম কিছুটা ঝুলে থাকা মনে হয়। এই পালকযুক্ত পা ব্রাহ্মাকে অন্যান্য বৃহৎ মুরগির জাত থেকে সহজেই আলাদা করে

 

রঙেও রয়েছে বৈচিত্র্য

ব্রাহ্মা শুধু আকারের জন্যই জনপ্রিয় নয়; এর রঙ পালকের নকশাতেও রয়েছে ব্যাপক বৈচিত্র্য। বিভিন্ন দেশে স্বীকৃত রঙের তালিকায় রয়েছে লাইট, ডার্ক, বাফ, কলম্বিয়ান, বাফ কলম্বিয়ান, পার্ট্রিজ, সিলভার পার্ট্রিজ, ব্লু পার্ট্রিজ, কুকু, বার্চেন, সাদা, কালো সেল্ফ ব্লুসহ নানা ধরন


 

বাংলাদেশের জন্য যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

ব্রাহ্মার ইতিহাসে বাংলাদেশের গুরুত্ব মূলত এর চট্টগ্রাম-সংযোগে ঐতিহাসিক সূত্রে ‘Grey Chittagong’ নামের যে মুরগির উল্লেখ পাওয়া যায়, সেটি বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্রাহ্মার বংশগঠনে এই ধরনের চট্টগ্রামের মুরগির প্রভাব ছিল বলে আধুনিক ব্রিড-ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়।

 চট্টগ্রাম ছিল প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। ফলে অঞ্চল থেকে বিভিন্ন প্রাণী, পণ্য কৃষিজাত সম্পদের সমুদ্রপথে অন্য অঞ্চলে যাতায়াতের ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে চট্টগ্রামকে মধ্যযুগে বাংলার অন্যতম প্রধান বন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথাও  ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

 


এ কে শামসুদ্দিন খান

 

চট্টগ্রামের প্রখ্যাত এ কে খান ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য এ কে শামসুদ্দিন খান এ বিষয়ে বিপরীত স্রোতকে জানান, লন্ডনের এক বইয়ের দোকান থেকে তিনি ‘দি কমপ্লিট এনসাইক্লোপিডিয়া অফ চিকেনস’ বইটি সংগ্রহ করেন। সেখানে পরিষ্কারভাবে ব্রাহ্মা মুরগির ‘কান্ট্রি অফ অরিজিন’ হিসেবে ইনডিয়া লেখা আছে। ১৮৫২ সালে বাংলা যেহেতু ইনডিয়ার অংশ ছিল সে কারণে এই পরিচয় দেয়া হয়েছে। এই এনসাইক্লোপিডিয়াতেও চট্টগ্রাম ও ব্রহ্মপুত্রের পাশ ঘেঁষে লক্ষীপুরের কথা বলা আছে।



দি কমপ্লিট এনসাইক্লোপিডিয়া অফ চিকেনসে ব্রাহ্মার আদি জন্মস্থান হিসেবে চট্টগ্রাম ও লক্ষীপুরের কথা বলা আছে

 

তাই ব্রাহ্মার গল্প কেবল একটি বিদেশি মুরগির জাতের গল্প নয়। এর মধ্যে চট্টগ্রামের নাম, বাংলার প্রাণিসম্পদ, আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্য এবং উনিশ শতকের আমেরিকান পোলট্রি-ব্রিডিংসবকিছুর একটি আকর্ষণীয় যোগসূত্র দেখা যায়

আজকের ব্রাহ্মা অবশ্য বহু প্রজন্মের নির্বাচিত প্রজননের মাধ্যমে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র জাত। কিন্তু তার নামের ইতিহাসে চট্টগ্রাম ব্রহ্মপুত্রের ছায়া এখনও রয়ে গেছে। এই কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাস পোলট্রি ঐতিহ্যের দৃষ্টিতে ব্রাহ্মা অন্য অনেক বিদেশি মুরগির জাতের তুলনায় আলাদা গুরুত্ব বহন করে




ক্যাটেগরিঃ জীবনধারা, কৃষি ও প্রকৃতি,


মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান

সম্পাদক, বিপরীত স্রোত। সাংবাদিক ও গবেষক। অ্যাসোসিয়েট ফেলো, রয়াল হিস্টোরিকাল সোসাইটি।



আরো পড়ুন