English
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-০৮-৩০ ২২:০২:৫৫
আপডেটঃ ২০২৬-১০-১৯ ২২:৪২:২০


তাত্ত্বিক আলোয় বিএনপি’র চার দশক: ইতিহাস, অর্জন ও নতুন যুগের অভিযাত্রা

তাত্ত্বিক আলোয় বিএনপি’র চার দশক: ইতিহাস, অর্জন ও নতুন যুগের অভিযাত্রা

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান

 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে

ভূমিকা পালন করে আসছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক

ঐতিহাসিক ও জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। একটি সদ্য স্বাধীন ও

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ, ক্ষমতার রূপান্তর এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য

দিয়ে যে নতুন দর্শনের জন্ম হয়েছিল, তার নির্মোহ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ রাজনৈতিক বিজ্ঞান ও

সুশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দলটির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর এই ক্ষণে এর জন্ম

ইতিহাস, মূল আদর্শিক ভিত্তি, শাসনতান্ত্রিক সাফল্য এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পথরেখার একটি

বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন সমকালীন রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বুঝতে সাহায্য করে। প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক

ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যালেক্সিস ডি টকভিল (Alexis de Tocqueville) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Democracy

in America-তে লিখেছেন, “An institution is the lengthened shadow of one man, but its durability

depends on how it captures the spirit of its times” [একটি প্রতিষ্ঠান মূলত একজন মানুষের

দীর্ঘায়িত ছায়া মাত্র, তবে এর স্থায়িত্ব নির্ভর করে এটি সমকালের চেতনাকে কতটা ধারণ করতে

পারে তার ওপর]। বিএনপি’র চার দশকের পথচলাতেও এই তাত্ত্বিক সত্যটি সমভাবে প্রযোজ্য।

 

পটভূমি ও জন্ম ইতিহাস: সংকটের আবর্তে নতুন সমীকরণ

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের গভীর শূন্যতা ও

দিকভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন সেনাপ্রধান ও পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান

রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে বেসামরিকীকরণের (Demilitarization) একটি সুনির্দিষ্ট

প্রক্রিয়া শুরু করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, স্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য একটি শক্তিশালী

রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম অপরিহার্য। এই লক্ষ্য নিয়ে প্রথমে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে

‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ (জাগদল) এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন মতাদর্শের দল ও ব্যক্তির

সমন্বয়ে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ গঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি

জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি)-র আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তাত্ত্বিক

দৃষ্টিকোণ থেকে, এই দলের জন্ম ছিল বামপন্থী, ডানপন্থী এবং মধ্যপন্থী—সব ধারার political

শক্তির এক অভূতপূর্ব মহাসমন্বয় (Syncretism)। বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন

(Samuel P. Huntington) তাঁর Political Order in Changing Societies গ্রন্থে সামাজিক রূপান্তরের

সময় রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ওপর জোর দিয়েছেন। হান্টিংটনের তত্ত্বের আলোকে বলা

যায়, জিয়াউর রহমানের এই রাজনৈতিক উদ্যোগ ছিল মূলত ভঙ্গুর ও খণ্ডিত একটি সমাজকে একটি

সুসংগঠিত কাঠামোর মাধ্যমে স্থিতিশীলতায় রূপান্তরের সফল প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস।

 

দর্শন, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি

বিএনপি’র রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’। এর আগে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর

যে ধারণা প্রচলিত ছিল, তার সঙ্গে এই দর্শনের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ মূলত

ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর জোর দেয়, যা ভৌগোলিক সীমানার বাইরেও বিস্তৃত হতে পারে। পক্ষান্তরে,

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রীয় সীমানা, ধর্ম, বর্ণ ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব

নাগরিকের অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিচয়কে ধারণ করে। রাজনীতি বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে ‘রাষ্ট্রিক

জাতীয়তাবাদ’ (State Nationalism) বলা যেতে পারে। বিখ্যাত তাত্ত্বিক বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন

(Benedict Anderson) জাতীয়তাবাদকে একটি ‘কাল্পনিক সম্প্রদায়’ (Imagined Community) হিসেবে

আখ্যায়িত করেছেন। অ্যান্ডারসনের এই তাত্ত্বিক কাঠামোর সাথে মিল রেখে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ

একটি আধুনিক ভূখণ্ডভিত্তিক বহুত্ববাদী রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছে, যা বিভাজিত সমাজকে

ঐক্যবদ্ধ করার মূল চালিকাশক্তি। বিএনপি’র মূল লক্ষ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বহুদলীয়

গণতন্ত্রের পুনরুত্থান, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং জনগণের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সর্বধর্মের সহাবস্থান নিশ্চিত করা।

 

নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও নতুন যুগের উদয়: আস্থার রাজনীতি

একটি রাজনৈতিক দলের অন্যতম প্রধান শক্তি হলো প্রতিকূলতার মুখে পুনরুত্থানের সক্ষমতা এবং

নেতৃত্বের সফল রূপান্তর। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর

দলটির অস্তিত্ব বড় ধরনের হুমকিতে পড়েছিল। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন ও অবিচল

নেতৃত্ব ধ্বংসস্তূপ থেকে দলকে পুনর্গঠিত করে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যায়। তবে সমকালীন

ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের

(Tarique Rahman) সুদূরপ্রসারী ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে

তীব্র দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি যেভাবে দলের সাংগঠনিক ঐক্য ধরে

রেখেছেন, তা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এক অনন্য