প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান
সাম্প্রতিক
সময়ে এক চরম মর্মান্তিক
ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে তরুণ তাহসিফ। যে
ঘটনাটি পুরো জাতিকে স্তব্ধ
ও মর্মাহত করেছে, তা নিয়ে যখন
চারদিকে শোকের মাতম, ঠিক তখনই আমাদের
সমাজের একদল ‘মানুষরূপী প্রাণীর’ অলস ও শয়তানি
মস্তিষ্কে কিছু কুৎসিত প্রশ্ন
উঁকি দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সস্তা স্ক্রোলিং আর কীবোর্ডের পেছনে
লুকিয়ে থাকা কিছু অনুভূতিরহিত
মানুষ প্রশ্ন তুলছেন—ভিকটিমের বাবার চোখে পানি নেই
কেন? তিনি সাংবাদিকদের সাথে
কথা বলার সময় চা
পান করছেন কেন? কেনই বা
তার অবয়বকে তথাকথিত ‘স্বাভাবিক’ মনে হচ্ছে?
বিজ্ঞজনদের
অনেকেরই ধারণা, শেখ হাসিনার পালানোর
ভিডিও ধারণ ও প্রকাশ
করার কারণে কোনো গুপ্ত ঘাতক
চক্র তাহসিফকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এই বিশাল রাষ্ট্রীয়
ও রাজনৈতিক মারপ্যাঁচের আড়ালে হারিয়ে গেছে একজন বাবার
বুক খালি হওয়ার হাহাকার।
উল্টো সেই পিতার শোকের
গভীরতা মাপা হচ্ছে একটি
স্থিরচিত্র বা কয়েক সেকেন্ডের
ভিডিও ক্লিপ দিয়ে। একটি চায়ের কাপের
ফ্রেমে বন্দি করে বিচার করা
হচ্ছে একজন পিতার পিতৃত্বের!
আমরা কি সত্যিই এতটুকু
নিচে নেমে গেছি যে,
একটি স্থিরচিত্র দেখে মানুষের হৃদয়ের
রক্তক্ষরণ মাপার ধৃষ্টতা দেখাব?
মনস্তাত্ত্বিক
বাস্তবতা ও শোকের ভিন্নতা
অপরাধবিজ্ঞান
এবং মনস্তত্ত্ব বলে, প্রতিটি মানুষের
ট্রমা বা মানসিক আঘাত
সামলানোর পদ্ধতি ভিন্ন। কোনো নির্মম সত্যের
মুখোমুখি হলে মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে
যে মানসিক ধাক্কা খায়, বিজ্ঞানের ভাষায়
তাকে বলা হয় 'Psychological Shock' বা 'Emotional Numbing' (আবেগীয় অসাড়তা)। এই অবস্থায়
মানুষের মস্তিষ্ক সাময়িকভাবে অনুভূতি প্রকাশের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। মানুষ তখন যান্ত্রিকভাবে দৈনন্দিন
কাজ করে যায়—পানি
খায়, চা খায়, ফোন
ধরে। বাইরে থেকে তাকে স্বাভাবিক
মনে হলেও, ভেতরে তার পুরো পৃথিবীটা
ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
বিখ্যাত
সমাজবিজ্ঞানী এলিজাবেথ কুবলার-রস শোকের পাঁচটি
ধাপের (Five Stages of
Grief) কথা বলেছেন। যার প্রথম ধাপটিই
হলো 'Denial' বা অস্বীকার এবং
'Isolation' বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। কান্না না আসা মানে
শোকের অনুপস্থিতি নয়, বরং তা
প্রচণ্ড আঘাতের ফলে তৈরি হওয়া
এক প্রকার অবশ অবস্থা।
পারিবারিক
ঐতিহ্য এবং ব্যক্তিত্বের আড়াল
অনেকেই
হয়তো জানেন না, তাহসিফের পুরো
পরিবারে এক অনন্য আভিজাত্য
ও বীরত্বের বসবাস। পরিবারটি উচ্চমানের পার্সোনালিটি ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন।
চার ভাইয়ের মধ্যে ভিকটিমের বাবা সবার বড়,
আর ছোট তিন ভাইয়ের
প্রত্যেকেই দেশের এক একজন বীর।
এমন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও
ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পরিবারের বড় সন্তান যেকোনো
চরম বিপর্যয়ের মুখেও প্রকাশ্যে কান্নাকাটি করে ভেঙে পড়বেন
না—এটাই উচ্চবংশীয় ঐতিহ্য,
এটাই তাদের পারিবারিক সৌন্দর্য।
সংসারের
অভিভাবক হিসেবে, নিজের স্ত্রীর বুকে পাথর চেপে
বসা শোককে সান্ত্বনা দিতে একজন পিতাকে
বাইরে থেকে লৌহমানব হতে
হয়। নিজের সম্মান ও আত্মমর্যাদা বাঁচিয়ে
পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে গিয়ে গুছিয়ে
কথা বলতে হয়। মনের
ভেতর তুষের আগুন জ্বললেও, সেই
আগুনের শিখা বাইরের মানুষকে
দেখতে দেওয়া তাদের রুচিতে বাঁধে। আর্তনাদ ও চিৎকার করে
বুক চাপড়ালেই কেবল শোক প্রকাশ
হয় না, মৃত্যুর নির্মম
সত্যকে মেনে নিয়ে পরবর্তী
দায়িত্ব পালন করাটাই একজন
প্রকৃত অভিভাবকের পরিচয়।
আমাদের
আত্মিক অভিজ্ঞতা ও জীবনের নির্মম সত্য
নিজের
জীবনের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার
কথা না বললেই নয়।
আমার বাবা, মা এবং ছোট
একটা বোন মারা গেছেন।
সংসারে আমি বড় না
হলেও প্রতিটি বিয়োগান্ত ঘটনায় তৎকালীন পরিস্থিতিতে সমস্ত দায়িত্ব আমাকেই সামলাতে হয়েছিল। বিশ্বাস করুন, তখন পরিবেশ-পরিস্থিতির
চাপে আমি কান্নার সুযোগটুকুও
পাইনি। সবাই ভেবেছিল আমি
কত শক্ত! অথচ আজ এত
বছর পরেও, মাঝরাতে যখন বুকটা ভেঙে
আসে, তখন আমি প্রায়শই
একাকী ডুকরে ডুকরে কাঁদি, যা এই পৃথিবীর
কেউ জানে না।
আমার
এক নিকট আত্মীয়ের কথা
মনে পড়ে। তার বড়
ছেলে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে থাকতেন,
কিন্তু একটি কনফারেন্সে যোগ
দিতে তিনি যখন আয়ারল্যান্ডে,
ঠিক তখনই তার মাজননী
মৃত্যুবরণ করেন। মায়ের মৃত্যুর সংবাদ শুনে আয়ারল্যান্ড থেকে
রওনা হয়ে ঢাকা পৌঁছানো
পর্যন্ত তিনি মুখে এক
ফোঁটা পানিও দেননি। মায়ের মরদেহ যখন অ্যাম্বুলেন্সে করে
গ্রামের বাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া
হচ্ছিল, লাশের একপাশে তিনি এবং অন্য
পাশে আমি বসা। সেই
দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রায়
একপর্যায়ে আমি খাবারের ব্যবস্থা
করলাম এবং আমরা দুজনেই
খেলাম। জীবনের প্রয়োজনে, টিকে থাকার তাদিদে
সেই মুহূর্তে খাওয়ার কোনো বিকল্প ছিল
না। আজ অনেক বছর
পর যখন পেছনে ফিরে
তাকাই, তখন নিজেরই অবাক
লাগে—কীভাবে সেই অবস্থায় আমাদের
পক্ষে খাওয়া সম্ভব হয়েছিল? কিন্তু এটাই জীবনের রূঢ়
বাস্তবতা।
মিডিয়া
ট্রায়াল ও নির্মম 'ক্লিক' বাণিজ্য
আজকের
বাংলাদেশে বেশি হাসা বা
কাঁদা—কোনোটিই করার জো নেই।
কম কাঁদলেও দোষ, বেশি কাঁদলেও
নাটকের তকমা দেওয়া হয়।
তাহসিফের বাবার দুই ফোঁটা চোখের
পানির আশায় অগণিত ক্যামেরা
তাক করে বসে আছেন।
একটা এক্সক্লুসিভ ‘ক্লিক’ বা একটু কান্নার
ভিডিও মানেই তাদের ভিউ, তাদের ব্যবসা,
তাদের রুজি-রোজগার। এই
করপোরেট ও সস্তা সাংবাদিকতার
যুগে একজন শোকার্ত বাবার
ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং তার ব্যক্তিগত
শোকের পবিত্রতা আজ ভূলুণ্ঠিত।
দার্শনিক
ও সাহিত্যিক অস্কার ওয়াইল্ড একবার বলেছিলেন, "The heart
was made to be broken." (হৃদয়
তৈরিই হয়েছে ভেঙে যাওয়ার জন্য)। কিন্তু সেই
ভেঙে যাওয়া হৃদয়কে যখন বাজারের পণ্য
বানানো হয়, তখন মানবতা
লজ্জিত হয়। আমরা কেউ
জানি না, ক্যামেরা ও
লাইমলাইটের বাইরে, একা ঘরে গিয়ে
সেই শোকার্ত পিতা কতটা চূর্ণবিচূর্ণ
হয়ে যান। আমরা জানি
না, রাতের অন্ধকারে সন্তানের শূন্য বিছানার দিকে তাকিয়ে তার
ঘুম আসে কি না।
বুকের ভেতর ঠিক কী
পরিমাণ জ্বলন্ত লাভা নিয়ে তিনি
বাইরে স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করছেন, তা পরিমাপ করার
ক্ষমতা কোনো থার্মোমিটারের নেই।
সুতরাং,
একটি স্থিরচিত্রে একজন বাবাকে চা
খেতে দেখা গেছে। কিন্তু
সেই চায়ের কাপে তার কতটুকু
মন ছিল, আর বুকের
ভেতর কতটুকু আগুন জ্বলছিল, তা
জানার ক্ষমতা আমাদের কারও নেই। আসল
সত্যটা শুধু সেই বাবাই
জানেন এবং পরম করুণাময়
জানেন।
অপরাধবিজ্ঞান
ও মানবাধিকারের একজন গবেষক হিসেবে
আমি জোর দাবি জানাই—তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হোক এবং এই
গুপ্ত হত্যার পেছনে যারা জড়িত, তাদের
কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। একই
সাথে, একটি পরিবারের এই
ব্যক্তিগত ও চরম শোকের
পবিত্র জায়গাটুকুতে কাদা না ছিটিয়ে,
আসুন আমরা তাদের প্রতি
ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন করি। মনে রাখবেন,
ছবিতে কেবল চায়ের কাপটাই
দেখা যায়, বাবার বুকের
ভেতরের সমুদ্রসমান কষ্টটা নয়।
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।
ড. বিজন কুমার শীল বিস্তারিত
বিপরীত স্রোত প্রতিবেদন বিস্তারিত
ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরী বিস্তারিত
যারিন মালিয়াত অদ্রিতা বিস্তারিত
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান বিস্তারিত
প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান বিস্তারিত
শিক্ষার্থীদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও.. বিস্তারিত
Bangladesh Addiction Professio.. বিস্তারিত
প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান বিস্তারিত
ডা. মনিরুজ্জামান বিস্তারিত