English
ঢাকা, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-১০-২৩ ১৯:০৯:৪৯
আপডেটঃ ২০২৬-১০-২৪ ০১:০৩:৫৫


আইনপ্রণেতা, প্রশাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি

আইনপ্রণেতা, প্রশাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি


প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান

 

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের স্থানীয় প্রশাসন এবং জাতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতির মধ্যে এক ধরনের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত সংকট দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের প্রশাসন—যেমন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কিংবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি)—জনপ্রতিনিধিদের সাথে সম্পর্কের যে রূপরেখা, তা প্রায়শই সুশাসনের তাত্ত্বিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। জনসেবার মহান ব্রত নিয়ে যে আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠার কথা ছিল, ক্ষমতার সমীকরণে তা অনেক সময়ই পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা কিংবা আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হয়।

 

ফরাসি দার্শনিক মঁতেস্কু তাঁর 'দ্য স্পিরিট অব লজ' গ্রন্থে ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি (Separation of Powers) আলোচনা করতে গিয়ে স্পষ্ট করেছিলেন যে, রাষ্ট্রের আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ যদি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তবে নাগরিকের স্বাধীনতা ও সুশাসন বিপন্ন হয়। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দেখা যায়, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে আমলাতন্ত্রকে এক ধরনের 'প্যাট্রন-ক্লিয়েন্ট' বা পৃষ্ঠপোষকতার সম্পর্কে আবদ্ধ করার চেষ্টা চলে। জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা যখন স্থানীয় কর্মকর্তাদের পাশে বসিয়ে ক্ষমতা প্রদর্শন করেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণাই পোক্ত হয় যে—প্রশাসন নিরপেক্ষ নয়, বরং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির অনুগত। আবার ক্ষমতার পালাবদলে এই সমীকরণ যখন বিপরীত রূপ নেয়, তখন কর্মকর্তাদের আচরণেও এক ধরণের দলকানা 'জমিদারি' মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে, যা সুশাসনের চরম পরিপন্থী।

 

সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানায় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এবং স্থানীয় ওসির মধ্যকার যে বাদানুবাদের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে প্রথম আলো এবং বাংলা ট্রিবিউন-এর মতো মূলধারার গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ—আইনসভার একজন সদস্যের আচরণের ধরন নিয়ে জনমনে গভীর ভাবনার খোরাক জুগিয়েছে। রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং আইনপ্রণেতা যখন দলবল নিয়ে থানার ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সেখানে এক ধরণের 'মব' বা উগ্র জনতাকে সাথে নিয়ে চাপ সৃষ্টির অভিযোগ ওঠে, তখন তা প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাকে আঘাত করে। যে রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল সংস্কার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি আজ গণমানুষের মুখে মুখে, সেখানে কোনো রাজনৈতিক নেতার আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কিংবা থানাকে রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে রূপান্তর করা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

 

অপরাধবিজ্ঞান ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, যেকোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, বালি উত্তোলন কিংবা ইটভাটা থেকে অবৈধ সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ উঠতেই পারে। কিন্তু সেই অভিযোগের সুরাহা করার জন্য নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক পথ রয়েছে। থানার ভেতরে উচ্চকণ্ঠ বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা আইনের শাসনের পরিপন্থী। আইনপ্রণেতাদের কাজ হলো আইন প্রণয়ন করা এবং সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে—যেমন পুলিশ সুপার (এসপি) কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া সচল রাখা। তা না করে যদি সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য কিংবা রাজনৈতিক স্টান্টবাজির উদ্দেশ্যে প্রশাসনিক কক্ষে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হয়, তবে তা রাষ্ট্রের শৃঙ্খলার ভিতকেই দুর্বল করে দেয়।

 

একই সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মদর্শনেরও একটি বড় অভাব এ দেশে পরিলক্ষিত হয়। অনেক সময় দেখা যায়, দলগুলো তাদের ভেতরে সুপ্ত থাকা সুবিধাবাদী বা উগ্র প্রবণতাগুলোকে সময়মতো চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়। যার ফলে সুসময়ের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর নেতৃত্ব ক্ষমতার খোলস ফেটে বেরিয়ে পড়ে, যা দলের দীর্ঘমেয়াদি ভাবমূর্তি ও দুর্ভাগ্য ডেকে আনে। অথচ বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, নির্যাতনের খড়্গ যখন সাধারণ নেতাকর্মীদের ওপর নেমে এসেছিল, তখন অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতাই এক ধরণের রাজনৈতিক আনুকূল্য বা মৃদু আচরণ লাভ করেছিলেন। রাজনৈতিক সংকটকালে ভৈরব টোল প্লাজার মতো স্থানে সাময়িক আটকে রাখার পর হোটেলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে স্যান্ডউইচ ও জুস দিয়ে আপ্যায়নের মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের তুলনায় প্রভাবশালী নেতাদের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা কতটা ভিন্ন এবং সুবিধাজনক ছিল।

 

জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবার আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পর্ক নিয়ে বলতে গিয়ে 'আইনি-যৌক্তিক কর্তৃত্ব' (Rational-Legal Authority)-এর ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, আধুনিক রাষ্ট্রে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আস্ফালন নয়, বরং পদের মর্যাদা ও নির্ধারিত নিয়মই হবে সর্বোচ্চ চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ যদি প্রকৃত অর্থেই একটি মানবিক, বৈষম্যহীন এবং সুশাসিত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়, তবে আইনপ্রণেতা ও আমলাতন্ত্র—উভয় পক্ষকেই তাদের নিজ নিজ সীমানা এবং রাষ্ট্রীয় প্রটোকলকে সম্মান করতে হবে। ক্ষমতার দম্ভে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর রাজনৈতিক মব সৃষ্টি করা যেমন ফৌজদারি অপরাধের শামিল, ঠিক তেমনি সরকারি দলের লেজুড়বৃত্তি করে আমলাদের 'জমিদার' বনে যাওয়াও সমভাবে নিন্দনীয়।

 

অতএব, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল সৌন্দর্য হলো এর প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য। কোনো জনপ্রতিনিধি যদি থানাকে নিজের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের চত্বর মনে করেন কিংবা কোনো কর্মকর্তা যদি নিজেকে জনগণের সেবকের পরিবর্তে অধিপতি ভাবেন, তবে সেই রাষ্ট্র কোনোদিনই সুশাসনের দেখা পাবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের নেতৃত্ব নির্বাচন ও আচরণের ক্ষেত্রে আরও বেশি সংযত, যৌক্তিক ও দূরদর্শী হওয়া, যাতে জনমানুষের আস্থা ও রাষ্ট্রীয় স্তম্ভগুলোর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে।


ক্যাটেগরিঃ কলাম,


প্রফেসর ড. আসিফ মিজান

উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।



আরো পড়ুন