English
ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-১০-২৯ ১৭:০৮:১২
আপডেটঃ ২০২৬-১০-৩০ ১৫:৪২:৩৫


সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের জন্য চাই লাইফস্টাইলের পরিবর্তন

সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের জন্য চাই লাইফস্টাইলের পরিবর্তন


ডা. মনিরুজ্জামান


সভ্যতা আজ অনেক উঁচুতে পৌঁছে গেছে‌। ‌ চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ অনেক উন্নত। কিডনি নষ্ট হয়ে গেলে তা প্রতিস্থাপন করা যায়, লিভার নষ্ট হলেও প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা রয়েছে। পৃথিবীতে প্রাচুর্য ও সুযোগ-সুবিধার এত বিস্তার আগে কখনো দেখা যায়নি। এত প্রাচুর্য, এত উন্নতি, এত সুযোগ-সুবিধার পরও প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি সত্যিই ভালো আছি?

বাংলাদেশে বর্তমানে ৭০% মৃত্যুর কারণ অসংক্রামক রোগ। এর মধ্যে ৩৪ শতাংশ মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ এবং দ্বিতীয় প্রধান কারণ ক্যান্সার। ডায়াবেটিসের অবস্থাও উদ্বেগজনক। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০ জনে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আর প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি ৫ জনে একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত।

অর্থাৎ, সামগ্রিক পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়। ১৯৮৬ সালে মোট মৃত্যুর মাত্র ৮ শতাংশের কারণ ছিল এসব অসংক্রামক রোগ। ২০১৪ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯ শতাংশে। ২০১৭ সালে তা হয় ৬৭ শতাংশ। আর বর্তমানে সত্য শতাংশে।

প্রশ্ন হলো, এর মূল কারণ কী? উত্তরটি খুবই সহজ খুবই সরল—জীবনধারা বা লাইফস্টাইলের সমস্যা। এসব রোগকে একত্রে বলা হয় লাইফস্টাইল ডিজিজ। অর্থাৎ, আমাদের জীবনযাপনের ধরনই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

 

দীর্ঘ জীবনের রহস্য কোথায়

আমরা যেমন দীর্ঘ ও কর্মময় জীবন চাই, বিজ্ঞানীরাও তেমনি দীর্ঘায়ু নিয়ে গবেষণা করছেন বহু বছর ধরে। কীভাবে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা যায়, কীভাবে সুস্থ থেকে জীবনের সর্বোচ্চ সময়টুকু কাজে লাগানো যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন তারা।

বিজ্ঞানীদের একটি ব্যাখ্যা হলো, মানুষের আয়ুর সঙ্গে তার ডিএনএর সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের প্রত্যেকের কোষের ভেতরে থাকে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম, আর ক্রোমোজোম তৈরি হয় ডিএনএ দিয়ে। ক্রোমোজোমের দুই প্রান্তে ক্যাপ বা টুপির মতো যে অংশ থাকে, তাকে বলা হয় টেলোমেয়ার।

বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জন্মের পর থেকেই টেলোমেয়ারের ক্ষয় শুরু হয়। কোষ বিভাজিত হয়, নতুন কোষ তৈরি হয় এবং এর সঙ্গে টেলোমেয়ারও ক্রমে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। একপর্যায়ে টেলোমেয়ার সম্পূর্ণ ক্ষয়প্রাপ্ত হলে মানুষের মৃত্যু ঘটে—এটি প্রাকৃতিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অবশ্য কেউ যদি ট্রেনের নিচে গিয়ে শুয়ে থাকেন, তাহলে টেলোমেয়ারের সম্পূর্ণ ক্ষয়ের আগেই তার মৃত্যু হতে পারে। সেটি অস্বাভাবিক মৃত্যু।

ধরা যাক, কারও আয়ু ১০০ বছর। কিন্তু তিনি জানেন না, কী করতে হবে, কী খেতে হবে, কোন খাবার এড়িয়ে চলতে হবে কিংবা তার জীবনধারা কেমন হওয়া উচিত। তিনি হয়তো বাবাকে যেভাবে জীবনযাপন করতে দেখেছেন, মাকে যেভাবে দেখেছেন, কিংবা পরিবারের অন্যদের যেভাবে চলতে দেখেছেন, সেটিই অনুসরণ করছেন। অথচ জীবনধারায় ভুল থাকলে টেলোমেয়ার দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে।

ফলে কারও সম্ভাব্য আয়ু ১০০ বছর হলেও ৫০-৫৫ বছর বয়সে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়ে তার মৃত্যু ঘটতে পারে। এর পেছনে জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে।

টেলোমেয়ার নিয়ে গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ড. এলিজাবেথ ব্ল্যাকবার্ন। ডা. ডিন অরনিশের সঙ্গে যৌথ গবেষণায় তারা দেখিয়েছেন, একজন মানুষ যদি তার জন্য প্রয়োজনীয় জীবনাচরণগুলো অনুসরণ করেন, তাহলে ডিএনএতে নির্ধারিত আয়ু—তা ৯০, ১০০, ১২০ কিংবা ১৪০ বছর যা-ই হোক—পূর্ণ করার সম্ভাবনা বাড়াতে পারেন।

তাদের গবেষণায় টেলোমেয়ারের অকাল ক্ষয়প্রাপ্তি ঠেকানো এবং ইতিমধ্যে অতিরিক্ত ক্ষয়প্রাপ্ত টেলোমেয়ারকে আগের অবস্থার দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এ জন্য কয়েকটি বিষয় অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে বিজ্ঞানসম্মত খাদ্যাভ্যাস। মানুষকে এমন খাবার খেতে হবে, যা মানুষের জন্য উপযুক্ত।

 


দীর্ঘায়ু মানুষের খাদ্যাভ্যাস

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে প্রকাশিত  Blue Zones: The Science of Living Longer শিরোনামের আলোচনায় পৃথিবীর পাঁচটি জনপদের কথা বলা হয়েছে। এসব অঞ্চলের মানুষ গড়ে ১০০ বছর বাঁচেন। তারা সুস্থ কর্মময় দীর্ঘজীবনের অধিকারী  এবং জীবনের শেষ দিনও কর্মক্ষম থাকেন।

এই পাঁচটি অঞ্চল হলো- জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপ, গ্রিসের ইকারিয়া দ্বীপ, ইতালির সার্ডিনিয়া দ্বীপ, কোস্টারিকার নিকোয়া পেনিনসুলা এবং ক্যালিফোর্নিয়ার লোমা লিন্ডা। সেখানে তাদের মত খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করে দীর্ঘজীবী হওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য জনপদ হলো হুনজা ভ্যালি। হিমালয়ের কোল ঘেঁষে পাকিস্তানের উত্তরে অবস্থিত এই এলাকাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ। গবেষণায় বলা হয়েছে, পাকিস্তানিদের গড় আয়ু যেখানে ৬৭ বছর,  হুনজাদের গড় আয়ু ১০০ বছর।

হুনজারা প্রাকৃতিক খাবার খান এবং বরফগলা পানিতে গোসল করেন। তাদের খাবারের মধ্যে রয়েছে তাজা প্রাকৃতিক- অর্থাৎ পর্যাপ্ত শাকসবজি, তরি-তরকারি, বাদাম, বীজ, বিন, লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি, ফল ও সালাদ।  তারা খুবই অল্প পরিমাণে মাছ মাংস দুধ খান।  চিপসের মতো প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খান না। গ্রিল করা খাবার কিংবা পরোটার জন্য অপেক্ষা করেন না।  মাঝেমধ্যে এসব খাবার খেতে পারেন, তবে এগুলো তাদের মূল খাবার নয়।

 

খাদ্যাভ্যাস নিয়ে আরেকটি গবেষণার কথা উল্লেখ করা যায়।

আমেরিকার কর্নেল ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস প্রফেসর ও গবেষক ড. টি কোলিন ক্যাম্পবেল এর নেতৃত্বে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং চাইনিজ একাডেমী অব প্রিভেন্টিভ মেডিসিন এর তিন দল গবেষক যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা পরিচালনা করে। ৩ দশক ধরে গবেষণার পর তারা একটি বই প্রকাশ করেন। বইটির নাম The China Study.

 ড. টি কোলিন ক্যাম্পবেল তিন দশক গবেষণার পর প্রকাশ করেন The China Study বইটি


গবেষণাটির মূল পর্যবেক্ষণ হলো, সুস্থ থাকার জন্য মানুষের যতটুকু প্রাণিজ আমিষ গ্রহণ করা উচিত, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি গ্রহণ করছে।

প্রকৃতিতে প্রাণীদের খাদ্যাভ্যাসের দিকে তাকালে বিষয়টি বোঝা যায়। বাঘকে কখনো সবজি খাওয়ানো যায় না। তাকে যতই সুস্বাদু খাবারের কথা বলা হোক, সে তার স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করবে। আবার গরুকে মাংস খাওয়ানোর চেষ্টা করলেও তাকে তা খাওয়ানো সম্ভব নয়। অথচ মানুষের দাঁতের অধিকাংশ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ছাগল, হরিণের হঠাৎ তৃণভোজী প্রাণীর দাঁতের মিল রয়েছে। বর্তমানে আমাদের সমস্যা হচ্ছে-  দাঁত হরিণের মতো, কিন্তু খাবার খাচ্ছি বাঘের মতো।

আমরা কখনো শুনি না, অমুক হরিণের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে কিংবা অমুক বাঘ স্ট্রোক করে তার হাত-পা বাঁকা হয়ে গেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব প্রাণী সাধারণত তাদের প্রাকৃতিক খাদ্যাভ্যাস লঙ্ঘন করে না। ব্যতিক্রম মানুষ।

মানুষ ইচ্ছামত মজাদার খাবার খাচ্ছে যা তার ডিএনএ সাথে যায় না। ফলশ্রুতিতে তৈরি হচ্ছে লাইফস্টাইল ডিজিজ।

২০১৯ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি ছিলেন জাপানের কানে তানাকা। দীর্ঘজীবী মানুষের তালিকায় জাপান শীর্ষে রয়েছে। দীর্ঘজীবী জাপানিদের প্রধান খাবার- ভাত, মাছ ও শাকসবজি। তাদের খাদ্যতালিকায় হয়েছে বাদাম বীজ বিন সহ অন্যান্য খাবার। আর স্নেহজাতীয় খাবারের পরিমাণ কম থাকে।

 

সুস্থ ও দীর্ঘজীবনের জন্য ছয়টি অভ্যাস

সুস্থ কর্মময় দীর্ঘজীবন পেতে কয়েকটি অভ্যাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রথমত, মানুষের উপযোগী খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নিয়মিত পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে। শারীরিক পরিশ্রমের বিকল্প হিসেবে প্রতিদিন এক ঘন্টা ব্যায়াম করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, প্রাণায়াম বা দম চর্চা করতে হবে। আমাদের শরীরের প্রধান খাবার কিন্তু ভাত রুটি মাছ মাংস ডিম দুধ নয়। এগুলো ছাড়াও ১০-১৫-২০ দিন বেঁচে থাকা সম্ভব। পানি ছাড়াও তিন চার পাঁচ সাতদিন বেঁচে থাকা সম্ভব। কিন্তু দম বা অক্সিজেন ছাড়া দুই মিনিটের বেশি বাঁচা সম্ভব নয়। অথচ আমরা সেটির চর্চা সবচেয়ে কম করে থাকি। তাই প্রতিদিন নিয়মিত দম চর্চা করতে।

চতুর্থত, ধূমপানের অভ্যাস থাকলে তা বন্ধ করতে হবে।

পঞ্চমত, ওজন বেশি থাকলে তা স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে হবে।

ষষ্ঠত, নিয়মিত দুবেলা মেডিটেশন করতে হবে।

 


২০১৫ সালে প্রকাশিত আমেরিকার বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের একটি বিশেষ সংখ্যার শিরোনাম ছিল:  This Baby Could Live to Be 142 Years Old। অর্থাৎ, একটি এক থেকে দেড় কিংবা দুই বছরের শিশুকে ১৪২ বছর বাঁচানোর সম্ভাবনার কথা সেখানে তুলে ধরা হয়েছিল।

ছবিতে শিশুটিকে মেডিটেশন বা ধ্যান করতে দেখা যায়। এর সঙ্গে ছিল হাতে তসবিহ বা জপমালা। অর্থাৎ নিয়মিত সৃষ্টিকর্তার নাম স্মরণ করতে হবে। তাই ম্যাগাজিনের সেই

সংখ্যাটিতে  মেডিটেশনকে শতভাগ বৈজ্ঞানিক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

মেডিটেশন ও শরীরের পরিবর্তন

২০১০ সালে রিডার্স ডাইজেস্ট-এ প্রকাশিত একটি আলোচনার শিরোনাম ছিল Relaxation Changes Genes। সেখানে বলা হয়েছে, মেডিটেশনের মাধ্যমে মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগুলোর কার্যক্রমে পরিবর্তন আসতে পারে। মেডিটেশন ও যোগব্যায়ামের মাধ্যমে যে শিথিলতার প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তা শরীরের পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।

মেডিটেশন কেবল চোখ বন্ধ করে বসে থাকা কিংবা ঝিমানোর বিষয় নয়। নিয়মিত মেডিটেশন করলে শরীরে মানসিক চাপের ফলে সৃষ্ট কিছু অস্বাভাবিকতা মেরামতের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের একদল চিকিৎসক এই গবেষণা পরিচালনা করেন

 

খাদ্যাভ্যাস: কী খাচ্ছি, কেন খাচ্ছি

সুস্থতার জন্য খাদ্যের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ মানুষ এখন অনেক ক্ষেত্রে বিবেচনা না করেই খাবার খায়। মন যা চায়, চোখ যা দেখে ভালো লাগে, তা-ই খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ভালো লাগলেও খায়, ভালো না লাগলেও খায়। অনেক সময় ক্ষুধা না থাকলেও বসে বসে খাওয়া চলতে থাকে।

খাদ্যকে  মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে: অ্যালকালি-ফর্মিং ফুডস এবং অ্যাসিড-ফর্মিং ফুডস।

অ্যালকালি-ফর্মিং খাবারের মধ্যে রয়েছে- বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, অধিকাংশ ফল, পালং শাক, ব্রকলি, সালাদ, ডাল, মটরশুটি, বিন, বীজ, বাদাম, ওটস, আদা, রসুন, পেঁয়াজ, মসলা ও টক দই।

কিন্তু এসব খাবার আমরা অনেক সময় কম খাই।