প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান
রাজনীতি
কোনো রৈখিক রেখা নয়, বরং
এটি এক জটিল সামাজিক,
মনস্তাত্ত্বিক এবং আদর্শিক সংগ্রামের
মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়।
ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ
'দ্য প্রিন্স'-এ ক্ষমতার বাস্তবমুখী
ও কৌশলগত রূপকে প্রাধান্য দিলেও, রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য কিন্তু জনকল্যাণ ও নৈতিকতার মানদণ্ডেই
নির্ধারিত হয়। রাজনীতিতে ব্যক্তিগত
বা তাৎক্ষণিক আবেগের হয়তো কোনো স্থায়ী
স্থান নেই, তেমনি রাষ্ট্রীয়
ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে বিবেক, সুশাসন ও ন্যায়বোধকে বিসর্জন
দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সামষ্টিক অধিকার আদায়ের লড়াই যখন ব্যক্তিগত
স্বার্থ হাসিল, নেতার সান্নিধ্যে ছবি তোলা কিংবা
চাটুকারিতার বৃত্তে বন্দী হয়ে পড়ে, তখন
শুধু একটি দলের সাংগঠনিক
ভিত্তিই দুর্বল হয় না, বরং
পুরো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়।
সম্প্রতি
বাংলাদেশে চাটুকারিতা এবং সুবিধাবাদের যে
রাজনৈতিক ক্ষত আমরা প্রত্যক্ষ
করছি, তা কোনো নতুন
বিষয় নয়। তবে যখন
এই সুবিধাবাদী শ্রেণী কোনো বড় রাজনৈতিক
দলের নীতিনির্ধারণী স্তরে বা নেতৃত্বের বলয়ে
প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে,
তখন দলের প্রকৃত মূলভিত্তি
অর্থাৎ তৃণমূল কর্মীরা চরম এক মনস্তাত্ত্বিক
সংকটে ভোগেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড লাসওয়েল তাঁর ক্লাসিক গ্রন্থ
'Politics: Who Gets What, When, How'-এ
ক্ষমতার যে বণ্টন প্রক্রিয়া
দেখিয়েছেন, তা যদি কেবল
তোষামোদকারীদের পক্ষে যায়, তবে ত্যাগ
ও নিষ্ঠার রাজনৈতিক দর্শন সমাজ থেকে চিরতরে
হারিয়ে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে,
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি
সময় ধরে চরম প্রতিকূল
পরিস্থিতি, মামলা-হামলা এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন
মোকাবেলা করে টিকে থাকা
দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর
জন্য এটি একটি অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ আত্মসমীক্ষার সময়।
ঐতিহাসিকভাবে
দেখা গেছে, একটি দলের প্রকৃত
শক্তি নিহিত থাকে তার নিবেদিতপ্রাণ
কর্মীদের হৃদয়ে—নেতার পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি
তোলা বা সুযোগসন্ধানী প্রচারের
আলোয় থাকা অতি-উৎসাহীদের
মধ্যে নয়। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী
পিয়েরে বুর্দিয়ু রাজনৈতিক অঙ্গনে যে 'সোশ্যাল ক্যাপিটাল'
বা সামাজিক পুঁজির কথা বলেছেন, ত্যাগী
কর্মীরাই হলেন একটি দলের
সেই আসল পুঁজি। অথচ
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সুসময় এলে
সুবিধাবাদীদের কোলাহলে এই নীরব, প্রচারবিমুখ
কর্মীরা প্রায়শই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান। তারা
মিছিলের শুরু থেকে শেষ
পর্যন্ত রাজপথে ঘাম ঝরান, স্লোগানে
কণ্ঠ মেলান, অথচ নেতার সঙ্গে
দুটি কথা বলার সুযোগটুকুও
পান না। অন্যদিকে, সুসময়ের
কোকিলেরা শেষ মুহূর্তে এসে
মঞ্চের প্রথম সারিতে জায়গা করে নেয়।
এই
প্রসঙ্গে বিশ্বখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবারের ‘ক্যারিশম্যাটিক লিডারশিপ’ বা সম্মোহনী নেতৃত্বের
তত্ত্বটি প্রণিধানযোগ্য। ভেবার স্পষ্ট দেখিয়েছেন যে, একজন প্রকৃত
নেতার পরিচয় কেবল তাঁর বাগ্মিতা
বা জনপ্রিয়তায় নয়, বরং তিনি
তাঁর অনুসারীদের কতটা ন্যায়বিচার ও
সততার সঙ্গে মূল্যায়ন করছেন, তার ওপর। কোনো
নেতৃত্ব যদি চাটুকারদের স্তুতিতে
বিভ্রান্ত হয়ে দলের অকৃত্রিম
কর্মীদের অবমূল্যায়ন করেন, তবে তিনি সাময়িকভাবে
প্রশংসার বলয়ে থাকলেও ক্রমান্বয়ে
দলের মূল চালিকাশক্তি থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। চাটুকাররা
নেতার গুণকীর্তন করে নিজস্ব ব্যক্তিস্বার্থ
চরিতার্থ করার জন্য, আর
ত্যাগী কর্মীরা নেতার আদর্শকে ধারণ করে গভীর
বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতা থেকে।
প্রতিকূল সময়ে চাটুকাররা সবার
আগে নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়, অথচ
মামলা-হামলার ক্ষত বুকে নিয়ে
রাজপথ আগলে রাখে এই
অবহেলিত তৃণমূল।
গণমাধ্যমে
প্রকাশিত বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিবেদন ও কলামে সমসাময়িক
রাজনীতিতে 'অনুপ্রবেশকারী' ও 'সুযোগসন্ধানী'দের
দৌরাত্ম্য নিয়ে বহু আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বের সাম্প্রতিক কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ,
যেমন—অপরাধ বা জনস্বার্থবিরোধী কাজে
জড়িত থাকা এবং দলের
পরিচয় ব্যবহার করে ফায়দা লোটার
বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি
ঘোষণা এবং সাংগঠনিক কঠোর
বার্তা প্রদান—নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবিদার। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব
যেভাবে তৃণমূলের অভিযোগ আমলে নিয়ে ব্যবস্থা
গ্রহণের নির্দেশ দিচ্ছেন, তা একাধারে দলের
অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের জন্য জরুরি এবং
সাধারণ মানুষের মাঝে আস্থা ফেরানোর
একটি বড় মাধ্যম। তবে
এই প্রক্রিয়াকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
দিতে হবে। দল বা
গ্রুপ ভারী করার জন্য
পরগাছা ও সুবিধাবাদীদের প্রশ্রয়
না দিয়ে দলের নিজস্ব
ও পরীক্ষিত কর্মীদের পরিচর্যা করা এখন সময়ের
সবচেয়ে বড় দাবি।
আমেরিকান
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট পুটনামের ‘সোশ্যাল ট্রাস্ট’ বা সামাজিক আস্থার
তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন কোনো সংস্থায়
ত্যাগীরা বারবার উপেক্ষিত হন, তখন নতুন
প্রজন্মের মাঝে ত্যাগের আদর্শিক
মূল্য হ্রাস পায়। তরুণ সমাজ
তখন ভাবতে শুরু করে যে,
নীতি ও নৈতিকতার চর্চা
করে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়া অসম্ভব; বরং
তোষামোদ এবং লবিংয়ের মাধ্যমেই
কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছানো সহজ। এই বিপজ্জনক
মানসিকতা একটি রাজনৈতিক দলকে
জনসেবার পথ থেকে সরিয়ে
কর্পোরেট বা বাণিজ্যিক স্বার্থ
উদ্ধারের মাধ্যমে পরিণত করে।
রাজনীতি
কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় এবং কোনো
রাজনৈতিক সংগঠনও চাটুকারদের ব্যক্তিগত বলয় হতে পারে
না। নেতৃত্বকে বুঝতে হবে যে, পাশে
দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষ
যেমন সমানভাবে বিশ্বস্ত নন, তেমনি প্রচারের
আলো থেকে দূরে নীরবে
দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষও
অবহেলার যোগ্য নন। দলের কঠিন
সময়ে এই কর্মীরাই রক্ত
দিয়েছেন, নিজেদের জীবন ও যৌবনের
শ্রেষ্ঠ সময় অকাতরে বিলিয়ে
দিয়েছেন। আজ সময় এসেছে
দল থেকে তাদের প্রতিদান
দেওয়ার—তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ স্বীকৃতি, সম্মান ও মূল্যায়ন নিশ্চিত
করার। পদ-পদবি ও
সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা বা চাটুকারিতার পরিবর্তে
সততা, যোগ্যতা, অতীত ট্র্যাক রেকর্ড
এবং ত্যাগকে একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে।
রাজনীতির
ইতিহাস শুধু কে কার
পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছে বা
কে কতটা তোষামোদ করতে
পেরেছে, তা দিয়ে লেখা
হয় না; ইতিহাস লেখা
হয় কে কোন সংকটে
দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, কে
দুঃসময়ে আদর্শের সঙ্গে আপস করেনি এবং
কে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সংগঠনের জন্য
কাজ করেছে, তা দিয়ে। কোনদিন
ক্ষমতার পরিবর্তন হলে, সুসময়ের কোকিলেরা
আবার নতুন আশ্রয়ের খোঁজে
দলবদল করবে, কিন্তু আদর্শে বিশ্বাসী প্রকৃত ত্যাগীরা তাঁদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ নিয়ে
ইতিহাসের পাতায় অম্লান থাকবেন। চাটুকারিতার কাছে আদর্শ এবং
সুবিধাবাদের কাছে বিবেকের বিসর্জন
রোধ করে রাজনীতিতে প্রকৃত
মূল্যায়ন ফিরে আসুক—এটাই
হোক নতুন বাংলাদেশে জবাবদিহিতামূলক
ও টেকসই রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। তবেই
"সবার আগে বাংলাদেশ" যথাযথ
মর্যাদা পাবে।
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।
ড. বিজন কুমার শীল বিস্তারিত
বিপরীত স্রোত প্রতিবেদন বিস্তারিত
ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরী বিস্তারিত
যারিন মালিয়াত অদ্রিতা বিস্তারিত
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান বিস্তারিত
Bangladesh Addiction Professio.. বিস্তারিত
প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান বিস্তারিত
ডা. মনিরুজ্জামান বিস্তারিত
শ্রেণিবৈষম্য, অভিনয়ের দর্শন, প.. বিস্তারিত
স্কুলছাত্রী মেহজাবিন মৌশি টানা.. বিস্তারিত