English
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-১০-২৮ ১৫:৫১:০১
আপডেটঃ ২০২৬-১০-২৯ ০৪:৫৬:৫৯


থিয়েটার অভিজাতদের শিল্প, সিনেমা সবার

থিয়েটার অভিজাতদের শিল্প, সিনেমা সবার

শ্রেণিবৈষম্য, অভিনয়ের দর্শন, প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব এবং দর্শকের রুচি নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা নিয়ে ড্যানিয়েল ডে-লুইসের ভাবনা

 

তিনবার অস্কারজয়ী অভিনেতা ড্যানিয়েল ডে-লুইসের কাছে অভিনয় কেবল একটি পেশা নয়, বরং মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতার গভীরে প্রবেশের এক কঠিন শিল্প। চরিত্রকে বোঝা, তার অনুভূতির কাছাকাছি যাওয়া এবং অভিনয়ের মুহূর্তে নিজেকে মুক্ত করে দেওয়া—এসবই তার অভিনয়দর্শনের অংশ। কিন্তু অভিনয়ের জগৎ নিয়ে তার ভাবনা শুধু শিল্পের কৌশলে সীমাবদ্ধ নয়। থিয়েটারের শ্রেণিগত চরিত্র, সিনেমার সহজলভ্যতা, প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব এবং দর্শকের মন জয়ের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রবণতা নিয়েও তার রয়েছে স্পষ্ট বক্তব্য।

ডে-লুইস মনে করেন, সমাজে এখনো থিয়েটারকে সিনেমার চেয়ে উচ্চতর শিল্পমাধ্যম হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে। নাট্যশিক্ষার সময় তার নিজের মধ্যেও এই ধারণা তৈরি হয়েছিল যে মঞ্চে অভিনয় করাই একজন অভিনেতার প্রধান লক্ষ্য। সিনেমা ও টেলিভিশনকে তুলনামূলকভাবে কম মর্যাদার কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। অথচ তার সহপাঠীদের অধিকাংশই গোপনে সিনেমায় অভিনয় করার স্বপ্ন দেখতেন। কারণ সিনেমা দেখেই তারা বড় হয়েছেন; সিনেমার মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন বিস্ময় ও জাদু।

থিয়েটারের প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও ডে-লুইস এর অভিজাত চরিত্র নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেন। তার মতে, থিয়েটার উপভোগ করার জন্য অনেক সময় এমন শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি প্রয়োজন হয়, যা সমাজের সবাই সমানভাবে পান না। ধ্রুপদি সাহিত্য ও নাটক সম্পর্কে পরিচিতি এবং থিয়েটারে যাওয়ার আর্থিক সামর্থ্য—সব মিলিয়ে এর দর্শকগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে সীমিত হয়ে পড়ে।

অবশ্য তিনি স্বীকার করেন, অনেক নাট্যদল সবার সাধ্যের মধ্যে টিকিটের দাম রেখে চমৎকার প্রযোজনা মঞ্চস্থ করে। তবু সিনেমার একটি বড় শক্তি ছিল এর সহজলভ্যতা। একসময় সাধারণ মানুষও সহজে সিনেমার টিকিট কিনতে পারতেন। এখন সেই সুযোগ আগের মতো নেই। ডে-লুইসের আক্ষেপ, থিয়েটারে কাজ করার সময় তিনি যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অনুভব করতেন, তা হলো—তাদের অভিনয় মূলত সুবিধাভোগী একটি জনগোষ্ঠীর কাছেই পৌঁছাত।

 

চরিত্রের ভেতরে প্রবেশের সাধনা

ড্যানিয়েল ডে-লুইসের নামের সঙ্গে মেথড অ্যাক্টিংয়ের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। চরিত্রের জীবন ও অভিজ্ঞতাকে গভীরভাবে বোঝার জন্য তার প্রস্তুতি এবং অভিনয়ের ধরন নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। তবে এই অভিনয়পদ্ধতি সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ধারণার সঙ্গে তিনি একমত নন।

তার মতে, মেথড অ্যাক্টিং সম্পর্কে অনেক মন্তব্যই করেন এমন মানুষ, যারা এই পদ্ধতিতে আসলে কী করা হয়, সে সম্পর্কে খুব কম জানেন। বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন এটি কোনো ছদ্মবিজ্ঞান অথবা অদ্ভুত কোনো গোষ্ঠীর আচরণ। তার অভিনয়ের ধরনকে অনেকেই অস্বাভাবিক কিংবা উন্মাদসুলভ বলেও বর্ণনা করেছেন।

কিন্তু ডে-লুইসের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তার কাছে মেথড অ্যাক্টিং হলো নিজেকে মুক্ত করার একটি উপায়। এর মাধ্যমে অভিনেতা চরিত্রের পরিস্থিতির প্রতি উন্মুক্ত হন এবং অভিনয়ের মুহূর্তে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন।

অ্যানিমোন সিনেমার একটি দৃশ্যের কথা বলতে গিয়ে তিনি এই স্বতঃস্ফূর্ততার উদাহরণ দেন। ছবিতে তার চরিত্র শৈশবে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর এক ধর্মযাজকের বিরুদ্ধে কীভাবে প্রতিশোধ নিয়েছিল, তা ভাইকে জানায়। প্রতিশোধের ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছিল গিনেস বিয়ার, কারি এবং জোলাপের একটি বাক্স। দৃশ্যটির কথা স্মরণ করে ডে-লুইস বলেন, একজন যাজকের ওপর মলত্যাগ করার ধারণাটি তার কাছে এত হাস্যকর মনে হয়েছিল যে তিনি হাসি থামাতে পারছিলেন না।

এই ঘটনা অভিনয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। চরিত্রের পরিস্থিতিকে শুধু বুদ্ধি দিয়ে বিশ্লেষণ করা নয়, বরং তার মধ্যে প্রবেশ করে মুহূর্তের অনুভূতিকে গ্রহণ করাও অভিনয়ের অংশ।

 

অন্যের জীবনের প্রতিনিধিত্ব কতটা নৈতিক?

১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া জিম শেরিডানের মাই লেফট ফুট সিনেমায় সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত আইরিশ শিল্পী ক্রিস্টি ব্রাউনের চরিত্রে অভিনয় করে ডে-লুইস প্রথম অস্কার জেতেন। চরিত্রটির প্রস্তুতির জন্য তিনি দুই মাস একটি বাড়িতে হুইলচেয়ার ব্যবহার করে এবং ছবি আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে সময় কাটিয়েছিলেন।

কিন্তু আজকের দিনে একই চরিত্রে অভিনয় করতে চাইতেন কি না, সেই প্রশ্নে তার উত্তর স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, বর্তমান সময়ে তার পক্ষে এই চরিত্রে অভিনয় করা সম্ভব হতো না, এবং তার যথার্থ কারণ রয়েছে।

গত কয়েক দশকে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রতিবন্ধী চরিত্রে প্রতিবন্ধী অভিনেতাদের সুযোগ দেওয়া এবং তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রশ্নটি এখন অনেক বেশি আলোচিত। ডে-লুইস জানান, মাই লেফট ফুট নির্মাণের সময়ও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। স্যান্ডিমাউন্ট ক্লিনিকে তাকে সাহায্য করা কয়েকজন তরুণ স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন, তাদের মতে এই চরিত্রে তার অভিনয় করা উচিত নয়।

ক্রিস্টি ব্রাউনের মতো একজন মানুষের জীবন পর্দায় তুলে ধরার দায়িত্বকে ডে-লুইস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। তার বক্তব্য, এমন একটি অভিজ্ঞতাকে বোঝার জন্য নিজের মানবিক সামর্থ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা প্রয়োজন।

তবে এই অভিজ্ঞতা একটি বড় প্রশ্নও সামনে আনে। কোনো চরিত্রের জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতি নেওয়া এবং তার জীবন বোঝার চেষ্টা করা কি সেই চরিত্রে অভিনয়ের অধিকার নিশ্চিত করে? নাকি সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও মতামতও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ? ডে-লুইসের স্বীকারোক্তি অন্তত এটুকু দেখায় যে, আন্তরিকতা থাকলেও প্রতিনিধিত্বের নৈতিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

 

সংঘাতের ইতিহাস এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় না

ডে-লুইসের নতুন সিনেমা অ্যানিমোন দুই ভাইয়ের গল্প। আশির দশকের শেষভাগের পটভূমিতে নির্মিত ছবিটিতে রে ও জেমের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ডে-লুইস ও শন বিন। বহু বছর আগে তারা দুজনেই উত্তর আয়ারল্যান্ডে বৃটিশ আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য ছিলেন।

এর আগে ইন দি নেম অফ দি ফাদার ও দি বক্সার–এর মতো সিনেমায় ডে-লুইস উত্তর আয়ারল্যান্ডের সংঘাতের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। তবে সেসব কাজে মূলত পশ্চিম বেলফাস্টের ক্যাথলিকদের অভিজ্ঞতা গুরুত্ব পেয়েছিল। এবার তিনি বৃটিশ সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞতার দিকটিও সামনে এনেছেন।

তার মতে, ওই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বৃটিশ বাহিনীকে খলনায়ক হিসেবে দেখা হতো বলে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরাকে অনেক সময় গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়নি। কিন্তু সংঘাতের বাস্তবতা ছিল আরও জটিল। বিভিন্ন পক্ষের তরুণ শ্রমজীবী মানুষ প্রায়ই কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।

ডে-লুইস এই সংঘাতকে অত্যন্ত নোংরা ও ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেন। তার উপলব্ধি, এত দিন তিনি বিষয়টি মূলত একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন।

সংঘাতের ইতিহাস বুঝতে একাধিক পক্ষের অভিজ্ঞতা জানা জরুরি। তবে একাধিক দৃষ্টিকোণ তুলে ধরার অর্থ সব পক্ষের দায় সমান বলে ধরে নেওয়া নয়। বরং কোনো সংঘাতের সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানবিক জটিলতা বুঝতে হলে তার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

 

দর্শকের আবেগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা

শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে ডে-লুইসের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দর্শকের রুচি অনুমান করে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রবণতা। তার ছেলে রোনান ডে-লুইসের পরিচালনায় অ্যানিমোন নির্মাণের অভিজ্ঞতা তার কাছে আনন্দের ছিল। কিন্তু সিনেমাটি সমালোচকদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। তার অভিনয় ও ছবির শৈল্পিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রশংসা করা হলেও সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত কতটা সুসংহত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ডে-লুইস স্বীকার করেন, এসব প্রতিক্রিয়া তাকে প্রভাবিত করেছে। নির্মাতারা নিজেদের কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলেও সিনেমাটি দর্শকের কাছে অর্থবহ হয়ে উঠছে কি না, সেটি তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমালোচকেরা দর্শককে সিনেমা দেখতে উৎসাহিত করতে পারেন, আবার নিরুৎসাহিতও করতে পারেন।

তবে দর্শকের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া আগেভাগে অনুমান করে সিনেমা নির্মাণের প্রবণতা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তার মতে, দর্শককে কখন হাসাতে হবে, কখন কাঁদাতে হবে, কখন উল্লাস করতে বাধ্য করতে হবে—এসব হিসাব কষার প্রবণতা চলচ্চিত্রজগতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

এই বক্তব্যের অর্থ দর্শককে উপেক্ষা করা নয়। বরং দর্শকের আবেগকে নির্দিষ্ট ছকে পরিচালিত করার চেষ্টা না করে শিল্পের নিজস্ব সত্য ও নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দেওয়া।

ডে-লুইসের নিজের অভিনয়জীবনেও এই স্বাধীনতার ছাপ রয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, কিছু কাজ নিয়ে তিনি গর্বিত হলেও অনেক কিছুই নতুন করে শুরু করতে চাইতেন। আবার পেছনে ফিরে তাকিয়ে স্বস্তিও পান যে, তার মধ্যে একধরনের স্থিরতা ছিল। সেই গুণের কারণে তিনি যতগুলো প্রকল্পে কাজ করেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে পেরেছেন।

 

সিনেমার জাদু থেকে জুলি অ্যান্ড্রুজ

 

ডে-লুইসের কাছে অভিনয়ের ইতিহাস শুধু নিজের কাজের ইতিহাস নয়, অন্য শিল্পীদের কাছ থেকে শেখারও ইতিহাস। মার্লন ব্র্যান্ডো একবার তার সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মাই বিউটিফুল লন্ড্রেট মুক্তির পর অ্যালেক গিনেস তাকে চিঠি লিখে অভিনয়ের প্রশংসা