ফাতেমা আক্তার
ঢাকার
নগর পরিবারের বাস্তবতায় দেখা যায়, নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ পুরুষতন্ত্রকে ভেঙে দেয়নি—বরং
নতুনভাবে সাজিয়েছে। যে নারী উপার্জন করে, তাকেই আবার শান্ত রাখতে হয়, ত্যাগ করতে হয়, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হয়। Raewyn
Connell-এর complicit
femininity ধারণা আসলে দেখায়,
নারীদের এমনভাবে
সামাজিকীকরণ করা হয় যাতে তারা পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ না করে বরং
টিকিয়ে রাখে। এখানে নারীদের “ভালো” হিসেবে দেখা হয় তখনই, যখন তারা যত্নশীল, আত্মত্যাগী, নীরব, এবং সম্পর্ক রক্ষার জন্য আবেগী
শ্রম দিয়ে যায়। অর্থাৎ নারীর পরিচয়কে এমনভাবে গড়ে তোলা হয় যাতে তিনি নিজের
ক্ষমতা বা স্বাধীনতা প্রকাশ না করে বরং পুরুষতান্ত্রিক শৃঙ্খলাকে মসৃণ রাখেন। তার
সাফল্যকে বলা হয় অহংকার, তার
ক্লান্তিকে বলা হয় বিলাসিতা। কর্মজীবী নারীরা শুধু অফিসের দায়িত্বই পালন করেন না,
পাশাপাশি ঘরের সমস্ত দায়িত্বও
কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। সামাজিক কাঠামো এখনো গৃহস্থালির কাজকে নিতান্তই
নারীর কাজ হিসেবে ধরে নিয়েছে। ফলে নারীর ডাবল বার্ডেন—অফিস, পরিবার, স্বামী, আত্মীয়—সব সামলানোর পরও তার
অবদানকে আমরা প্রায় অস্বীকার করি।
এই
বাস্তবতা উঠে এসেছে ঢাকা মহানগরীতে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক পিএইচডি গবেষণায়: “ Women
Labour Force Participation and the Status Conflict Within the Family: A Case
Study in Dhaka Metropolitan City. Researcher Fatema Akter ("নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ও
পরিবারে মর্যাদাগত দ্বন্দ্ব: ঢাকা মহানগরীর একটি কেস স্টাডি।”) গবেষক ফাতেমা
আক্তার তার সাম্প্রতিক পিএইচডি গবেষণায় দেখেছেন, নারীর ক্ষমতায়ন দায়িত্ব
বাড়িয়েছে, কিন্তু
দ্বন্দ্বও তীব্র করেছে।
শিশুর জন্মের পর একজন নারী শারীরিকভাবে দুর্বল, মানসিকভাবে ক্লান্ত, এবং কর্মজীবন থেকে সাময়িক দূরত্বে থাকে। অথচ এই সময়ে তাকে একা সব দায়িত্ব নিতে হয়। গবেষণায় এক উত্তরদাতা, কিশোর (ছদ্মনাম), জানিয়েছেন—শিশুর জন্মের পর স্বামী আলাদা ঘরে ঘুমাতেন, যাতে তার ঘুম নষ্ট না হয়।
কিশোর-
"আমি একা রাত জেগে থাকতাম।”
প্রশ্ন জাগে, শিশুর জন্ম কি শুধুই মায়ের দায়িত্ব? বাবার কি কোনো অংশগ্রহণ নেই? নতুন মা একদিকে শারীরিক দুর্বলতা আর মানসিক ক্লান্তি নিয়ে সন্তানের যত্ন করছেন, অন্যদিকে স্বামীর দূরত্ব তাকে আরও নিঃসঙ্গ করে তুলছে। এভাবে মাতৃত্ব হয়ে ওঠে দ্বৈত নিপীড়ন—শরীরের ক্লান্তি আর আবেগের নিঃসঙ্গতা।
এই
বাস্তবতা সমাজতাত্ত্বিক Arlie Hochschild “second shift” and
"emotional labor" ধারণার
সঙ্গে মিলে যায়। তিনি দেখিয়েছিলেন, নারীরা অফিস থেকে ফিরে আবার অদৃশ্য গৃহশ্রমে ডুবে যায়।
মাতৃত্বের সময় এই “second shift” আরও
গভীর হয়, কারণ
নারীর ক্লান্তি প্রকাশের অধিকার নেই, বরং তাকে হতে হয় “সুপার উইম্যান”—সব সামলাতে হবে, সব সহ্য করতে হবে। এমনকি আজকাল
বিজ্ঞাপনেও কর্মজীবী নারীকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন তিনি এক “সুপার
উইম্যান”—শিক্ষিত, চাকরিজীবী,
একই সাথে গৃহস্থালিতে
পারদর্শী। সবকিছু সামলে, সবাইকে
খুশি করে আবার নিখুঁতভাবে পরিপাটি। এই চিত্রটা নিছক ফ্যান্টাসি, এক ধরনের ফেরিটেল। বাস্তবতায়
নারীরা যখন ডাবল রোল প্লে করেন, তখন
তারা বিধ্বস্ত হন, ক্লান্ত
হন, কিন্তু সেই ক্লান্তি
প্রকাশের অধিকার তাদের দেওয়া হয় না। এ গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, কর্মজীবী নারীরা যখন সাহায্য
চান, তখন তাদের চাহিদা
উপেক্ষিত হয়।পরিবারে যদি কোনো নারী, স্বামীর কাছে সাহায্য চান বা নিজের দ্বন্দ্ব ও আবেগ নিয়ে
কথা বলতে চান, তখন
প্রায়ই তাকে বলা হয়—“তুমি দুঃখবিলাসী হয়ে গেছো।”
আর
যদি তিনি ক্লান্তি প্রকাশ করেন, তখন
শোনা যায়—“চাকরি ছেড়ে দাও, সংসার
সামলাও।” অর্থাৎ নারীর ক্লান্তি যেন কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা নয়, বরং এক ধরনের অযথা অভিযোগ। যেন
নারী মানেই ক্লান্তি প্রকাশের অধিকারহীন এক সত্তা। এই বাস্তবতা নারীর জীবনের গভীর
দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে। বাইরে কর্মজগৎ সামলে ঘরে এসে আবার গৃহস্থালির কাজ করতে হয়,
অথচ ক্লান্তি দেখানো বা
সাহায্য চাওয়া যেন অপরাধ।অন্যথায় তাকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়—“তুমি
কেমন মা? কেমন
বৌমা? কেমন স্ত্রী?”
সমাজতাত্ত্বিক আলোচনায় এটিই সেই অদৃশ্য আবেগিক শ্রম, যা নারীর জীবনে প্রতিদিনের বোঝা হয়ে থাকে।
নারীরা
যখন গৃহস্থালির কাজ সামলাতে বিভিন্ন ম্যানেজমেন্ট স্ট্র্যাটেজি নেন—খাবার আউটসোর্স
করেন, সন্তানদের কাজে যুক্ত
করেন, কিংবা বাইরের কাউকে
দিয়ে রান্না বা গৃহস্থালির কাজ করান—তখনও তাদের সমালোচনা করা হয়।
ইভা (ছদ্মনাম) তাঁর ফুল‑টাইম ব্যবসা সামলে রান্নার
জন্য একজন কুক নিয়েছিলেন, কখনও
খাবার আউটসোর্স করেন । তখন শাশুড়ি তাকে তিরস্কার করে বলেছিলেন, “তুমি কি সারা জীবন ছেলেকে (Food-
Panda) ফুড-পাণ্ডার খাবার
খাওয়াবে? স্বামীকে
বা নিজের সন্তানকে কি নিজের হাতের রান্না দিতে পারবে না?” এভাবে তাকে সমালোচিত করা হয়।
আরেকজন উত্তরদাতা, নিলু (ছদ্মনাম), স্বামীর কাছ থেকে শুনেছিলেন যে, তিনি ভালো স্ত্রী নন, ভালো মা নন, কারণ তিনি নিজে রান্না করেন না। কাজের লোকের রান্না খেয়ে স্বামী ও ছেলের শরীর নষ্ট হচ্ছে বলে তাকে অপরাধবোধে ভুগতে বাধ্য করা হয়।
এই
অভিজ্ঞতাগুলোকে বোঝার জন্য Axel Honneth’s Theory of Recognition প্রাসঙ্গিক। নারীর অবদানকে
অর্জন নয়, কর্তব্য
হিসেবে দেখা হয়। ফলে তাদের শ্রম অদৃশ্য থেকে যায়, স্বীকৃতি পায় না, বরং নীরবতা ও আত্মত্যাগকে গুণ
হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
Raewyn Connell’s Gender Order ধারণা দেখায়, শিক্ষিত ও কর্মজীবী নারীর স্বাধীনতা পরিবারে উত্তেজনা তৈরি করে। তাদের কর্তৃত্বকে দুর্বল করার জন্য অপরাধবোধ, ক্ষমা, নীরবতা ব্যবহার করা হয়। মাতৃত্বের সময় এই কৌশল আরও তীব্র হয়, কারণ সমাজ ধরে নেয় সন্তান লালন‑পালন একমাত্র নারীর কাজ। Raewyn Connell's Complicit Femininity
ইভা
ইলুজের emotional capitalism ধারণা
এখানে প্রাসঙ্গিক, যেখানে
নারীর আবেগকে পরিবারের ভেতরে পণ্যায়িত করা হয়। ভালোবাসা বিনিময় হয় শ্রমের
মাধ্যমে। “ভালো মা” মানে আত্মত্যাগী, আর “খারাপ মা” মানে স্বাধীন। এই দ্বৈততা নারীর আত্মত্যাগকে
সম্মানের মুদ্রা বানিয়ে দেয়।একদিকে কর্মজীবী নারীকে বলা হয়—তুমি স্বাধীন,
তুমি শক্তিশালী, তুমি উপার্জনক্ষম। কিন্তু
অন্যদিকে যদি তিনি ঘরের কাজ, সন্তান
লালন‑পালন,
শাশুড়ি সেবা কিংবা
আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে না পারেন, তখনই তাকে বলা হয় নারী হিসেবে
তার জীবন ব্যর্থ। যেন ভালো মা না হলে, ভালো স্ত্রী না হলে, ভালো বৌমা না হলে তার সমস্ত
অর্জন বৃথা।বাস্তবে দেখা যায়, যদি
কোনো নারী রান্না না করেন এবং তার স্বামী কাজের লোকের হাতের খাবার খেতে অস্বীকৃতি
জানিয়ে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েন, তখন তাকে বলা হয়—“তুমি কেমন
স্ত্রী?”।
এভাবে নারীর পরিচয়কে গৃহস্থালির কাজের সঙ্গে একীভূত করে ফেলা হয়। অথচ তিনি
শিক্ষিত, কর্মজীবী,
অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন।
প্রশ্ন হলো—শুধু শিক্ষিত এবং কর্মজীবী হওয়ার ফলেই কি নারীর ক্ষমতায়ন সত্যিই
হয়েছে?নারীর
শিক্ষা ও কর্মজগতে অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে তার আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং ক্ষমতায়নের
পথে পদার্পণ ঘটায়। কিন্তু তা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বা বৈষম্য কমায় না। গৃহকর্ম
এখনো শুধুই নারীর কাজ হিসেবে দেখা হয়, তার আত্মত্যাগকে স্বাভাবিক ও নিশ্চিত বলে ধরা হয়। এমনকি
তার অদৃশ্য গৃহশ্রম—যা আবেগিক সহায়তা, মানসিক সান্ত্বনা ও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য
অপরিহার্য—সেটিও অস্বীকৃত!
প্রকৃত নারীবাদকে আবেগের এই অর্থনীতি ভাঙতে হবে। Hoschild যেমন বলেছিলেন, মুক্তি শুরু হয় তখনই, যখন যত্নকে শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়—নিয়তি হিসেবে নয়। ক্ষমতায়ন হলো নারীরা কী সহ্য করছে তা নয়—বরং তারা কী প্রত্যাখ্যান করতে স্বাধীন সেটা।
লেখক
পরিচিতি

ফাতেমা আক্তার
পিএইচডি
গবেষক
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়
ড. বিজন কুমার শীল বিস্তারিত
বিপরীত স্রোত প্রতিবেদন বিস্তারিত
ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরী বিস্তারিত
যারিন মালিয়াত অদ্রিতা বিস্তারিত
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান বিস্তারিত
ফাতেমা আক্তার বিস্তারিত
প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান বিস্তারিত
আবদুল্লাহ আল মোহন বিস্তারিত
রাশেদ জামান বিস্তারিত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়,.. বিস্তারিত