English
ঢাকা, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-১০-১৮ ১৮:১৯:১৯
আপডেটঃ ২০২৬-১০-১৯ ০৩:২৭:০১


প্রকৃতিতে লেগেছে হেমন্তের ছোঁয়া

প্রকৃতিতে লেগেছে হেমন্তের ছোঁয়া


আবদুল্লাহ আল মোহন


সংশয়ী বন্ধুর ভীষণ মন খারাপ শুনেই ফোন পেয়ে বটতলায় ছুটে গেলাম। শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় এই হেমন্তের গ্রামে ছুটে যেতে পারেনি বলে ভীষণই বিষন্ন সে। নগরের নাগর নয়, তার মন যে দখল করে আছে বাংলার হেমন্তের গান, হেমন্তের পরিণতি শীতের আগমনী গানও। এই সময়ের গ্রাম বাংলার জল হাওয়া বড্ড তার প্রিয়। তার প্রিয় কবি মনমোহন দাসের ভাষায় উচ্চারণ করে শোনায়, ‘রূপসী হেমন্তের প্রেমে পড়ে যাই, হৈমন্তিক ছুটিতে ছুটি গ্রামে তাই, জীবনে জীবনানন্দ খুঁজে পাই।’ বন্ধুটির আমার জীবনানন্দ দাশ আর হেমন্তে পেয়ে বসেছে আজ, বুঝতে একটুও দেরি হলো না। সংশয়ী বন্ধুটি বলতে থাকে, ‘আমাদের স্কুল-কলেজগুলোতে এই সময়ই ছুটি হওয়া উচিত, হেমন্তকে উপভোগের জন্য গ্রামে গিয়ে প্রকৃতি মায়ের সুসঙ্গ লাভের জন্যে। এবং নিয়ম করা উচিত ফিরে এসে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলার প্রকৃতি মাকে নিয়ে আপন ভাবনার আলোয় উৎসারিত সৃজনশীল লেখা জমা দেওয়া। এজন্য কিছু নম্বরও রাখা যেতে পারে সিলেবাসে। এর ফলে ‘নিজেকে জানতে’ কৃষক পিতার-মাতার প্রতি টানও বাড়বে, দেশকে জানা হবে, প্রকৃত দেশপ্রেমও বাড়বে। মন্দ নয় সংশয়ী বন্ধুর ভাবনাটি। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপকগণের মনে কি এই নবচেতনার শিহরণ অনুভূত হবে?’

 

২.
সংশয়ী বন্ধু স্বপ্নের কথা বলতে থাকে চায়ের চুমুকের ফাঁকে ফাঁকে, আমি মুগ্ধ শ্রোতা। বলতে থাকে - কুয়াশার চাদরে ঢাকা বাংলার আরেক ঋতু শীতের দরজা খুলে দিয়ে আসে হেমন্তের বিদায়ের পালা। শুষ্ক কঠিন প্রকৃতির পরিপূর্ণ রিক্ততা ও দিগন্তব্যাপী সুদূর বিষাদের প্রতিমূর্তি নিয়ে নিঃশব্দ চরণে হেমন্তের যেমন আগমন ঘটে তেমনি বাঙালির ঘরে ঘরে সোনার ফসল দান করে রিক্ততার মধ্য দিয়ে শিশিরের মত নিঃশব্দ চরণে বিদায়ও গ্রহণ করে এই ঋতু। আর হেমন্তের দুঃখঝরা দিনে কেবলি মনে পড়ে জীবনানন্দকে। কবি জীবনানন্দের অনেক কবিতায় তাঁর প্রিয় ঋতু হেমন্তের নানাবিধ উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এই হেমন্তকে ঘিরেই তাঁর যাবতীয় ক্ষয়িষ্ণুবোধের সঞ্চালন এবং মৃত্যুচেতনার, শূন্যতার, রিক্ততার এবং অবসাদগ্রস্ততার আবহ সৃষ্টি হয়েছে। এই হেমন্ত আবার কখনো কখনো উজ্জীবনের, পূর্ণতার এবং জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি কোনো চেতনারও প্রতীক হিসেবে এসেছে। তাই মনে হয় জীবনানন্দ দাশ ষোলোআনা হেমন্তপ্রেমী কবি। তাঁর কবিতায় হেমন্ত, প্রকৃতি আর আত্মমগ্ন একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। জীবনানন্দের ভাষায়,
‘আমি সেই সুন্দরীরে দেখে লই-নুয়ে আছে নদীর এ পাড়ে / বিয়োবার দেরী নাই- রূপ ঝড়ে পড়ে তার / শীত এসে নষ্ট করে দিয়ে যাবে তারে।’ হেমন্তের গভীর গম্ভীর রূপ কবির প্রাণ ভরিয়েছিল। শিশির-কুয়াশা মিশ্রিত হেমন্ত ঋতু তাকে আকৃষ্ট করত। এই ক্ষণস্থায়ী ঋতুকে জীবনানন্দ নতুন করে অবলোকন করেছিলেন। কবি হৃদয়ের গোপন ভালোবাসার আর্তি এই হেমন্ত ঋতু। তাই কেবল জীবনানন্দের কাব্যেই হেমন্ত পেয়েছে শীর্ষস্থান। তার প্রতিটি কবিতায় রূপায়িত হয়েছে হেমন্তের অপরূপ বৈশিষ্ট্য– শিশিরের শব্দ, ধূসর কুয়াশা, মেটে জোছনা, মাঠ পাড়ের গল্প। তাইতো কবির ভাষায়, ‘অঘ্রাণ এসেছে আজ পৃথিবীর বনে / সে সবের ঢের আগে আমাদের দুজনের মনে / হেমন্ত এসেছে তবু।’

 

৩.

‘সবুজ পাতার খামের ভেতর / হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে / কোন্ পাথারের ওপার থেকে / আনল ডেকে হেমন্তকে ...’ আজ পয়লা কার্তিক। আবহমান বাংলায় ষড় ঋতুর পরিক্রমায় এলো হেমন্ত। পঞ্জিকার পাতায় আজ থেকে শুরু হলো হেমন্ত। শরতের পর কার্তিক-অগ্রহায়ণ মিলে এই হেমন্ত। বাংলার ষড়ঋতুর পরিক্রমায় চতুর্থ ঋতু হেমন্ত। একে বলা হয় শীতের বাহন। শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে ধীর ধীরে প্রকৃতিতে আসে এ ঋতু। জীবন ও প্রকৃতিতে এক আশ্চর্য সময় হয়ে ওঠে হেমন্ত। তীব্র গরমও থাকে না আবার শীতও জেঁকে বসে না। তবে রাতের বেলা এবং ভোরে হালকা হিমেল হাওয়া ও কুয়াশার ছোঁয়া পাওয়া যায়। বর্ষার পরে এই সময়ে বৃক্ষরাজি থাকে সবুজে ভরা। ভরা থাকে খাল-বিল নদী-নালা। বিল জুড়ে থাকে সাদা-লাল শাপলা আর পদ্ম ফুলের সমারোহ। হেমন্ত শস্যের, তৃপ্তির, বিরতির ঋতু। শস্যভরা এই ঋতুকে সবচেয়ে বেশি মহিমান্বিত করেছেন জীবনানন্দ দাশ। কবি হেমন্তকে দেখেছেন প্রেমে-কামে, দেহে-দেহহীনতায়, সৃষ্টিতে, তৃপ্তিতে, বিরহে, বিরতিতে। ‘পিপাসার গান’ কবিতায় লিখেছেন, ‘এ দেহ অলস মেয়ে / পুরুষের সোহাগে অবশ / চুমে লয় রৌদ্রের রস / হেমন্ত বৈকালে / উড়ো পাখপাখালির পালে / উঠানের পেতে থাকে কান, শোনে ঝরা শিশিরের ঘ্রাণ / অঘ্রাণের মাঝরাতে।’ কাব্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে হেমন্ত এক অপরূপা সুন্দরী। ঋতুকন্যা হৈমন্তীর প্রেমে হাবুডুবু খায় পুরো প্রকৃতি। কবির চোখে হেমন্ত কী অসাধারণ, ‘প্রথম ফসল গেছে ঘরে / হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে শুধু শিশিরের জল; / অঘ্রানের নদীটির শ্বাসে / হিম হয়ে আসে / বাঁশপাতা-মরা ঘাস-আকাশের তারা! / বরফের মতো চাঁদ ঢালিছে ফোয়ারা! / ধানক্ষেতে-মাঠে / জমিছে ধোঁয়াটে / ধারালো কুয়াশা!’

 

৪.
প্রকৃতির নিয়মে শরতের সাদা মেঘের ভেলা উড়িয়ে হেমন্ত নিয়ে আসে হিম হিম মৃদু কুয়াশার স্তর। চারিদিকে নতুন ধানের মিষ্টি গন্ধ। শীতের আগমনী বার্তা। কৃষিনির্ভর আমাদের জনজীবনে হেমন্ত আনন্দ-বেদনার কাব্যের মতো। শুরুতে অভাব-অনটন, শেষটায় সমৃদ্ধির সোনালি উদ্ভাস। আবহমানকাল থেকেই হেমন্ত মানেই কৃষকের মুখে অনাবিল হাসি। ধান কাটা-মাড়াই নিয়ে পরিতৃপ্তির ব্যস্ততা। চলতে থাকে নবান্নের পিঠা-পায়েসের আয়োজন। ঋতুবৈচিত্র্যের বাংলাদেশে কার্তিক-অগ্রহায়ণ হেমন্তকাল। কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। মিষ্টি রোদের আদর। জ্যোৎস্না-প্লাবিত রাত। পাতাঝরা বৃক্ষের নৃত্য। এসব ঋতুকন্যা হেমন্তের বৈশিষ্ট্য। আর এসব বৈশিষ্ট্য নাড়া দিয়েছে প্রকৃতির কবি, নিসর্গের কবি, রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশকে। অন্য কোনো কবির কাব্যে হেমন্ত এলেও জীবনানন্দের মতো কেউ আবেগতাড়িত করতে পারেনি আমাদের। বাংলা কবিতার বিপুল ভাণ্ডার থেকে তুলে আনা পঙক্তিমালা পর্যালোচনা করলেই দেখা যাবে, হেমন্তকে কবিতার ঋতু করে তুলেছেন একান্তভাবে জীবনানন্দ। তাঁর কবিতায়
‘ধান কাটা’, ‘নবান্ন’, ‘ইঁদুর’, ‘শালিক’, ‘লক্ষীপেঁচা’, ‘নির্জন স্বাক্ষর’, ‘কার্তিকের নীল কুয়াশায়’ প্রভৃতি শব্দ ও শব্দবন্ধ হেমন্তের চিত্র এমনভাবে তুলে ধরে যে, জীবনানন্দ পাঠ করলে পুরো হেমন্তের চিত্রই ফুটে ওঠে। শুধু জীবনানন্দে হেমন্তের শিশিরে ভিজলে চলে ? প্রভাত রবির কিরণের বর্ণচ্ছটায় শিহরিত না হয়ে থাকা যায়? যায় না বলেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হেমন্তকে নিয়ে লেখা চরণ স্মরণে আসে, ‘আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে / জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে / শব্দহীন গতিহীন স্তব্ধতা উদার / রয়েছে পড়িয়া শ্রান্ত দিগন্ত প্রসার / স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি।’

 

৫.

হেমন্ত ঋতুতে ফোটে অনেক ফুল। গন্ধরাজ, মল্লিকা, শিউলি, কামিনী, হিমঝুরি, দেব কাঞ্চন, রাজ অশোক, ছাতিম ইত্যাদি ফুলের ম ম ঘ্রাণে সুরভিত হয় এ দুই মাস। এ সময় লেখক-কবিরাও কাব্যের খাতা মেলে বসেন। লিখে চলেন রূপ-লাবণ্যের অসাধারণ দৃশ্যকল্প। তাইতো বাংলা সাহিত্যে হেমন্ত ঋতু অন্যতম উপজীব্য রূপে বিবেচিত। অনেকের মতে, হেমন্ত বিষণ্ণতার ঋতু তারপরও হেমন্ত ধরিত্রীর অন্তরঙ্গ সহচরী। হেমন্ত ভরে তোলে গৃহভাণ্ডার। কবির চোখে হেমন্ত শষ্যের ঋতু, তৃপ্তির ঋতু। ‘হেমন্তের ধান ওঠে ফলে / দুই পা ছড়ায়ে বোসো এইখানে পৃথিবীর কোলে।’ জীবনানন্দ ছাড়া আর কে উচ্চারণ করতে পারেন এমন কথা? ‘যখন ঝরিয়া-যাবো হেমন্তের ঝড়ে / পথের পাতার মতো তুমিও তখন / আমার বুকের’ পরে শুয়ে রবে?’ ঋতুকন্যা হেমন্ত আসে, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। প্রকৃতি ঝরাপাতার গান শোনাতে থাকে। ফসলের মৃত্যু ঘোষিত হলেও প্রকৃতির গালিচায় বাদামি, লাল, সোনালি পাতার রাশি। ঝরাপাতার শব্দ ও হেমন্তের রং প্রাণিত করে পৃথিবীর কবিদের। কবি বলেছেন, ‘হেমন্ত ফুরায়ে গেছে পৃথিবীর ভাঁড়ারের থেকে: / কোথাও বা সৃষ্টির অন্ধকার রহস্যের সঙ্গে বিজড়িত করেছেন তাকে: / আজকে মানুষ আমি তবুও তো-সৃষ্টির হৃদয়ে / হৈমন্তিক স্পন্দনের পথের ফসল।’

 

৬.

‘রূপসী বাংলা’র কবি বাংলার প্রকৃতিসম্ভার ‘তমালের নীল ছায়া বাংলার অপরূপ রূপ’ দেখে আর পৃথিবীর রূপ খুঁজতে যান না, সেই কবির এই প্রকৃতিগত ভাব, ভাষা পেয়েছে ‘হেমন্ত’কে কেন্দ্র করে। তাই মৃত্যুর পরে তিনি ‘ধানসিঁড়ি নদীর তীরে এই বাংলায়...‘কার্তিকের নবান্নের দেশে’ ফিরে আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন কখনো ‘শঙ্খচিল শালিখের বেশে’ অথবা ‘ভোরের কাক হয়ে’...বাংলার নদী মাঠ খেত ভালোবেসে’ (আবার আসিব ফিরে, রূপসী বাংলা)। জীবনানন্দ দাশের হেমন্ত কখনো কখনো উৎসবেরও প্রতীক, যদিও তা পূর্ণ অঙ্গীকারের ধারণারহিত; অবসাদের ছায়ায় ভারাক্রান্ত। ‘মাঠের নিস্তেজ রোদে নাচ হবে- / শুরু হবে হেমন্তের নরম উৎসব...কার্তিকের মিঠে রোদে আমাদের মুখ যাবে পুড়ে;’ (অবসরের গান, ধূসর পাণ্ডুলিপি)। ‘কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে’ আমরা দেখি ‘মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায়’। ঘোড়া কবিতায় যে পরাবাস্তব চিত্রকল্পের সন্নিবেশ ঘটেছে, তা কার্তিকের জ্যোৎস্নাকে কেন্দ্র করে বেশি প্রত্যয়ী হয়ে উঠেছে। নরম বিকেল, কুয়াশা, জ্যোৎস্না এবং সর্বোপরি অন্ধকারের প্রতি তাঁর দুর্নিবার মোহ তাঁর মৃত্যুচেতনার দিগন্তকে আরও প্রসারিত করেছে। তাঁর এই মৃত্যুচেতনা এক নার্সিসাসীয় উন্মাদনায় উন্মুখ এবং গভীর মমতায় আবেশিত। ‘অন্ধকার’ কবিতায় এই বোধ সর্বাধিক উন্মোচিত এবং গাঢ়ীকৃত হয়েছে। এই কবিতার জীবন-বিমুখীনতা কখনোই জীবনহীনতা নয়; ‘যুগজ্বরে’ আক্রান্ত মানস-প্রতিক্রিয়া যা আধুনিক কবিতার চারিত্র্যলক্ষণ।

 

৭.

‘হেমন্তের প্রান্তরের তারার আলোক’ (তিমির হননের গান) এবং সেই আলোকের হাতছানিতে নিজেকে মানুষ হিসেবে- ‘সৃষ্টির হৃদয়ে / হৈমন্তিক স্পন্দনের পথের ফসল’ (সময়ের কাছে) তুলে দিয়ে শেষাবধি তিনি একটি নক্ষত্রের মতো এসে ‘তারপর একপায়ে চলে / ঝাউয়ের কিনার ঘেঁষে হেমন্তের তারাভরা রাতে’ (একটি নক্ষত্র আসে) ‘উজ্জ্বল ও নিরুজ্জ্বল নক্ষত্র-গ্রহের আলোড়নে/ অঘ্রানের রাত্রি হয়;...’ আর ‘শেষ ট্রাম মুছে গেছে, শেষ শব্দ, কলকাতা এখন/ জীবনের জগতের প্রকৃতির অন্তিম নিশীথ;…’ (ঐ)। হেমন্ত ছিল তাঁর প্রগাঢ় কবিসত্তারই অভিব্যক্তি; ধ্বংস, বিনষ্টি, বিষাদ ও অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে হেমন্তের প্রতীকীসত্তা উজ্জ্বলতর হয় যখন দেখি, ব্যাপারটি কাকতালীয় যদিও, কবি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু হেমন্ত ঋতুতে ঘটেছে। ট্রামের ধাক্কায় আহত হওয়া এবং (২২ অক্টোবর ১৯৫৪) মৃত্যুবরণ যেন সেই বিনাশী হেমন্তেরই মহাডাক ‘শেষ ট্রাম মুছে গেছে, শেষ শব্দ...।’

 

৮.

বৈচিত্র্যময় এক রূপের দেশ-বাংলাদেশ। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। এখানকার প্রকৃতিজুড়ে ছয় ঋতুর খেলা সত্যিই উপভোগ করার মতো। সারা বছর নবনব রূপের মধ্যে আমাদের বসবাস। কাব্য, ছন্দ, সুর আর রূপের খেলায় কখন যে রং বদলায় রসিক প্রকৃতি-বুঝেই আসে না। এখন শিশির স্নাত সকাল আর সোনারাঙা ধান ভাঙার দিন। দক্ষিণা বাতাসে কাশফুলের দোল শেষে হেমন্তের আয়োজনে মাতোয়ারা গ্রাম-বাংলার মানুষজন। কৃষকের মুখে স্বপ্নজয়ের রাঙাহাসি। কদিন পরই ঘরে ঘরে শুরু হবে পিঠাপুলির ধুম। তত দিনে শীতের আগমন আরো ঘনীভূত হবে। ষড়ঋতুর হিসেবে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ-হেমন্তকাল। হেমন্ত মানেই শিশিরস্নাত ভোর। মাঠ ভরা সোনালি ফসল। হালকা শীতের হাওয়ার দোলায় বন-বনানীর হৃদয়জুড়ে মৃদু কাঁপন। দূর্বাঘাসে, গাছের পাতায়, ঘরের চালে শিশির ঝরিয়ে শীতের সূচনা। খেজুরগাছে গাছিদের কলসি বাঁধার দৃশ্য। সত্যিকার নাতিশীতোষ্ণমন্ডলের মূল পরিচয়টাই যেন বাংলার প্রকৃতিতে মূর্ত হয়ে ওঠে এই ঋতুতে। প্রকৃতির হিম হিম ভাব আর হাল্কা কুয়াশায় শীতের আগমন বার্তা জানিয়ে ১লা কার্তিক থেকেই শুরু হয় হেমন্তকাল। এক হেমন্তের দুটি রূপ-ঋতুর শুরুতে মরা কার্তিকে অভাব আর ক্ষুধার হাহাকার; আবার শেষে অগ্রহায়ণে ধানের প্রাচুর্য। তবে শরতের পরে আর শীতের আগে এ ঋতু এখন যেন কাগুজে ঋতুতে পরিণত হয়েছে। বাস্তবে এ ঋতুর আবেশ বাঙালির ঐতিহ্য থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এখন থেকে যত দিন যাবে, ততই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য কমতে থাকবে। পার্থক্য যত কমবে, তত শীত বাড়তে থাকবে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে এখন প্রকৃতি যেন আর নিয়ম মানছে না। কেমন খামখেয়ালী হয়ে উঠেছে।

 

৯.

হেমন্তকাল এসে পৌঁছাতেই হলুদ ফসলের মাঠ দেখে কৃষকদের মুখে ফুটে উঠত তৃপ্তির হাসি। এ কারণেই সে সময়টাকে উৎসবে পরিণত করা হলো, নাম দেওয়া হয় ‘নবান্ন উৎসব’। নবান্ন উৎসব মানে ‘নতুন চাল বা অন্নের উৎসব’। এই সময় ধান কেটে শুকিয়ে সিদ্ধ করে তৈরি করা হয় নানা ধরনের পিঠাপুলি, পায়েস। বাংলার কৃষিজীবী সমাজে শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায় যেসব আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালন হয়, নবান্ন তার মধ্যে অন্যতম। ‘নবান্ন’ মানে ‘নতুন অন্ন’। বাংলাদেশে নবান্ন শুরু হয় আমন ধান কাটার পর। আমনের নতুন ধানের চালের প্রথম রান্না উপলক্ষকে  কেন্দ্র করেই নবান্ন শব্দটির জনপ্রিয়তা। অগ্রহায়ণে বা অঘ্রানে নতুন ফসল পাকলে কৃষকরা  ফসল কাটার আগে বিজোড় সংখ্যক ধানের ছড়া কেটে ঘরের চালের এক কোণায় বেঁধে রাখেন। বাকি এই চালের পায়েসে শুরু হয় নবান্ন উৎসব। এই নতুন চালের পায়েস দিয়ে মসজিদে দেওয়া হয় সিন্নি। এক সময় সাড়ম্বরে নবান্ন উদযাপন হতো। এই উৎসব মানুষের ভেতরে সমাদৃত ছিল অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে। কিন্তু কালের বিবর্তনে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব অনেকটা স্বকীয়তা হারিয়েছে। তবে এখনো বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কিছু কিছু স্থানে নবান্ন উৎসব অত্যন্ত ঘটা করে আনন্দমুখর পরিবেশে উদযাপন হয়।

 

১০.

কালের দূরত্ব ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেকটাই পাল্টে গেছে গ্রাম-বাংলার হেমন্তরূপ। তাছাড়া আমরাও ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি প্রকৃতির গভীর সান্নিধ্য থেকে। উপলব্ধির চেতনায়ও এখন আর ধরা পড়ে না প্রকৃতির সুনিবিড় দৃশ্যপটগুলোর তাৎপর্য। আধুনিকতার ছোঁয়ায় কৃত্রিম হয়ে পড়েছে অপরূপা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শোভা! অপরূপের মহিমায় আদতে হেমন্ত রোমান্টিক ঋতু। মনোরম আকাশ, শীতল বাতাস, মাঠে মাঠে সোনার ফসল। আবার পানি কমতে থাকা খালে-বিলে ধরা পড়ে কই, শিং, মাগুর, শোল ও টাকির মতো দেশি মাছ। যদিও দুর্মূল্যের কারণে তা সাধারণের পাতে ওঠার জো নেই। হেমন্তে আমাদের এই জনপদে দূর দেশ থেকে আসে হাজারো পরিযায়ী পাখি। কিছু পাখি এখানে খায়দায়, সংসার পাতে। শীতের শেষে আবার ফিরে যায় সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে ওদের জন্মভূমিতে। পরিযায়ী পাখিরা আমাদের হেমন্ত-শীতের মেহমান। ভালোবাসার বারতা নিয়ে ওরা আসে। হেমন্ত প্রকৃতির মতোই শান্ত হোক আমাদের জনপদ। হেমন্তের রোদের মতোই হেসে উঠুক বাংলাদেশ।

 

 

 

 লেখক পরিচিতি:

 

 

 

আবদুল্লাহ আল মোহন

সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

ভাসানটেক সরকারি কলেজ, ঢাকা

 

 

 

 

 


ক্যাটেগরিঃ জীবনধারা,


আরো পড়ুন