প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
একটি
দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রধান চালিকাশক্তি হলো তার আর্থিক
খাত, যার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান
করে ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ব্যাংক কেবল আমানত গ্রহণ
ও ঋণ বিতরণের নিষ্ক্রিয়
মাধ্যম নয়; বরং এটি
অর্থনৈতিক উদ্বৃত্তের সঞ্চালন ও পুঁজি গঠনের
প্রধানতম প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। তবে উন্নয়নশীল বিশ্বে,
বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো
উদীয়মান অর্থনীতিতে, ব্যাংকিং খাতের গতিপ্রকৃতি কেবল বাজার অর্থনীতির
সনাতন সূত্র বা চাহিদার নিয়মে
নির্ধারিত হয় না। এর
পেছনে ক্রিয়াশীল থাকে ক্ষমতা, স্বার্থের
বিন্যাস এবং নীতিনির্ধারণী প্রভাবের
এক জটিল সমীকরণ। অর্থনীতি
বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে আমরা বলি
‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ (Political
Economy)। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংকিং
খাতে যে কাঠামোগত ভঙ্গুরতা,
তারল্য সংকট এবং খেলাপি
ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে, তা কোনো আকস্মিক
আর্থিক দুর্ঘটনা নয়। বরং এটি
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংস্কৃতিরই এক অনিবার্য রূপান্তর।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে খাতটির সংকটকে নিছক ‘ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি’ হিসেবে না দেখে, এর
পেছনের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক অর্থনীতির
সমীকরণটিকে একটি নির্মোহ দৃষ্টিকোণ
থেকে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা
প্রয়োজন।
তাত্ত্বিক
অবয়বে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,
আধুনিক রাজনৈতিক অর্থনীতিতে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা স্বজনতোষী পুঁজিবাদ
এবং ‘রেণ্ট-সিকিং’ বা অনুপার্জিত আয়
খোঁজার প্রবণতা ব্যাংকিং খাতকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে।
অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু এবং জেমস রবিনসন
তাঁদের বিখ্যাত আকর গ্রন্থ ‘হোয়াই
নেশনস ফেইল’-এ দেখিয়েছেন, যখন
কোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’
(Inclusive) না হয়ে ‘শোষণমূলক’ (Extractive) হয়ে পড়ে,
তখন মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর হাতে সম্পদ কুক্ষিগত
করার প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। বাংলাদেশের
ব্যাংকিং খাতে নতুন ব্যাংকের
অনুমোদন প্রদান থেকে শুরু করে
পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা- প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের
ছায়া স্পষ্ট। ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ যখন
বাজার দক্ষতার ভিত্তিতে না হয়ে রাজনৈতিক
আনুগত্য বা প্রভাবের মাপকাঠিতে
নির্ধারিত হয়, তখন আর্থিক
খাতের সুশাসন তাসের ঘরের মতো ভেঙে
পড়তে বাধ্য। এর প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ
আমরা দেখেছি, নামসর্বস্ব সংস্থাকে বিপুল অঙ্কের ঋণ প্রদান এবং
পরবর্তীতে তা নিয়মের বেড়াজাল
ডিঙিয়ে পুনঃতফসিলীকরণ কিংবা অবলোপন করার এক সংস্কৃতি।
এটি মূলত সাধারণ আমানতকারীদের
সঞ্চয়কে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী
গোষ্ঠীর কাছে স্থানান্তরের এক
প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল মাত্র।
এই সংকটের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থার
ক্যাপচার’ বা ‘রেগুলেটরি ক্যাপচার’
(Regulatory Capture)। একটি আদর্শ আর্থিক
ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত এবং স্বাধীন রেগুলেটর
হিসেবে কাজ করতে হয়।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জর্জ স্টিগলারের তত্ত্ব
অনুযায়ী, যখন কোনো খাতের
নিয়ন্ত্রক সংস্থা জনস্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে সেই খাতের শক্তিশালী
অংশীজন বা রাজনৈতিক শক্তির
স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত বা ‘ক্যাপচার্ড’ হয়,
তখন নিয়মের প্রয়োগ সিলেক্টিভ বা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে
পড়ে। আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে খেলাপি ঋণের
সংজ্ঞা শিথিল করা বা একক
গ্রাহকের ঋণসীমা বাড়ানোর যে সব সিদ্ধান্ত
নিয়েছে, তা অনেক সময়ই
অর্থনৈতিক যৌক্তিকতার চেয়ে বাইরের অদৃশ্য
চাপের প্রতিফলক হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। যখন বড় খেলাপিদের
জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়, তখন
তা সৎ ও নিয়ম
মেনে চলা ঋণগ্রহীতাদের জন্য
একটি ভুল বার্তা বা
‘মোরাল হ্যাজার্ড’ (Moral Hazard) তৈরি করে। এর
ফলে বাজারে এমন এক মনস্তত্ত্ব
তৈরি হয় যে, ‘ঋণ
ফেরত না দেওয়াটাই লাভজনক’। এই মনস্তাত্ত্বিক
বিকৃতি সামগ্রিক ঋণ শৃঙ্খলাকে ধ্বংসের
মুখে ঠেলে দিয়েছে।
অনেকে
মনে করেন, ব্যাংকিং খাতের এই সংকট কেবল
বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একচেটিয়া ব্যাধি। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত
ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন। সেখানে
‘জনস্বার্থ’ রক্ষার আড়ালে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ বরাদ্দ এবং
পরবর্তী সময়ে সেই মূলধন
ঘাটতি মেটাতে জনগণের করের টাকায় ‘বেল-আউট’ বা পুনঃমূলধন
জোগানোর যে রেওয়াজ তৈরি
হয়েছে, তা কোনোভাবেই টেকসই
অর্থনৈতিক নীতি হতে পারে
না। এটি মূলত আর্থিক
খাতের অদক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভর্তুকি দেওয়ার
শামিল। অথচ এই বিপুল
অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সামাজিক সুরক্ষার
মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে ব্যয় হতে পারত।
ফলে ব্যাংকিং খাতের এই রাজনৈতিক অর্থনীতি
দেশের সামষ্টিক সমতা ও সামাজিক
ন্যায়বিচারের ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
তবে
এই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ অসম্ভব
নয়, যদি আমরা সংকটের
মূলে আঘাত করতে পারি।
প্রথমত, ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার জন্য একটি
স্বাধীন, শক্তিশালী এবং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক
চাপমুক্ত ‘ব্যাংকিং কমিশন’ গঠন করা এখন
সময়ের দাবি। এই কমিশন কোনো
দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং
সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ও আইনি কাঠামোর
মধ্যে থেকে খেলাপি ঋণের
ফরেনসিক অডিট করবে এবং
অপরাধীদের আইনের আওতায় আনবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংককে তার আইনি ক্ষমতা
পূর্ণাঙ্গভাবে প্রয়োগের স্বাধীনতা দিতে হবে। পরিচালক
নিয়োগ, ঋণ অনুমোদন এবং
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হতে হবে। তৃতীয়ত,
দেউলিয়া আইন এবং অর্থঋণ
আদালতের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও
সংস্কার করতে হবে, যাতে
প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও আইনের ঊর্ধ্বে যাওয়ার সুযোগ না পান।
অতএব,
বলা যায়, ব্যাংকিং খাতের
বর্তমান ব্যাধিটি যতটা না আর্থিক,
তার চেয়ে অনেক বেশি
প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক। আমরা
যদি একটি টেকসই, বৈষম্যহীন
এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির বাংলাদেশ
বিনির্মাণ করতে চাই, তবে
ব্যাংকিং খাতকে এই দুষ্টচক্র থেকে
মুক্ত করতেই হবে। আর্থিক খাতের
সুশাসন রক্ষা কোনো রাজনৈতিক দয়া
বা অনুকম্পা নয়, এটি রাষ্ট্রের
অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও সাধারণ মানুষের
আমানতের নিরাপত্তার আইনি গ্যারান্টি। রাজনৈতিক
সদিচ্ছা এবং নির্মোহ প্রাতিষ্ঠানিক
সংস্কারের মাধ্যমেই কেবল এই খাতের
হৃত গৌরব ও জনআস্থা
ফিরিয়ে আনা সম্ভব। নচেৎ,
ব্যাংকিং খাতের এই ক্ষত সামগ্রিক
সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতার
দিকে ঠেলে দিতে পারে,
যা কোনো সচেতন নাগরিকেরই
কাম্য নয়।
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।
ড. বিজন কুমার শীল বিস্তারিত
বিপরীত স্রোত প্রতিবেদন বিস্তারিত
ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরী বিস্তারিত
যারিন মালিয়াত অদ্রিতা বিস্তারিত
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান বিস্তারিত
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান বিস্তারিত
নজরুল ইসলাম লিখন বিস্তারিত
বাংলা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্.. বিস্তারিত
তিনদিনব্যাপী ডাকটিকিট প্রদর্শ.. বিস্তারিত
পটার সিরিজ বিশ্বের ৮৫টিরও বেশি.. বিস্তারিত