English
ঢাকা, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-০৭-২৬ ২১:৩৪:২৮
আপডেটঃ ২০২৬-০৭-২৭ ০৩:৩৩:২২


ভূ-রাজনীতির সমীকরণ ও জাতীয় স্বার্থ

ভূ-রাজনীতির সমীকরণ ও জাতীয় স্বার্থ


সবার আগে বাংলাদেশ

  প্রফেসর . আসিফ মিজান

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল গতিশীল সমীকরণে কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের আকস্মিক কূটনৈতিক, রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা বিষয়ক তৎপরতা কখনো স্রেফ বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মার্কিন সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) ডিরেক্টরেট অব অপারেশন্সের সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা জেরাল্ড পি হ্যামিল্টনের ঢাকা আগমন এবং এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গোরের আসন্ন সফর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের উদ্যোগকে বৈশ্বিক রাজনীতির গভীর তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোতেই পাঠ করা প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক খাতায় কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠকের সূচি না থাকা সত্ত্বেও একজন অভিজ্ঞ গোয়েন্দা কর্মকর্তার নেপথ্যে অবস্থান করাটা রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভাষায়ট্র্যাক-টু ডিপ্লোমেসি’ (Track-II Diplomacy) কিংবাস্ট্র্যাটেজিক কভার্ট এঙ্গেজমেন্ট’-এর স্পষ্ট সংকেত বহনে সক্ষম।

 

রাষ্ট্রিক অস্তিত্ব 'নব্য-বাস্তববাদ'-এর পাঠঃ

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি 'নব্য-বাস্তববাদ' (Neorealism) বা স্ট্রাকচারাল রিয়ালিজমের প্রধান অনুসিদ্ধান্ত হলোবিশ্বব্যবস্থা মূলত একটি অরাজক কাঠামো (Anarchic Structure), যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রকে তার ভৌগোলিক অখণ্ডতা, অস্তিত্ব স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় নিজেদের সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করতে হয়। প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিজ্ঞানী কেনেথ ওয়াল্টজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো যখন কোনো সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে তৎপরতা বৃদ্ধি করে, তখন তার মূল উদ্দেশ্য থাকে ক্ষমতার কৌশলগত ভারসাম্য (Balance of Power) রক্ষা করা। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করায় আমাদের এই ভূখণ্ডের কৌশলগত গুরুত্ব আজ ওয়াশিংটন, বেইজিং কিংবা নতুন দিল্লির কাছে অভূতপূর্ব উচ্চতায় পোঁছেছে।

হ্যামিল্টনের মতো শীর্ষ সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তার উপস্থিতিকে যদি আমরা 'ইন্টেলিজেন্স ডিপ্লোমেসি' (Intelligence Diplomacy) তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করি, তবে স্পষ্ট হয় যে প্রথাগত কূটনৈতিক প্রোটোকলের বাইরে গিয়েই পরাশক্তিগুলো জটিল সংবেদনশীল আঞ্চলিক সমীকরণে নিজেদের নীতিভিত্তিক বার্তা আদান-প্রদান করে। রবার্ট জারভিসের ভাষায়, সংকটকাল বা রূপান্তরকালে এই অদৃশ্য যোগসূত্রই রাষ্ট্রগুলোর প্রকৃত মনস্তত্ত্ব প্রকাশ করে। অন্যদিকে, মানবিক ইস্যুকে সামনে রেখে বিশেষ দূতের সফরকে জোসেফ নাই-এর 'সফট পাওয়ার' (Soft Power) 'মানবিক নিরাপত্তা কূটনীতি' মোড়কে প্রভাব বিস্তারের কৌশল হিসেবে দেখাই যুক্তিযুক্ত।

 

ভূ-রাজনীতি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy)

আমাদের রাষ্ট্রীয় সত্তা, ভূখণ্ড এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সারসংক্ষেপ হলোকোনো বহিরাগত শক্তির অনুগত না হয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব আত্মমর্যাদা সার্বভৌম অবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখা। বৈশ্বিক শক্তিগুলোর এই টানাপোড়েনের মাঝে আমাদের মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত: "আমাদের এজেন্ডা একটাই: সবার আগে বাংলাদেশ"

পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে কোনো পক্ষ না নিয়ে নিজেদের নীতিগত অবস্থান সুসংহত রাখাই এখন সময়ের প্রধান দাবি। প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ভারতের মতো বৃহৎ শক্তির সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার একটি সুনির্দিষ্ট তাত্ত্বিক কৌশলগত পথরেখা আলোচনা করা জরুরি।

 

. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ক্ষমতার সীমাঃ

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত অর্থনৈতিক উন্মোচন, বাণিজ্যিক সুবিধা এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব। তবে 'ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল' (IPS)-এর মতো নিরাপত্তা বলয়ে যুক্ত হওয়ার প্রশ্নে রাষ্ট্রকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। রিচার্ড হাস-এর 'প্র্যাগম্যাটিক কন্টেইনমেন্ট' তত্ত্ব স্মরণে রেখে নিশ্চিত করতে হবে, ওয়াশিংটনের সাথে আমাদের মেলবন্ধন যেন বাণিজ্যিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখে, কিন্তু তা যেন কোনো আঞ্চলিক সামরিক ব্লকের অংশে পরিণত না হয়।

 

. চীন: উন্নয়ন অলংকার 'হেজিং' (Hedging) কৌশলঃ

চীন আজ দেশের অন্যতম অবকাঠামোগত উন্নয়ন সহযোগী। তবে রিয়েলপলিটিক বা বস্তুনিষ্ঠ রাজনীতির নিরিখে চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI)-এর সুবিধা গ্রহণ করতে হবে অত্যন্ত হিসাব-নিকাশ করে। অর্থনৈতিক কূটনীতিতে 'হেজিং' নীতির মাধ্যমে চীনের বিশাল মূলধন কারিগরি সক্ষমতাকে নিজেদের শিল্পায়নে কাজে লাগাতে হবে, কিন্তু ঋণের ফাঁদ একক ভূ-রাজনৈতিক নির্ভরতা এড়াতে আর্থিক শর্তাবলীতে সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অপরিহার্য।

 

. ভারত: ভৌগোলিক বাস্তবতাবাদ সমতার সমীকরণঃ

ভৌগোলিক বাস্তবতায় ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের কালজয়ী নীতি—"You can change your friends, but not your neighbors"—এখানে প্রণিধানযোগ্য। প্রখ্যাত চিন্তাবিদ হ্যান্স মরগেনথাউ-এর 'ক্লাসিক্যাল রিয়ালিজম' অনুযায়ী, প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক হতে হয় 'রেসিপ্রোসিটি' বা পারস্পরিক লেনদেনের ভারসাম্যভিত্তিক। সীমান্তের নিরাপত্তা অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের প্রশ্নে দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে হবে, আবার একই সাথে প্রতিবেশীর বৈধ নিরাপত্তা শঙ্কাকে সম্মান জানিয়ে নিজেদের ভূখণ্ডকে পারস্পরিক উন্নয়নের কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।

 

সিদ্ধান্ত: একটি টেকসই পররাষ্ট্র কাঠামোর প্রত্যাশাঃ

আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবাখেলায় কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির 'স্যাটেলাইট স্টেট' বা নির্ভরক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া আত্মঘাতী। বৈশ্বিক অঙ্গনে চিরস্থায়ী কোনো মিত্র বা শত্রু থাকে না, চিরস্থায়ী কেবল রাষ্ট্রীয় স্বার্থ।

অতএব, মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা কিংবা বিশেষ দূতের এই সফরসূচিকে স্রেফ পর্যবেক্ষণ না করে, এটাকে নিজেদের দরকষাকষির শক্তি বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। 'কৌশলগত ভারসাম্য' এবং 'স্বায়ত্তশাসন' অক্ষুণ্ণ রেখে বিশ্বমঞ্চে স্বাবলম্বী নীতি গ্রহণ করাই আমাদের একমাত্র অগ্রাধিকার। সবার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সম্মানজনক কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখে জাতীয় সার্বভৌমত্ব অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে সর্বাগ্রে রাখাটাই হোক আমাদের মূল পররাষ্ট্রনীতি।


ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি,


প্রফেসর ড. আসিফ মিজান

উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।



আরো পড়ুন