ধর্মীয়
নৈতিকতার মোড়কে প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
গণতান্ত্রিক
শাসনব্যবস্থায় যখন কোনো রাজনৈতিক
দল নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে রাষ্ট্রক্ষমতা বা আইনসভার অংশ
হওয়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়, তখন সর্বাগ্রে
প্রয়োজন পড়ে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক
সততা, নৈতিক মানদণ্ড ও উচ্চমাত্রার জবাবদিহিতা।
কিন্তু সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াত
দলীয় সংসদ সদস্য গাজী
নজরুল ইসলামের "ব্যক্তিগত মুহূর্তের" যে ভিডিও কেলেঙ্কারি
এবং সেই কেন্দ্রিক অপকর্মের
বস্তুনিষ্ঠ আলামত উন্মোচিত হয়েছে, তা সমকালীন সমাজ,
রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থায় এক
গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক সংকটের
ইঙ্গিত দেয়।
সংবাদমাধ্যমের
অনুসন্ধানী তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী,
ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে
একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণীকে চাকরির প্রলোভন দেখানো, ফাঁদে ফেলে একটি সাজানো
বিয়ের নাটক বা তড়িঘড়ি
'দ্বিতীয় বিবাহ' তত্ত্ব সামনে আনা, পেছনের তারিখে
(ব্যাক ডেটে) অবৈধ উপায়ে বিবাহের
ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করা এবং
দীর্ঘ সময় পর জীবনবৃত্তান্তে
সেই ভুক্তভোগীকে অবিবাহিত রাখার যে শুভঙ্করের ফাঁকি
দৃশ্যমান হয়েছে- তা কেবল একটি
বিচ্ছিন্ন ফৌজদারি অপরাধই নয়, বরং আইনসভার
মর্যাদা লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক ভণ্ডামির
চরম রূপ।
একজন
সমাজ, রাজনীতি, মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষক
এবং আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক হিসেবে এই বহুুমাত্রিক অপরাধকে
সমকালীন রাজনৈতিক সমাজতত্ত্ব এবং অপরাধবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক
কাঠামোর আলোকে ব্যবচ্ছেদ করা অত্যন্ত জরুরি।
অপরাধের
তাত্ত্বিক ও বহুমাত্রিক ব্যবচ্ছেদ
একজন
জনপ্রতিনিধি তথা সংসদ সদস্য
হিসেবে অভিযুক্ত গাজী নজরুল ইসলাম
একই সাথে যেসব গুরুতর
আইনি, নৈতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অপরাধ
সংগঠিত করেছেন, তা তাত্ত্বিকভাবে নিম্নরূপ:
১.
পদের চরম অপব্যবহার ও
প্রাতিষ্ঠানিক অমর্যাদা: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় জনপ্রতিনিধিত্ব হলো একটি 'পাবলিক
ট্রাস্ট' বা জনগণের আমানত।
আইনপ্রণেতা হিসেবে অর্পিত রাষ্ট্রীয় পদ ও প্রশাসনিক
প্রভাবকে ব্যক্তিগত যৌন লালসা ও
ট্র্যাপিংয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তিনি পদের
চরম অবমাননা করেছেন।
২.
চাকরির প্রলোভনে অপ্রাপ্তবয়স্কের যৌন নির্যাতন (Sexual Exploitation): অর্থনৈতিক সংস্থান ও চাকরির প্রলোভন
দেখিয়ে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণীকে
ফাঁদে ফেলা কেবল সেক্সচুয়াল
হ্যারাসমেন্ট বা যৌন হয়রানিই
নয়, আন্তর্জাতিক শিশু সুরক্ষা আইন
ও দেশীয় শিশু আইন অনুযায়ী
এটি একটি গুরুতর অপরাধ।
৩.
ধর্মীয় বিধিনিষেধের চরম লঙ্ঘন ও
জেনা (Adultery): ইসলামি অনুশাসন ও শরিয়াহ আইনের
দৃষ্টিতে বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক বা
জেনা অত্যন্ত গুরুতর ও কঠোর শাস্তিযোগ্য
অপরাধ। ধর্মীয় রাজনীতির দাবিদার একটি দলের শীর্ষ
নেতার এই আচরণ চরম
ভণ্ডামি নির্দেশ করে।
৪.
সুসংগঠিত জালিয়াতি ও পেছনের তারিখে
নথি প্রস্তুত (Backdated
Fraudulence): অপরাধ ঢাকতে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে আইনবহির্ভূতভাবে পেছনের
তারিখে বিয়ের কাগজপত্র প্রস্তুত করা সুস্পষ্ট ফৌজদারি
জালিয়াতি (Forgery) ও প্রতারণার (Fraud) শামিল।
৫.
পদ্ধতিগত সত্য গোপন ও
প্রতারণা: ঘটনা ঘটার দীর্ঘ
সময় পরও ভুক্তভোগীকে দাপ্তরিক
জীবনবৃত্তান্ত বা জীবন বৃত্তান্তে
অবিবাহিত হিসেবে প্রদর্শন করা প্রমান করে
যে, সম্পূর্ণ বিষয়টি একটি পরিকল্পিত মিথ্যার
ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।
৬.
সর্বোচ্চ আইনসভা 'জাতীয় সংসদ'-এর অবমাননা: একটি
রাষ্ট্রের জাতীয় সংসদ হলো সার্বভৌম
ক্ষমতার প্রতীক। সংসদের একজন সদস্য যখন
এই ধরনের নিম্নমানের ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে
লিপ্ত হন, তখন তিনি
সংসদীয় গণতন্ত্রের মর্যাদা ও পবিত্রতাকে চরমভাবে
ক্ষুণ্ন করেন।
৭.
ভোটার ও জনগণের সাথে
বিশ্বাসভঙ্গ (Breach of
Trust): সাধারণ মানুষ যাদের নৈতিক আদর্শ ও অভিভাবক মনে
করে ভোট দিয়ে প্রতিনিধি
নির্বাচিত করে, তাদের সাথে
এই প্রতারণা সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের (Social Contract
Theory) সরাসরি লঙ্ঘন।
৮.
ধর্মের অবমাননা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের
রাজনৈতিক অপব্যবহার: ইসলাম ধর্ম যেখানে নৈতিকতা,
চরিত্র গঠন ও সুবিচারের
শিক্ষা দেয়, সেখানে ধর্মের
অনুশাসনের রাজনৈতিক বুলি আউড়ে এরকম
পাপাচার লিপ্ত হওয়া দ্বীনের অবমাননা
এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশ্বাসের ওপর আঘাত।
৯.
সাংবিধানিক শপথ ভঙ্গ: জাতীয়
সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় সংবিধানে বর্ণিত
যে শপথ বা প্রতিশ্রুতি
নেওয়া হয়, তার প্রতি
অবিশ্বস্ততা প্রদর্শন করে তিনি তাঁর
সাংবিধানিক ও শপথগত দায়বদ্ধতা
ভঙ্গ করেছেন।
১০.
অপরাধমূলক সিন্ডিকেট গঠন: পুরো প্রক্রিয়ায়
ব্যক্তিগত চালক (ড্রাইভার) এবং একটি সংগঠিত
চক্রকে ব্যবহার করা প্রমাণ করে
যে, এটি কোনো আকস্মিক
ভুল নয়, বরং একটি
সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ট্র্যাপিং সিন্ডিকেটের কাজ।
'জাস্টিফিকেশন কালচার' ও নিউট্রালাইজেশন থিওরি
অপরাধবিজ্ঞানে
গ্রেশাম সাইকস (Gresham Sykes) এবং ডেভিড মাতজা
(David Matza)-এর বিখ্যাত "নিউট্রালাইজেশন থিওরি" (Neutralization
Theory) অনুযায়ী, অপরাধীরা সমাজ বা নিজের
বিবেকের দংশন থেকে বাঁচতে
তাদের অপকর্মকে বৈধতা দেওয়ার জন্য কিছু ঢাল
বা মনস্তাত্ত্বিক কসরত ব্যবহার করে।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের এই
জামায়াত এমপির ক্ষেত্রেও সেই তাত্ত্বিক প্রতিফলন
স্পষ্ট।
পাপাচার
উন্মোচিত হওয়ার পর দলটির তথাকথিত
"আলেম" নামধারী কিছু গোষ্ঠী এবং
তাদের আজ্ঞাবহ সাইবার বট বাহিনী পরম
আত্মবিশ্বাসের সাথে একে জাস্টিফাই
করতে মাঠে নেমেছে। কখনো
"এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার
অপপ্রচার", আবার কখনো রাতারাতি
"বৈধ দ্বিতীয় বিয়ে"-র ধর্মীয় দোহাই
দিয়ে এই অপরাধকে জায়েজ
করার যে কসরত চলছে,
তা মূলত ভণ্ডামির প্রাতিষ্ঠানিক
রূপায়ন। এই কট্টরপন্থী মনস্তত্ত্ব
নারীদের কেবল ভোগের বস্তু
হিসেবে বিবেচনা করে এবং অপরাধ
আড়াল করতে ধর্মীয় বিধানকে
নিজেদের মতো বাঁকিয়ে উপস্থাপন
করে।
সাইবার
প্রোপাগান্ডা, 'ডিজিটাল অথোরিটারিয়ানিজম' ও আর্থিক অপরাধ
এই
চক্রটির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো তাদের সাইবার
নেটওয়ার্ক, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়
"ডিজিটাল অথোরিটারিয়ানিজম"
(Digital Authoritarianism) বলা
যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে চরিত্র হরণ (Character
Assassination) করা, ভুয়া ন্যারেটিভ তৈরি
করা এবং ক্যাম্পাসে কুরুচিপূর্ণ
সংস্কৃতির চর্চা এদের দৈনন্দিন রাজনৈতিক
এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে।
অত্যন্ত
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ইসলামী
অর্থব্যবস্থার অন্যতম পবিত্র স্তম্ভ 'যাকাত'-এর অর্থকে মানবকল্যাণে
ব্যয় না করে, এই
ধরনের নোংরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বট বাহিনী পরিচালনা
ও দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠছে,
যা চরম ধর্মীয় অবমাননা
ও গুরুতর আর্থিক অপরাধের সামিল।
আন্তর্জাতিক
অভিজ্ঞতা ও জবাবদিহিতার নজির
আন্তর্জাতিক
রাজনীতির ইতিহাসে নৈতিক স্খলন ও পদের অপব্যবহারের
কারণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের
ভুরিভুরি উদাহরণ রয়েছে। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক বিশ্বে এমনকি এশিয়ার রাজনীতিতেও কোনো জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে
যৌন বা আর্থিক কেলেঙ্কারির
সামান্যতম সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলে, দল এবং রাষ্ট্রীয়
পদ থেকে অবিলম্বে পদত্যাগ
করার রেওয়াজ রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ,
যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সরকারের
চিফ হুইপ ক্রিস পিনচারের
কেলেঙ্কারি সামনে আসার পর যেভাবে
তীব্র রাজনৈতিক চাপে পুরো সরকারকে
জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, কিংবা
এশিয়ার বিভিন্ন প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দেশে নীতিগত কারণে
শীর্ষ নেতৃত্বের পদত্যাগের নজিরগুলো প্রমাণ করে যে, নৈতিকতা
ছাড়া গণতন্ত্র অচল।
অপরাধবিজ্ঞানের
তত্ত্ব বলে- যতই নেপথ্যের
চক্র বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের উপাদান
থাকুক না কেন, একজন
আইনপ্রণেতা যিনি নিজে সারাক্ষণ
সমাজকে নৈতিকতার বাণী শোনান, তার
নিজের ভেতর যদি ন্যূনতম
নৈতিকতা না থাকে, তবে
তার সেই পদে থাকার
কোনো আইনগত বা নৈতিক অধিকার
থাকে না।
নীতিগত
দাবি ও চূড়ান্ত করণীয়
বাংলাদেশ
জামায়াতে ইসলামী যদি প্রচলিত আইন
ও গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিতে নিজেদের শুদ্ধ দাবি করতে চায়,
তবে তাদের দ্বিমুখী নীতি (Double Standard) পরিহার করতে হবে। "তথ্য-উপাত্ত খতিয়ে দেখার" দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক কালক্ষেপণ বা ধামাচাপা দেওয়ার
চেষ্টা জনগণ মেনে নেবে
না।
জরুরি
প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি দাবি:
১.
দল থেকে স্থায়ী বহিষ্কার:
অবিলম্বে এই বিতর্কিত ও
বহুবিধ অপরাধে অভিযুক্ত এমপিকে দল থেকে স্থায়ীভাবে
বহিষ্কার করতে হবে।
২.
সংসদ সদস্য পদ বাতিল: জাতীয়
সংসদের স্পিকারের মাধ্যমে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী
অবিলম্বে তার সংসদ সদস্য
পদ বাতিল করতে হবে।
৩.
বিচারের মুখোমুখিকরণ: অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণীকে ক্ষমতার প্রলোভন দেখিয়ে যৌন নিপীড়ন, জালিয়াতি
ও প্রতারণার অভিযোগে প্রচলিত ফৌজদারি আইনে নিরপেক্ষ তদন্ত
ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনীতি
যখন নৈতিকতাহীনতার অতল গহ্বরে তলিয়ে
যায়, তখন পুরো সামাজিক
ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। বাংলাদেশে
ধর্ম, ক্ষমতা আর প্রোপাগান্ডার মিশেলে
এই ধরনের পাপাচারের প্রাতিষ্ঠানিক জাস্টিফিকেশন রুখে দেওয়ার এখনই
সময়।
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।
ড. বিজন কুমার শীল বিস্তারিত
বিপরীত স্রোত প্রতিবেদন বিস্তারিত
ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরী বিস্তারিত
যারিন মালিয়াত অদ্রিতা বিস্তারিত
ডা. আতাউর রহমান বিস্তারিত
শশাঙ্ক সাদী বিস্তারিত
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান বিস্তারিত
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান বিস্তারিত
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান বিস্তারিত
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান বিস্তারিত