নাগরকোট থেকে মনোরম বরফ ঢাকা হিমালয় পর্বত শৃংঙ্গ
কাজী রওনাক হোসেন
পাহাড় ও সমুদ্র দুটোই আমাকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। সমুদ্রে সাঁতার কাটতে জানি না আর পাহাড়ে ট্র্যাকিং করতে পারি না। কিন্তু প্রকৃতির দুর্নিবার আকর্ষণ এই দুই জায়গায় আমাকে সুযোগ পেলেই টেনে নিয়ে যায়। পাহাড়ের মাঝে দুরকম সৌন্দর্য-গাছগাছালিভরা বনাঞ্চল আর বরফে ঢাকা হিমালয়ের বা অন্যদেশের পর্বতমালা। সম্প্রতি নেপাল ফোরাম অফ ফটোজার্নালিস্টের (এনএফপিজে) আমন্ত্রণে বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের দশ সদস্যের একটি দল নিয়ে ২৫ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে আমরা রওনা হলাম নেপালের উদ্দেশ্যে। বাংলাদেশ বিমানের বিজি জিরো সেভেন ওয়ান ফ্লাইটে। নেপালে এখন শুধু বাংলাদেশ বিমান যায়। সুতরাং আকাশপথে বিমানই ভরসা। কিন্তু শুরুতেই ধাক্কা খেতে হলো বিমানের ফ্লাইট দু’ঘণ্টা বিলম্বিত হওয়ার কারণে। এই দু’ঘন্টা বেড়ে শেষ অব্দি সাড়ে তিন ঘণ্টায় পৌঁছালো।
আধুনিক প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের কল্যাণে অন্তত এনএফপিজেকে আমরা জানাতে পেরেছিলাম ফ্লাইট বিলম্বিত। সে যাই হোক সাড়ে দশটার ফ্লাইটে শেষ পর্যন্ত দেড়টার দিকে ঢাকা থেকে রওনা হলাম। ঢাকার আকাশ ছিল পরিষ্কার, রোদ্রৌজ্জ্বল এবং প্রখর খরতাপে দগ্ধ। এক ঘণ্টা পনেরো মিনিটের যাত্রায় কাঠমান্ডুর কাছাকাছি আসতেই সিট বেল্ট বাঁধার সংকেত জ্বলে উঠলো এবং মাইক্রোফোনে সতর্কবাণী উচ্চারিত হলো যে সামনে আকাশের অবস্থা ভালো নয়। আকাশের অবস্থা যে কতটা ভালো ছিল না, সেটা একটু পরেই টের পেলাম। বোয়িং ৭৩৭ প্লেনটিকে ত্রিশ-চল্লিশ সেকেন্ড খেলনার মতো লুফোলুফি করতে থাকলো। সাথে সাথেই সবার মনে ভেসে উঠলো সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ইউএস বাংলা বিমানের দুর্ঘটনার বিষয়টি। যাই হোক, সৃষ্টিকর্তার অশেষ মেহেরবাণীতে আমরা প্রচণ্ড ভয়ের ভেতর হলেও ওই মুহূর্তগুলো নিরাপদে পার করলাম। শেষ পর্যন্ত ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভালোভাবেই অবতরণ করলাম।
ইমিগ্রেশন ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ করে আমরা বাইরে বেরিয়ে আসলাম। সেখানে অপেক্ষা করছিল এনএফপিজের সেক্রেটারি প্রদীপ রাজ অন্তে ও অন্যান্যরা। দেখা হওয়া মাত্রই তাদের রীতি অনুযায়ী আমাদের সবাইকে উত্তরীয় পরিয়ে স্বাগত জানালো। তারপর আমরা হোটেলে চলে গেলাম। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে না হতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিল। তাই আমরা হোটেলে গিয়ে আর তেমন বাইরে গেলাম না। পরদিন ছিল হোটেল অন্নপূর্ণায় মূল অনুষ্ঠান ‘এনএফপিজে ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড সিরিমনি’। নেপালের উপ-প্রধানমন্ত্রী ছিলেন প্রধান অতিথি। আমাদের সবচেয়ে যে বিষয়টি আকৃষ্ট করে তা হলো একজন পুলিশ অফিসারকে আজীবন সম্মাননা দেয়া। বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের তোলা রূপসী বাংলার ছবির একটি সংক্ষিপ্ত প্রদর্শনী হলো হোটেল অন্নপূর্ণাতেই। অসংখ্য দর্শক আকৃষ্ট করতে পেরেছিল প্রদর্শনীটি। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের দলনেতা হিসেবে আমি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য প্রদান করি যা প্রশংসিত হয়।

হোটেল অন্নপূর্ণায় নেপালের উপ -প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে স্মারক ক্রেস্ট হাতে বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যগণ
বাংলাদেশ দলের প্রতিটি সদস্যের জন্য নামাঙ্কিত ক্রেস্ট ও উত্তরীয় ছিল প্রতিনিধি দলটির জন্য বিশেষ সম্মাননা। ২৭ তারিখে আমরা এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করে দুপুরে রওনা হলাম নাগরকোটের পথে।
নাগরকোটে যেতে যেতে দেখলাম পাহাড় থেকে খুব সরু ঝিরঝিরে ঝর্ণা নেমে এসেছে বিভিন্ন জায়গায়। ঘরের উঠোনে মুরগি আর শূকর ছানার ঘোরাঘুরি, শুকোতে দেয়া ভূট্টা আর আলু বোখারা (পিচ)। সরু চেরা চোখের শিশুরা ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে, ঘরের দরজায় জপমন্ত্র হাতে ঐতিহ্যবাহী তিব্বতি পোশাকের বৃদ্ধা। কাঠমান্ডু থেকে ৩২ কি.মি পূর্বে অবস্থিত এই গ্রামটি থেকে হিমালয়ের জমকালো সূর্যোদয় দেখা যায়। অধিকাংশ পর্যটকই কাঠমান্ডু থেকে গিয়ে নাগরকোটে রাত্রি যাপন করে সূর্যোদয় দেখার জন্য। বিশেষত বসন্তকালে, তখন এখানে নানারকম ফুলের সমারোহ ঘটে। এখানকার হিমালয়ের সর্বোচ্চ শিখরের নাম প্যানোরোমা। হিমালয়ের আরো কিছু চূড়া যেমন: মানাস্লু, গণেশ হিমেল, লেঙ্গান, চোবা, ভাম্রি, গৌরীশঙ্কর নাগরকোট থেকে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থানে অবস্থিত এই গ্রামের মানুষেরা মাঠ থেকে আকাশকে যেন দেখে নিচে তাকিয়ে। পাহাড়ি রাস্তার মোড়ে মোড়ে চা-খানা। নাগরকোট আগে যাবার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি এর সূর্যাস্ত সবার মনেই দাগ কাটার মতো। সূর্যাস্তের সময় আকাশে যদি হালকা সাদা মেঘ থাকে তাহলে বরফের চূড়ার সোনা রঙের সাথে আকাশের রঙ মিশে যে একটা রূপ ফুটে ওঠে তা নিঃসন্দেহে এক স্বর্গীয় দৃশ্য।
কিন্তু সেই স্বর্গীয় দৃশ্য দেখার সুযোগ আমাদের হলো না। নাগরকোট থেকে দৃশ্যমান হিমালয়ের চূড়াও আমরা দেখতে পারলাম