English
ঢাকা, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-১০-১১ ১৬:১২:৫৮
আপডেটঃ ২০২৬-১০-১১ ২২:৪০:৫৪


শিল্পে মানুষের তৈরি কাজ এবং এআই

শিল্পে মানুষের তৈরি কাজ  এবং এআই


রস অ্যাটকিনস

বিবিসি | ইনডেপথ

 

এআইয়ের ভিড়ে মানবসৃষ্ট শিল্পের বিশেষ মূল্য তৈরি হচ্ছে।

 কিন্তু সেই মূল্য কি দীর্ঘস্থায়ী হবে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যখন ছবি আঁকতে পারে, গান তৈরি করতে পারে, বই লিখতে পারে, এমনকি অভিনয়ও করতে পারে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: শিল্পকর্মটি মানুষের তৈরি কি না, তা কি আমাদের কাছে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ? নাকি শেষ পর্যন্ত আমরা কেবল ফলাফলটিই দেখব?

কর্নওয়ালের ফালমাউথে কয়েক সপ্তাহ আগে একটি পুরোনো ব্যাংক ভবনে আয়োজিত নাচ-গানের অনুষ্ঠানে ডিজে হিসেবে কাজ করছিলাম। ভবনটি এখন সংগীতানুষ্ঠানের জায়গা। ‘রেভ মেশিন’ নামে আমি নিয়মিত যে আয়োজন করি, সেদিনের অনুষ্ঠানটিও ছিল তুমুল শব্দ, উদ্দীপনা, ঘাম আর নাচে ভরা—যেমন একটি প্রাণবন্ত নাচের রাত হওয়া উচিত।

দর্শক, শিল্পী, আয়োজক, সংগীত এবং অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার যাত্রা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। একই রকম অভিজ্ঞতা আবার হুবহু তৈরি করা সম্ভব নয়। পুরো বিষয়টির কেন্দ্রে ছিল মানুষ। তাত্ত্বিকভাবে, প্রযুক্তি দিয়ে যে অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করা কঠিন বলেই মনে হয়।

কিন্তু ডিজের জগতে প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। নব্বইয়ের দশকে একজন ডিজেকে শুধু গান বেছে নিলেই চলত না; ভিনাইল রেকর্ড, দুটি টার্নটেবল ও একটি মিক্সারের সাহায্যে একটির সঙ্গে অন্যটি এমনভাবে মেলাতে হতো, যাতে সংগীতের প্রবাহে ছেদ না পড়ে।

এখন সেই কাজে প্রযুক্তির সহায়তা অনেক বেশি। বিভিন্ন গানের বিট বা তাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে দেওয়ার সফটওয়্যারও রয়েছে। চাইলে ডিজে এই সুবিধা নিতে পারেন—যদিও আমি তা করি না। অ্যাপল মিউজিক ও স্পটিফাইতেও এআইয়ের সাহায্যে গান মেশানোর সুবিধা রয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, আপনি যদি নাচের অনুষ্ঠানে যান, আর জানতে পারেন যে ডিজে আসলে নিজে গান মেলাচ্ছেন না, বরং প্রযুক্তিই অধিকাংশ কাজ করছে, তাতে কি আপনার কিছু যায়-আসে? বাজানো গানগুলো যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে সেগুলো কীভাবে পরিবেশিত হচ্ছে, তা কি গুরুত্বপূর্ণ?

সৃজনশীল কনটেন্ট তৈরি করতে সক্ষম জেনারেটিভ এআই আমাদের সবার সামনে এই প্রশ্নটিই তুলে ধরছে।

ফালমাউথের সেই রাতের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিশেষ অতিথি, গ্রুভ আরমাডার অ্যান্ডি ক্যাটোর গান পরিবেশনা। তিনি দক্ষতার সঙ্গে একের পর এক সংগীতের টুকরো মিলিয়ে পরিবেশটিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন। কিন্তু কোনো ডিজে যদি কেবল একটি বোতাম টিপে গান চালিয়ে দেন, তাহলে আমার কেমন লাগবে? বাস্তবে এমনটাও ঘটে।

এই অভিজ্ঞতা থেকেই আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে আসে: একটি চিত্রকর্ম, গান, বই, কবিতা কিংবা অন্য যেকোনো শিল্পকর্ম মানুষের হাতে তৈরি কি না, সেটি কি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ?

 

রেনেসাঁ যুগের দেয়ালচিত্র থেকে দাবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন

সংগীত স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ডিজারের তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্ল্যাটফর্মে আপলোড করা গানের ৪৪ শতাংশ এআই দিয়ে তৈরি। তাদের গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ৯৭ শতাংশ শ্রোতা বুঝতে পারেননি কোন গান এআই দিয়ে তৈরি আর কোনটি নয়।

কিন্তু এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকেরও বেশি মানুষ জানিয়েছেন, কোনো গান এআই দিয়ে তৈরি কি না, তা তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা চান, সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় মানুষ যুক্ত থাকুক।

লন্ডনের কিংস কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক ড্যানিয়েল সাসকিন্ড মনে করেন, শিল্প সৃষ্টিতে মানুষের ভূমিকার প্রতি আমরা অনেকেই গভীর মূল্যবোধ পোষণ করি। তাঁর মতে, এই মানবিক ভূমিকার কারণেই সৃজনশীল প্রক্রিয়া অন্যান্য ব্যবহারিক ও কার্যকরী কাজ থেকে আলাদা হয়ে ওঠে।

একবার একদল হিসাবরক্ষকের সঙ্গে একটি কক্ষে থাকার অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেন, তাঁদের একজন উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, তাঁর মক্কেলরা ব্যক্তিগত যত্ন ও মানবিক যোগাযোগের জন্য তাঁর কাছে আসেন।

সাসকিন্ডের জবাব ছিল, মানুষ হিসাবরক্ষকের কাছে যান না মানবিক স্পর্শ পাওয়ার জন্য; তাঁরা যান নিজেদের করের হিসাব সঠিকভাবে সম্পন্ন করাতে।

কিন্তু শিল্পের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা।

তিনি বলেন, কেউ যদি ভ্যাটিকানের সিস্টিন চ্যাপেলে প্রবেশ করে ছাদের দিকে তাকান, তাহলে শুধু অসাধারণ সৌন্দর্যই তাঁকে মুগ্ধ করবে না। তাঁর বিস্ময় জাগবে এই ভেবেও যে, তাঁরই মতো রক্তমাংসের একজন মানুষ নিজের হাত ও মনের সাহায্যে এমন সৃষ্টি করেছেন। তাঁর মতোই একটি মানবমস্তিষ্ক এমন কিছুর স্বপ্ন দেখেছিল, যা আজও মানুষকে বিস্মিত করে।

সাসকিন্ডের ব্যাখ্যায়, কোনো শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে আমাদের মূল্যায়ন শুধু চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না। সেই ফলাফলে পৌঁছানোর পেছনে আমাদেরই একজন মানুষ কাজ করেছেন—এই জ্ঞানও আমাদের কাছে মূল্যবান। মানুষের এই অর্জন আমাদের বিস্মিত করে।

অবশ্য পাল্টা যুক্তিও রয়েছে। কম্পিউটার ও এআই সফটওয়্যারও তো মানুষই তৈরি করেছে। সাসকিন্ড সিস্টিন চ্যাপেলে গিয়ে যে বিস্ময় অনুভব করেন, অন্য কেউ হয়তো চ্যাটজিপিটির মতো চ্যাটবট ব্যবহার করে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বিস্ময় অনুভব করতে পারেন।

মানুষ ও প্রযুক্তির সম্পর্ক বোঝাতে সাসকিন্ড আরও একটি উদাহরণ দেন—১৯৯৭ সালের একটি ঐতিহাসিক দাবার ম্যাচ।

সে বছর তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভ আইবিএমের তৈরি ডিপ ব্লু নামের কম্পিউটারের কাছে হেরে যান। প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে কোনো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দাবাড়ুর কম্পিউটারের কাছে পরাজয়ের ঘটনা ছিল এটিই প্রথম।

তখন আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, কম্পিউটারের এমন সাফল্যের ফলে দাবার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। বর্তমানে দাবা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় জনপ্রিয়; লাখ লাখ মানুষ এই খেলা খেলেন।

সাসকিন্ডের মতে, মানুষ কেবল দাবার বোর্ডে চালগুলো কীভাবে দেওয়া হচ্ছে, সেটি নিয়ে আগ্রহী নয়। বোর্ডের সামনে একজন মানুষ বসে আছেন এবং নিজের হাতে ঘুঁটি সরাচ্ছেন—এই বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

কেউ কেউ মনে করেন, এআইয়ের আবির্ভাব মানুষের তৈরি শিল্পকর্মের মূল্য বরং আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একে বলা যেতে পারে ‘হিউম্যান প্রিমিয়াম’ বা মানবসৃষ্টির জন্য অতিরিক্ত মূল্য।

 

মানবিক স্পর্শের মূল্য

প্রযুক্তিবিষয়ক লেখক কাইল চায়কা যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী দ্য নিউ ইয়র্কার-এ লেখেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ, এআই দিয়ে লেখা সাহিত্যকে এখন অনেকেই সাধারণ, অতিরিক্ত তোষামোদপূর্ণ এবং গতানুগতিক বলে মনে করেন।

এর ফলে পাঠকেরা এমন লেখার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হতে পারেন, যেখানে লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর স্পষ্ট। এমনকি যে লেখা কিছুটা অগোছালো, কাঠামোগতভাবে কম নিখুঁত কিংবা পুরোপুরি পরিমার্জিত নয়, সেটিও পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

চায়কার মতে, চিত্রাঙ্কন ও গ্রাফিক ডিজাইনের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যখন সাধারণ মানের নকশা খুব সহজেই তৈরি করা সম্ভব, তখন ডিজাইনাররা আরও অদ্ভুত, দৃষ্টিনন্দন ও ব্যতিক্রমী কিছু করার চেষ্টা করছেন—এমন কিছু, যা এআইয়ের পক্ষে সহজে তৈরি করা সম্ভব নয়।

এআই-নির্মিত কনটেন্টের দ্রুত বিস্তারের প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষাবিদেরা এমন একটি সর্বজনস্বীকৃত প্রতীক বা লেবেল তৈরির চেষ্টা করছেন, যা দিয়ে বোঝানো যাবে কোনো কাজ মানুষের তৈরি। ১৯৮০-এর দশকে চালু হওয়া ‘ফেয়ারট্রেড’ লেবেলের মতো একটি পরিচিত চিহ্নের কথা ভাবা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছু বই, চলচ্চিত্র ও অ্যালবামের প্রচ্ছদে ‘এআই-মুক্ত’ বা ‘AI-free’ লেখা দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইউটার দর্শনের অধ্যাপক সি. থি. নগুয়েন মনে করেন, বিষয়টি আমাদের মৌলিক মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত।

নিজেদের প্রকৃত মূল্যবোধ বোঝার জন্য তিনি ‘হোয়াই চেইন’ বা ‘কেন’-এর ধারাবাহিক প্রশ্নের কথা বলেন। কোনো কিছু পছন্দ হলে কিংবা কোনো কাজ করতে চাইলে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—কেন?

উত্তর যদি হয় অর্থ উপার্জন কিংবা সফল হওয়া, তাহলে আবার প্রশ্ন করতে হবে—কেন? এভাবে প্রশ্নের ধারাবাহিকতা চালিয়ে যেতে হবে। যখন আর কোনো ‘কেন’ অবশিষ্ট থাকবে না, তখনই বোঝা যাবে কোন বিষয়টি আমাদের কাছে সত্যিকার অর্থে মূল্যবান।

নগুয়েনের প্রশ্ন, এই ধারাবাহিক প্রশ্নের একেবারে শেষেও কি মানুষের অংশগ্রহণ এবং মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া অভিজ্ঞতার মূল্য অটুট থাকবে?

লেখক জন ল্যানচেস্টার এ বিষয়ে আশাবাদী। তাঁর বিশ্বাস, যে কাজগুলো কেবল মানুষই করতে পারে, সেগুলোর মূল্য শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে। ‘মানবসৃষ্টির জন্য বাড়তি মূল্য’ ধারণাটির প্রতিও তাঁর সহানুভূতি রয়েছে।

তাঁর ভাষায়, কোনো কিছুকে যখন পণ্যে পরিণত করা হয়, তখন যেসব জিনিসকে পণ্যে পরিণত করা যায় না, সেগুলোই ক্রমে আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হতে শুরু করে।

 

অ্যালগরিদমের আবর্তে সংস্কৃতি

মানুষ সংস্কৃতি ও শিল্প সৃষ্টির কেন্দ্রে থাকবে—যাঁরা এমনটা আশা করেন, তাঁদের কাছে এসব যুক্তি আশাব্যঞ্জক মনে হতে পারে।

কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আমার সংশয় রয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট এত দ্রুত বাড়ছে যে, অদূর ভবিষ্যতে কোনো কাজে এআই ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা বোঝা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

গত বছর তৈরি এআই-অভিনেত্রী টিলি নরউডের কথা নিশ্চয়ই অনেকের নজরে এসেছে। তাঁকে তৈরি করেছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যারা নিজেদের বিশ্বের ‘প্রথম এআই ট্যালেন্ট স্টুডিও’ বলে পরিচয় দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিনেতাদের সংগঠন স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড বিষয়টিকে