
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান
বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ ও অক্লান্ত গবেষণা করেন আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া। বাংলাদেশে প্রত্নতত্ত্ব চর্চায় অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে অনেকে ‘প্রত্নতত্ত্বের গুরু’বলেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ বুধবার ৯৭ বছর বয়সী আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া মৃত্যুর কয়েক মাস আগেও লেখালেখি করে গিয়েছেন। তাঁর অসামান্য
স্মৃতিশক্তি এবং কর্মক্ষমতা অনেকের কাছে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। ১ অক্টোবর ২০২০ তার ১০২তম জন্মদিন।
প্রত্নগুরু আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
‘বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ নামে তাঁর লেখা গবেষণাধর্মী বইটিকে এ বিষয়ে একটি আকর গ্রন্থ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ‘বাংলাদেশের প্রাচীন কীর্তি ’(দুই খণ্ড), ‘নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা’, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস’, ‘কুমিল্লা জেলার ইতিহাস’, ‘প্রশ্নোত্তরে বাংলাদেশের প্রাচীন কীর্তি’(দুই খণ্ড), ‘বৃহত্তর ঢাকা জেলার প্রাচীন কীর্তি’, ‘দিনাজপুর মিউজিয়াম’ সহ আরো অনেক মূল্যবান বই লেখার পাশাপাশি ফারসি ভাষা থেকে সরাসরি অনুবাদ করেছেন ‘তবকাত-ই- নাসিরি’, ‘তারিখ-ই-বঙ্গালা-ই- মহব্বত জঙ্গী’, ‘মোযাফফর নামা’, ‘সিয়ার-উল-মুতাখখিরিন’, মৃত্যুর আগেও মাসিক রুটসে একাধিক ফারসি বই ও সূত্র থেকে ধারাবাহিকভাবে লিখছিলেন ‘হিন্দুস্তানে বিশেষ করে এর পূর্বাঞ্চলে মুসলিম অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস’। পুঁথি সাহিত্য নিয়ে গবেষণা ও সম্পাদনা ছিল তাঁর আরেক সাধনার বিষয়। ‘গুপিচন্দ্রের সন্যাস’, ‘গাজী কালু চম্পাবতী’ সহ বিভিন্ন পুঁথি নিয়ে তাঁর গবেষণা প্রাচীন পুঁথিগুলোকে সবার সামনে নিয়ে আসে। দুইখণ্ডে প্রকাশিত ‘গ্রাম বাংলার হাসির গল্প’ তাঁর ভিন্নধর্মী সংগ্রহের সংকলন। ‘বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয়’ তাঁর অরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই। প্রকাশিত উপন্যাস ‘মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার ও একজন তরুণী’। এর বাইরেও তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের প্রথম পর্বসহ উপন্যাস- ‘আলোছায়ার কল্পকথা’, ‘জোড়াতালি মিয়া’, ‘বসতি’, ‘কাইমা গাদির কিসসা’, ‘মির্জা সাহেবের শেষ উইল’, ‘সেতুর সাংবাদিকের ডায়রি’ এবং ইতিহাসের বই ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইতিহাস’, ‘দিনাজপুরের ইতিহাস’,‘বাঞ্ছারামপুরের ইতিহাস’ ও আরো কিছু বই অপ্রকাশিত রয়েছে। তিনি এক সময় কবিতাও লিখেছেন।
ঢাকা ইউনিভার্সিটির একজন মেধাবী ছাত্র হিসাবে আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া অবিভক্ত বাংলার প্রতিযোগিতামূলক বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস বা বিসিএস পরীক্ষায় পাস করে সে সময়ের অতি দুর্লভ সরকারি চাকরিতে যোগ দেন ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার সময়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে অবসর নেন ১৯৭৬ সালে। তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তিনি ছিলেন একজন চমৎকার ক্রীড়া সংগঠক। প্রশাসনিক কাজের বাইরে তিনি তাঁর পুরো জীবন উৎসর্গ করেন দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা প্রত্নসম্পদ অন্বেষণে। বর্তমান সময়ে আলোচিত উয়ারী বটেশ্বর প্রত্নস্থানটির বিষয়ে স্থানীয় গবেষক হানীফ পাঠানকে সহযোগিতা করা এবং দেশের ইতিহাসবিদদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রথম উদ্যোগ নেন তিনি। সীতাকোট বৌদ্ধ বিহারসহ অসংখ্য প্রত্নস্থান তিনি অবিষ্কার এবং খননের ব্যবস্থা করেছেন। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ, বাংলা একাডেমীসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে গ্রহণ করেন রাষ্ট্রীয় একুশে পদক। এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বাংলাদেশ তাঁকে দিয়েছে সোসাইটির সম্মানজনক প্রেসিডেন্টস স্বর্ণপদক। যা তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলা একাডেমি, ইতিহাস পরিষদ, ইতিহাস একাডেমি থেকে সম্মানিত হয়েছেন। রুটস আজীবন সম্মননা পেয়েছেন ২০০৮ সালে।
আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত দীর্ঘ আলাপচারিতা, স্মৃতিচারণ, সাক্ষাৎকার ও অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে পাওয়া কিছু তথ্য নিয়ে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।
ছেলেবেলা ও পড়াশোনা
আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার
গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার দরিকান্দি গ্রামে। বাবা ইমদাদ আলী মিয়া ও মা আতিকুন্নেসা বেগম। গ্রামের পাশেই মামার বাড়ি ভেলানগরে তাঁর জন্ম ১ অক্টোবর ১৯১৮। রূপসদী বৃন্দাবন হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯৩৯ সালে । এতো দেরি হওয়ার কারণ বাবা তাঁকে মাঝখানে আরবি, ফারসি পড়িয়েছেন। এই শিক্ষাটা পরে তাঁকে ফারসি বই অনুবাদ করতে সাহায্য করেছে। ১৯৪১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। পরীক্ষায় তিনি বোর্ডে দশম হয়েছিলেন। ঢাকা কলেজ তখন ছিল পুরনো হাই কোর্ট বিল্ডিং-এ। এখানে শিক্ষক হিসাবে পান কাজী আবদুল