মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম আলোচিত
সামাজিক হত্যাকাণ্ড
যার মূল আসামী এখনো পলাতক
বিশেষ প্রতিবেদন: পর্ব ১
১৯৭৬
সালের ২৭ জানুয়ারি।
রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী নীহার বানু সেদিন আর
বাড়ি ফেরেননি।
একজন
তরুণী নিখোঁজ হয়েছেন—প্রথমে ঘটনাটি এতটুকুই ছিল। পরিবার খুঁজেছে।
স্বজনেরা খুঁজেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ হয়েছে। পরিচিতজনদের
কাছে খবর নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু কোথাও নীহার নেই।
দিন
গেল।
সপ্তাহ
গেল।
মাসও
পেরিয়ে গেল।
কেউ
তখনও জানত না, রাজশাহী
শহরের মিনা মঞ্জিলের একটি
উঠানের মাটির নিচে চাপা পড়ে
আছে নীহারের দেহ।
১৯৭৬
সালের ১২ জুন—প্রায়
সাড়ে চার মাস পর—সেই মাটি খোঁড়া
হলো।
উঠে
এল একটি কঙ্কালসার দেহ।
মুখ
দেখে চেনার উপায় নেই। শরীরের
অধিকাংশই মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কিন্তু
কয়েকটি জিনিস তখনও রয়ে গেছে—খয়েরি চেক শাড়ি, নকশা
করা বাটা স্যান্ডেল, গলায়
চারকোনা রুপার তাবিজ।
সেই
চিহ্নগুলোই শেষ পর্যন্ত বলে
দিল—
এটি নীহার বানু।
তারপর
একে একে সামনে এলো
একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের বিবরণ।
সামনে
এলেন তারই সহপাঠী আহমদ
হোসেন বাবু। সামনে এল আরও কয়েকজনের
নাম। আদালতের সাক্ষ্যে উঠে এলো একটি
সম্পর্কের গল্প—যেখানে নীহার
একজন পুরুষকে ভাইয়ের মতো ভাবতেন, কিন্তু
সেই পুরুষ তাকে বিয়ে করতে
চাইতেন।
নীহার
সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
আর
তার সেই ‘না’-এর
পরিণতি হয়েছিল মৃত্যু।
১৯৭৭
সালের ২৯ আগস্ট বিশেষ
সামরিক আইন আদালত এই
মামলায় তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু প্রধান
আসামি আহমদ হোসেন বাবু
তখনও পলাতক।
পঞ্চাশ
বছর পরও তার সেই
সাজা কার্যকর হয়নি।
তাই
নীহার বানু হত্যাকাণ্ডের গল্প
শুধু একটি হত্যার গল্প
নয়।
এটি
একজন নারীর নিজের জীবনের ওপর নিজের সিদ্ধান্তের
অধিকার, সেই সিদ্ধান্তকে অস্বীকার
করার ভয়াবহ পরিণতি এবং একটি বিচারপ্রক্রিয়ার
অসমাপ্ত অধ্যায়ের গল্প।

নীহার বানু: হত্যাকাণ্ডের আগে যে মেয়েটির একটি জীবন ছিল
হত্যার
শিকার মানুষকে আমরা প্রায়ই একটি
মামলা, একটি লাশ কিংবা
একটি সংবাদে সীমাবদ্ধ করে ফেলি।
নীহার
বানুর গল্প সেভাবে শুরু
করা উচিত নয়।
কারণ
হত্যার আগে তার একটি
জীবন ছিল।
ছিল
পরিবার। ছিল পড়াশোনা। ছিল
স্বপ্ন। ছিল ভবিষ্যৎ।
তার
বাবা নজীবুর রহমান ছিলেন রাজশাহী কো-অপারেটিভ অফিসের
সহকারী রেজিস্ট্রার। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের
সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তিনি শহীদ
হন।
পাঁচ
বোন ও এক ভাইয়ের
মধ্যে নীহার ছিলেন দ্বিতীয়। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্বের
বড় অংশ এসে পড়ে
বড় বোন মঞ্জিলা বেগমের
ওপর। তিনি ছিলেন চিকিৎসক।
দিনাজপুরে
তাদের পারিবারিক শিকড় থাকলেও পরিবারটি
রাজশাহীতে বসবাস করত।
নীহার
পড়তেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে।
১৯৭৬
সালে তিনি উচ্চশিক্ষার পরবর্তী
পর্যায় ও পরীক্ষার প্রস্তুতি
নিচ্ছিলেন। পারিবারিকভাবেও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে
পরিকল্পনা ছিল। নওগাঁর এক
প্রকৌশলীর সঙ্গে তার বিয়ের কথাও
এগিয়েছিল বলে জানা যায়।
অর্থাৎ নীহারের সামনে তখন ভবিষ্যৎ ছিল।
কিন্তু
সেই ভবিষ্যৎ আর আসেনি।
নীহার বানু: ১৯৭৭ সালে বিচিত্রায়
প্রকাশিত পরিচিতি
১ জানুয়ারি ১৯৫৩ দিনাজপুরের চিরির
বন্দরে বাসুদেবপুর গ্রামে জন্ম। রংপুর রবার্টসনগঞ্জ হাই স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তির মাধ্যমে ছাত্রজীবন শুরু। পিতার চাকরিস্থল পরিবর্তনের সাথে সাথে নীহার
পর্যায়ক্রমে দিনাজপুর সরকারী গার্লস হাই স্কুল, নওগা গার্লস হাই
স্কুল ও সবশেষে পাবনা গার্লস হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৮ সালে এস
এস সি পাশের পর
তার পিতা রাজশাহী বদলী
হলে নীহার রাজশাহী মহিলা কলেজে ভর্তি হন। ১৯৭০ সালে
দ্বিতীয় বিভাগে এইচ এস সি
পাশ করেন। ১৯৭৩ সালে রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেকেণ্ড ক্লাস
পেয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনার্সে ডিগ্রি লাভ করেন (ফলাফল
ঘোষণা ১৯৭৫)।
প্রধান
শখ ছিল গান শোনা-ছবি তোলা। সুন্দর
ছবি আকতে পারতেন স্কুল
ও কলেজ জীবনে। ছোটকালে
নাচের শখ ছিল। স্কুলে
কয়েকবার নাচে প্রাইজও পেয়েছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন কালে রাজশাহী বেতারে কয়েকবার আবৃত্তি ও নিজের কবিতা
পড়েন।
সব ধরনের রান্নাবান্না শেখার ইচ্ছা ছিল সবচেয়ে বেশি। পিতার ও বাড়ির সকলের
মতো তারও প্রিয় শখ
ছিল ফুলের বাগান করা। ঘরবাড়ি সাজানো নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন
দিন রাত। সুই সুতোর কাজ কম পছন্দ
করলেও উল এবং কুরুশের
কাজ বেশি পছন্দ করতেন।
গোলাপী
ও নীল ছিল নীহারের
প্রিয় রং। তিনি ছিলেন
একটু খেয়ালী। বেশি সেজেগুজে বাইরে
বেরুনো অপছন্দ করতেন। কিন্তু বাড়িতে প্রায়ই হঠাৎ করে খুব
সাজগোজ করে এঘর ওঘর বেড়িয়ে
আয়না দেখে আবার কিছুক্ষণ
পরই সব সাজ খুলে
ফেলতেন।
পাঁচবোন
একভাই-এর মধ্যে নীহার
ছিলেন দ্বিতীয়। মৃত্যুর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
রাষ্ট্রবিজ্ঞান শেষ বর্ষের ছাত্রী
নীহার এম এ ফাইনাল
পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল
২২। তিনি ছিলেন অবিবাহিতা।
নীহার ভাবতেন ভাই, বাবু ভাবতেন প্রেমিকা
আহমদ
হোসেন বাবু ছিলেন নীহারের
সহপাঠী।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান
বিভাগে বাবু ছিলেন পরিচিত
ও প্রভাবশালী ছাত্র। খেলাধুলার সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
ছিল—ফুটবল, সাঁতার ও ওয়াটার পোলোতে
তিনি পরিচিত ছিলেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে
তার যোগাযোগও ছিল।
পড়াশোনার
ক্ষেত্রেও তিনি অন্যদের সহযোগিতা
করতেন।
নীহারও
তার কাছ থেকে নোট
ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহযোগিতা নিয়েছিলেন।
এই
সূত্রেই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
কিন্তু
নীহারের কাছে সম্পর্কটির অর্থ
ছিল পরিষ্কার।
তিনি
বাবুকে ‘ভাইয়া’ বলতেন।
বাবুও
একসময় তাকে ছোট বোন
হিসেবে পরিচয় করাতেন।
কিন্তু
ধীরে ধীরে বাবুর দৃষ্টিভঙ্গি
বদলে যায়।
তিনি
নীহারকে বিয়ে করতে চান।
নীহার
রাজি হননি।
তিনি
বাবুকে বোঝানোর চেষ্টা করেন—তাদের সম্পর্ক
ভাই-বোনের মতো। বিয়ের প্রশ্ন
সেখানে আসতেই পারে না।
এখানেই
নীহার বানু হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্বটি তৈরি হয়।
নীহারের
কাছে যে সম্পর্কের নাম
ছিল ভাই-বোন, বাবুর
কাছে তা ধীরে ধীরে
হয়ে উঠেছিল প্রেমের সম্পর্ক।
নীহার
তার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন।
কিন্তু
সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হয়নি।
পরবর্তী
আদালতের সাক্ষ্য ও প্রতিবেদনে এই
সম্পর্কের নানা দিক উঠে
আসে।
একটি ছবি, একটি সম্পর্কের পরিচয়
বাবু
নীহারের একটি ছবি চেয়েছিলেন।
নীহার
তাকে একটি ছবি দেন—এক আত্মীয়ের সঙ্গে
তোলা ছবি। ছবির পেছনে
তিনি এমন একটি কথা
লিখেছিলেন, যার মধ্যে ভাই-বোনের সম্পর্কের স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল।
নীহারের
কাছে সম্পর্কটির পরিচয় ছিল নির্দিষ্ট।
কিন্তু
বাবুর কাছে সেই ব্যাখ্যা
আর গ্রহণযোগ্য ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে
তাদের সম্পর্ক নিয়ে কথাবার্তাও চলছিল।
নীহার বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন।
পঞ্চাশ
বছর পর এই ছোট
ঘটনাটির দিকে তাকালে মনে
হয়, এখানেই আসলে একটি বড়
প্রশ্ন লুকিয়ে আছে—
একজন
মানুষ তার নিজের সম্পর্কের
পরিচয় নির্ধারণ করার অধিকার রাখেন
কি না।
২৩ জানুয়ারি: পরিকল্পনার শুরু
১৯৭৬
সালের ২৩ জানুয়ারি।
রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আবদুল লতিফ
হলের একটি কক্ষে বৈঠক
বসে।
সেখানে
ছিলেন আহমদ হোসেন বাবু,
এনামুল হক, আহসানুল হক
এবং শহীদুল ইসলাম।
পরে
এনামুল হক এই মামলার
রাজসাক্ষী হন। তার জবানবন্দিতে
বৈঠকের বিষয়টি উঠে আসে।
পরিকল্পনা
ছিল—নীহারকে একটি দাওয়াতের কথা
বলে মিনা মঞ্জিলে নিয়ে
যাওয়া হবে। সেখানে বাবু
তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব
দেবেন।
নীহার
রাজি হলে সমস্যা নেই।
কিন্তু
রাজি না হলে তাকে
জোর করে বিয়ে পড়ানোর
পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে
সাক্ষ্যে উঠে আসে।
পরবর্তী
আরেকটি বৈঠকের কথাও বিভিন্ন প্রকাশিত
বিবরণে এসেছে। সেখানে পরিকল্পনা আরও ভয়াবহ হয়ে
ওঠে—নীহার বিয়েতে রাজি না হলে
তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া
হয়েছিল বলে উল্লেখ করা
হয়।
অর্থাৎ
২৭ জানুয়ারির ঘটনা হঠাৎ ঘটে
যাওয়া কোনো আবেগের বিস্ফোরণ
ছিল না।
আদালতের
সাক্ষ্য ও রায়ের ভিত্তিতে
এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
২৫ জানুয়ারি: প্রথম সুযোগটি ব্যর্থ
বাবু
নীহারকে একটি আত্মীয়ের বাড়িতে
দাওয়াতের কথা বলেন।
নীহার
সরাসরি রাজি হননি। বলেছিলেন—‘দেখা যাবে।’
শেষ
পর্যন্ত তিনি সেখানে যাননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের
একটি পিকনিকে সারদায় চলে যান।
পরিকল্পনা
ব্যর্থ হলো।
কিন্তু
পরিকল্পনাকারীরা থামেনি।
দুই
দিন পর আবার সুযোগ
তৈরি হলো।
২৭
জানুয়ারি।
এই
দিনটিই হয়ে উঠল নীহার
বানুর জীবনের শেষ দিন।
২৭ জানুয়ারি: মিনা মঞ্জিল

মিনা মঞ্জিল:
যেখানে নীহার বানুকে হত্যা করে উঠানে মাটি
চাপা দেয়া হয়
দুপুরে
নীহার ও বাবু আলাদা
রিকশায় করে মিনা মঞ্জিলে
পৌঁছান।
সেখানে
আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন এনামুল হক, আহসানুল হক
ও শহীদুল ইসলাম।
নীহার
ও বাবু ভেতরে ঢোকার
পর বাড়ির প্রধান ফটক বন্ধ করে
দেওয়া হয়। ঘরের দরজা-জানালাও বন্ধ করা হয়।
নীহার
তখনও জানতেন না, যে জায়গায়
তিনি এসেছেন, সেটিই হতে যাচ্ছে তার
জীবনের শেষ ঠিকানা।
বাবু
তার সামনে বিয়ের প্রস্তাব রাখেন।
নীহার
অস্বীকার করেন।
তিনি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন—তাদের সম্পর্ক ভাই-বোনের। এমন কথা আবার বলা হলে তিনি চিৎকার