English
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২০-১২-১৫ ১২:৩৬:০৬
আপডেটঃ ২০২৬-০৫-৩১ ১৬:৫৫:৫১


পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বিশ্বে একটিই আছে

পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বিশ্বে একটিই আছে


-  ডিআইজি হাবিবুর রহমান

 

২৫ মার্চ ১৯৭১ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন সীমিত লোকবল এবং অতি সাধারণ অস্ত্র নিয়ে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের সাহসী পুলিশ সদস্যরা।পাকিস্তানি ট্যাংক, সাঁজোয়া যানের বিরুদ্ধে বাঙালি পুলিশরা লড়ে গেছেন থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে। এই অসম যুদ্ধে অসীম সাহসিকতা দেখিয়ে পুলিশ সদস্যরা প্রমাণ করেন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সম্ভব। সারা দেশে চোদ্দ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য তাদের কর্মস্থল ত্যাগ করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। আবার অনেকেই কর্মস্থলে থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে সহযোগিতা করেন। এগারো শ’য়ের বেশি পুলিশ সদস্য শহীদ হন। আহত ও নির্যাতিত হন বহু সংখ্যক। বাংলাদেশ পুলিশের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বগাঁথা নিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসেই গড়ে তোলা হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। এই জাদুঘর গড়ে তোলার পেছনে প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করেন  ঢাকা রেঞ্জের বর্তমান ডিআইজি হাবিবুর রহমান। যিনি বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে আলোচিত হয়েছেন। তিনি বেদে, হিজড়া সম্প্রদায়সহ সমাজে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাদের পুর্নবাসনের উদ্যোগ নিয়েছেন নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। ডিআইজি হাবিবুর রহমান অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। মেয়েদের জন্য স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। জড়িত আছেন কাবাডি ফেডারেশনের সঙ্গে। পুলিশের জন্য ব্লাড ব্যাংক স্থাপন করা এবং করোনার সময়ে প্লাজমা সরবরাহের উদ্যোগটিও তার নেয়া। ডিআইজি হাবিবুর রহমান তৈরি করেছেন পুলিশ নাট্যদল। অভিনয়শিল্পী মোমেনা চৌধুরীর একক নাটক হিসেবে রেকর্ড সংখ্যক ২৫২ বার মঞ্চায়িত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক লালজমিন-কে দেশজুড়ে পুলিশের মাঝে প্রচারে তিনি ব্যাপক সহযোগিতা করছেন। সম্প্রতি ডিআইজি হাবিবুর রহমান কথা বলেন বিপরীত স্রোত সম্পাদক মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামানের সাথে।

 



বিপরীত স্রোত: পুলিশ হওয়ার আগ্রহ কি ছেলেবেলা থেকেই ছিল?

ডিআইজি হাবিবুর রহমান: ছেলেবেলায় পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন হয়তো ছিল না, কিন্তু সব সময় ভাবতাম বড় হতে হবে। একই সঙ্গে এমন কোনো কাজ করতে চাইতাম যেন মানুষের উপকার করা যায়। কারণ তখন থেকেই দেখেছি কেউ বিপদে পড়লে বা সাহয্য চাইলে আমার বাবা আবদুল আলী মোল্লা এবং মা রাবেয়া বেগম দুজনেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। এমন কী এমন অনেক সমস্যা যেগুলোতে কেউ যেতে চাইতো না, আমার বাবা মাকে দেখেছি ঝুঁকি নিয়ে সে কাজ করতে। যা আমার মনে দাগ কেটে যায়।আমি গ্রামে পড়াশোনা করি। আমার স্কুল ছিল গোপালগঞ্জের চন্দ্রদীঘলিয়া মোল্লাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমি যখন ক্লাস ফাইভ বা সিক্সে পড়ি তখন একজন দরিদ্র ছাত্র যে কিনা অর্থাভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না তাকে বিনা পয়সায় পড়াতাম। এসএসসি, এইচএসসি এমন কী ডিগ্রি পরীক্ষা পরবর্তী ফ্রি টাইমেও আমি বিনা পয়সায় ছাত্রদের পড়িয়েছি। কারো সাহায্য প্রয়োজন হলে আমি টিউশনি করে টাকা আয় করে তাদের সহযোগিতা করেছি। এ ঘটনা নিয়মিতই ঘটতো। কেউ হয়তো পরীক্ষার ফি দিতে পারছে না তাকে তখন টিউশনির টাকা দিয়ে সাহায্য করেছি।



বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, রাজারবাগ, ঢাকা


বিপরীত স্রোত: বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পেছনে আপনি প্রধান ভূমিকা রেখেছেন। এ ভাবনাটি কীভাবে এলো?

ডিআইজি হাবিবুর রহমান: ছোটবেলায় আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি।তিন বোন এক ভাইয়ের মধ্যে আমি সবার বড়। যে সময়টায় ছোটদের এবিসিডি শেখানো হয়, তখন বাবা আমাকে বঙ্গবন্ধুর নাম শেখাতেন। স্বাধীনতার স্লোগান যেমন ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’-এসব স্লোগান বাবার কাছ থেকে শুনে মুখস্ত করে ফেলেছিলাম বর্ণমালা শেখার আগেই। বাবা একজন ব্যবসায়ী ছিলেন কিন্তু তিনি রাজনীতি সচেতন ছিলেন এবং আমাদেরও ছেলেবেলা থেকে সেই শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি ৭ মার্চ ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে গিয়ে সেখানে কী ঘটলো সব আমাকে বলতেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনের অনেক বিষয় তার কাছ থেকে শোনা। 

১৯৯৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আমি পুলিশের চাকরিতে জয়েন করি। সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে পুলিশে চাকরির প্রথম পোস্টিংই ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে। পুলিশে ঢোকার আগে থেকেই রাজারবাগের নাম অনেক শুনেছি। ফলে এই জায়গা সম্পর্কে আগ্রহ ছিল অনেক। রাজারবাগে এসে ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে দেখি খুবই বর্ণাঢ্য এর ইতিহাস। বিশেষ করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে রাজারবাগের ভূমিকা অতুলনীয়। তখন আমার কন্ট্রোলিং অথরিটি উপ-পুলিশ কমিশনার (প্রোটেকশন) হাবিবুর রহমান যিনি এখন বগুড়ার শেরপুর-ধুনটের এমপি, তাকে বিষয়টি জানালে তিনি আমাকে উৎসাহ দেন।

চাকরি জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে দশ বছরেরও বেশি সময় পর এসপি পদে ঢাকা মেট্রোপলিটাল পুলিশে পোস্টিং হয়। ডিসি, পুলিশ হেডকোয়াটার্স হিসেবে রাজারবাগ তখন আমার কাজের ক্ষেত্রের অংশ হওয়ায় আমি আবার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ শুরু করি। এ সময় কমিশনার ছিলেন এ কে এম শহীদুল হক যিনি পরে আইজিপি হন। তিনি নিজে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকায় আমার কাজ করা সহজ হয়। জাদুঘরের কাজ শুরু করি। বিভিন্ন জায়গা থেকে মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রী সংগ্রহ করি। ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরটি উদ্ধোধন করেন। সারা বিশ্বে অনেক জায়গায় পুলিশ জাদুঘর আছে। কিন্তু কোথাও পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নেই। তাই এটি একেবারেই আলাদা। এখানে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা চর্চা হচ্ছে। এখান থেকেই প্রকাশিত হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ’। বইটির সম্পাদনা করি আমি।


ডিআইজি হাবিুবর রহমান

 সম্পাদিত বই

মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ-এর প্রচ্ছদ


বিপরীত স্রোত: বঞ্চিত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে আপনি সক্রিয়। বেদে পল্লীর মানুষদের জন্য কীভাবে কাজ শুরু করেন?

ডিআইজি হাবিবুর রহমান: আমি তখন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার ছিলাম।তখন দেখলাম বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন মাদক ব্যবসার সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িত। তাদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যমই হলো মাদক এবং সেটা মূলত ইয়াবা। টেকনাফে সাপ খেলা দেখানোর কথা বলে তারা সেখান থেকে ইয়াবা নিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে। তখন আমার মনে হলো এটি আমার অফিসিয়াল দায়িত্ব।যারা অপরাধী তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিই। বেদে সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারি তাদের যদি আইন স্বীকৃত কোনো পেশা বা কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া যায় তবে তারা হয়তো অপরাধের পথে হাঁটবে না। সেই ভাবনা থেকেই বেদে সম্প্রদায়ের নারীদের জন্য গার্মেন্টস বা সেলাই শিক্ষার ব্যবস্থা করি। তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি করে দিই।পুরুষদের কর্মমুখী শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করি। বিভিন্ন কাজে ঢুকিয়ে দিই। পাশাপাশি তাদের আবাসনসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করি আমরা।

 

বিপরীত স্রোত: সুবিধা বঞ্চিত বা অবহেলার শিকার হওয়া সম্প্রদায় যেমন হিজড়া, বেদে এবং অন্যান্যদের সাধারণত লোকজন এড়িয়ে চলে। তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগের পেছনে আপনার কোন চিন্তা কাজ করেছে? 

ডিআইজি হাবিবুর রহমান: এর পেছনে মোটিভেশনটা এসেছে মূলত আমাদের দেশের সংবিধান থেকে। সেখানে দেশের সব মানুষের সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে। সেজন্য সবারই সমাজে বেঁচে থাকার, পেশা গ্রহণ করার এবং সম্মানজনক ভাবে জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, তারা নিজেরাই নিজেদের ছোট মনে করে। তারা মনে করে তারা সমাজে অচ্ছুৎ, আর পাঁচজনের মতো নয়। তখন আমার মনে হলো, এটা ঠিক নয়, এই কুসংস্কার ভাঙা প্রয়োজন। একজন নাগরিক হিসেবেই এর প্রতিকার করা প্রয়োজন। আরেকটি বিষয় হলো পুলিশ অফিসার হিসেবে যেমন আইন প্রয়োগ করি তেমনি পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও আমরা নিয়ে থাকি। অপরাধীকে যদি অপরাধ থেকে সরিয়ে রাখা যায় তবে অপরাধটি আর সংগঠিত হচ্ছে না। তখন পুলিশ সুন্দর ভাবে কাজ করতে পারবে। পুলিশ অফিসার হিসেবে এই পরিবেশ তৈরি করাও আমার দায়িত্ব। আমি ঢাকা জেলার দায়িত্ব ছেড়ে এলেও এখনো তাদের সাথে আমার নিয়মিত যোগাযোগ আছে। তাদের সহযোগিতা করছি।

 

বিপরীত স্রোত: এ ধরনের কাজে আপনার পরিবারের কেমন সহযোগিতা পচ্ছেন?

ডিআইজি হাবিবুর রহমান: এ বিষয়ে আমার পরিবারের কাছ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা পেয়ে আসছি। বিশেষ করে আমার স্ত্রী ডাক্তার ওয়াজেদ শামসুন নাহার এসব বিষয়ে খুব আন্তরিক। আমাদের বাসায় যদি একজন বেদে বা হিজড়া সম্প্রদায়ের লোক আসেন তখন একজন অতিথির সঙ্গে আমরা যেভাবে আপ্যায়ন করি, তাদের প্রতিও একই আচরণ করি। এখানে কোনো পার্থক্য আমরা করি না। এমন কী ঈদের সময় যখন কোনো পোশাক কিনি তখন তাদের কথাও চিন্তা করি। আমার সহধর্মিনী নিজেই জানতে চান তাদের জন্য আমি কী করলাম।পরিবারের সহযোগিতা পাওয়াতে আমি এই কাজগুলো করতে পারছি। আমার কোনো রিক্রিয়েশন নেই। বহু সাপ্তাহিক ছুটির দিন যখন আমার পরিবারের সাথে সময় কাটানোর কথা তখন হয়তো আমি চলে যাচ্ছি তাদের খোঁজ খবর নিতে।

 

বিপরীত স্রোত: আপনার ক্যারিয়ারে বা জীবনে এমন কোনো বিশেষ স্মৃতি কি আছে যেটার জন্য আপনার মনে ভালো লাগা কাজ করে?

ডিআইজি হাবিবুর রহমান: জীবনে অনেক স্মৃতিই আছে। তবে একটি ঘটনার কথা আমি বলতে চাই। আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন বাবা গোপালগঞ্জ শহরে থাকতেন। আমি মায়ের সাথে গ্রামে থাকতাম। আমাদের স্কুলের হেডমাস্টার আমাকে খুব ভালোবাসতেন।তিনি প্রায়ই আমাকে তার সঙ্গে করে বাড়িতে নিয়ে যেতেন এবং আমাকে পড়াতেন। তার একটি ছোট বাচ্চা ছিল। সে কান্না করতো। ম্যাডাম হয়তো তখন রান্না ঘরে। স্যার তখন শিশুটিকে কোলে নিয়ে তার কান্না থামাতে চেষ্টা করতেন। তিনি তখন আমাকে দেখিয়ে বলতেন, ‘এই দেখো তোমার এক ভাই। এখন পড়াশোনা করছে। একদিন ও অনেক বড় চাকরি করবে। তুমিও পড়াশোনা করবে। তারপর বড় হলে এই ভাইয়ের কাছে যাবে। সে তোমাকে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে।’

অনেক বছর পর সত্যিই এই ঘটনা ঘটে। আমি কৃতজ্ঞ স্যারের কথা রাখতে পেরেছি বলে। এটা সব সময় আমার মনে পড়ে।এ ছাড়া ছোটবেলা মনে হতো বড় হয়ে একটি মসজিদ তৈরি করে দেবো।বড় হয়ে আল্লাহ সুযোগ করে দিয়েছেন শতাধিক মসজিদ করে দেয়ার।    

 

 

 



 

 

 


ক্যাটেগরিঃ প্রধান কলাম,


মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান

সম্পাদক, বিপরীত স্রোত। সাংবাদিক ও গবেষক। অ্যাসোসিয়েট ফেলো, রয়াল হিস্টোরিকাল সোসাইটি।