করোনা তুমি যাও : তোমার শিক্ষাটুকু মানুষ হতে আমাদের জন্য রেখে দাও
রাগিব উদ্দিন আহ্ম্মদ
বর্তমানে গোটা বিশ্ব কাঁপছে এক সামান্য ভাইরাসের কারণে। করোনা তার নাম, কোভিড-১৯ নামকরণের প্রেক্ষাপট ছিল, COVID-19 is a disease caused by a new strain of coronavirus. 'CO' stands for corona, 'VI' for virus, and 'D' for disease. Formerly, this disease was referred to as '2019 novel coronavirus' or '2019-nCoV.' এ RNA ভাইরাস মূলত স্তন্যপায়ী প্রাণী ও পাখিদের রোগের কারণ হয়ে থাকে। মানুষের বেলায় এটি শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ সৃষ্টি করে মৃদু থেকে মারাত্মক আকার ধারণ করে মৃত্যুও ঘটাতে পারে।
একজন পরিবেশ বিজ্ঞানী হিসাবে আমি করোনা ভাইরাসকে প্রকৃতির একটা পজেটিভ ও প্রয়োজনীয় (অবশ্যই মানুষের মৃত্যু, তা নিকট বা পরিজন হোক দেশি বিদেশি যারই হোক তা নিশ্চয়ই কাম্য নয় বরং দুঃখের। সকল মৃতদের শান্তিময় চিরনিদ্রা ও ধর্মানুযায়ী শ্রদ্ধা জানাই) বলেই মেনে নিচ্ছি। প্রকৃতির একটা বিশেষ অংশ মানুষ, কিস্তু তার আরো অনেক অংশীদার রয়েছে যাদের আগমনে মা পৃথিবীতে ঘটেছে আমরা মানুষদের আগমনের অনেক পরে। প্রকৃতি কেবল আমাদের চাহিদা মেটানো অফুরন্ত আধার নয়, এটা আরো অগণিত জীবের আবাস। এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সবকিছুই প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ও পরির্বধনের মাধ্যমে তার গঠনের পক্রিয়া অব্যাহত রাখে। ১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে থেকে এ প্রক্রিয়া চলে আসছে, যা আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয় দিয়ে এখনই অনুভব করা সম্ভব না। যার যার গতিপথ ও বেগ নির্ধারিত। সূর্য উদয় থেকে অস্ত যাওয়া দেখতে আমাদের বারো ঘণ্টা লেগে যায়। আমরা সন্ধ্যার আগে সমুদ্রের পাড়ে যখন সূর্যাস্তের ছবি তুলি তাকে ছবিতে স্থির মনে হলেও কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আর তাকে দেখা যায় না। এই পৃথিবীর সূর্যটাকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা সময় লাগে যা আমরা দেখতে পাই না কিন্তু ঋতুর পরিবর্তন ও সে অনুযায়ী তাপমাত্রার পরিবর্তন (আবহাওয়া) অনুভব করতে ঠিকই পারি।
প্রকৃতিতে সবকিছুই একটা নিয়মের মধ্যেই চলে, তার একটা ধারাবাহিকতা আছে। একে অপরের সাথে সর্ম্পকযুক্ত আর নির্ভরশীল সবাই একটা পরিমিত শৃঙ্খলিত জীবন চক্রে বাঁধা। পৃথিবীর ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু সৌরজগতে নানান পরিবর্তন আমাদের চোখে দেখার নয় দূরত্ব আর ভিন্ন গতির জন্য। সেক্ষেত্রে মানুষ টেলিস্কোপের সাহায্য নেয়। ঋতুর পরিবর্তনের একটা গতি আছে, তেমনি পৃথিবীর আরো বড় বড় দাগে পরিবর্তন হচ্ছে যা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে আসার কথা বা বিষয় নয়, যেমন বির্বতন। আজ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে আমাদের সৌরজগতের (সূর্য নামের একটা নক্ষত্র আর তা থেকে ছিটকে পড়া কয়েকটা অংশ, গ্রহ যার একটা পৃথিবী, এখন পর্যন্ত জানা মতে একমাত্র গ্রহ যার মধ্যে প্রাণ বা জীবন আছে) সৃষ্টি। জ¦লন্ত সূর্যে থেকে ছিটকে পড়া পৃথিবীটাও ছিল একটা অগ্নিপিণ্ড ধীরে ধীরে তাপ বিকিরণের মাধ্যমে তাপ তাপমাত্রা কমতে থাকে। সূর্য থেকে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। এক সময় এ দূরত্ব আর অনুকূল তাপের কারণে পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাব ঘটে। প্রথম প্রাণ ছিল সমুদ্রগর্ভে কোনো এক প্রকারের ভাইরাস। ভাইরাস হলো বাহিরে প্রটিন (অ্যামাইনো এসিড) এবং ভেতরে কিছু জেনেটিক্যাল উপাদান যা কেবল অন্য কোনো জীবনের দেহে প্রজনন ঘটাতে পারে। বিষয়টিকে জটিল করে দিচ্ছে সৃষ্টির শুরুতে অন্য কোনো প্রাণী তো ছিল না। তখন দীর্ঘ সময় নিয়ে ভাইরাস সৃষ্টি হতো আর বিস্তার করার আগেই ধ্বংস হয়ে যেতো। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এরই এক সময় অন্য প্রাণী সৃষ্টি হয় কালের বিবর্তে এবং তখন ভাইরাস সুযোগ পেয়ে যায় তার প্রজননের আর বিবর্তনের ধারায় একেক প্রজাতির প্রাণে ভিন্ন ভিন্ন ভাইরাসের আর্বিভাব হয়। এখনো ভাইরাসের জীবন অন্যান্য প্রাণীদের কোষের ওপর নির্ভরশীল। বেঁচে থাকার জন্য এর বাইরের প্রোটিন (RNA) অন্যান্য প্রাণীদের প্রোটিন সংগ্রহ করে বাঁচার সময়কে দীর্ঘ করার চেষ্টা চালায়। এক ভাইরাস বিভিন্ন প্রাণীদের দেহে বিভিন্ন রকমের আচরণ করে। কিছু (অল্প) ভাইরাস আছে যা মানব দেহের আরএনএ-এর ওপর নির্ভরশীল করোনার কয়েকটি ভাইরাস তাদেরই এক সত্বা। এডেনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নাইজেল ব্রাউন-এর মতে ভাইরাস কোনো জীবিত সত্বা নয়। এক ক্ষণস্থায়ী জীবন বলে মত প্রকাশ করেন ডেভিড ভেলা, একই দেশের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। ভাইরাসের বেঁচে থাকা ও প্রজননের জন্য অন্য প্রাণীর দেহের প্রোটিনের প্রয়োজন, তাই সে যখন প্রথম প্রাণী হিসেবে আবির্ভূত হয় তখন অন্য প্রাণীর অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু দেখা গেল ও প্রমাণ করা গেল যে, এক ভাইরাস আরেক ভাইরাসকে নির্ভর করেই প্রাথমিক অভিযোজনের কাজ সেরে নেয়। তারপর বিবর্তনের দীর্ঘ পথচলায় বহুকোষী প্রাণীর আর্বিভাব হলে সে সমস্যার অবসান ঘটে। এখন ভাইরাস বিভিন্ন প্রাণী ও মানুষের দেহকে ব্যবহার করে তার প্রজননের কাজ সেরে নেয়। করোনা এমন একটা ভাইরাস যা মানুষের দেহে প্রবেশ করে প্রজননের কাজ করতে মানুষকে নানান ভাবে অসুস্থ কওে তোলে অনান্য ভাইরাসের মতো।
মানুষের আগমনের পর প্রকৃতির ভারসাম্যের তারতম্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। সৃষ্টির শুরু থেকে মানবজাতিকে নানান দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে যার বেশির ভাগই মানব সৃষ্ট। বড় দাগে বলা চলে যেমন রাশিয়ার চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যূৎ কেন্দ্রের বিস্ফোরণ (এপ্রিল ২৬, ১৯৮৬. কনিবার, স্থানীয় সময় ১:২৩:৪০) যার বিক্রিয়ায় গোটা বিশ্ব খাদ্যচক্রে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। এমনকী আমাদের দেশের শিশুখাদ্যে (বিশেষ করে গুড়োদুধের মাধ্যমে) ক্ষতিগ্রস্থ হতে হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো হরহামেশা লেগেই আছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভৌগোলিক ভাবে বিশ্বখ্যাত। এরই মধ্যে বয়ে গেল ঘূর্ণিঝড় আমফান, আইলা, মহাসেন, সিডর। যুদ্ধবিধ্বস্ততার নজির বিশ্বব্যাপী। রিফিউজি সমস্যার আমরাও শিকার। রোহিঙ্গা নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কিন্তু করোনা এমন এক দুর্যোগ যা চায়নার উহানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্থানীয় অফিসে ডিসেম্বর ৩১ তারিখে নিমোনিয়ার আক্রান্তের খবর দেয়া হয়। এটাকে জানুয়ারি ৩০, ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২০-এ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস নামকরণ করা হয়। উহান থেকে সে ভাইরাস দ্রুত বিশ্ব ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাকে প্যানডেমিক বা বিশ্ব ব্যাপী স্বাস্থ্য সমস্যা ঘোষণা করে।
ভাইরাসের সংক্রামণের ধরন
করোনা ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়, ড্রপলেটের মাধ্যমে। ড্রপলেট হলো আমাদের হাঁচি, কাশি, সর্দির সাথে ভাইরাস মিশ্রিত ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র জলকণা। যা আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে নিঃশ্রিত হয়ে নিকটবর্তী মানুষের দেহে প্রবেশ করে চোখ, নাক বা মুখের সাহায্যে। এটা খাবার বা পানিবাহিত কোনো রোগ নয়। মশা বা অন্য কোনো প্রাণীর কামড়ে সংক্রামিত হয় না। সে জন্যই কম করে তিন ফিট নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে মানুষকে শুরু থেকেই চলাচল বা সাবধনতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে মাস্ক বা নাক মুখ ঢেকে রাখার জন্য মুখোশ ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হয় যাতে তার শরীর থেকে ড্রপলেট অন্যদের সংক্রামিত করতে না পারে। বিষয়টি এতোটাই সাধারণ আর সীমিত থাকতে পারতো যদি বিশ্ববাসী শুরুতেই এ দুটি নির্দেশনা মেনে চলতো। কিন্তু তা হয়ে উঠেনি। চীনের উত্তরের প্রদেশ উবের রাজধানী উহানের ভাইরোলজি পরীক্ষাগার থেকে সংক্রামণ শুরু হলে (ডিসেম্বর ২০১৯) প্রাথমিক ধারণা করা হয় এটি বাদুর বা প্যাঙ্গোলিন নামক এক পিপিলিকাভূক প্রাণী থেকে সে সংক্রামণ ঘটে। উল্লেখ্য যে চায়নার খোলা বাজারে এ জাতীয় বন্যপ্রাণী খাদ্য হিসাবে জীবিত বিক্রি হয়। চায়না তাৎক্ষণিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়, যাতে করে ভাইরাস ছড়িয়ে না পড়তে পারে এবং উহানের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অবহিত করে। বিশ্বর এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা (বিমান নির্ভর) উন্নতিই গোটা বিশ্বের জন্য বড় হুমকি যা নিয়ন্ত্রণহীন। স্বল্প সময়েই উহান থেকে বিমানে করে অনেক মানুষ এ রোগ বহনকারী হয়ে সুদূর আমেরিকা ও ইওরোপ চলে যায় খুব অল্প সময়েই, দ্রুত এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে মহামারীর আকার ধারণ করে।
ভাইরাসের লক্ষণ
প্রথম পর্যায়ে সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা, জ¦র হলো এ রোগের লক্ষণ, যা যে কোনো ভাইরাসের সাধারণ লক্ষণ। দিন চারেকে এ লক্ষণ নিয়ে রোগী গায়ে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে উপনিত হন, ক্রমান্বয়ে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট বাড়তে বাড়তে আট দশদিনের মাথায় ৫% রোগী তৃতীয় বা চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে পারেন তখন তার বাড়তি অক্সিজেনের প্রয়োজন হতে পারে এবং শেষ পর্যায়ে তাকে ICU সহায়তা বা লাইফ সাপোর্টে নিতে হয়। সময় মতো সঠিক চিকিৎসা না পেলেই রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। গোটা বিশ্ব এরই মধ্যে নিজ নিজ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের দুর্বলতা, অপর্যাপ্ততা ও চিকিৎসা সাফল্যের অগ্রগতির নমুনা বুঝে গেছে তা ইওরোপ, আমেরিকা বা যে কোনো উন্নত দেশের দাবিদার আর সকল অহংবোধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে, বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম। আমেরিকার মতন দেশে (বিশেষ করে নিউ ইয়র্কে) করোনা তাণ্ডব চালালো সেখানে এতো মানুষ হয়তো বা মারা যেতেন না যদি তাদের গোঁয়ার আর পাগলাটে প্রেসিডেন্ট শুরুতেই করোনাকে রাজনীতিকরণ না করতেন। তিনি শুরুতেই এর নামকরণ করেন চীনা ভাইরাস, তিনি মাস্ক ব্যবহার করবেন না ঘোষণা দিলেন, সরকারি ভুলে মাস্ক, গ্লাভস, ভেন্টিলেটর ডাক্তাদের নাগালে পৌঁছায়নি, মেডিকেল সাপোর্ট নিয়ে সংকট দেখা দেয় বিশ্বের এই উন্নত দেশে, প্রাথমিক সময় ক্ষেপণের ফলে রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে আর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অনেক দেরিতে পরীক্ষা শুরু করে, এই লেখার সময় পর্যন্ত দেখতে দেখতে আমেরিকায় আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা বিশ্বের সব দেশের রের্কড ছাড়িয়ে গেল (১২৫,৭৬৮)। এর মধ্যেই মৃত্যু হয়েছে কানাডা (৮,৫৮২), স্পেন (২৮,৩৪৩), ইটালি (৩৪,৭৩৮), ফ্রান্স (২৯,৮৬১), জার্মানি (৮,৯৬৮), ইন্ডিয়া (১৬,০৯৫), পাকিস্তান (৪,২৪৫), তুরস্ক (৫,০৮২), সউদি আরব (১,৫৫১), ব্রাজিল (৫৭,৬২০), রাশিয়া (৯,১৬৬), ইংল্যান্ড (৪৩,৬৩৪) এবং বাংলাদেশে (১,৭৩৮)। এই লেখার সময় জুন ২৯, ২০২০ (১০:৫০ জি. এম. টি.) বিশে^ মোট আক্রান্ত: ১০,২৭২,০২৮, মোট মৃত্যু: ৫০৪,৯৫২, মোট সুস্থ হয়েছেন: ৫,৫৭৩,৪৩২ জন। একই সময়ে বাংলাদেশে: মোট আক্রান্ত: ১৪১,৮০১, মোট