
আবদুল্লাহ আল মামুন
আমি গ্রীষ্মের যে মুহূর্তে তোমাকে এই চিঠিখানি লিখছি, তুমি হয়তো গরমে দরদর করে ঘামছো। অথচ দেখো, প্রায় একই রকম বা তার চেয়ে বেশি গরমে থেকেও আমি আমার উঠোনের গাছের ছায়ায় বসে তোমাকে লিখছি, পরম স্বস্তির সাথে। এরকমই আনন্দের কাবুলের আবহাওয়া। বাতাসে আর্দ্রতা এখানে খুবই কম। অনেক গরম হলেও বাতাস শরীরের ঘাম মুহূর্তেই টেনে নেয় বলে একটা চনমনে ভাব কাজ করে। কাবুলে বছরের বেশিরভাগ সময়টাই এইরকম থাকে। কিন্তু দেখো, এই দেশটার, আফগানিস্তানের নাম শুনলেই মানুষ কেমন আঁতকে ওঠে!
একবার কি হয়েছে শোনোÑ আমার বাগানে খুব বড় জাতের একটা গোলাপ ফুটেছে। বাংলাদেশি এক বন্ধুকে টেলিফোনে কথা বলতে বলতে কথা প্রসঙ্গে বললাম সে কথা। সে তো সাথে সাথে আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করতে লাগলো, কবে হয়েছে এই ঘটনা? কেউ মারা গেল কিনা? এইসব নানা প্রশ্ন।
আমি বুঝলাম, আমার গোলাপ ফুটেছে কথাটা তার কানে গোলা ফুটেছে হিসেবে বেজেছে। মনে মনে বলি, এই সেরেছে! এ যেন সুকুমার রায়ের ছড়ার এক অবিকল প্রেক্ষাপট-
ঠাস্ ঠাস্, দ্রিম্ দ্রাম্, শুনে লাগে খটকা,
ফুল ফোটে! তাই বল, আমি ভাবি পটকা
আসলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে আফগানিস্তান নামটা এতটাই বোমা ফোটা শব্দের সাথে শুনতে হয় যে, মনেই হয় না, ওখানেও মানুষ থাকে। যারা গান গায়, কবিতা করে, ভালোবাসে, ভালোবেসে প্রাণও দেয়। ওখানেও ফুল ফোটে, ফল ধরে। বরফগলা নদী যখন তরতর করে এগিয়ে যায়, চলার পথে থাকা পাথরের সাথে খুনসুটি করে ছলকে চলে, ঘন সবুজ তুঁত-বাগানের পাশ ঘেঁষে, তখন বিমুগ্ধ কোনো পথিক যেন মরণের পরেও সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে চায়, নিজের অজান্তেই বলে ওঠে- আমারে কবর দিও এই মাটিতে। যেমনটা বলেছিলেন পরাক্রমশালী মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা, সম্রাট জহিরউদ্দিন মোহাম্মদ বাবর।
তুমি হয়তো পাঠ্য বইয়ের কল্যাণে মোঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস জেনেছ, তাই এই বিষয়ে বাড়তি কিছু লিখছি না, শুধু বাবরের কাবুলপ্রীতির অংশটুকু বলছি। বাবর তার জীবনে যতো জায়গায় থেকেছেন, সেসবের মাঝে কাবুলকে রেখেছিলেন সর্বোত্তম স্থানে। তার জীবনের লেখা স্মৃতি কথা বাবরনামা থেকে জানা যায়, কাবুলকে নিয়ে তিনি কতটা স্মৃতিকাতরতায় ভুগতেন। তিনি আগ্রায় থাকলেও তার মন পড়ে থাকতো কাবুলে। তিনি স্মরণ করতেন কাবুলের ফুল, ফল, জল, রুটি, মাংস ইত্যাদিসহ আরও আনেক কিছু। এমনকি কাবুলের মানুষের আচার-ব্যবহার ও ভদ্রতা জ্ঞানও মনেপ্রাণে উপলব্ধি করতেন তিনি। প্রসঙ্গত বলি, কাবুলে বা আফগানিস্তানে মানুষ একে অপরের সাথে দেখা হলে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে দুজনেই একসঙ্গে সোৎসাহে পরস্পরের কুশলাদি জিজ্ঞেস করতে থাকে। যেমন- দুজনেই বলতে থাকে- তুমি কেমন আছো, ভালো আছো তো? সুস্থ আছো তো? তোমার শরীর কেমন আছে ইত্যাদিসহ আরও অনেক বাক্য। এখানে বলে যাওয়াটাই রীতি, শোনা বা উত্তর দেয়া নয়। যাই হোক, বাবরের শেষ ইচ্ছা ছিল কাবুলেই যেন তাকে সমাধিস্থ করা হয়। তার মনের সে ইচ্ছা পূরণ হয়েছিল। বাবর ১৫৩০ সনে আগ্রাতে মারা যান, মাত্র ৪৯ বছর বয়সে। প্রথমে তিনি আগ্রাতেই সমাধিস্থ হন। অতঃপর ১৫৪০ সনে কাবুলে তার সমাধি স্থানান্তরিত হয়।
বাবরের সমাধিটি কাবুলের একপ্রান্তে পাহাড়ের উপরে এক মনোরম বাগানে স্থাপন করা হয়। পুরো বাগানটি মোঘল স্থাপত্যরীতিতে তৈরি। আমি সেখানে দুবার গিয়েছি। বাবরের বংশধর সম্রাট জাহাঙ্গীর (সম্রাট আকবরের পুত্র) সমাধিটির মাথার কাছে একটি মার্বেল পাথরের স্মৃতিফলক স্থাপন করেন; যা আজও সেখানে আছে। বর্তমানে সমাধিটি একটি দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সেই দেয়ালের পাশ ঘেঁষে একটি সাদা মার্বেল পাথরের মসজিদ আছে। বাবরের উজ্জ্বল কীর্তির প্রতি সম্মানস্বরূপ সম্রাট জাহাঙ্গীরের পুত্র সম্রাট শাহজাহান ১৬৪৭ সনে সেটি তৈরি করেন, যা ছিল খুবই