প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান
অন্তর্ঘাতমূলক ভূ-রাজনীতির বিষাক্ত ছোবল
বাংলাদেশের
অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড এবং বৈদেশিক মুদ্রার
প্রধান অর্জনকারী খাত হলো তৈরি
পোশাক (RMG) শিল্প। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, এই
শিল্পকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে
যে অস্থিতিশীলতা, বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুরের ঘটনা
ঘটে চলেছে, তা কেবল সাধারণ
শ্রমিকদের কোনো ন্যায্য অধিকার
আদায়ের আন্দোলন নয়। অপরাধবিজ্ঞান, ভূ-রাজনীতি এবং সাপ্লাই চেইন
ইকোনমিকসের মারপ্যাঁচ বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট
হয়ে ওঠে যে, এটি
দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার এবং একটি
দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের সুদূরপ্রসারী ও অন্তর্ঘাতমূলক নীলনকশা।
মজুরির
যৌক্তিকতা বনাম অহেতুক নৈরাজ্য
গত এক দশকে নিত্যপ্রয়োজনীয়
জিনিসপত্রের দাম বহুগুণ বৃদ্ধি
পেলেও সাধারণ পোশাক শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান এবং প্রকৃত
মজুরি সেই অনুপাতে বাড়েনি—এটি একটি অনস্বীকার্য
বাস্তব সত্য। শ্রমিকদের এই কষ্টের কথা
মাথায় রেখে বর্তমান সরকার
মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ এবং নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের
সমন্বয়ে ইতোমধ্যে একটি কার্যকর ‘নিম্নতম
মজুরি বোর্ড’ গঠন করেছে।
শ্রমিক
পক্ষের প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট শ্রমিক
নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে স্পষ্ট জানিয়েছেন
যে, মজুরি বোর্ড অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে এবং
আগামী জানুয়ারি মাস থেকেই শ্রমিকরা
যাতে বর্ধিত ও যথোপযুক্ত মজুরি
হাতে পান, সে লক্ষ্যে
সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নিয়ে এগোচ্ছে। এমনকি
শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের আড়ালে যেসব নিরীহ শ্রমিককে
হয়রানি করা হয়েছে, তাদের
আইনি সুরক্ষা ও মুক্তির দাবিও
জোরালো হয়েছে। এমন একটি গঠনমূলক
ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া চলমান থাকা সত্ত্বেও, ঠিক
এই ডেলিভারি পিক-টাইমে কারখানায়
ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও মহাসড়ক অবরোধের
মতো ঘটনা প্রমাণ করে
যে, এর পেছনে অসৎ
ও ধ্বংসাত্মক কোনো উদ্দেশ্য নিহিত
রয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও ডিসেম্বরের বাণিজ্য ফাঁদ
রাজনীতি
ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি কোনো
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এর
পেছনে থাকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত
পরিকল্পনা। বর্তমান সময়টি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।
ডিসেম্বরের মধ্যে ভারত ও ইউরোপীয়
ইউনিয়নের (EU) মধ্যে একটি শতভাগ মুক্তবাণিজ্য
চুক্তি (FTA) সই হওয়ার এবং
এর ক্লজগুলো সিলগালা হওয়ার কথা রয়েছে।
বর্তমান
বৈশ্বিক বাজারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক বাজারের ১৯.৫ শতাংশ
এককভাবে বাংলাদেশের দখলে, যেখানে ভারতের অংশ মাত্র ৪.৫ শতাংশ। বর্তমানে
ইউরোপে ভারতীয় পণ্যের ওপর ১২ শতাংশ
বাণিজ্য শুল্ক বহাল রয়েছে। কিন্তু
এই মুক্তবাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত ও বাস্তবায়িত হলে
সেই শুল্ক সরাসরি শূন্যে নেমে আসবে। ফলশ্রুতিতে,
বাংলাদেশের মতো ভারতও কোনো
শুল্ক ছাড়াই ইউরোপীয় বাজারে অবাধ প্রবেশের সুবিধা
পাবে।
সমস্যা
হলো, ইউরোপের বড় বড় ব্র্যান্ড
ও রিটেইলারদের সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি
করে নিয়েছে। বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ‘জারা’ (Zara)-র গ্লোবাল সাপ্লাই
চেইনের মেরুদণ্ড হলো বাংলাদেশ। এককভাবে
জারা’র মোট পোশাকের
১২-১৫ শতাংশ সোর্স
হয় বাংলাদেশ থেকে, যেখানে ভারতের অংশ মাত্র ৫
শতাংশ। বাংলাদেশের প্রায় ৩০০টি টায়ার-১ ফ্যাক্টরি এবং
১৫০০-এর অধিক সহযোগী
কারখানা সরাসরি এই ব্র্যান্ডগুলোর সাথে
যুক্ত। স্বভাবতই, এই বিশাল বাজার
একলপ্তে দখল করার জন্য
প্রতিযোগিতাপূর্ণ কূটকৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
হাইব্রিড
অন্তর্ঘাত ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ভূমিকা
অর্থনৈতিক
অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এই নাশকতা কেবল
দেশীয় অপরাধ নয়, এটি একটি
ট্রান্সন্যাশনাল ইকোনমিক টেরোরিজমের অংশ। গত অক্টোবর
মাসে ভারতের ‘কে কে ক্রিয়েশন’-এর মতো কিছু
কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো
হয়েছিল। তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কারখানার অন্দরমহলের
ত্রুটিবিচ্যুতিকে অতিরঞ্জিত করে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড
‘জারা’-কে ট্যাগ করে
নেতিবাচক প্রচার চালিয়েছে।
তাদের
মূল গেমপ্ল্যান অত্যন্ত স্পষ্ট
উৎপাদন
ব্যাহত করা: নভেম্বর ও
ডিসেম্বর মাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডেলিভারি
উইন্ডোতে কোটি কোটি টাকা
ঢেলে কিছু ভাড়াটে লোক
ও দুষ্কৃতকারীকে দিয়ে রাস্তায় বিশৃঙ্খলা
সৃষ্টি করা।
আন্তর্জাতিক
ক্রেতাদের আস্থা হ্রাস: কারখানায় ভাঙচুর চালিয়ে প্রোডাকশন শিডিউল ব্যাহত করা এবং বিদেশি
বায়ারদের মনে এই ভীতি
ঢুকিয়ে দেওয়া যে, বাংলাদেশে সময়মতো
পণ্য সরবরাহ করা অনিশ্চিত।
বাজার
স্থানান্তর: আগামী বছর (২০২৭) যখন
গ্লোবাল বায়াররা নতুন কন্ট্রাক্ট সই
করবেন, ঠিক তার আগে
আগে ইউরোপীয় ক্রেতাদের টেবিলে বিকল্প অফার উপস্থাপন করে
বাংলাদেশের বাজার হাতছাড়া করা।
বিশিষ্ট
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে,
দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে দেশীয়
কিছু পলাতক রাজনৈতিক কীট, সুবিধাভোগী ক্রোনি
ব্যবসায়ী এবং ক্ষমতাচ্যুত চক্রের
অনুসারীরা পর্দার আড়ালে থেকে এই সাবোটাজ
ফান্ডিং পরিচালনা করছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য—দেশের
অর্থনীতিকে ধ্বংস করে বৈদেশিক মুদ্রার
রিজার্ভে আঘাত হানা এবং
দেশের কোটি কোটি শ্রমিকের
রুটি-রুজি অনিশ্চয়তার মুখে
ঠেলে দেওয়া।
জাতীয়তাবাদী
শ্রমিক দল ও অংশীজনদের প্রতিরোধমূলক ভূমিকা
এই বহুমুখী সংকট মোকাবেলায় জাতীয়তাবাদী
শ্রমিক দল, ছাত্রদল, যুবদল
ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা মাঠপর্যায়ে
অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও সতর্ক ভূমিকা
পালন করে চলেছেন। একদিকে
শ্রমিক দলের শীর্ষ নেতারা
মজুরি বোর্ডের টেবিলে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও দাবি আদায়ে
জোরালো ভূমিকা রাখছেন, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে কোনো বহিরাগত বা
দুষ্কৃতকারী যেন সাধারণ শ্রমিকদের
কাঁধে ভর দিয়ে নাশকতা
চালাতে না পারে, সে
বিষয়ে সচেতনতামূলক ও প্রতিরোধমূলক অবস্থান
নিয়েছেন।
ঢাকা
ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক দল ও সহযোগী
সংগঠনগুলোর এই নিয়মতান্ত্রিক উপস্থিতি
এবং সাধারণ শ্রমিকদের সচেতন করার উদ্যোগ দেশের
উৎপাদন খাতকে বড় ধরনের ধ্বংসের
হাত থেকে রক্ষা করছে।
অতএব,
বাস্তবতা হল- এটি কোনো
সাধারণ শ্রমিক আন্দোলন নয়; এটি দেশের
সার্বভৌম অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর সুপরিকল্পিত আঘাত।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সুশাসন বিশেষজ্ঞদের
মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই
অর্থনৈতিক সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে চিহ্নিত করা জরুরি।
গোয়েন্দা
সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনীর প্রতি আমাদের দ্ব্যর্থহীন আহ্বান—এই নাশকতার নেপথ্যে
থাকা অর্থের উৎস, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট
এবং মাস্টারমাইন্ডদের মুখোশ উন্মোচন করে জাতির সামনে
তাদের পরিচয় প্রকাশ করুন। একই সঙ্গে প্রকৃত
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও আইনি সুরক্ষা
নিশ্চিত করে এবং এই
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ষড়যন্ত্রের দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে আমাদের
এই গৌরবময় পোশাক শিল্পকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। দেশের
অর্থনীতির সুরক্ষায় সরকার, মালিকপক্ষ এবং সচেতন শ্রমিক
সমাজকে সম্মিলিতভাবে এই অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদী
চক্রান্ত প্রতিহত করতে হবে।
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।
ড. বিজন কুমার শীল বিস্তারিত
বিপরীত স্রোত প্রতিবেদন বিস্তারিত
ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরী বিস্তারিত
যারিন মালিয়াত অদ্রিতা বিস্তারিত
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান বিস্তারিত
নজরুল ইসলাম লিখন বিস্তারিত
প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান বিস্তারিত
আবদুল্লাহ আল মোহন বিস্তারিত
আবদুল্লাহ আল মোহন বিস্তারিত
প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান বিস্তারিত