আবদুল্লাহ
আল মোহন
ধীরেন্দ্রনাথ
দত্ত (জন্ম : ২ নভেম্বর ১৮৮৬ - শহীদ :২৯ মার্চ ১৯৭১) একজন বাঙালি আইনজীবী, সমাজকর্মী,
ভাষা সৈনিক ও রাজনীতিক। একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসেবে পাকিস্তানের
রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, বাঙালি জাতীয়তাবের প্রতি গভীর বিশ্বাসী নেতা হিসেবে
সুপরিচিত ছিলেন। দেশ বিভাগের আগে ভারতীয় উপমহাদেশের ভারত অংশে এবং পরে পূর্ব
পাকিস্তানে তিনি রাজনীতিবিদ হিসেবে নানাভাবে সক্রিয় ছিলেন। অনুসরনীয় এবং নমস্য
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর (১২৯৩ বঙ্গাব্দের ১৬
কার্তিক) ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের উত্তরে রামরাইল গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য যে, ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে পুত্র দিলীপকুমার দত্তসহ ধীরেন্দ্রনাথ
দত্তকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁদেরকে ময়নামতী সেনানিবাসে নিয়ে হত্যা করা হয়। মহান
এই বাঙালির স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
১.
ছেলেবেলা থেকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক
কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকলেও রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি হয় ১৯০৫ সালের পর বঙ্গভঙ্গবিরোধী
আন্দোলনে অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয়
মর্যাদা দেয়ার দাবি গণপরিষদে উত্থাপনে তিনি পূর্ব বাংলায় ‘বীরের মর্যাদা’ পান। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পরিচয় আমাদের কাছে প্রধানত
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা দাবির প্রবক্তা হিসেবে। কিন্তু পূর্ব বাংলার প্রতি পাকিস্তানি
শাসকদের বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভূমিকাও পালন করেছিলেন তিনি।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের দৌহিত্রী আরমা দত্তের কথাটি মনে দাগ কাটে, ‘ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন একজন দেবতুল্য মাটির মানুষ, যিনি ধর্মের লোক
দেখানো আনুষ্ঠানিকতায় আগ্রহী ছিলেন না বরং মানুষের বিবেকের উত্থানকেই ধর্মজ্ঞান করতেন।’ শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের দৌহিত্র রাহুলের স্মৃতি ঘিরে রচিত প্রবীর বিকাশ
সরকারের উপন্যাস ‘রাহুল’
পাঠ ও আলোচনার স্মৃতি মনে পড়ছে আজ খুব। আমাদের ভাসানটেক সরকারি কলেজের আনন্দময়
সহশিক্ষা সৃজনশীল আয়োজন ‘মঙ্গল আসর’-এ
সেই উপস্যাসটি পাঠ আলোচনায় আমরা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেছিলাম শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ
দত্তকে ‘রাহুল’
উপন্যাসের বিষয়কে ঘিরে।
২.
পাকিস্তান গণপরিষদে যিনি প্রথম মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদার দাবি তুলে ধরেছিলেন, একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত যিনি স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে গেছেন তিনি শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। বলা যেতে পারে একুশের গোড়ায় ছিলেন কুমিল্লার কৃতিসন্তান শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। আমরা মায়ের ভাষায় প্রাণখুলে কথা বলতে পারছি যে সকল কালজয়ী মহান ব্যক্তির অক্লান্ত ত্যাগের কল্যাণে; তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেছিলেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে অনন্যসাধারণ দেশপ্রেমের পরিচয় রেখে গেছেন। অধ্যাপক মোরশেদ শফিউল হাসান একাগ্র ‘দেশব্রতী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত’ শীর্ষক একক বক্তৃতায় যথার্থই বলেছেন, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পরিচয় আমাদের কাছে প্রধানত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা দাবির প্রবক্তা হিসেবে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ছয় মাসের মাথায় পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দাখিল করা প্রস্তাবে তিনি পরিষদের কার্যপরিচালনার ভাষা হিসেবে ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও স্থান দেওয়ার দাবি জানান। কিন্তু আমরা অনেকেই হয়তো যে তথ্যটি জানি না কিংবা মনে রাখিনি, তা হলো ভাষার বিষয়টি ছাড়াও তিনি সেদিন আরও একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। সেটি হলো, বছরে গণপরিষদের অন্তত একটি অধিবেশন যাতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। বলা যায়, এই দাবি উত্থাপনের মধ্য দিয়ে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গোড়াতেই সেদিন পূর্ব বাংলার প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে একরকম প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেছিলেন। আর তাঁকে নিয়ে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছেন, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা ভাষার প্রসঙ্গ উত্থাপনের মধ্য দিয়ে যে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তা দাবানলে পরিণত করেন। তিনি আরও বলেন, শুধু বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তার অবদানের কথা স্মরণই যথেষ্ট নয়, একই সঙ্গে তার বর্ণাঢ্য মানবপ্রেমী রাজনৈতিক জীবনও স্মরণ করা প্রয়োজন। আর বাংলা একাডেমির প্রাক্তন মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের ভাষায়, ভাষাভিত্তিক-অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে পাকিস্তান গণপরিষদে রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রসঙ্গ উত্থাপন থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তার অনন্যসাধারণ দেশপ্রেমের পরিচয় রেখে গেছেন। এই বিরল দেশপ্রেমিককে প্রতিবছর জাতীয়ভাবে স্মরণ করা প্রয়োজন বলেও মনে করেছেন শামসুজ্জামান খান।
৩.
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মৃত্যুসংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে ভারতীয় পার্লামেন্টে একটি শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, তিনি এমন একজন নেতা, যাঁকে নিয়ে যেকোনো জাতি গর্ব করতে পারে। কথাটি একটুও অতিরঞ্জিত নয়। পরাধীন ভারতবাসীর স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। লড়েছেন পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধেও। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো কাটিয়ে দিয়েছেন কারা-অন্তরালে। সাধারণ পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তিনি যে সর্বভারতীয় নেতাদের সারিতে ঠাঁই করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন, সেটা সম্ভব হয়েছিল তাঁর অতুলনীয় ত্যাগ, নিষ্ঠা ও অনাড়ম্বর জীবনাদর্শের কারণে। ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি যে অসামান্য যুক্তি তুলে ধরেছিলেন, তা আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। মূলত তাঁর এই প্রস্তাবকে কেন্দ্র করেই বায়ান্নর সেই মহাবিস্ফোরণের ক্ষণগণনা শুরু হয়ে যায়। তবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যদি এ প্রস্তাব উত্থাপন না-ও করতেন, তবু নির্লোভ, নিরহংকার ও অসামান্য মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি আমাদের কাছে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকতেন। মহত্ত্বের তপস্যায় সমর্পিত সত্যিকারের একজন বড় মাপের মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর বড় হয়ে ওঠার কাহিনিটিও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয় এক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
৪.
বাংলাভাষার প্রথম প্রাণপুরুষ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম অবিভক্ত বাংলার তৎকালীণ ত্রিপুরা জেলার (বর্তমানে কুমিল্লা) ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাকুমার (বর্তমানে জেলা) রামরাইল গ্রামে। তাঁর বাবা জগবন্ধু দত্ত ছিলেন কসবা ও নবীনগর মুন্সেফ আদালতের সেরেস্তাদার। ধীরেন্দ্রনাথ পড়াশোনা করেছেন নবীনগর হাই স্কুল, কুমিল্লা কলেজ, এবং কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। তিনি ১৯০৪ সালে নবীনগর হাই স্কুল হতে প্রবেশিকা, ১৯০৬ সালে কুমিল্লা কলেজ থেকে এফ.এ.; ১৯০৮ সালে কলকাতা রিপন কলেজ হতে বি.এ এবং ১৯১০ সালে একই কলেজ হতে বি.এল পরীক্ষা পাস করেন। ১৯০৬ সালে ছাত্রজীবনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তৎকালীন কুমিল্লা মহকুমার মুরাদনগর থানার পূর্বধইর গ্রামের কৃষ্ণকমল দাসমুন্সীর কন্যা সুরবালা দাসকে বিয়ে করেন। কৃষ্ণকমল দাসমুন্সী পেশায় আইনজীবী ছিলেন। বিয়ের সময় ধীরেন্দ্রনাথের বয়স ছিল ২১ বছর এবং সুরবালার ১৪ বছর। দীর্ঘ ৪৩ বছর দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে ১২ আগস্ট ১৯৪৯ সালে সুরবালার মৃত্যুতে। তাঁদের সাত মেয়ে ও দুই ছেলে জন্ম গ্রহণ করে। বড়ছেলে সঞ্জীব দত্ত লেখক ও সাংবাদিক হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি ২৭ এপ্রিল ১৯৯১সালে কোলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। ছোটছেলে দীলিপ দত্ত ১৯৭১ এর মার্চ মাসে পাকহানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন।
৫.
তিনি প্রায় একবছরকাল কুমিল্লার মুরাদনগর বাঙ্গুরা উমালোচন হাই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। আইন ব্যবসা করার জন্য ১৯১১ সালে তিনি কুমিল্লা জেলা বারে যোগদান করেন। তিনি ১৯০৭ সালে ‘ত্রিপুরা হিতসাধনী সভা’র সেক্রেটারি নির্বাচিত হন এবং ১৯১৫ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের কাজে অংশগ্রহণ করেন। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ অনুসরণে তিনি ‘মুক্তি সংঘ’ নামে একটি সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা গঠন করেন। কুমিল্লার ‘অভয় আশ্রম’-এর কর্মকাণ্ডের সাথেও তিনি জড়িত ছিলেন এবং ১৯৩৬ সালে ত্রিপুরা (বর্তমানে কুমিল্লা) জেলা বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় ত্রাণসামগ্রী বিতরণে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী এবং ব্যারিস্টার আবদুর রসুলের রাজনৈতিক মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে তিনি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯১৯ সালে ময়মনসিংহ শহরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আহ্বানে তিনি তিন মাসের জন্য আইন ব্যবসা স্থগিত রাখেন এবং অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৩৭ সালে তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন, বঙ্গীয় কৃষিঋণ গ্রহীতা ও বঙ্গীয় মহাজনি আইন পাসের সাথে ধীরেন দত্ত সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিনি ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনে যোগ দেন। ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপের জন্য তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়ে বিভিন্ন কারাগারে বিনাশ্রম ও সশ্রম দণ্ড ভোগ করেন।
৬.
১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি কংগ্রেস দলের টিকিটে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য ঐ বছর ডিসেম্বরে পূর্ববঙ্গ হতে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালের পর একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি অধিবেশনের সকল কার্যবিবরণী ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাতেও রাখার দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৫৪ সালের জুন মাসে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরের শাসন প্রবর্তনের বিরুদ্ধে একটি ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৫৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর হতে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত আতাউর রহমান খানের মন্ত্রিসভায় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন।
৭.
ধীরেন দত্ত তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং কারাগারে আটক ছিলেন। ১৯৩৫ সালের নতুন ভারত শাসন আইনে ১৯৩৭ সালে যে সাধারণ নির্বাচন হয়, তাতে জয়লাভ করে তিনি বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য হন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনেও তিনি আবার নির্বাচিত হন। দেশ ভাগের পর তিনি পাকিস্তান সংবিধান সভার সদস্য হিসেবে করাচিতে অনুষ্ঠিত প্রথম অধিবেশনে যোগদান করেন এবং তৎকালীন পূর্ব বাংলায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৭ সালে গঠিত সংবিধান সভা একই সঙ্গে পাকিস্তান গণপরিষদ হিসেবেও কাজ করে। ওই গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন করাচিতে অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তান গণপরিষদের এ অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই পূর্ব বাংলায় বাংলাকে অফিস-আদালতের ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করার জন্য ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলনেরই প্রতিফলন ঘটে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কর্তৃক উত্থাপিত ভাষা বিষয়ক একটি প্রস্তাবের মধ্যে। প্রস্তাবটিতে তিনি বলেন, ‘উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের অধিকার থাকতে হবে’। তিনি যুক্তি উপস্থাপন করেন, পাকিস্তানের পাঁচটি প্রদেশের ছয় কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে চার কোটি ৪০ লাখ মানুষ বাংলা ভাষাভাষী। সুতরাং বিষয়টিকে প্রাদেশিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে দেখা উচিত। তাই তিনি গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজীর পাশাপাশি বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্তির দাবি করেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবটি পাকিস্তান গণপরিষদে আলোচিত হয় ১৯৪৮’র ২৫ ফেব্রুয়ারি। প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে বক্তৃতা করেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, মোহাজের ও পুনর্বাসনমন্ত্রী গজনফর আলী খান, পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন এবং গণপরিষদের সহ-সভাপতি তমিজউদ্দিন খান। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান তার বক্তৃতায় বলেন, ‘পাকিস্তানের অধিবাসীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা ও একটি সাধারণ ভাষার দ্বারা ঐক্যসূত্র স্থাপনের প্রচেষ্টা হইতে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করাই এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য।’ খাজা নাজিমুদ্দীন বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসীরই এই মনোভাব, ‘একমাত্র উর্দুকেই রাষ্ট্র ভাষারূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে।’ মুসলিম লীগ সংসদীয় দলের নেতাদের এসব বক্তব্যের জবাবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব সমর্থন করে গণপরিষদে কংগ্রেস দলের সেক্রেটারি রাজকুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘উর্দু পাকিস্তানের কোনো প্রদেশেরই কথ্য ভাষা নয়। তা হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানের উপরতলার কিছুসংখ্যক মানুষের ভাষা। আসলে এ হলো অন্যদের উপর উচ্চশ্রেণির আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা। বাংলাকে আমরা দুই অংশের সাধারণ ভাষা করার জন্য চাপ দিচ্ছি না। আমরা শুধু চাই পরিষদের সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি। ইংরেজিকে যদি সে মর্যাদা দেয়া হয়, তাহলে বাংলা ভাষাও সে মর্যাদার অধিকারী।’ ১১ মার্চ পাকিস্তান গণপরিষদে রাষ্ট্রভাষা উর্দু বিল পাশ হয়ে যায়। ওই দিন সারা পূর্ব বাংলায় প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত করাচীর অধিবেশন থেকে ঢাকায় ফিরে এলে, বিমান বন্দরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা তাকে বিপুল সম্বর্ধনা জানান। ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত মূলতঃ সেখান থেকেই।
৮.
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ
আইন পরিষদের অধিবেশনের ঠিক আগে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ কয়েকজন পরিষদ সদস্যকে ছাত্ররা
মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের ভেতরে পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের দ্বারা আক্রান্ত কয়েকজনের
কাছে নিয়ে যান এবং পরিষদের বাংলা ভাষার সপক্ষে বলার জন্য তাদের কাছে দাবি জানান।
পরদিন সরকার সমর্থক ইংরেজি দৈনিক ‘মর্নিং
নিউজ’ পত্রিকায় এর একটি মিথ্যা রিপোর্ট দিয়ে বলা হয়, পরিষদ
অধিবেশনের আগে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের কাছে গিয়ে পরিস্থিতি
নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং ছাত্ররা ১০ জন করে গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ
করতে শুরু করেন। এ মিথ্যা প্রচার সম্পর্কে পরিষদের অধিবেশনে ধীরেন দত্ত প্রতিবাদ
করে নিজের বক্তব্য দেয়ার অনুমতি চান। কিন্তু স্পিকার সে অনুমতি দিতে অস্বীকার করেন
এ যুক্তিতে যে, ওই ধরনের প্রচারণার সঙ্গে পরিষদের কোনো সম্পর্ক নেই। শুধু ২১
ফেব্রুয়ারি নয়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সমগ্র পর্যায়টিতে পরিষদের অভ্যন্তরে
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা ভাষার সপক্ষে এবং ছাত্র ও সাধারণ মানুষের ওপর সরকারি
নির্যাতনের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তৃতা করেন।
৯.
পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর ১৯৬০ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উপর ‘এবডো’ (Elective Bodies Disqualification Order) প্রয়োগ করা হয়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয় এবং তখন থেকে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। এত অপরিসীম ত্যাগের পরও বাংলাভাষার এই প্রাণপুরুষ স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশ দেখে যেতে পারেননি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নেই বর্বর পাক হানাদার বাহিনী যে নির্মম গণহত্যা শুরু করে, তিনি তার শিকার হন। তাকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয় ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ। ৮৫ বছরের এই বৃদ্ধ ক্যান্টনমেন্টে কী অমানবিক অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন, এক সাক্ষাৎকারে সেই বিবরণ দিয়েছেন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ক্ষৌরকার রমণীমোহন শীল। রমণীমোহন শীল হিন্দু হলেও তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল পাকিস্তানী মিলিটারিদের প্রয়োজনেই, কারণ তার মৃত্যু হলে পাকিস্তানী সৈন্যদের চুল দাড়ি কাটার মতো কোন লোক থাকবে না। শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ওপর যে অমানবিক নির্যাতন হয়েছে তা দেখে কোনো সুস্থ ও বিবেকবান মানুষের চোখের জল সংবরণ করা সম্ভব নয়। সাখাওয়াত আলী খান প্রদত্ত এক সাক্ষাতকারে জানা যায়: ‘ধীরেন বাবু সম্পর্কে বলতে গিয়ে রমণী শীলের চোখের জল বাঁধন মানেনি। মাফলারে চোখ মুছে তিনি বলেন, ‘আমার সে পাপের ক্ষমা নেই। বাবু স্কুলঘরের বারান্দায় অতি কষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন কোথায় প্রস্রাব করবেন। আমি আঙ্গুল দিয়ে ইশারায় তাকে প্রস্রাবের জায়গা দেখিয়ে দিই। তখন তিনি অতি কষ্টে আস্তে আস্তে হাতে একটি পা ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠানে নামেন। তখন ঐ বারান্দায় বসে আমি এক জল্লাদের দাড়ি কাটছিলাম। আমি বার বার বাবুর দিকে অসহায়ভাবে তাকাচ্ছিলাম বলে জল্লাদ উর্দুতে বলে, ‘এটা একটা দেখার জিনিস নয়, নিজের কাজ কর।’ ‘এরপর বাবুর দিকে আর তাকাবার সাহস পাইনি। মনে মনে শুধু ভেবেছি বাবু জনগণের নেতা ছিলেন, আর আজ তার কপালে এই দুর্ভোগ। তার ক্ষতবিক্ষত সমস্ত দেহে তুলা লাগান, মাথায় ব্যান্ডেজ, চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় উপর্যুপরি কয়েকদিনই ব্রিগেড অফিসে আনতে নিতে দেখি।’ (শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মারকগ্রন্থ: পৃষ্ঠা ৩০২)। নানা প্রতিকূলতার পরও বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখতেন। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে পুত্র দিলীপকুমার দত্তসহ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁদেরকে ময়নামতি সেনানিবাসে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। কুমিল্লা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ মহান ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক, বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান ও আইনজীবি হিসেবে শহীদ ধীরেন্দ্র নাথ দত্তের নামে রাস্তার নামকরণ হয়েছে। তাঁর স্মরণে কুমিল্লা শহরে তাঁর বাসভবনের সামনের রাস্তাটির নামকরণ করা হয়েছে ’ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সড়ক’। জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে শহীদ খাজা নিজাম উদ্দিন সড়ক পর্যন্ত রাস্তাটি শহীদ ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত সড়ক নামে পরিচিত।
১০.
বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যা ভাষার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। আর সেই ভাষার পক্ষে প্রথম আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রদান করেন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। বাংলাদেশের গোড়াপত্তন যে-ভাষা আন্দোলনে, তার গোড়ায় ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। যে-রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা, তার সূচনায় তাঁর আত্মাহুতি। বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নামটি তাই অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। তাঁকে আমরা ভুলিনি। তাঁর কথা বলতে গেলে পুনরাবৃত্তিরই সম্ভাবনা। তাতে ক্ষতি নেই, বরঞ্চ তাই প্রয়োজন আজ। তিনি পূণ্যশ্লোক, তাঁর নাম বারবার উচ্চারণ করি। তিনি মহাপ্রাণ, তাঁকে অনুসরণের জন্য সকলকে আহ্বান করি। তিনি সত্যনিষ্ঠ, সেই সত্যের কণ্টকময় পথে অবিরাম না চলতে পারলে আমরা কখনও গন্তব্যে পৌঁছুতে পারব না। পাকিস্তান স্বাধীন হয় ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। মাত্র ছয় মাসের মাথায় ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্পষ্ট ভাষায় দাবি তুলেন- বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা হোক। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছেন, সেই দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়, ভাষা আন্দোলনের সূচনা ঘটে। মুখ্যত, ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে দেশ স্বাধীন হয়। এটাই ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু এর বাস্তবায়ন করেন। সেই অর্থে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। মহান একুশ বাংলা ভাষার জয়গাথা। অভিযোগ রয়েছে, এই ফেব্রুয়ারি মাসেও ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত অবহেলিত, তাকে কেউ খুব একটা স্মরণ করে না।
১১.
মাতৃভাষা, মাতৃভূমি ও মাতৃভূমির মানুষের প্রতি প্রবল ভালোবাসা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের চরিত্রের একটি উজ্জ্বলতম দিক। এর জন্য চরম মূল্যও দিতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু এ নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ বা অনুশোচনা ছিল না। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার ব্যবস্থাপক পরিষদের ডেপুটি লিডার। ছিলেন কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতাদের একজন। তখন দেশত্যাগ করে ভারতে চলে গেলে উচ্চপদে আসীন হতে পারতেন, পেতেন উপযুক্ত সম্মান ও স্বীকৃতি। অন্যদিকে, ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান যে তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে, তা তিনি জানতেন। তা সত্ত্বেও পাকিস্তানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পরও তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের অনেকেই দেশ ছেড়ে গেছেন প্রাণভয়ে। তখনো তিনি দেশত্যাগের কথা একবারও ভাবেননি, বরং বরাবরের মতোই ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রশ্নকে ছাপিয়ে উঠেছে তাঁর দেশপ্রেম ও কর্তব্যবোধ। একাত্তরের ২৫ মার্চের গণহত্যাযজ্ঞের পর যখন দলে দলে লোক দেশ ছেড়ে যাচ্ছে, তখনো তিনি দেশত্যাগে সম্মত হননি একই কারণে। বরং সপুত্র জীবন দিয়েই মাতৃভূমি ও মাতৃভূমির মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও কর্তব্যবোধের অনবদ্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তিনি। ১৯৭১-এ পুত্রসহ এই অশীতিপর বিশুদ্ধ মানুষটিকে পাকিস্তানি হানাদার সেনাবাহিনী কুমিল্লা সেনানিবাসে দিনের পর দিন নিষ্ঠুরতম নির্যাতন করে হত্যা করে। বস্তুত এভাবেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালের প্রতিশোধ গ্রহণ করে। কিন্তু পাকিস্তানি হানাদাররা শারীরিকভাবে এই বরেণ্য মনীষীকে হত্যা করতে সক্ষম হলেও তাঁর কালজয়ী আদর্শ হত্যা করতে পারেনি। শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাঙালির স্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্র এবং একটি ভেদ-বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ মানবিক সমাজ গড়ার সংগ্রামে অনাগতকাল ধরে ধ্রুবতারা হয়ে আমাদের পথ দেখাবেন। বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে নিবেদিতপ্রাণ এই মহান মানুষটির জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
১২.
মন্ত্রিত্বকে তিনি ক্ষমতা ও
রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা লাভের উপায় হিসেবে দেখেননি। মন্ত্রিত্বকে তিনি
সন্ন্যাসব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। আজকের দিনে আমাদের পক্ষে এ কথা কল্পনা করাও প্রায়
অসম্ভব। এ প্রসঙ্গে ‘আত্মকথা’য়
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন: “… শপথ গ্রহণ করিবার সময়ে আমার মন
দায়িত্ববোধে অভিভূত হইয়া পড়িয়াছিল। যখন আমাকে আহ্বান করা হয় তখন গীতার ষষ্ঠ
অধ্যায়ের শ্লোকটি আমার মনে আসে। ‘অনাশ্রিতঃ কর্ম্মফলং কার্যণং কম্ম
করোতি যঃ।/স সন্ন্যাসী চ যোগী চ নিরগ্নির্ণ চাক্রিয় ॥’ এই শ্লোকটি তিনবার পাঠ করিয়া শপথ গ্রহণ করি। আমি সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ
করিলাম। বস্তুত, যে কোনো দেশের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করা, বিশেষ করিয়া অনুন্নত দেশের,
সন্ন্যাসব্রত ছাড়া কিছুই নহে। ফলের আকাঙ্ক্ষা না করিয়া কর্তব্য করিয়া যাইতে হইবে
এই সংকল্প গ্রহণ করিলাম।” যতদিন তিনি মন্ত্রিত্ব করেছেন, ততদিন তিনি তাঁর এই
সন্ন্যাসব্রতের ব্যত্যয় ঘটাননি। লোভ-লালসা, বিলাস-ব্যসনের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের একজন
প্রকৃত সেবক হিসেবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সততা, নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগের এক অত্যুজ্জ্বল
দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। রাজনীতি ও মন্ত্রিত্ব যে আজকের মতো অর্থ-বিত্ত
উপার্জন, বৈধ-অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার উপায় নয়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রকৃত
সন্ন্যাসীর মতোই তা প্রমাণ করেছেন। সেই যুগে ঢাকার ধানমণ্ডির অভিজাত এলাকায় এক
বিঘার মতো প্লট নেওয়ার বৈধ সুযোগও তিনি গ্রহণ করেননি। তাঁর জীবনচর্যায় বা যাপিত
জীবনে কোনো কলুষ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি।
১৩.
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কেবল বাঙালির ধর্মসহিষ্ণুতার ঐতিহ্যের ধারকই ছিলেন না। তিনি বাঙালির বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সারাৎসারও আত্মস্থ করেছিলেন। তিনি লিখেছেন: “আমি জেলে বসিয়া গীতা ও কোরান পাঠ করিয়াছি। পাঠ করিয়া কোরান ও গীতার মূলতত্ত্ব একই উপলব্ধি করিয়াছি।” তাঁর ‘আত্মকথা’য় একাধিক অধ্যায়ে তিনি গীতা ও কোরানের উদ্ধৃতি দিয়ে এই সত্যই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবক্তা হলেও তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মীয় মূল্যবোধ অপরিহার্য মনে করেছেন। কিন্তু ধর্মের নামে কোনো সাম্প্রদায়িকতা, সংকীর্ণতা, গোঁড়ামি এবং আচারনিষ্ঠতাকে তিনি স্থান দেননি। চণ্ডিদাসের মতো সবার উপরে মানুষ সত্য এবং মানবধর্ম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মতো এক অখণ্ড চৈতন্য তাঁকে মানবিকতার উচ্চতর আসনে সমাসীন করেছিল। হিন্দু-মুসলমান, জাত-পাত, উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র ভেদ-বৈষম্য তাঁর মন স্পর্শ করতে পারেনি। তার ধর্মবোধে ছিল হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের মিলন তথা ধর্ম-সমন্বয়ের ধারা। আমাদের জাতিসত্তার গঠন প্রকৃতি যে যৌগিক (Syncretec) এবং ধর্ম যে একান্তই ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচরণের বিষয়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর জীবনচর্যায় তা কেবল তত্ত্বের পর্যায়ে না রেখে জীবনভর ধর্মপরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষে মানুষে সেতুবন্ধ রচনা করার নিরলস কর্মযজ্ঞ চালিয়েছেন। তাঁর মধ্যে সচেতনভাবে কার্যকর ছিল বাঙালি সংস্কৃতির সংশ্লেষণের ধারা। তিনি ছিলেন মনুষ্যত্ব এবং বাঙালিত্বের সাধনার এক মহত্তম সিদ্ধ পুরুষ।
১৪.
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পুত্রবধূ হিসেবে তাঁকে দেখার স্মৃতিচারণ করে প্রতীতি দেবী বলেছিলেন, ‘মানবোত্তর মানুষ বললেও কম বলা হয়। আমার দুই ভাই ওনাকে দেখে এসে মাকে বলেছিল, মানুষ কতটা মহান হয়, তা ওনাকে না দেখলে বোঝা যেতো না। পাকিস্তান আর্মি মেরে ফেলতে পারে, এই আশঙ্কা থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে কিছুদিনের জন্য ভারতে চলে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু উনি যাননি, উনি ওনার বন্ধুদের বলেছিলেন, ‘আমি আমার চারপাশের মানুষকে ছেড়ে অন্য কোথাও যাবো না, তোমাদের চলে যেতে হয় তো যাও আর নয়তো যুদ্ধে শামিল হও, যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করো।’ ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে ওনাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। উনি তখন বিছানায় শুয়ে, একটু অসুস্থ ছিলেন, হাই ব্লাডপ্রেশার, এর মধ্যেই বাড়ির দরজায় নক করছে পাক সেনারা, আমি দরজা খুলতে গেলাম। আমার ছোট দেবর দিলীপ কুমার দত্ত আমাকে দরজা খুলতে দিল না, সে নিজে গিয়ে দরজা খুললো। তারপর আমাদের চোখের সামনে থেকে আমার শ্বশুরমশাই আর দেবরকে ওরা ধরে নিয়ে গেল। আমি বাধা দিতে চাইলাম, আমাকে একটা বড় রিভলবার উঁচিয়ে বাধা দেওয়া হলো। সারা বাড়ি ঘিরে রেখেছিল ওরা। পরদিন সকাল হলো, আমরা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম, একটু দূরে হিন্দু আর মুসলিমদের পরপর বাড়ি, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কোনো সমস্যা ছিল না। কুমিল্লা আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছিল সবচেয়ে অসাম্প্রদায়িক এলাকা। আমাদের খুব যত্ন করে সীমান্ত পার করে দেওয়া হলো। আমরা আগরতলা পৌঁছালাম। তারপর কলকাতায় গেলাম। ওখান থেকে আমার আরেক বোন পন্ডিচেরিতে নিয়ে গেল। সেখানে আরও মাস ছয়েক থাকলাম।’
১৫.
১৬.
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যারের কথাই
উল্লেখ করছি আবারো, তিনি বলেছেন, ‘ধীরেন্দ্রনাথ
দত্ত নিজে যা করেছিলেন, তার চেয়েও তাঁর বড় কীর্তি আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে দেওয়ায়। সে
আগুন সবখানে ছড়িয়ে গিয়েছিল। তারপরও আমরা তাঁকে দেখেছি মানুষের অধিকারের পক্ষে
দাঁড়াতে। ক্ষমতায় গিয়েও তিনি মানুষকে ভোলেননি। ক্ষমতার বাইরে তো তিনি মানুষের
মধ্যেই ছিলেন। কতবার কারাগারে গেছেন, কত দুর্ভোগ সহ্য করেছেন। তবু দেশ ছাড়েননি।
করেননি বলেই তো ১৯৭১-এ তিনি আবার নতুন আশায় উজ্জীবিত হয়েছিলেন। তারপর যখন নেমে এল
ভয়াবহ আঘাত, তখনও তিনি নিরাপত্তার কথা ভাবেননি, দেশের ভবিষ্যতের কথাই ভেবেছিলেন।
তিনি জানতেন, পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর আক্রমণের লক্ষ্য হতে যাচ্ছেন তিনি। তবু
তিনি অকুতোভয়। পরাজয়ের গ্লানি স্বীকার করবেন না, তার চেয়ে বরঞ্চ দেশের মাটি তাঁর
রক্তে সঞ্জীবিত হোক। জীবনে-মরণে এই নির্লোভ, সদাচারী, দেশপ্রেমিক, সথ্যসন্ধ মানুষ
অকপিম্পত চিত্তে নিজের কর্তব্য করে গেছেন। এখন তাঁর প্রতি আমাদের কর্তব্য করার
সময়।’ শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ
দত্তের অবদান ‘মাতৃভাষা বাঙালি দেশপ্রেমিককে’ চিরকাল স্মরণে রাখব আমরা।
তথ্যসূত্র :
১. শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আত্মকথা : সম্পাদনা আনিসুজ্জামান, শহীদ
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতিরক্ষা পরিষদ, নভেম্বর ১৯৯৫
২. একাগ্র দেশব্রতী ধীরেন্দ্রনাথ
দত্ত : মোরশেদ শফিউল হাসান, বাংলা একাডেমি পত্রিকা, ৫৮ বর্ষ:
৩য়-৪র্থ সংখ্যা: জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৪, প্রকাশকাল মে-২০১৭, পৃষ্ঠা: ২২-৪১
৩. শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ
দত্ত - একজন মানবতাবাদী
দ্রষ্টা ও স্রষ্টার প্রতিকৃতি : সৈয়দ
আনোয়ার হোসেন, বাংলা একাডেমি পত্রিকা, ৪৪ বর্ষ: ১ সংখ্যা: এপ্রিল-জুন ২০০০,
প্রকাশকাল জুন-২০০১, পৃষ্ঠা: ৫-১৬
৪. বাংলাপিডিয়া, ‘দেশব্রতী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত’
স্মারক বক্তৃতা : অধ্যাপক মোরশেদ শফিউল হাসান, দৈনিক বণিক বার্তাসহ বিভিন্ন
পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট
লেখক পরিচিতি

আবদুল্লাহ আল মোহন
সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ভাসানটেক সরকারি কলেজ, ঢাকা