আনোয়ার কবির খান
মনোযোগ ফেরানোর সহজ কৌশল
ডিজিটাল
বিভ্রান্তির যুগে কাগজ-কলমের
কাছে ফিরে গিয়ে সময়
বাঁচানো, চিন্তা গুছিয়ে নেওয়া এবং নিজের জীবনের
নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা।
স্মার্টফোন
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।
সময় দেখা, কাজের তালিকা তৈরি, দিনপঞ্জি পরীক্ষা কিংবা প্রয়োজনীয় কোনো তথ্য খোঁজা—সবকিছুর জন্যই আমরা ফোনের ওপর
নির্ভর করি। কিন্তু প্রয়োজনীয়
কাজের জন্য ফোন হাতে
নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নানা অ্যাপ কিংবা
অনলাইন কনটেন্টে ডুবে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও
কমবেশি সবার আছে। যে
কাজটি কয়েক মিনিটে শেষ
হওয়ার কথা, সেটিই কখনো
কখনো কেড়ে নেয় দীর্ঘ
সময়। হারিয়ে যায় মনোযোগ, ব্যাহত
হয় কাজের ছন্দ।
এই
সমস্যার একটি সহজ বিকল্প
তুলে ধরেছেন লেখক সারাহ ব্রিংহার্স্ট
ফ্যামিলিয়া তার How I Replaced My Phone
with a Notebook শীর্ষক
লেখায়। তার প্রস্তাব, স্মার্টফোনের
ওপর নির্ভরতা কমাতে দৈনন্দিন জীবনের অনেক কাজ আবার
কাগজের নোটবুকে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে।
ফোনের ছোট্ট ফাঁদ
লেখকের
অভিজ্ঞতায়, ফোনের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু
এর ব্যবহার নয়; বরং একটি
নির্দিষ্ট কাজ করতে গিয়ে
অন্য কাজে অনিচ্ছাকৃতভাবে জড়িয়ে
পড়া। যেমন, পরদিনের ব্যায়ামের সময়সূচি দেখার জন্য ফোন হাতে
নেওয়া হলো। এরপর একটি
অ্যাপ, তারপর আরেকটি বিজ্ঞপ্তি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো পোস্ট। এভাবে
মূল কাজটির কথা ভুলে গিয়ে
অনেকটা সময় কেটে যেতে
পারে।
ডিজিটাল
প্রযুক্তি আমাদের কাজ সহজ করেছে,
কিন্তু একই সঙ্গে মনোযোগের
ওপর তৈরি করেছে নতুন
চাপ। ফোনের পর্দায় ক্রমাগত আসা তথ্য ও
বিজ্ঞপ্তি আমাদের চিন্তাকে বারবার অন্য দিকে নিয়ে
যায়। ফলে কাজের ধারাবাহিকতা
নষ্ট হয় এবং অবসর
সময়ও অনেক ক্ষেত্রে পর্দার
পেছনে ব্যয় হয়ে যায়।
লেখক
এই অভ্যাস বদলাতে প্রথমে একটি বড় নোটবুকে
দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় তথ্য, পরিকল্পনা, লেখালেখির নোট ও ব্যক্তিগত
ভাবনা রাখতে শুরু করেন। কিন্তু
সেটি এত ভারী হয়ে
ওঠে যে সব সময়
সঙ্গে রাখা কঠিন হয়ে
পড়ে। পরে তিনি ছোট,
হালকা ও সহজে বহনযোগ্য
একটি নোটবুক বেছে নেন। সেখান
থেকেই তার নতুন অভ্যাসের
সূচনা।
একটি নোটবুকেই অনেক কাজ
লেখকের
নোটবুকটি কেবল দিনলিপি লেখার
খাতা নয়; বরং দৈনন্দিন
জীবনের একটি ছোট নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র।
এতে রয়েছে মাসিক ক্যালেন্ডার, করণীয় কাজের তালিকা, ব্যায়ামের সময়সূচি, বইয়ের নাম, রান্নার পরিকল্পনা,
কেনাকাটার হিসাব এবং প্রয়োজনীয় তথ্য।
পাশাপাশি তিনি সেখানে ব্যক্তিগত
ভাবনা, লেখার ধারণা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও
লিখে রাখেন।
বিভিন্ন
বিষয় সহজে খুঁজে পেতে
নোটবুকের পাতায় ব্যবহার করেন রঙিন চিহ্ন
ও আলাদা সংকেত। ফলে প্রয়োজনীয় তথ্য
খুঁজতে একের পর এক
অ্যাপ খুলতে হয় না। কাজ
শেষ হলে তালিকায় টিক
চিহ্ন দিয়ে পরবর্তী কাজে
এগিয়ে যাওয়া যায়।
এই
পদ্ধতির মূল শক্তি এর
সরলতা। একটি নোটবুক, একটি
কলম এবং কয়েক মিনিট
সময়—এই সামান্য উপকরণ
দিয়েই তৈরি করা যায়
ব্যক্তিগত কাজ ও চিন্তা
ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থা।
লেখার মধ্য দিয়ে চিন্তার স্পষ্টতা
নোটবুক
ব্যবহারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিজের
চিন্তাকে বুঝতে শেখা। লেখক লক্ষ করেছেন,
কোনো সমস্যা নিয়ে মনে মনে
বারবার ভাবার চেয়ে সেটি কাগজে
লিখে ফেললে বিষয়টি অনেক বেশি স্পষ্ট
হয়ে ওঠে।
নিজের
লেখালেখি নিয়ে অসন্তুষ্টির কারণ
খুঁজতে গিয়ে তিনি একদিন
ক্যাফেতে বসে কাগজে ভাবনাগুলো
লিখতে শুরু করেন। লিখতে
লিখতেই উপলব্ধি করেন, তার লেখার আনন্দ
কমে যাওয়ার পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণ
রয়েছে। নিজের প্রকাশনা ও লেখার ধরন
সম্পর্কে সেই উপলব্ধি তাঁকে
নতুন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
এ
অভিজ্ঞতা দেখায়, লেখা কেবল তথ্য
সংরক্ষণের উপায় নয়; নিজের
ভাবনা বিশ্লেষণ, সমস্যার উৎস শনাক্ত করা
এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছানোরও একটি মাধ্যম। মনের
ভেতর অস্পষ্টভাবে ঘুরতে থাকা কোনো প্রশ্নকে
যখন ভাষায় প্রকাশ করা হয়, তখন
তার বিভিন্ন দিক সামনে আসে।
কোনটি গুরুত্বপূর্ণ, কোথায় সমস্যা কিংবা কী পরিবর্তন প্রয়োজন—তা বোঝা সহজ
হয়।
প্রযুক্তি বর্জন নয়, সচেতন ব্যবহার
লেখক
অবশ্য স্মার্টফোন পুরোপুরি ছেড়ে দেননি। গান
ও পডকাস্ট শোনা, ছবি তোলা কিংবা
প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগের মতো কাজে তিনি
ফোন ব্যবহার করেন। তবে পরিকল্পনা, করণীয়
কাজের তালিকা তৈরি এবং দৈনন্দিন
তথ্য সংরক্ষণের মতো কাজগুলো নোটবুকে
সরিয়ে নিয়েছেন।
অর্থাৎ,
তার উদ্দেশ্য প্রযুক্তির বিরোধিতা করা নয়; বরং
প্রযুক্তির ব্যবহারকে প্রয়োজনের মধ্যে সীমিত রাখা। যে কাজ কাগজে
সহজে করা যায়, তার
জন্য বারবার ফোন খুলতে হবে
কেন?
এই
দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এমন এক সময়ে,
যখন স্মার্টফোনের ব্যবহার শুধু যোগাযোগের মধ্যে
সীমাবদ্ধ নেই। সংবাদ, বিনোদন,
কেনাকাটা, সামাজিক যোগাযোগ এবং কাজ—সবকিছু
একই পর্দায় এসে জমা হয়েছে।
সুবিধার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে অনবরত
মনোযোগ বিচ্যুতির ঝুঁকি।
কাগজ-কলমে ফিরে যাওয়ার পাঁচটি উপকার
প্রথমত,
সময়ের অপচয় কমানো। প্রয়োজনীয়
কাজের তালিকা ও সময়সূচি নোটবুকে
থাকলে প্রতিটি ছোট প্রয়োজনে ফোন
খুলতে হয় না।
দ্বিতীয়ত,
চিন্তা গুছিয়ে নেওয়া। নতুন ধারণা, প্রশ্ন
কিংবা অসমাপ্ত কাজ লিখে রাখলে
সেগুলো ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা
কমে এবং পরে সেগুলো
নিয়ে কাজ করা সহজ
হয়।
তৃতীয়ত,
পড়াশোনা ও গবেষণায় সুবিধা।
বইয়ের নাম, গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি,
তথ্যসূত্র ও পর্যবেক্ষণ এক
জায়গায় লিখে রাখলে দীর্ঘমেয়াদে
ব্যক্তিগত জ্ঞানভান্ডার গড়ে ওঠে।
চতুর্থত,
কাজের অগ্রগতি বোঝা। করণীয় কাজ শেষ হলে
টিক চিহ্ন দেওয়া এবং অসমাপ্ত কাজের
তালিকা দেখা নিজের সময়
ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায়।
পঞ্চমত,
নিজের জন্য সময় তৈরি
করা। ফোনের পর্দা থেকে কিছুটা দূরে
থাকলে নিরিবিলি চিন্তা, পড়া কিংবা লেখার
জন্য সময় বের করা
সহজ হতে পারে।
শুরু করবেন যেভাবে
এই
অভ্যাস গড়ে তুলতে দামি
নোটবুক কেনার প্রয়োজন নেই। সাধারণ একটি
খাতা দিয়েই শুরু করা যায়।
খাতাটিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা
যেতে পারে—দৈনন্দিন কাজ,
গুরুত্বপূর্ণ তারিখ, পড়াশোনা ও বইয়ের নোট,
নতুন ধারণা এবং ব্যক্তিগত ভাবনা।
প্রতিদিন
সকালে কয়েক মিনিট সময়
নিয়ে দিনের কাজগুলো লিখে রাখা যায়।
রাতে দেখে নেওয়া যেতে
পারে কোন কাজ শেষ
হলো, কোনটি বাকি রইল এবং
পরদিন কী করা প্রয়োজন।
প্রথম দিকে সবকিছু কাগজে
সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা না করে, ফোনে
যে কাজগুলো করতে গিয়ে সবচেয়ে
বেশি সময় নষ্ট হয়,
সেগুলো দিয়েই শুরু করা ভালো।
তবে
জরুরি যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় ডিজিটাল সেবা কিংবা যেসব
কাজে ফোন অপরিহার্য, সেগুলোর
বিকল্প তৈরি করার দরকার
নেই। লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তিকে
বাদ দেওয়া নয়, বরং কোন
কাজের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার
করব, তা সচেতনভাবে নির্ধারণ
করা।
মনোযোগই আসল সম্পদ
স্মার্টফোন
আমাদের হাতে অসংখ্য তথ্য
ও সুযোগ এনে দিয়েছে। কিন্তু
তথ্যের প্রাচুর্য মানেই গভীর চিন্তার সুযোগ
বৃদ্ধি নয়। বরং প্রতিনিয়ত
নতুন কিছুর দিকে মনোযোগ সরিয়ে
নেওয়ার অভ্যাস আমাদের কোনো একটি বিষয়
নিয়ে স্থিরভাবে ভাবার ক্ষমতাকে ব্যাহত করতে পারে।
একটি
সাধারণ নোটবুক সেই সমস্যার পূর্ণ
সমাধান নয়। তবু এটি
এমন একটি অভ্যাসের সূচনা
করতে পারে, যেখানে মানুষ নিজের সময়কে একটু বেশি গুরুত্ব
দেয়, চিন্তাকে লিখে রাখে এবং
প্রয়োজন ছাড়া ডিজিটাল জগতে
প্রবেশ করে না।
শেষ
পর্যন্ত প্রশ্নটি নোটবুক না স্মার্টফোন—তা
নয়। প্রশ্ন হলো, আমাদের দৈনন্দিন
জীবনের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে?
প্রযুক্তির, নাকি আমাদের নিজেদের?
কাগজ-কলমে ফিরে যাওয়ার
এই ছোট্ট উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়,
সব কাজের জন্য নতুন অ্যাপের
প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো
একটি কলম, কয়েকটি সাদা
পাতা এবং নিজের সঙ্গে
কিছুটা নিরিবিলি সময়ই হতে পারে
মনোযোগ ফিরে পাওয়ার সবচেয়ে
সহজ উপায়।
লেখক
পরিচিতি
আনোয়ার
কবির খান
সমাজবিজ্ঞানী
ও লেখক
ড. বিজন কুমার শীল বিস্তারিত
বিপরীত স্রোত প্রতিবেদন বিস্তারিত
ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরী বিস্তারিত
যারিন মালিয়াত অদ্রিতা বিস্তারিত
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান বিস্তারিত
ডিজিটাল বিভ্রান্তির যুগে কাগজ-.. বিস্তারিত
প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান বিস্তারিত
প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজা.. বিস্তারিত
আবদুল্লাহ আল মোহন বিস্তারিত