English
ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-১০-২৪ ২০:৫৫:৫৭
আপডেটঃ ২০২৬-১০-২৫ ০১:৫২:০৭


ধর্মীয় লেবাসে প্রাতিষ্ঠানিক শিশু নির্যাতন

ধর্মীয় লেবাসে প্রাতিষ্ঠানিক শিশু নির্যাতন

প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান

 

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও এবং তার প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট নাগরিক আলোড়ন বাংলাদেশের সমাজ-মনস্তত্ত্ব, অপরাধের ধরন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার সংকটকে এক নতুন কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। মাদ্রাসার এক ধর্মীয় শিক্ষকের পক্ষ থেকে এক শিশুর ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিকৃত আচরণের বিপরীতে ক্ষুব্ধ অভিভাবকের তাৎক্ষণিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া (থাপ্পড়) রাষ্ট্রীয় আইন ও সামাজিক নৈতিকতার সমান্তরাল এক জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে। একজন অপরাধবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার গবেষক হিসেবে এই ঘটনাকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন 'চড়' বা আকস্মিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত সনাতনী বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক অন্ধকার ব্যাধি এবং এর বিপরীতে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের একটি সামষ্টিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিস্ফোরণ।

 

আইনের শাসন, স্বতঃস্ফূর্ত বিচার ও সামাজিক ক্ষোভের মনস্তত্ত্ব

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim) তাঁর 'কালেক্টিভ কনসায়নেস' (Collective Consciousness) বা সামষ্টিক সচেতনতার তত্ত্বে দেখিয়েছেন, যখন কোনো সমাজে আইনগত প্রতিষ্ঠানগুলো অপরাধ দমনে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয় বা দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নেয়, তখন জনমানুষের যৌথ চেতনা নিজেই এক ধরনের তাৎক্ষণিক 'বিচার' বা সামাজিক প্রতিবাদের রূপ ধারণ করে। অভিভাবকের সেই চড়টি আইনি পরিভাষায় হয়তো 'আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া', কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক ও অপরাধবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা ছিল সমাজদেহে বাসা বাঁধা এক চরম অস্বস্তির তাৎক্ষণিক ও সংক্রামক জবাব।

 

ডিজিটাল পাবলিক স্ফেয়ার বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়াগুলো পর্যবেক্ষণ করলে এই মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার প্রমাণ মেলে। নিচে ফেসবুকের কিছু নির্বাচিত মন্তব্য তুলে ধরা হলো, যা এ দেশের নাগরিক সমাজের ক্ষোভের তীব্রতা ও রাষ্ট্রের প্রতি এক প্রকার প্রচ্ছন্ন অনাস্থাকে স্পষ্ট করে:

 

১। এই থাপ্পড় রাষ্ট্রের দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু একজন পিতা দিয়েছে। চারিদিকে বলৎকারের বিপক্ষে প্রতিবাদ করতে হবে। ২। এই রসালো চুমু খাওয়ার জন্য সৌদিতে শিরশ্ছেদ করা হইছে ৩। থাপ্পড়ের শব্দটায় একদম কলিজাটা ঠান্ডা হইয়ে গেছে ৪। একটা বহুল প্রচারিত বিজ্ঞাপন - "দাগ থেকে যদি ভালো কিছু হয় তাহলে দাগই ভালো ৷" এই কথাটি প্রথমবার শুনে বুঝতে দেরী হয়েছিল আমার ৷ "থাপ্পড় থেকে যদি ভালো কিছু হয় তাহলে থাপ্পড়ই ভালো ৷" এটি বুঝতে কি আপনাদের কষ্ট হচ্ছে? ৫। কিসের চুমু অনেক দিন পরে বাংলাদেশের মাটিতে একটা বিচার দেখলাম। দেখে শান্তি পেলাম। এই প্রতিবাদের জন্য আমাকে হয়তোবা অনেকে খারাপ বলবে। কিন্তু তাতে আমার কিছুই আসে যায় না। ধন্যবাদ ভাই তোমাকে। ৬। আমি মনে করি ঘটনা যদি সত্য হয়ে থাকে তবে তাকে শরিয়া আইনে বিচার করা হোক ৭। একজন পিতা হিসেবে এই থাপ্পড় শতভাগ সমর্থন করি ৮। এক থাপ্পড় ই পা/য়ু যো/দ্ধা দের যেকোনো অপরাধের জন্য আইন ও সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের বিচার করার ক্ষমতার কথা মনে করাইয়া দিছে! ৯। একদম বাঘের বাচ্চা! অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন সাহসী প্রতিবাদই হওয়া উচিত। অন্যায়ের কাছে মাথা নত নয়, অন্যায়কারীর সামনে নীরবতাও নয়—প্রতিবাদ হোক প্রতিটি কণ্ঠে, প্রতিটি মানুষের বিবেকে। সমাজে তথা প্রতিটা মাদ্রাসা এলাকায় বর্তমান এমন বীর সন্তানের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে ৷ পায়ূযুদ্ধাদের সায়েস্তা এভাবেই করতে হবে ৷ ১০। নিজের মেয়েরে যেয়ে চুমু দেন অন্যের শিশুকে কেন চুমু দিবেন .... তো বেশি হয়ে গেল না তাই ওষুধটাও বেশি পড়েছে ১১। একজন বাবা হিসেবে একদম ঠিক কাজ করছে আমার পক্ষ থেকে তাকে স্যালুট জানাই। ১২। জরুরি ঘোষণা সকল পায়ু যোদ্ধাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে!  কারণ, বিপদে-আপদে এক পায়ু যোদ্ধাই আরেক পায়ু যোদ্ধার সবচেয়ে বড় ভরসা!

 

এই মন্তব্যগুলোর একটি বড় অংশ স্পষ্ট ইঙ্গিত করে যে, নাগরিক সমাজ যখন প্রাতিষ্ঠানিক বিচারহীনতা বা দীর্ঘসূত্রতা দেখে, তখন তারা অনানুষ্ঠানিক বিচার পদ্ধতি বা 'ভিজিলান্তে জাস্টিস' (Vigilante Justice)-কে বৈধতা দিতে শুরু করে। এটি সুশাসনের জন্য একটি অশনিসংকেত হলেও সমাজবাস্তবতার নিরিখে অত্যন্ত খাঁটি। যদিও ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা জনতার হাতে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা আইনের দৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য নয়, কারণ এটি প্রমাণের ভিত্তিতে সঠিক বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

 

ধর্মীয় পরিচয়, জ্ঞানের পরিধি ও নৈতিক দায়িত্ব

আমাদের সমাজের বহু অভিভাবক এক অন্ধ বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠান এই ভাবনায় যে—সন্তান হাফেজ বা আলেম হলে পরকালে পিতা-মাতার বেহেশত নিশ্চিত। অথচ ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক এই কাঠামোর ভেতরে বহুলাংশে পবিত্র কুরআনের মূল স্পিরিটের বিচ্যুতি ঘটেছে। পবিত্র কুরআনের সূরা আর-রূমের ২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেছেন:

 

"আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য; নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের (লিল-‘আলামীন/আলেমদের) জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।"

 

এই আয়াতের গভীর তাত্ত্বিক অর্থ হলো—যিনি সৃষ্টিতত্ত্ব, ভাষা, নৃবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং মহাবিশ্বের বিজ্ঞান বোঝেন, প্রকৃত অর্থে তিনিই 'আলেম' বা বিশেষ জ্ঞানধারী। দুঃখজনকভাবে, কওমি মাদ্রাসার একটি বড় অংশের পাঠ্যক্রম ও চিন্তাভাবনা এই বৈশ্বিক ও মহাজাগতিক জ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন। কেবল মুখস্থবিদ্যা এবং সংকীর্ণ আচারসর্বস্বতার চর্চায় সেখানে অনেক সময় এমন এক 'কাঠমোল্লা' শ্রেণির জন্ম হচ্ছে, যারা ধর্মের নামে শিশুদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক অবদমন ও বিকৃতির চর্চা করছে। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন, "ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান পঙ্গু, আর বিজ্ঞান ছাড়া ধর্ম অন্ধ।" ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবাধিকার, শিশু মনস্তত্ত্ব এবং আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতির সমন্বয় না ঘটলে তা এক অন্ধ ও অনুদার আবহে রূপ নেয়।

 

অপরাধবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ: রুটিন অ্যাক্টিভিটি তত্ত্ব ও তদারকির সংকট

অপরাধবিজ্ঞানের 'রুটিন অ্যাক্টিভিটি থিওরি' (Routine Activity Theory) অনুযায়ী, একটি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার জন্য তিনটি উপাদান লাগে—একজন সম্ভাব্য অপরাধী, একটি উপযুক্ত লক্ষ্য (এক্ষেত্রে অরক্ষিত শিশু), এবং একজন যোগ্য অভিভাবক বা তদারককারীর অনুপস্থিতি। কওমি মাদ্রাসা ও আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বদ্ধ পরিবেশ, বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগের অভাব এবং রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারির অনুপস্থিতি বিকৃতকাম অপরাধীদের জন্য একটি 'নিরাপদ স্বর্গ' তৈরি করে দেয়।

 

শিশুরা বয়স ও নির্ভরশীলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। যে কোনো প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর পথ বন্ধ থাকলে, কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেও প্রতিকার না মিললে কিংবা অভিযোগকারীকে ভয়ভীতি বা সামাজিক চাপের মুখে পড়তে হলে নির্যাতনের ঘটনা আড়ালে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

 

শিশু সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাসমূহ

এই ব্যাধি থেকে মুক্তি এবং আমাদের শিশুদের পবিত্র শৈশব নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন করা জরুরি:

 

রাষ্ট্রীয় আইনি নজরদারি ও ম্যান্ডেটরি রিপোর্টিং:

দেশের সকল আবাসিক ও অনাবাসিক কওমি মাদ্রাসাকে সরকারি সমাজকল্যাণ বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কঠোর লাইসেন্সিং ও নজরদারির আওতায় আনতে হবে। মাদ্রাসার অভ্যন্তরে যেকোনো ধরনের শিশু নির্যাতন বা অনৈতিক আচরণের ঘটনা ঘটলে তা রাষ্ট্রকে জানাতে বাধ্য থাকার (Mandatory Reporting) আইনি বিধান করতে হবে।

 

পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন ও মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন:

সূরা আর-রূমের ২২ নম্বর আয়াতের মূল স্পিরিট অনুযায়ী শিক্ষার সাথে আধুনিক বিজ্ঞান, মানবাধিকার এবং শিশু মনস্তত্ত্বের পাঠ যুক্ত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি বাধ্যতামূলক মনস্তাত্ত্বিক ও পেশাগত আচরণগত মূল্যায়ন প্রবর্তন করতে হবে।

 

নিরাপদ পরিবেশ ও সিসিটিভি মনিটরিং:

মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষ ও আবাসিক হলগুলোতে শিশুদের গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষা করে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, মানবাধিকার কর্মী ও অভিভাবকদের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ কমিটির মাধ্যমে নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে।

 

শিশুদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ সুযোগ:

শিশুরা যেন ভয়, লজ্জা কিংবা শাস্তির আশঙ্কা ছাড়াই তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের কথা জানাতে পারে, সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে। গোপনীয়তা রক্ষা এবং জরুরি মনাসসামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক।

 

আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা:

সমাজ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়, সেজন্য অপরাধীদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

 

অতএব, একটি সায়েন্টিফিক ও যৌক্তিক সমাজ গঠনে অপরাধের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি সেই ক্ষোভকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অভিভাবকের হাতের থাপ্পড়টি একটি সাময়িক ক্ষোভের শান্তিদায়ক বহিঃপ্রকাশ হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান নয়। নোবেলজয়ী মানবাধিকার কর্মী নেলসন ম্যান্ডেলার ভাষায়, "একটি সমাজ তার শিশুদের সাথে কেমন আচরণ করে, তা দিয়েই সেই সমাজের আসল চরিত্র ফুটে ওঠে।"

 

আমাদের শিশুদের পবিত্র শৈশব এবং সামগ্রিক মানবাধিকার রক্ষা করতে হলে এখনই রাষ্ট্র, সমাজ এবং ধর্মীয় নেতৃত্বকে একযোগে কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিক সংস্কারে হাত দিতে হবে। বিচারহীনতার ধারণা দূর করে আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই