শশাঙ্ক সাদী
আমরা
প্রায়শই শুনি যে, বাংলাদেশের
ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির সংযোগের মধ্যেই নিহিত। গত এক দশকে
রাষ্ট্রীয় ভাবে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ তৈরির নামে অতি তাড়াহুড়ো
করে আমরা আদতে যন্ত্রের
প্রতি আচ্ছন্ন একটি জাতিতে পরিণত
হয়েছি। আমরা শিশুদের হাতে
তুলে দিচ্ছি ট্যাবলেট, ফোন, ল্যাপটপ এর
মতো রঙিন প্রযুক্তি, আর
একেই বলছি ‘শিক্ষা’। আমরা ধরেই
নিয়েছি যে স্মার্ট যন্ত্র
প্রয়োজনীয় ‘বিষয়বস্তু’ সরবরাহ করছে, আর তাতেই শিশুদের
শিক্ষা অর্জন হচ্ছে। শিক্ষা কি ডাউনলোড করা
যায়? একে তো লালন
করতে হয়।
আমরা বিগত দুই দশক
ধরে শহরাঞ্চলে অনেক স্কুলের শ্রেণীকক্ষগুলোকে
প্রযুক্তি-বান্ধব করেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো তাতে করে
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কি আমরা ‘মানবিক’
করে তুলতে পেরেছি?
এক
শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এক ঔপনিবেশিক কাঠামো
দ্বারা জর্জরিত যা জ্ঞানের কৌতূহল
নয়, বরং বাধ্যতা তৈরির
উদ্দেশ্যে নির্মিত। ১৯৯০-এর দশক
থেকে আমাদের শিক্ষা সংস্কারের ‘ভৌত’ কেন্দ্রবিন্দু অর্থাৎ
অবকাঠামো নির্মাণের ঝোঁক স্কুলগুলোতে সর্বজনীন
শিশু ভর্তি নিশ্চিত করার জন্য একটি
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু এটিও
দিন শেষে শিশুর জন্য
প্রয়োজনীয় মানবিক শিক্ষণ পদ্ধতিকে দূরেই ঠেলে রেখেছিল।
শিক্ষা ব্যবস্থায় গত ৫০ বছরের নীতিগত বিবর্তন
আমাদের
বর্তমান সময়ের প্রযুক্তি-আচ্ছন্নতা বুঝতে হলে একটু পেছনে
ফিরে দেখা জরুরি। বাংলাদেশের
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে তৈরি করা
বা শিক্ষা নীতিগুলোতে শিক্ষার মান ও প্রয়োজনীয়
পরিবর্তনগুলো সংজ্ঞায়িত করার সাহসী এবং
বহুমুখী প্রচেষ্টা এবং সেগুলো বাস্তবায়নের
রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা বোঝা দরকার।
আমাদের
জাতীয় শিক্ষা-যাত্রা ‘শিক্ষাভিত্তি’ তৈরি থেকে ‘দক্ষতা
কাঠামো’ তৈরির নীতিগত অগ্রাধিকার পরিবর্তনের একটি চলমান গল্প।
এই গল্পের শুরু ১৯৭৩ সালে।
ভিত্তিস্থাপন সময় (১৯৭৩)
স্বাধীন
বাংলাদেশে কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা
কমিশন ছিল শিক্ষা নিয়ে
আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্বের প্রথম পদক্ষেপ। এই শিক্ষানীতি একটি
ধর্মনিরপেক্ষ, বিজ্ঞান-ভিত্তিক এবং ঐক্যবদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থার
স্বপ্ন দেখিয়েছিলো। ওই শিক্ষানীতি ছিল
বিশাল আশার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু
সেসময় বাংলাদেশ চরম দারিদ্র্যের আর্থ-সামাজিক অবস্থার মুখোমুখি থাকায় ঐ শিক্ষানীতির প্রাথমিক
লক্ষ্য বস্তু হয়ে দাঁড়ায় যেভাবেই
হোক যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশের সকল শিশুদের পরিপূর্ণ
স্কুল ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে
আসা। ফলে ঐক্যবদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থার
স্বপ্ন শুরুতেই একটি বিরাট ধাক্কা
খায় যা থেকে আজও
আমরা বের হতে পারিনি।
প্রবেশগম্যতা তৈরির সময় (১৯৯০-২০০০):
এই
সময়কালে আমরা ‘ভৌত কাঠামো’-র
উপর মনোনিবেশ করেছি। বিশাল অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে স্কুলগুলোতে প্রায় সর্বজনীন প্রাথমিক ভর্তির লক্ষ্য অর্জন করেছি। তবে শিক্ষার সাফল্য
সেই সময় ইট-পাথর
আর কাঁচের জানালার সংখ্যার মাধ্যমেই পরিমাপ করা হয়েছিলো। আমরা
স্কুলে স্কুলে হাজার হাজার নতুন শ্রেণিকক্ষ তৈরি
করেছি। কিন্তু একই সময়ে ওই
শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুদের মনে কৌতূহল তৈরির
পরিবর্তে সব কিছুতে সম্মতি
দেয়ার মানসিকতা তৈরির নক্সা যেন বুনে দেয়া
হয়েছিলো। অনেকটাই তা ঔপনিবেশিক যুগের
‘কারখানা মডেল’ এর নক্সারই প্রতিফলন
বলা যায় অর্থাৎ সব
একই ধরনের বস্তু উৎপাদন করবে আর যেগুলো
একটু আলাদা সেগুলো বাতিলের খাতায় চলে যাবে।
গুণগত পরিবর্তন সময় (২০১০)
২০১০
সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে আমরা পাঠ্যক্রমকে আধুনিকীকরণ
এবং অন্তর্ভুক্তিমুলক নিশ্চিত করার চেষ্টা দেখতে
পাই। কিন্তু এর বাস্তবায়ন শুধুমাত্র
উচ্চ-স্তরের পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কৃতির মধ্যেই আবদ্ধ করে রাখা হয়।
আমরা তখন শিশুদের পরীক্ষায়
যেভাবেই হোক মুখস্ত করে
বেশি নম্বর নিয়ে পাশ করতে
শেখাচ্ছিলাম। কিন্তু কিভাবে সমস্যা নিয়ে ভাবতে হয়
এবং নিজেরাই সমাধান করতে হয় সেই
বিষয়ে কোন রকম জোর
দেয়া হয়নি। ফলে এ সময়ে
প্রাইভেট কোচিং ব্যবসার রমরমা বৃদ্ধি আর শিশুদের ওপর
মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে
প্রবল ভাবে। স্কুলগুলোও আমলাতন্ত্র ও শাসকগোষ্ঠীর সুনজরে
থাকার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য
নম্বর পাওয়ার প্রক্রিয়া জোরে শোরে চাপিয়ে
দিয়েছে শিশুদের ওপর।
দক্ষতা কাঠামো তৈরির সময় (২০২৩-বর্তমান):
২০২৩
সালে প্রবর্তিত নতুন পাঠ্যক্রম কাঠামো
পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় একটি আমূল পরিবর্তনকে
দৃশ্যমান করে। এটিই প্রথম
‘পড়া মুখস্থ’ করার প্রক্রিয়া থেকে
‘অভিজ্ঞতামূলক শিক্ষা’ গ্রহণের দিকে এগিয়ে যায়।
এই পাঠ্যক্রম ছাত্রদেরকে ‘স্বকীয়’ সত্তা হিসেবে তৈরি করার একটি
সাহসী প্রচেষ্টা। তবে এই পরিবর্তন
নিয়ে অপ্রতুল আলোচনা, অপর্যাপ্ত পূর্ব প্রস্তুতি, শিক্ষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের অনুপস্থিতি এবং অন্বিত পরিকল্পনা
গ্রহণ না করার ফলে
তা শুরুতেই প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে।
শিশুরা হয়ে ওঠে নতুন
ভাবনার গিনিপিগ। শিক্ষকরা তৈরি না থাকার
কারণে এই শিক্ষা-ভাবনাকে
কাগজের গন্ডি থেকে প্রকৃত অবস্থায়
রূপান্তরিত করতে অনেক প্রতিবন্ধকতার
মুখোমুখি হন। স্কুলগুলোর ভৌত
অবকাঠামো, কারিগরি সহায়তার বৈষম্য ও আর্থিক সক্ষমতা
সেসব প্রতিবন্ধকতার অন্যতম উৎস। ফলে কোভিড
মহামারীর সময়ে প্রয়োজনের কারণে
তৈরি হওয়া প্রযুক্তি নির্ভরতাকেই
দিন শেষে আবারো শিক্ষার
বাহন হিসেবে অত্যধিক জোর দেওয়া শুরু
হয়।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অবকাঠামোগত ফাঁদ
গত
পঞ্চাশ বছরে নানা ধরণের
প্রগতিশীল পরিবর্তন সত্ত্বেও আমরা যেন একটি
‘অবকাঠামোগত ফাঁদ’-এ পড়ে গেছি।
আমরা সফলভাবে একটি জাতির শিক্ষার
হার্ডওয়্যার তৈরির চেষ্টা করেছি। কিন্তু এটা সেই শেয়াল
আর বকের দাওয়াত খাওয়ার
গল্পের মতোই। আমরা তিনটি ভিন্ন
বাস্তবতার (গ্রামীণ, আধা-নগর ও
নগর) জন্য একটা ধরণের
প্রযুক্তিগত সমাধান প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছি।
গ্রামীণ
জনপদঃ আমাদের
প্রত্যন্ত গ্রাম এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ
হাওর, উপকূলীয় এবং নদীর চরগুলিতে
শিক্ষা হিসেবে প্রযুক্তির প্রতিশ্রুতি আসলে বাস্তবতার দেয়ালে
মাথা কুটে মরে। আমরা
ভুলে যাই যে সেখানে
শিক্ষা কেবল একটি প্রক্ষেপণ
যন্ত্র বা পর্দা নয়;
এটি বেঁচে থাকার বিষয়। জলাবদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলার একটি শিশুর এমন
একটি শিক্ষার প্রয়োজন যা তাদের নিজস্ব
পরিচয় ও অক্ষর জ্ঞানের
সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় অভিযোজন জ্ঞানকে একীভূত করে। যখন আমরা
দুর্যোগ-সচেতন পরামর্শ ছাড়া তাদের হাতে ট্যাবের মতো
একটি প্রযুক্তি তুলে দিই, তখন
আসলে আমরা তাদের কাছে
এমন একটি বিশ্বের জানালা
খুলে দেই যেখানে তারা
পৌঁছাতে পারে না। পরিবারের
আর্থিক অসক্ষমতার কারণে শিশুদের স্কুল ছেড়ে দেয়া এবং পরিবারের সহায়তায়
শিশুদের স্কুলে থেকে যাওয়া ও
পরবর্তীতে ক্লাসে নেতৃত্ব দেওয়া - এই পার্থক্যটাই যে
ওই জনপদগুলোতে শিক্ষা বিস্তারে সবচেয়ে বড় ‘মানবিক’ উপাদান
তা আমরা বারবার বুঝতে
ভুল করছি।
আধা-নগরের পরিবর্তন - মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চাপঃ বাংলাদেশের
ক্রমবর্ধমান জেলা ও উপজেলা
শহরগুলিতে আমরা একটি উদীয়মান
‘মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চাপ’ দেখতে পাচ্ছি।
সেখানে অভিভাবকরা বুঝে হোক বা
না বুঝে হোক "স্মার্ট"
লেবেলের জন্য ক্ষুধার্ত। এই
জায়গাগুলোতে উচ্চ প্রযুক্তির ডিভাইস
এবং পুরাতন পদ্ধতির প্রাইভেট কোচিং সেন্টারের এক শংকর তৈরি
হয়েছে। ফলে এসব জায়গায়
ভালো ফলের প্রতিযোগিতার কাছে
প্রায়শই হারিয়ে যাচ্ছে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক উপাদান। তাতে করে শিশুর
শেখার জন্য অতি প্রয়োজনীয় ‘যত্ন’-কে প্রতিস্থাপিত করছে
কর্মক্ষমতা তৈরির চাপ। আমরা হাজার
হাজার ‘ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনকারী’ তৈরি করছি যারা
প্রযুক্তিগতভাবে দারুন সক্ষম হয়ে উঠছে। কিন্তু
তাদের মধ্যে পরস্পরের জন্য সহানুভূতি এবং সহযোগিতার মতো
নরম দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না।
নগর
জঙ্গল - সংযুক্ত কিন্তু বিচ্ছিন্নঃ ঢাকা
বা চট্টগ্রামের ঘনবসতির বস্তিতে হোক বা শীততাপ
নিয়ন্ত্রিত ফ্লাটে হোক, প্রযুক্তি আজ
সর্বব্যাপী। কিন্তু এসব জায়গায় মানুষের
মানবিক সংযোগ আজ প্রায় শূণ্যের
কোঠায়। একই সাথে নগরের
শিশুরা খোলা ও বিনোদনের
জায়গার অভাব এবং সুরক্ষা
সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শারীরিক খেলাধুলা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষার
অভাব মোকাবেলা না করে তাদের
শ্রেণীকক্ষগুলিকে প্রযুক্তি-বান্ধব করে ফেলে আমরা
এমন একটি প্রজন্ম তৈরি
করছি যারা প্রযুক্তিগতভাবে শিক্ষিত
কিন্তু আবেগগতভাবে বিচ্ছিন্ন। উঁচু উঁচু ভবনের
ছায়ায় প্রযুক্তির পর্দা শিশুদের পরস্পরের মধ্যে মানবিক সংযোগ সেতু তৈরির পরিবর্তে
বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ডিজিটাল সমাধানের ভুল ধারণা থেকে বের হওয়া
আমরা
৫০ বছর ধরেই আমাদের
শিক্ষাব্যবস্থার নীতিগত সংস্কারের চেষ্টা করে আসছি কিন্তু
আরাধ্য জায়গায় আজও পৌঁছাতে পারিনি।
রূপান্তরিত শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন নিয়ে ২০২৩ সাল
থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের যে বহু বিলিয়ন
ডলারের সংস্কারের চেষ্টা সেখানে যে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি
অনুপস্থিত তা প্রযুক্তি নয়,
সেটি হোলো ‘যত্ন’। ভৌত
অবকাঠামো তৈরি এবং প্রযুক্তি
সংগ্রহের উপর অতিরিক্ত মনোযোগ
দিয়ে আমরা কাঠামোগত শিক্ষার
একটি উচ্চ-প্রযুক্তিগত সংস্করণ
তৈরি করার ঝুঁকি নিয়েছি।
আমরা জানি যে শিশুরা তখনই শেখে যখন তারা অনুভব করে তাদের শেখাটা কেউ দেখছে। যখন কেউ তাদেরকে তাদের কথা বলতে দেয় ও মনোযোগ দিয়ে শোনে তখনই তারা বেড়ে ওঠে। শিশুদের মধ্যে কৌতূহল তখনই জেগে ওঠে যখন একটি শিশু নিজে ভুল করার জন্য যথেষ্ট নিরাপদ বোধ করে অর্থাৎ তারা জানে যে ভুল করলেই বকা খেতে হবে না বরং আবার চেষ্টা করার জন্য উৎসাহ পাওয়া যাবে। প্রযুক্তির