English
ঢাকা, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-২০ ১৯:৫৩:৫১
আপডেটঃ ২০২৬-০৯-২১ ০৪:০৯:৪৯


জীবনের অবমূল্যায়ন: দায় কার?

জীবনের অবমূল্যায়ন: দায় কার?


প্রফেসর . আসিফ মিজান

 

মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কোনো রাষ্ট্রের অনুগ্রহ নয়; এগুলো মানুষের জন্মগত অধিকার জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের নম্বর অনুচ্ছেদে প্রত্যেক মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকারের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে  অথচ আমাদের সমাজে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি সহিংসতার ঘটনা প্রমাণ করছেবাংলাদেশে মানুষের জীবন সম্পদের নিরাপত্তা আজ গভীর সংকটে নিমজ্জিত

এই সংকট কেবল আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; এটি একই সঙ্গে নৈতিকতা, পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং সুশাসনের সংকট

নিকট অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে এক অপরিচিত ব্যক্তির নির্মম হত্যাকাণ্ড, খুলনায় এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ওপর নৃশংস হামলা পরে হত্যা এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকায় কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে কুমিল্লার ঘটনায় শিক্ষার্থীরা বিচার নিরাপত্তার দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করেছে; পুলিশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে এবং তদন্তে কিছু সূত্র পাওয়ার কথা জানিয়েছে  খুলনার ঘটনায়ও হত্যামামলা হয়েছে, যেখানে কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে

ঘটনাগুলোর বিবরণ ভিন্ন হতে পারে, স্থান প্রেক্ষাপট ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু অন্তর্নিহিত সূত্রটি একইমানুষের জীবনের প্রতি ভয়াবহ অবজ্ঞা, সহিংসতাকে স্বাভাবিক মনে করা এবং অপরাধ সংঘটনের পর শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার এক বিপজ্জনক সংস্কৃতি

 

জীবন সম্পদের মর্যাদা

ইসলাম মানুষের জীবনকে পবিত্র আমানত হিসেবে বিবেচনা করেছে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করা যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার সমতুল্য; আর একজনের জীবন রক্ষা করা যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষার অনুরূপ এই শিক্ষা কেবল ধর্মীয় অনুশাসন নয়- এটি মানবসভ্যতার নৈতিক ভিত্তির অন্যতম শক্তিশালী ঘোষণা

অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ, চুরি, লুণ্ঠন দুর্নীতিও ইসলামে কঠোরভাবে নিন্দিত সূরা আল-মায়িদার ৩৩ ৩৮ নম্বর আয়াতে জননিরাপত্তা বিনষ্টকারী অপরাধ এবং চুরির জন্য কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে  এসব বিধানের মূল উদ্দেশ্য প্রতিহিংসা নয়; বরং মানুষের জীবন, সম্পদ, মর্যাদা সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষা করা

মানবাধিকারের ভাষা, ধর্মীয় নৈতিকতা এবং সামাজিক রীতিনীতি- তিনটিই একই সত্যের দিকে নির্দেশ করে: মানুষকে হত্যা করা, নির্যাতন করা কিংবা তার সম্পদ লুণ্ঠন করা সভ্যতার বিরুদ্ধে অপরাধ

কিন্তু যখন অপরাধী প্রকাশ্যে অপরাধ করে, যখন দর্শকেরা নীরব থাকে, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হত্যার দৃশ্য বিনোদনের উপাদানে পরিণত হয় এবং যখন বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আক্রান্ত হয়তখন বুঝতে হবে, সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন নয়; এটি সামগ্রিক সামাজিক চরম অবক্ষয়ের লক্ষণ

 

অসুস্থ প্রজন্মের দায় কার?

সন্তান জন্ম দিলেই পিতা-মাতার দায়িত্ব শেষ হয় না সন্তানকে কীভাবে বড় করা হচ্ছে, তার মূল্যবোধ কী, সে দুর্বল মানুষকে কীভাবে দেখে, ভিন্নমতকে কীভাবে গ্রহণ করে, অর্থ সাফল্য সম্পর্কে তার ধারণা কীএসব প্রশ্নের উত্তর পরিবারেই তৈরি হয়

আজ অনেক পরিবারে সন্তানের নৈতিক চরিত্রের চেয়ে ফলাফল, ্যাংক, চাকরি, অর্থ, সামাজিক পরিচিতি প্রদর্শনযোগ্য সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সন্তান বৈধ পথে অর্জন করুক বা অবৈধ পথে- শুধু সাফল্য অর্জন করলেই অনেক অভিভাবক গর্বিত হন এইযেকোনো মূল্যে সফল হওয়া সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বিবেক, সংযম দায়িত্ববোধকে ক্ষয় করে

সন্তানকে আমরা প্রায়ই বলি- ‘জীবনে বড় হওকিন্তু খুব কম পরিবার তাকে বলে-‘সৎ হও, দুর্বলকে রক্ষা করো, অন্যের অধিকারকে সম্মান করো, রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করোফলে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও নৈতিক মানুষ তৈরি হচ্ছে না জ্ঞান যদি বিবেকের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা কখনো কখনো অপরাধকে আরও দক্ষ, আরও সংগঠিত এবং আরও ভয়ংকর করে তুলতে পারে

দার্শনিক অ্যারিস্টটল মনে করতেন, মানুষের চরিত্র গড়ে ওঠে অভ্যাসের মাধ্যমে অর্থাৎ শিশুকে আমরা প্রতিদিন যে আচরণ, ভাষা মূল্যবোধের মধ্যে বড় করি, তার মধ্য দিয়েই তার চরিত্র নির্মিত হয় তাই পরিবারে মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেওয়া, অন্যায়কেচালাকিহিসেবে প্রশংসা করা এবং ক্ষমতাবানকে দেখে নৈতিকতার মানদণ্ড বদলে ফেলা- এসবের দীর্ঘমেয়াদি ফল ভয়াবহ

 

প্রতিষ্ঠান ভাঙলে অপরাধ বাড়ে

গত দুই দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে, কিন্তু তার চেয়েও বিপজ্জনকভাবে ভেঙে পড়েছে দায়িত্বের শৃঙ্খল বা chain of command কোথায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, কে জবাবদিহি করবে, কোন পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হবে- এই মৌলিক কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট অকার্যকর হয়ে পড়েছে

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবাস, ক্যাম্পাস, আবাসিক এলাকা বা আশপাশের জনপদে কোনো অপরাধ ঘটলে প্রশাসন, প্রক্টরিয়াল বডি, আবাসিক কর্তৃপক্ষ, পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় থাকা প্রয়োজন কিন্তু