জসীম উদ্দিন রাসেল
গ্রাম থেকে মানুষ কাজের সন্ধানে শহরে আসে। আর এবার করোনাভাইরাস মহামারি আকারে দেখা দিলে মানুষ শহর ছেড়ে আবার গ্রামমুখী হতে শুরু করেছেন। মানুষ দুবেলা তার পরিবারকে নিয়ে খাবারের জন্য একবার শহর, আরেকবার গ্রাম ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু কোথাও মানুষ খাবারের নিশ্চয়তা নাই।
কারণ যে প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে মানুষ গ্রামে চলে যাওয়ার খবর এসেছে, সেই রিপোর্টেই তাদের ইন্টারভিউ এসেছে, তারা গ্রামে চলে যাচ্ছেন ঠিকই। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা কী করবেন তা তারা জানেন না।
তবে তারা কেন গ্রামে যাচ্ছেন? যেখানে নিশ্চয়তা নেই, সেখানে মানুষ কেন ছুটছেন?
এর কারন হলো, বাসা ভাড়া। মাস গেলেই আয়ের বড় একটি অংশ চলে যায় বাসা ভাড়ায়। তারপর যা থাকে তা দিয়ে কোনো রকমে দিন পার করেন। রিপোর্টে দেখা যায়, ঢাকা শহরের অলি-গলিতে অসংখ্য টু-লেট ঝুলছে।
আর আগে বহুবার রিপোর্ট বেড়িয়েছে, বিশ্বের মধ্যে ঢাকা শহর থাকার জন্য একটি অযোগ্য শহর। কিন্তু সেই বাস অনপযোগী শহরই আবার বিপরীত দিক থেকে সবচেয়ে ব্যয়বহুল। আর এজন্যই মানুষ হিমশিম খায়।
খেটে খাওয়া মানুষ যেমন বিপদের মধ্যে পড়েছে আবার তেমনি বিপদে পড়েছে যারা ঋণ নিয়ে বাড়ি বানিয়েছেন বা ফ্ল্যাট কিনেছেন তারা। এখন তারা চিন্তায় আছেন, ফ্ল্যাট কাদের কাছে ভাড়া দিবেন। কিভাবে সামনে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করবেন।
এইগুলো যেমন আলোচনা হচ্ছে আবার তেমনি সমালোচনা হচ্ছে, বাসা খালি থাকলেও বাড়িওয়ালারা ভাড়া এক টাকাও কমাবেন না।
আবার কেউ কেউ বলছেন, ২৬ মার্চ থেকে আমাদের দেশে লক ডাউন শুরু হয়েছে। আমরা তিন মাসও নিজেদের জমানো টাকায় চলতে পারলাম না। আমরা এমন ফতুর জাতি হয়ে গেলাম।
এসবই বিক্ষিপ্তভাবে মানুষের মতামত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে জানিয়েছেন।
অনেকেই আবার অতীত স্মৃতি সামনে এনে আফসোস করেছেন। তারা বলছেন, আগে মা-দাদিরা যখন রান্না করতেন তখনও তারা এক মুষ্টি চাল আলাদা করে সঞ্চয় করতেন। যদি কখনো টান পড়তো তখন সেখান থেকে রান্না হতো।
আর এখন ক্রেডিট কার্ডের দুনিয়ায় মানুষ ইএমআই সুবিধা নিয়ে দেশের বাইরে বা দেশে ঘুরতে যায়। নিজের যে একটা পৈতৃক ভিটা আছে তার কথা মনে থাকে না। সেখানেও যে বেড়ানো যায়, এই কথা তাদের মাথায় আসে না।
আসলে বিপদে পড়লে তখন মানুষের মনে বিভিন্ন ধরনের কথা আসে। সব সময় মানুষ যদি হিসেব করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতো তাহলে আমাদের কোনো সমস্যাই থাকতো না।
তবে কিছু ক্ষেত্রে মানুষ নিরুপায়। ইচ্ছা থাকলেও করতে পারেন না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটা মানুষের তাদের মাসিক বা বাৎসরিক আয়ের ১০% সঞ্চয় করা উচিত। একটা জরিপে দেখা গেছে ২৭% মানুষ তাদের আয়ের ১০% এর কম সঞ্চয় করেন।
কেন তারা সঞ্চয় করতে পারছেন না?
এর উত্তরে তারা বলেন, দৈনন্দিন খরচ, বাচ্চাদের পড়ালেখার খরচ, ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে তারা আর সঞ্চয় করতে পারছেন না।
এখন হয়তো বলবেন, মানুষ অকারণেও অনেক খরচ করে। বিলাসিতা করে। যেমন, কেউ কেউ বলছেন, আয় অনুযায়ী মানুষ যে এলাকায় থাকতে পারবে সেখানে না থেকে তার থেকে বেশি টাকা ভাড়া দিয়ে থাকবে। পালা করে দামি রেস্তোরায় গিয়ে খাবে।
এখন এগুলো মানুষের মনের ব্যাপার। অনেক সময় মন চায়, একটু ভালো জায়গায় থাকতে, ভালো জায়গায় প্রিয় মানুষগুলোকে নিয়ে খেতে। অনেকেই হয়তো এই মনের চাওয়াগুলোকে ঠিকমত লাগাম টেনে ধরতে পারেন না। আর এজন্যই আর্থিক টানাটানির মধ্যে পড়েন।
তবে সবচেয়ে বেশি টানাটানির মধ্যে থাকেন যারা দৈনিক ভিত্তিতে আয় করেন তারা। যেমন, পরিবহন সেবা খাতের সাথে জড়িত বা ভাসমান কাজে নিয়োজিত শ্রমিক।
পরিবহন খাত
কাজে গেলে টাকা আছে। না গেলেই নাই। দিনের টাকা দিনেই পেয়ে যান। কোনোদিন বেশি পান। কোনোদিন কম পান। এই দিয়ে তারা বাসায় ফেরার পথে বাজার করে নিয়ে আসেন। পরিবারের লোকজন নিয়ে খেয়ে রাত পার করেন।
আবার পরের দিন ঘুম থেকে উঠে কাজে চলে যান। এভাবে দিনের পর দিন তাদের সংসার চলছে। কোনোদিন বেশি টাকা পেলে বাজার একটু ভালো করে ভালো খেতে চান। কিন্তু টাকা জমিয়ে রাখার চিন্তা মাথায় আসলেও গুরুত্ব দেন না। তারা মনে করেন, এই টাকা জমিয়ে কবে কী হবে?
এজন্য ২৬ মার্চ থেকে লক ডাউন শুরু হলে সবার আগে তারাই বিপদে পড়েন। এসময় অনেকেই বলেন, রাস্তায় প্রতিদিন পরিবহন খাতে বিভিন্ন ধরনের চাঁদা তোলা হয়। সেই টাকা শ্রমিকদের নাম করে তোলা হয়। সেই টাকা কোথায়? এখন শ্রমিকদের দরকারের সময় তাদের কল্যাণে কেন কাজে আসছে না?
তবে দিন এনে দিন খাওয়া এই পরিবহন খাতের নাজুক অবস্থার চেয়ে সবচেয়ে অভিজাত পরিবহন খাত এয়ারলাইন্স আরো নাজুক হয়ে যায়। তাদের আভিজাত্য শেষ হয়ে যায় নিমেষেই। ইওরোপ-আমেরিকার বড় বড় এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলো সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন