English
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-১০-১৩ ০০:০৩:৩৬
আপডেটঃ ২০২৬-১০-১৩ ০৩:২২:০৪


ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে সেমিনার

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে সেমিনার


উপমহাদেশের ইতিহাস, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশের ঐতিহাসিক পটভূমি নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১২ অক্টোবর ২০২৬ সোমবার সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এ. আর. মজিদ লেকচার হলে আয়োজিত এ সেমিনারে ভারতীয় উপমহাদেশের রাষ্ট্রগঠন, ঔপনিবেশিক শাসন, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক, বঙ্গভঙ্গ, দ্বিজাতিতত্ত্ব, ভারত বিভাজন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করা হয়।

সেমিনারে ‘ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান খান। আলোচক হিসেবে অংশ নেন অধ্যাপক ড. আরিফা সুলতানা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. জসীম উদ্দীন।

আলোচনায় ইতিহাসকে কেবল প্রচলিত পাঠ্যবই বা রাজনৈতিক বয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমকালীন দলিল, সংবাদপত্র, সাহিত্য ও প্রশাসনিক নথির আলোকে বিশ্লেষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, জাতীয়তাবাদের বিকাশ এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয় বুঝতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষাগত, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আলোচনায় ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণার ঐতিহাসিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক তাৎপর্য পর্যালোচনা করা হয়। প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন রাজ্য, সাম্রাজ্য ও আঞ্চলিক শক্তির উত্থান-পতন ঘটেছে। মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্য থেকে সুলতানি, মুঘল এবং ব্রিটিশ শাসন—প্রতিটি পর্বেই রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের অঞ্চল এবং দেশীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পার্থক্য বজায় ছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে যে পরিবর্তন ঘটে, তার পেছনে ঔপনিবেশিক শাসন, জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, সম্প্রদায়গত পরিচয় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদারত্বের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলার ভূমি-সম্পর্ক, রাজস্বব্যবস্থা এবং গ্রামীণ সমাজে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনে। জমিদারি ব্যবস্থার পুনর্গঠন, মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির বিকাশ এবং কৃষকের ভূমি-নিরাপত্তার প্রশ্ন বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আলোচনায় ঔপনিবেশিক ভূমিব্যবস্থা, শিক্ষার সুযোগ এবং প্রশাসনিক চাকরিতে অংশগ্রহণের পার্থক্য কীভাবে বাংলার বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর অবস্থানকে প্রভাবিত করেছিল, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। উনিশ শতকে বাংলার মুসলমানদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন নিয়ে উইলিয়াম উইলসন হান্টারের The Indian Musalmans (১৮৭১) একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থ। সমকালীন দলিল ও গবেষণার আলোকে ঔপনিবেশিক শাসনের সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় উঠে আসে।

বাংলা ভাষার বিকাশ, শব্দভান্ডারের ব্যবহার এবং উনিশ শতকের সাহিত্যচর্চার সঙ্গে সামাজিক পরিচয়ের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করা হয়। বাংলা ভাষায় সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি উৎসের শব্দের ব্যবহার এবং ভাষার শুদ্ধতা নির্ধারণের প্রচেষ্টা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নকে প্রভাবিত করেছিল। সাহিত্য ও ইতিহাসে মুসলিম চরিত্রের উপস্থাপন, ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং তৎকালীন বুদ্ধিজীবী সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পর্যালোচনার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। সাহিত্য কেবল নান্দনিক সৃষ্টির ক্ষেত্র নয়; নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে তা সামাজিক পরিচয় ও রাজনৈতিক ধারণা নির্মাণেও ভূমিকা রাখতে পারে।



অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান খান


ঔপনিবেশিক বাংলায় শিক্ষা, চাকরি, ভূমির মালিকানা ও অর্থনৈতিক সুযোগের অসম বণ্টন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে দূরত্ব তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল। এসব বিষয় বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ শ্রেণিগত ও রাজনৈতিক বৈচিত্র্য বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে নতুন প্রদেশ গঠনের ফলে ঢাকাকেন্দ্রিক প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন বাংলার জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে নতুন গতি দেয়। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপট পরবর্তী সময়ে মুসলিম রাজনৈতিক সংগঠনের বিকাশ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

১৯০৬ সালে ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা, মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিতর্ক, ১৯২৮ সালের নেহরু রিপোর্ট এবং ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব ভারত বিভাজনের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এসব ঘটনার পেছনে সাংবিধানিক অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, ক্ষমতার অংশীদারত্ব এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য কাজ করেছিল। ১৯৪৭ সালে শরৎচন্দ্র বসু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে অবিভক্ত স্বাধীন বাংলার যে প্রস্তাব সামনে এসেছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাংলা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত হয়। এই বিভাজনের ইতিহাস পর্যালোচনার ক্ষেত্রে তৎকালীন রাজনৈতিক দর-কষাকষি, নেতৃত্বের অবস্থান এবং বাংলার মানুষের সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশের ইতিহাস ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের দীর্ঘ সংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কিত। পরবর্তী সময়ে এই জাতীয়তাবাদী চেতনা স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতার সংগ্রামে নতুন মাত্রা লাভ করে।

সেমিনারে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের রাজনৈতিক বিভাজন ও জাতীয়তাবাদের বিকাশকে বহুমাত্রিক দৃষ্টিতে দেখার প্রয়োজনীয়তা প্রতিফলিত হয়। ইতিহাসের কোনো ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যাখ্যা না করে তার সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি। প্রামাণ্য দলিল, সমকালীন সাহিত্য, সংবাদপত্র ও নির্ভরযোগ্য গবেষণার ভিত্তিতে ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন বর্তমান বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অর্থবহ আলোচনার পথ তৈরি করতে পারে।

 

 

-বিপরীত স্রোত ডেস্ক

 


ক্যাটেগরিঃ জীবনধারা,
ট্যাগঃ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ভাষা আন্দোলন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ


শিল্পে মানুষের তৈরি কাজ  এবং এআই

শিল্পে মানুষের তৈরি কাজ এবং এআই

এআইয়ের ভিড়ে মানবসৃষ্ট শিল্পের.. বিস্তারিত

বিদায় খসরু ভাই !

বিদায় খসরু ভাই !

সংবাদ, রাজনীতি ও বিশ্বপরিস্থিত.. বিস্তারিত

প্রতিবাদের ক্যানভাসে অগ্নিশিখা

প্রতিবাদের ক্যানভাসে অগ্নিশিখা

প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান বিস্তারিত

আরো পড়ুন