৮৫ নির্বাচন কর্মকর্তার রায় ও সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক শ্রেষ্ঠত্ব
প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় রাষ্ট্র পরিচালনার যে মৌলিক আদর্শের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, তার মূল কথা হলো ‘আইনের শাসন’ (Rule of Law)। আইনের শাসন কেবল শব্দমালা বা আদালতের রায়ের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত অর্থ হলো—আইন তার নিজস্ব স্বকীয় শক্তিতে চলবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ও নির্বাহী বিভাগ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বা রায় বিনা শর্তে পালন করবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ৮৫ জন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার চাকরিতে পুনর্বহাল, জ্যেষ্ঠতা ও চাকরিকাল গণনাসংক্রান্ত মামলায় মহামান্য আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়কে ঘিরে প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে যে বিভ্রান্তি ও সময়ক্ষেপণের দৃশ্যপট তৈরি করা হয়েছে, তা সুশাসনের মূল ভিত্তিকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশেষ করে, নির্বাচন কমিশন (EC) ও নির্বাহী বিভাগের কোনো কোনো মহল আদালতের সুস্পষ্ট আদেশ বাস্তবায়ন না করে ‘Contradictory’ বা ‘প্রশাসনিক জটিলতা’র ধুয়া তুলে যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে—তা স্রেফ আইনি অজ্ঞতাই নয়, বরং বিচারিক ক্ষমতার ওপর প্রশাসনিক আধিপত্য বিস্তারের এক বিপজ্জনক খেলা।
১. বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: শব্দার্থের সংকীর্ণতা বনাম বিচারিক প্রতিকার (Judicial Remedy)
বিতর্কের মূলে রয়েছে The Prescribed Leave Rules, 1959-এর Rule 9(3) ধারা এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ব্যবহৃত ‘Extraordinary Leave’ বা ‘অসাধারণ ছুটি’ শব্দবন্ধটি। নির্বাচন কমিশন ও আইন কর্মকর্তাদের একাংশ যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন যে, এই প্রবিধান অনুযায়ী কর্মকর্তা নিজে আবেদন না করলে বা পাওনা ছুটি না থাকলে এ ছুটি মঞ্জুর করা প্রশাসনিকভাবে অসংগতিপূর্ণ।
এই
যুক্তিটি আইনের প্রাথমিক পাঠের আলোকেও সম্পূর্ণ অসার। কারণ, এটি প্রশাসনিক ছুটি এবং সর্বোচ্চ আদালতের ‘বিচারিক প্রতিকারে’র (Judicial Remedy) মৌলিক ফারাক বুঝতে ব্যর্থতারই ফল:
আবেদনহীন বঞ্চনা ও প্রবিধান ৯(৩): চাকরিবিধির Rule 9(3) অনুযায়ী স্বেচ্ছায় বিনাবেতনে ছুটির আবেদনের বাধ্যবাধকতা সরকারি চাকুরিজীবীদের স্বাভাবিক ছুটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অথচ, ভাগ্যবিড়ম্বিত এই ৮৫ জন কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করেননি বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ছুটি চাননি। মহামান্য হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রায়ে স্ফটিকের মতো পরিষ্কার যে, তাঁদের সম্পূর্ণ বেআইনি ও অন্যায়ভাবে দীর্ঘকাল দাপ্তরিক দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হয়েছিল।
আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা (Inherent Power): রায়ে ‘Extraordinary Leave’ শব্দটি প্রবিধানের সাধারণ ছুটির ফ্রেমে বন্দি করার বিষয় নয়। সর্বোচ্চ আদালত যখন কোনো বঞ্চনার প্রতিকার দেন, তখন আদালতের লক্ষ্য থাকে অন্যায়ভাবে বাদ পড়া সময়কে আইনিভাবে ‘নিয়মিতকরণ’ (Regularization) করা। এটি সংবিধান প্রদত্ত অন্তর্নিহিত ক্ষমতা থেকে উদ্ভূত একটি বিশেষ প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা, যাতে কর্মকর্তাদের চাকরির ধারাবাহিকতা (Service Continuity), জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি ও অবসরভাতা অক্ষুণ্ণ থাকে।
‘No Work, No
Pay’ নীতির অকার্যকারিতা: আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো—যে অন্যায়ের জন্ম দিয়েছে, সেই অন্যায়ের সুযোগ নিয়ে সে লাভবান হতে পারে না। প্রশাসনিক ভুল বা বেআইনি আদেশের কারণে কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করতে না পারলে সেখানে ‘No Work, No Pay’ অজুহাত তোলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ছুটির শব্দাবলিকে কাল্পনিক অজুহাত বানিয়ে সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখা আইনের মূল উদ্দেশ্যকেই নস্যাৎ করে।
২. নির্বাচন কমিশনের ‘চুজ অ্যান্ড পিক’ নীতি ও অহেতুক চিঠি চালাচালি
আদালতের রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যে আচরণ প্রদর্শন করছে, তা গভীর উদ্বেগজনক:
বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা: আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তা অবিকৃত অবস্থায় কার্যকর না করে ফাইল স্থানান্তর, মতামত আহ্বান ও প্রশাসনিক ব্যাখ্যার নামে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে।
আংশিক গ্রহণের অপচেষ্টা (Choose and Pick): রায়ের সুবিধাজনক অংশ গ্রহণ করা আর জটিলতা বা আর্থিক-প্রশাসনিক অজুহাতে বাকি অংশ আটকে রাখা স্পষ্টতই খণ্ডিতাংশের নীতি। একটি বিচারিক আদেশকে টুকরো টুকরো করে নিজের সুবিধামতো গ্রহণ করার সুযোগ সংবিধান ও আইনের চোখে সম্পূর্ণরূপে অবৈধ।
সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে ঔদ্ধত্য: সর্বোচ্চ আদালত যেখানে কর্মকর্তাদের পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসনের নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে আমলাতান্ত্রিক চাতুরি দিয়ে রায় অকার্যকর রাখা সুপ্রিম কোর্টের মর্যাদার প্রতি সরাসরি অবমাননা।
৩. তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও বিশ্বব্যাপী প্রশাসনিক আইনি নজির (Jurisprudence & Precedents)
বিচার বিভাগের রায় বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক বা প্রশাসনিক বিধিমালা কখনো প্রতিবন্ধক হতে পারে না—এই নীতি দেশি-বিদেশি আইনশাস্ত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।
(ক) তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি (Administrative & Constitutional Theories)
Doctrine of Supremacy of Judicial Review: সংবিধানবিদ এ. ভি. ডাইসি (A. V. Dicey)-র আইনের শাসন তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো প্রশাসনিক