
মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ
গ্রাম বাংলায় “আট-পৌরে” বলে একটা বুলি প্রচলিত আছে। আট-পৌরে বুলিটার অর্থ বুঝেছি শোনার অনেক দিন পরে। কথাটা এসেছে অষ্ট প্রহর থেকে। চব্বিশ ঘন্টার দিনে প্রহর আছে আট-টি। এক এক প্রহর তিন ঘণ্টা করে। আট প্রহরে মোট চব্বিশ ঘণ্টা, মানে এক দিন। আরামদায়ক সাধারণ সুতি শাড়ি—যা গ্রাম-বাংলার মহিলারা সারাদিন পরে থাকতেন বা থাকতে পারতেন, সেগুলোকেই “আট-পৌরে“ শাড়ি বলা হত। প্রসঙ্গটা এসে গেল, কারণ—ভাবছিলাম, হোটেল কোয়ারেন্টিনে আরও আটটি প্রহর কাটিয়ে দিলাম।
গতকাল জেট-ল্যাগ ফিল করি নি।মনে হলো, আজ তা পেয়ে বসেছিল। কারণ, ঘুম থেকে উঠেছি সকাল দশটায়। ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে নিজেই অবাক হয়েছি, কেননা গতকাল আপনা-আপনি সকাল আটটার আগেই ঘুম ভেঙ্গেছিল। যাহোক, তরতাজা হয়ে রুমের দরজা খুলে যথাস্থানে নাস্তার প্যাকেট চোখে পড়লো। প্যাকেটটা নিয়ে টেবিলে গিয়ে বসলাম।
গতকালের মতোই গাঢ় সবুজ রঙের আপেল, একশ’ গ্রাম গ্রিক ইয়োগার্টের ডাব্বা, দুইশ’ পঞ্চাশ মিলিলিটারের মিক্সড ফ্রুট জুসের বোতল, মিষ্টি ডেনিস পেস্ট্রি, সাথে সামান্য মাখন। আর হ্যাঁ, লবণ আর ব্ল্যাক পেপারের গুঁড়ো দিতে ভোলেনি কিন্তু আজও। তবে প্লাস্টিকের বাটিতে আজকের মূল নাস্তাটা দেখে মনটা কিয়ৎ বিষন্ন হয়ে গেল।
স্কিম মিল্কের সাথে গুঁড়ো ওট আমার প্রায় প্রাত্যহিক নাস্তার অংশ। ডায়াবেটিকে আক্রান্ত বলে তাতে কখনো চিনি মিশাই না। তাই বলে, একেবারে শুধু গরম পানিতে গুঁড়ো ওট ফেলে সার্ভ করার মতো নিষ্ঠুরতা কেন দেখাতে হবে, সেটা বুঝে উঠতে পারলাম না। তবে সান্ত্বনা এটুকু, যে ভদ্রতা করে উপরে ব্লু-বেরি জ্যাম আর কিছু মিক্সড সিড ছড়িয়ে বিরস খাবারটাতে কিছু বেরসিক রস সঞ্চারের চেষ্টা হয়েছে।
চায়ের সরঞ্জামে তিন ধরনের চা রাখা আছে—‘ইংলিশ ব্রেকফাস্ট’, ‘আর্ল গ্রে’, আর ‘গ্রিন’। নামে ব্রেকফাস্ট আছে বলে নয়, ফ্লেভারটার কারণেই সকালের নাস্তায় ‘ইংলিশ ব্রেকফাস্ট’ চা-টাই আমার পছন্দ। দিনের বাকি সময় ‘গ্রিন টি’ চলে। তবে, রুচির পরিবর্তন আনার জন্য মাঝে মধ্যে ‘আর্ল গ্রে’ মন্দ লাগে না। এক মগ ‘ইংলিশ ব্রেকফাস্ট’ চা নিয়ে জানালার ধারে গিয়ে বসলাম নাস্তা সেরে নেওয়ার উদ্দেশ্যে।
বাইরের দৃশ্যের কোনো পরিবর্তন নেই। দুটো বানিজ্যিক ভবনের একই অংশ। ডানে তাকালে সিডনি টাওয়ার। অনেক নিচে রাস্তার ফুটপাথে কিছু ব্যস্ত মানুষের চলাফেরা। ভবন দুটোর বাইরের দিকটা স্বচ্ছ কাঁচে মোড়া হলেও বাইরে উজ্জ্বল আলোর জন্য কাঁচের দেয়ালে আমার হোটেলের প্রতিবিম্বটাই চোখে পড়ে। খুব খেয়াল করলে, ভেতরে কর্মরত মানুষ দেখা যায়। একঘেয়ে এক দৃশ্য, যা দেখতে দেখতে হঠাৎ স্কুলপাঠ্যে পড়া ‘প্রবাস বন্ধু’ গল্পটার কথা মনে পড়ে গেল।
সেখানে আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষায় তার আফগান ভৃত্য আব্দুর রহমানের দেয়া ‘পানশির’-এর চমৎকার একটি বর্ণনা ছিল। সাত দিন ধরে কি জানালার পাশে বসে থাকা যায়—মুজতবা আলীর অনেকটা এমন একটি প্রশ্নের জবাবে আব্দুর রহমান ঠিক এভাবেই বলেছিল—“একবার আসুন, জানালার পাশে বসুন, দেখুন। পছন্দ না হয়, আবদুর রহমানের গর্দান তো রয়েছে। . . . . . . সে কত রকমের বরফ পড়ে। কখনো সোজা,ছেঁড়া ছেঁড়া পেঁজা তুলোর মতো, তারি ফাঁকে ফাঁকে আসমান জমিন কিছু কিছু দেখা যায়। কখনো ঘুরঘট্টি ঘন- চাদরের মতো নেবে এসে চোখের সামনে পর্দা টেনে দেয়। কখনো বয় জোর বাতাস, প্রচণ্ড ঝড়। বরফের পাঁজে যেন সে বাতাস ডাল গলাবার চর্কি চালিয়ে দিয়েছে। বরফের গুঁড়ো ডাইনে বাঁয়ে উপর নিচে এলোপাথাড়ি ছুটোছুটি লাগায়, হু হু করে কখনো একমুখে হয়ে তাজি ঘোড়াকে হার মানিয়ে ছুটে চলে। কখনো সব ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু শুনতে পাবেন সোঁ-ওঁ-ওঁ তার সঙ্গে আবার মাঝে মাঝে যেন দারুল আমানের ইঞ্জিনের শিটির শব্দ।”
মুজতবা আলী অবশ্য পুরো শীতকালটা পানশিরে কাটাবেন বলেই আব্দুর রহমানকে জানিয়ছিলেন। তবে তা যতোটা না বরফের খেলা দেখার জন্য, তার চেয়ে অনেক বেশি—আব্দুর রহমান পুরো শীতকাল বরফের খেলা দেখলে কাবুলে তাঁর জন্য কে রান্না করবে—এই দুশ্চিন্তায়। আমার মনে হলো হোটেলের জানালায় বসে একঘেয়ে এই দৃশ্য দেখার সাথে রক্ত-জমানো শীতে পানশীরের কোনো এক ঘরে পায়ের কাছে লোহার বারকোশে জ্বলন্ত অঙ্গারের ওমে জানালার পাশে ইজি চেয়ারে বসে একটানা সাতদিন ধরে বরফের খেলা দেখার তুলনাটা না করাই শ্রেয়। তাতে মনের জ্বালা বাড়বে বৈ কিছু কমবে না।
চেয়ারে বসে থাকতে থাকতেই—নক্ নক্ নক্। এরই মাঝে দুপুর বারোটা বেজে গেছে। দরজায় দুপুরের খাবার দিয়ে গেছে। উঠে গিয়ে নিয়ে আসার ইচ্ছে হচ্ছে না। নিয়ে না আসা পর্যন্ত ওটা ওখানেই থাকবে। ঠান্ডা হয়ে যাবে — এই আর কী! হলে হোক। আমি লিখছি, বরং লিখতে থাকি। রুটিন মাফিক গতকাল থেকে তো কেবল খেয়েই চলেছি। সকালে নাস্তা, দুপুর আর রাতের খানা, নিয়ম মাফিক, ঘড়ি ধরে। গতকাল দুপুরে ছিল ভেজিটেবল-পাস্তা, আর রাতে—চায়নিজ ভেজিটেবল, সাথে স্টিকি রাইস। আজও তেমনি কিছু দিয়েছে হয়তো। জানালার ধারে বসে আছি বটে, তবে আমার বর্তমান অবস্থাটার সাথে আব্দুর রহমানের পানশিরের চেয়ে বরং আমি রবীন্দ্রনাথের মুক্তি (পলাতকা) কবিতাটার দুটি ছত্রের বেশি মিল খুঁজে পাচ্ছি:
“. . . . . . , আমি কেবল জানি,
রাঁধার পরে খাওয়া, আবার খাওয়ার পরে রাঁধা,
বাইশ বছর এক-চাকাতেই বাঁধা।”
তুলনাটা অতিরঞ্জিত হয়ে গেল বললে অত্যুক্তি হবে না। বাইশ বছর একঘেয়ে জীবন কাটানোর পর অসুস্থ এক গ্রাম্য বধু জীবনে প্রথম স্বামীর সাথে রেলগাড়িতে চড়ে বায়ূ পরিবর্তনে বেড়িয়ে তার নিজের জীবন নিয়ে যা বলেছিল, তার সাথে এই তুলনাটা খামখেয়ালি—সত্যি বটে। তবে ওই ছত্র দুটিকে আলাদা করে ভাবলে আমার এই রুটিন মাফিক কয়েকটা দিনের সাথে কিছু মিল তো পাওয়া যায়ই—হোক না কিছুটা অতিরঞ্জিত!
নয় তারিখ রাত বারোটায় হোটেল রুমে ঢোকার পর থেকে আজ সকালের আগে সামনে-সামনি কোন মানুষের চেহারা দেখি নি। একটু ব্যতিক্রম হলো আজ। দু’জন নার্স এসেছিল করোনা টেস্ট করার জন্য লালার স্যাম্পল নিতে। দরজায় দাঁড়িয়েই স্যাম্পল নিয়ে জানিয়ে গেল—নেগেটিভ হলে আমাকে কিছু জানানো হবে না। পজিটিভ হলে তবেই আমার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করবে। কোয়ারেন্টিনের দ্বিতীয় ও দশম দিনে টেস্ট স্যাম্পল নিতে আসবে—সিডনি এয়ারপোর্টে নামার পর একজন ডাক্তারের কাছ থেকে এমনটাই জেনেছিলাম। তার মানে, আগামী আট দিন আর কোনো মানুষের চেহারা আমি দেখবো না।
কিছুক্ষণ আগে দরজায় নক্ হলো। দরজা খুলে দেখলাম একটি ব্যাগ। আমার ছেলে-মেয়েরা এসে একটি ব্যাগে করে কিছু খাবার আর একটা স্কিপিং রোপ রেখে গিয়েছে রিসেপশনে। তারা সেটা পাঠিয়ে দিয়েছে। দেখা হলো না ছেলেমেয়েদের সাথে। তবে ওরা ফোনে জানালো, ওদের মতো অনেকেই এসে পার্সেল রেখে যাচ্ছে রিসেপশনে। এমনকী কেউ একজন একটা এক্সারসাইজ মেশিনও রেখে গেছে। আমার এক বন্ধু আজ জানিয়েছে—কাল সকালে একটা মাইক্রোওয়েভ দিয়ে যাবে। গরম খাবার খেতে সুবিধা হবে তখন।
আজ সকালে দেরিতে উঠেছি। মাঝে, স্নান, নামাজ, দুপুরের খানা ইত্যাদিতে সময় গেছে অনেকটা। ফোন কলও রিসিভ করেছি অনেকগুলো। শুভাকাঙ্খীরা সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আমেরিকা, ইওরোপ, এশিয়া আর অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে। গতকালের ফেসবুক পোস্ট পাওয়ার পর আমাকে সঙ্গ দিতে এদের অনেকেই ফোন করেছিল। এসব করতে করতেই বিকেল হয়ে এসেছে। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে অনেকটা। দরজায় এরই মধ্যে আবার কেউ এসেছে—নক্ নক্ নক। এ কী! বিকাল পাঁচটা পেরিয়ে গেছে? টেরই পাই নি। দেখি, রাতের খাবারটা দিয়ে গেল বোধ হয় ।
১১ নভেম্বর ২০২০
লেখক পরিচিতি:

মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ
অতিরিক্ত
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড।
ব্যাংকার ও কলামিস্ট। তিন দশক
ধরে ব্যাংকিং সেক্টরে বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন ব্র্যাক ব্যাংক,
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, সিটি ব্যাংক এনএ-তে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির আইবিএ গোল্ড মেডালিস্ট
মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ আমেরিকার ম্যাসেচুসেটস ব্র্যান্ডাইস ইউনিভার্সিটি থেকে ফুলব্রাইট
স্কলার হিসেবে এমএ ডিগ্রি নিয়েছেন।
ড. বিজন কুমার শীল বিস্তারিত
বিপরীত স্রোত প্রতিবেদন বিস্তারিত
ডা. আহমদ মরতুজা চৌধুরী বিস্তারিত
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান বিস্তারিত
যারিন মালিয়াত অদ্রিতা বিস্তারিত
মাইক্রোসফট অফিস স্পেশালিস্ট (M.. বিস্তারিত
মুস্তাকিম আহমেদ বিস্তারিত
সাংবাদিক শফিক রেহমানের পুরো বক.. বিস্তারিত
উৎপাদিত মাছের প্রায় ১২ শতাংশ আ.. বিস্তারিত