English
ঢাকা, সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২ আশ্বিন ১৪২৮

প্রকাশঃ ২০২০-০৮-১৩ ১৫:১১:১৫
আপডেটঃ ২০২১-০৯-২৭ ০৬:২৭:০৬


সুরস্রষ্টা ভোলফগাং আমাদেউস মোৎসার্ট

সুরস্রষ্টা ভোলফগাং আমাদেউস মোৎসার্ট


. সাবরিনা আক্তার টিনা

ভোলফগাং আমাদেউস মোৎসার্ট ছিলেন পাশ্চাত্য সংগীত জগতের এক বিখ্যাত সংগীতকার সুরকার অস্ট্রিয়ায় সালৎসবার্গ শহরে ১৭৫৬ সালের ২৭ জানুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন তাঁর পিতা ছিলেন লিওপোল্ড, সেখানকার আর্চ বিশপের সঙ্গীত শিক্ষক শৈশবকাল থেকেই মোৎসার্টের মধ্যে সঙ্গীতপ্রীতি দেখতে পাওয়া যায় আর তাই লিওপোল্ড মোৎসার্টকে সঙ্গীত শেখানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং সঙ্গীতে প্রথম পাঠ দেন

মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই মোৎসার্ট পিয়ানো বাজানোর চেষ্টা করতেন এবং সেই বয়স থেকেই তিনি পিতার কাছে পিয়ানো শিক্ষায় তালিম নিতে আরম্ভ করেন মোৎসার্ট এতো ক্ষিপ্রগতিতে শিক্ষা আয়ত্ত করতে থাকেন যে, সবাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে গিয়েছিলেন মাত্র চার বছর বয়সে মোৎসার্ট তার প্রথম পিয়ানো সঙ্গীত রচনা করেছিলেন, তাঁর বড় ভাই নানারেল বয়সে পাঁচ বছরের বড় হওয়া সত্ত্বেও মোৎসার্টের সঙ্গে পেরে উঠতেন না

ইওরোপ ভ্রমণ

১৭৬৩ সালে বাবা লিওপোল্ড তার ছোট দুই ছেলেকে নিয়ে ইওরোপের বিভিন্ন শহরে পরিভ্রমণ করেন ভিয়েনার রাজপ্রসাদে তাদের সঙ্গীতের কনসার্ট অভিজাত মহলে বিশেষভাবে আদৃত হয় সেখানে প্রখ্যাত রাজকুমারী মারি তাঁতোনিয়েৎ এবং স্বয়ং সম্রাট উপস্থিত থেকে বালক মোৎসার্টকে আদর প্রশংসা করেন ভিয়েনার সঙ্গীতাভিযানে উৎসাহিত হয়ে লিওপোল্ড অর্থ যশের আকাক্সক্ষায় জার্মানি, ফ্রান্স, হল্যান্ড ইংল্যান্ডের রাজধানীগুলোতে ভ্রমণ করেন তাদের এই সফর আরম্ভ থেকে শেষ পর্যন্ত সাফল্যম-িত ছিল বিশেষ করে বালক মোৎসার্টের নাম ডাক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সময় মোৎসার্টের বেহালাবাদন সমগ্র সঙ্গীতানুরাগী মহলকে চমৎকৃত করে অতি অল্প বয়সেই তিনি হারপসিকর্ড, অর্গ্যান, বেহালা প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র অতি নিপুণভাবে বাজাতে পারতেন স্বরলিপি দেখে যে কোনো সঙ্গীত বাজাতে পারতেন কিশোর বয়সেই তার সোনাটা, সিম্ফনি নানা সাঙ্গীতিক রচনার অদ্ভুত ক্ষমতা দেখে সঙ্গীত সমালোচকগণ তাঁকে প্রডিজি বা বিস্ময় বালক রূপে আখ্যায়িত করেন

ভদ্র বিনম্র স্বভাবের জন্য মোৎসার্টের এক বিপুল বন্ধুগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল তাঁদের মধ্যে অভিজাত সম্প্রদায় থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকও ছিলেন সুরশিল্পী ছাড়া অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল রাজদরবারে তাঁর যথেষ্ট প্রতিপত্তি ছিল সেই সময় সাধারণত রাজপরিবার বা উচ্চবিত্ত সমাজের মধ্যেই সঙ্গীতানুরাগ সীমাবদ্ধ ছিল আর্থিক দিক থেকে খুব সুবিধা করতে না পারলেও ভিয়েনার সংগীত রসিকম-লীতে মোৎসার্টের নাম যশ হয় সঙ্গীত অপেরা রচয়িতা হিসাবে তাঁর নাম সারা ইওরোপে ছড়িয়ে পড়ে

 

প্রাগে ভ্রমণ রাজদরবারে সুরকারের পদ

জার্মানি, ফ্রান্স হল্যান্ড প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করে মোৎসার্টের কনসার্ট দল ১৭৬৩ সালে লন্ডন পৌঁছান সেখানে মোৎসার্টের ক্লাডিয়ার বেহালা বাদনও খুব উচ্চ প্রশংসিত হয় লন্ডনের সাঙ্গীতিক ভ্রমণ নানা দিক থেকে ফলপ্রসু হয়েছিল এখানে পাশ্চাত্যের অন্যতম সুরস্রষ্টা দিকপাল সুরকার জোহান সেবাস্তিয়ান বাখের  ছোট ছেলে জোহান ক্রিশ্চিয়ান বাখের সঙ্গে মোৎসার্টের আলাপ পরিচয় ঘটে এবং এই পরিচয় ক্রমে বন্ধুত্বে পরিণতি লাভ করে বাখের কাছ থেকে তিনি ইওরোপীয় সঙ্গীতের সর্বশেষ বিকাশ ধারার একটি সামগ্রিক পরিচয় লাভ করেন পরবর্তীকালে তিনি বলেছিলেন যে, ক্রিশ্চিয়ান বাখ ছাড়া অন্য কোনো সঙ্গীতবিদ থেকে তিনি এত বেশি সঙ্গীতের জ্ঞান আহরণ করতে পারেন নি

লন্ডনের এক বিখ্যাত আইনবিদ, বিজ্ঞানী পুরাতত্ত্ববিদ আকৃষ্ট মুগ্ধ হন তরুণ সুরকার মোৎসার্টের প্রতিভায় তার নাম ডেইনিজ বেরিংটন মোৎসার্টের সাঙ্গীতিক পারঙ্গমতায় তিনি এতো আগ্রহী হলেন যে, মোৎসার্টের সঙ্গীতের একটি সার্বিক মূল্যায়ন না করে তিনি থাকতে পারলেন না মোৎসার্টকে তিনি কতোগুলো পরীক্ষামূলক কাজ দিলেন মোৎসার্ট অবলীলাক্রমে সকল কঠিন কাজগুলো সম্পন্ন করে দিলেন এতে বিজ্ঞানী এতো সন্তুষ্ট হলেন যে, ইংল্যান্ডের রয়েল সোসাইটির কাছে মোৎসার্টের সঙ্গীত সঙ্গীত বিজ্ঞান সম্পর্কে এক বিস্তৃত রিপোর্ট লিখে পাঠান


আমাদেউস মুভিতে সঙ্গীত রচনায় ব্যস্ত মহান সুরস্রষ্টা 

১৭৬৩-৬৬ সালে বৃহৎ কনসার্ট টুর সমাপ্তির পর মোৎসার্ট অনেকগুলি সাঙ্গীতিক রচনার কাজ শেষ করেন তার মধ্যে মাসেস, সিম্ফনী, এরিয়াস, সেরিনাডাস, ডাইভারটিম্যান্টি এবং তার প্রথম দুটি অপেরা অপেরা দুটি যথাক্রমে La Finta Semplice এবং Bastien and Bastienne যদিও মোৎসার্টের এই অপেরাগুলো কৈশোরে রচিত তবুও এদের মধ্যে শক্তিমত্তার অবশ্যই পরিচয় পাওয়া যায় প্রথম অপেরাটিতে ইটালীয় অপেরা এবং দ্বিতীয় অপেরাটিতে জার্মান অপেরার সুস্পষ্ট ছাপ রয়েছে

ইটালি সালজবুর্গ শহরে অবস্থান

১৭৬৯ সালে মোৎসার্ট মোৎসার্টের পিতা ইটালি যান সেখানে তদানীন্তন প্রখ্যাত সংগীততত্ত্ববিদ পাদ্রে মার্টিনির কাছে মোৎসার্ট কাউন্টার পয়েন্টের  তালিম নেন ইটালিতে কয়েক বৎসর থাকার পর তিনি সালজবুর্গের বিশপের অধীনে গির্জার সংগীতজ্ঞ হিসাবে চাকরি গ্রহণ করেন

এই আর্চবিশপ ভদ্রলোকটি ছিলেন অতি নির্দয় প্রকৃতির মানুষ তিনি মোৎসার্টের সঙ্গীত-প্রতিভার মূল্য বুঝতে পারতেন না এবং বোঝার চেষ্টাও করেন নি, তার প্রতি সদ্ব্যবহার করতেন না , সুবিধা - অসুবিধার প্রতি বিন্দুমাত্র দৃষ্টি দিতেন না তার গতিবিধিও নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল প্রায় কারাবন্দীর মতো মোৎসাটকে জীবনযাপন করতে হতো সেখানে সালজবুর্গ শহরে অসন্তুষ্ট অবস্থায় দিন কাটালেও তিনি এখানে অনেক শ্রুতিমধুর সঙ্গীত রচনা করেন

প্যারিস ভ্রমণ

১৭৭৭ সালে মোৎসার্ট তাঁর মাকে নিয়ে প্যারিস যান এটাই তার শেষ প্রধান সঙ্গীত ট্যুর পথে বিখ্যাত মেনহাইম অর্কেস্ট্রা শোনার সৌভাগ্য তার হয়েছিল এবং ওখানেই তিনি সদ্য ব্যবহৃত ক্ল্যারিওনেট বাদ্যযন্ত্র দেখেন এই বাদ্যযন্ত্র পরবর্তীকালে তার কাছে অতিপ্রিয় যন্ত্ররূপে গৃহীত আদৃত হয়

প্যারিসে মোৎসার্টের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না সঙ্গীতানুরাগী শহরবাসীরা সুরকার ক্রিস্টোফ উইরিবাড গ্লুক সুরকার গিয়াকোমো পুচিনিকে নিয়ে এতো মশগুল ছিলেন যে নবাগত সুরকার মোৎসার্টের গুরুত্ব তারা বুঝতে পারেন নি সামান্য কয়েকজন সমঝদার ছাড়া তিনি প্রায় সকলের কাছেই অজ্ঞাত অনাদৃত রয়ে গেলেন পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে উঠে যখন গ্রীষ্মকালে মোৎসার্টের মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান ফলে তিনি নিজের বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হলেন

সালজবুর্গের গির্জায় যোগদান

তাঁর জীবনের শেষের দিকে সালজবুর্গের ক্যাথিড্রালে আর্চবিশপের হয়ে তিনি অর্গ্যান বাদক সুরকার রূপে যোগ দেন ওই সময় তিনি বহু গির্জা সঙ্গীত অন্যান্য সংগীত রচনা করেন ১৭৮০ সালে  ইলেক্টর কার্ল থিয়েডোরের জন্য একটি অপেরা নির্মাণ কাজ শুরু করেন মোৎসার্ট যথেষ্ট উৎসাহ ভরে এই কাজে হাত দেন এবং আশ্চর্যজনক ভাবে এতে সাফল্য লাভ করেন তার এই নাট্যসংগীত বা অপেরাটির নাম ইদোমেনিও এই অপেরাটি পরবর্তীকালে তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অপেরারূপে গণ্য হয়

আর্চবিশপের সঙ্গে মোৎসার্টের সম্পর্ক ক্রমশঃ তিক্ত হতে তিক্ততর হতে থাকে কনসার্ট টুরে যাবার জন্য বার বার ছুটি চাইলে আর্চবিশপ তাঁর প্রতি প্রচণ্ড ক্রোধান্বিত হন মোৎসার্টের স্বাধীন স্বভাব তিনি মোটেই বরদাস্ত করতে পারতেন না অধিকন্তু তিনি তার সঙ্গে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের মতো ব্যবহার করতে শুরু করেন ১৭৮১ সালে এই বিরোধ চরমে পৌঁছালো যখন ভিয়েনায় কিছুদিন কাটিয়ে তিনি কর্মস্থলে পৌঁছলেন নানা বাদানুবাদের পর যখন মোৎসার্ট তাঁর পদত্যাগপত্র পেশ করতে যান, তখন আর্চবিশপ তাঁকে কটুভাষায় ভর্ৎসনা করেন এবং বিশপের সেক্রেটারি তাকে ঘর থেকে অপমান করে বের করে দেন

আর্চবিশপের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ায় মোৎসার্টের পক্ষে ভালো হয়েছিল এখন থেকে তিনি স্বাধীনভাবে কাজকর্ম করতে লাগলেন বিস্তীর্ণ কর্মক্ষেত্র তার সামনে দেখা দিল সংগীত প্রতিভা শতদলে বিকশিত হওয়ার দিগন্ত উন্মোচিত হলো তখন থেকে তিনি উচ্চমার্গের সংগীত রচনায় আত্মনিয়োগ করলেন কিন্তু এই নিয়ে তাঁর পিতার সঙ্গে প্রায়ই বিরোধ বাধত বাবা মোৎসার্টকে বলতেন লঘু জনপ্রিয় সঙ্গীত রচনায় বেশি গুরুত্বারোপ করতে বাবার ধারণা ছিল, শুধু উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত সৃষ্টি করলে মোৎসার্ট অচিরেই জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলবেন

ভিয়েনায় বসবাস

তখন থেকে মোৎসার্ট ভিয়েনাতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে লাগলেন তার অনেক ছাত্রছাত্রী জুটলো সুরকার পিয়ানোবাদক হিসেবে তাঁর খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লো শহরবাসের প্রথম বছরেই তার আয় প্রচুর বেড়ে যায় ১৭৮২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তাঁর পূর্ব প্রণয়িনী আলয়সিয়া ওয়েবারের বোন কনস্টানজকে বিবাহ করেন কিন্তু দাম্পত্য জীবনে আর্থিক ব্যাপার ছাড়া স্বামীর সঙ্গে কোনো বিষয়েই তার খুব একটা মতের মিল ছিল না যদিও তিনি নিজেও সঙ্গীতজ্ঞ সুকণ্ঠের অধিকারী ছিলেন কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মোৎসার্টের এই অসমান্য প্রতিভাকে বোঝার মতন তার কোনো মানসিক গড়ন ছিল না স্বামীকে তিনি কোনো দিনই বুঝতে পারেন নি সুরকারের বাবাও বিয়েতে অসন্তুষ্ট ছিলেন


হলিউডের আমাদেউস মুভির একটি বিখ্যাত দৃশ্য

সম্রাট দ্বিতীয় যোসেফের জার্মান অপেরার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল সম্রাটের এই অভিরুচি মোৎসার্টকে সেরাগলিও নামক অপেরা লিখতে উৎসাহিত করে স্বয়ং সম্রাট মোৎসার্টের উচ্চ প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন ১৭৮২-৮৩ সালে রাশিয়ার গ্র্যান্ড ডিউক ডাচেস যখন শীতকালে ভিয়েনা পরিদর্শন করতে আসেন তখন ওই অতিথিবর্গের আপ্যায়নের জন্য সম্রাট একটি সঙ্গীত প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করেন এই উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় মোৎসার্ট বিখ্যাত বাদক সুরকার ক্লেমেন্তি  অংশগ্রহণ করেন অনুষ্ঠানের শেষে ক্লেমেন্তি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মোৎসার্টের বাদন কৌশলের ভূয়সী প্রশংসা করেন কিন্তু মোৎসার্ট ক্লেমেন্তির বাদন রচনার খুব একটা প্রশংসা করেন নি কপট ভদ্রতা তিনি পছন্দ করতেন না তিনি সরল বিশ্বাসী ছিলেন বলে তাঁর ভাগ্যে অনেক শত্রুমিত্র দুটোই ছিল

সমাজের প্রতি স্তরে মোৎসার্টের বন্ধুবান্ধব ছিল এদের মধ্যে অভিজাত, শিল্পী বুর্জোয়া শ্রেণীর লোকও ছিল শিল্পী মহলে বন্ধুদের মধ্যে ব্যারন ভন সুইটেন  ছিলেন অন্যতম তিনিই মোৎসার্টকে বাখ হ্যান্ডেলের সঙ্গীত প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এই যোগাযোগ তার ভবিষ্যৎ সঙ্গীত রচনায় এক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তাঁর সঙ্গে প্রবীণ সুরকার যোসেফ হাইডেনের বন্ধুত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ ১৭৮৫ সালে মোৎসার্টের পিতার কাছে হাইডেন বলেন -

 ছয়টি String quartets যেগুলো মোৎসার্ট হাইডেনকে উৎসর্গ করেন - সেইগুলোর ওপর হাইডেনের বিশেষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয় তার কোয়ার্টেটগুলোর সাঙ্গীতিক ভাষা এতো অগ্রসারী ছিল যে, সমকালীন সুরকাররা সেইগুলির সম্যক রসগ্রহণ করতে পারেননিম্যারেজ অফ ফিগারোডন গিওভান্নিঅপেরার অন্তবর্তীকালে মোৎসার্ট তাঁর অনেকগুলি চেম্বার মিউজিক রচনা করেছিলেন এদের মধ্যে String quintet in G minor (K 516) এবং বিখ্যাত সিম্ফনি No. 34 in D (The `Pragure' symphony) বিশেষ উল্লেখযোগ্য

 

প্রাগে যাওয়া

১৭৮৭ সালে মোৎসার্টের পিতা মারা যান এতে তিনি একবারে ভেঙ্গে পড়েন পিতার মৃত্যুর বৎসর গ্রীষ্মকালে তিনি প্রাগে গিয়েছিলেন সেখানে তিনি সঙ্গীতকার হিসেবে নাম যশ অর্জন করেন প্রাগে তিনি বেশ সুখেই দিন অতিবাহিত করেছিলেন এরপর তিনি খানিকটা ভালো সময়ের মুখ দেখতে পেলেন কালো মেঘ ধীরে ধীরে কেটে যেতে লাগল প্রাগের লোকেরাম্যারেজ অফ ফিগারো’- সাফল্যে চমৎকৃত হয়ে তাকে আরো অপেরা লিখার জন্য উৎসাহিত করেন ১৭৮৭ সালের গ্রীষ্মকালের শেষদিকেডন গিওভান্নিসমাপ্ত করার জন্য তিনি প্রাগে চলে যান সেই সময় প্রাগের জনগণ এই বলিষ্ঠ অপেরার সাফল্য সম্পর্কে দোদুল্যমান ছিলেন; কিন্তু শেষপর্যন্ত এই অপেরার অনুষ্ঠান অতীব সাফল্যমণ্ডিত হয়েছিল এবং মোৎসার্টের এই দ্বিতীয়বারের প্রাগ অবস্থান খুবই সুখের ছিল হয়ত তার জীবনের শেষ সুখময়কাল এটিই

 মোৎসার্টের শেষ জীবন

প্রাগ থেকে ফিরে এসে মোৎসার্ট রাজকীয় দরবারে সুরকার হিসাবে গ্লুকের স্থালাভিষিক্ত হন কিন্তু তাঁর বেতন খুবই কম - বৎসরে মাত্র ৮০০ ফ্লোরিং।। প্রাগ থেকে ফিরে এসে মোৎসার্ট রাজদরবারে সুরকারের পদে দায়িত্ব নেন এই নিয়োগ তাঁর পক্ষে খুব ভালো হয়নি, কারণ তাঁর অন্যান্য আয়ের পথ সব রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল তাঁর আর্থিক সঙ্গতি ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যেতে লাগলো তিনি আবার তাঁর ধনী বন্ধু মাইকেল পুচবার্গের কাছ থেকে ধার করতে শুরু করেন সুরকারের উচ্চপদে নিযুক্ত হলেও তাঁর বেতন খুব বেশি ছিল না তিনি  বেশ আর্থিক অনটনের মাঝে ছিলেন ভিয়েনায় প্রথম জীবন তার মোটামুটি সুখের ছিল; কিন্তু শেষেরদিকে তার স্বাস্থ্যও ভেঙ্গে পড়ে কড়া চাপের ঋণগুলো শোধ করার জন্য তাঁকে মূল্যবান আসবাবপত্র অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী বন্ধক দিয়ে টাকার জোগাড় করতে হয় এই সবের জন্য তাঁর মন একবারে ভেঙ্গে পড়ে এই নিরানন্দ জীবনে তিনি সিম্ফনি রচনা করেন রচনাগুলি E Flat. G minor C major- গ্রথিত হয় রচনাগুলোতে তাঁর মানসিক অশান্তি উদ্বিগ্নতার ছাপ পাওয়া যায়

১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে মোৎসার্ট বার্লিনে যান বার্লিনের এই কনসার্ট টুর টাকাকড়ির দিক থেকে মোটেই সফল হয় নি তিনি আবার তাঁর ব্যবসায়ী ধনাঢ্য বন্ধুর কাছে টাকার জন্য আবেদন করেন ১৭৮৯ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর প্রধান সঙ্গীত রচনা হলো Cast Fun tutle অপেরা পরবর্তী বৎসরগুলিতে তাঁর রচনাশক্তি ক্রমশঃ হ্রাস পেতে লাগল ১৭৯০ সালে মোৎসার্ট রাজ্যাভিষেক দেখার জন্য ফ্রাঙ্কফুর্টে গেলেন এবং সেখানে তাঁর সদ্যরচিত সিম্ফনি বাজিয়ে শ্রোতাবৃন্দকে মুগ্ধ করেন কিন্তু এই যাত্রা তাকে আশানুরূপ অর্থ এনে দিতে পারে নি

 মোৎসার্টের জীবনের শেষ বৎসর তিনি আবার তাঁর পূর্বের মতো রচনা শক্তি ফিরে পেলেন এই সময়ে তিনি তাঁর বিখ্যাত রচনা The string quintets in D and E Sharp, The Piano concerto in B flat, The mofet Ave Verun corpus, The clarinet concerto in A, The opera - the magic flute  The Pequiem Mass   প্রভৃতি সমাপ্ত করেন

আগস্ট মাসের মাঝামাঝি মোৎসার্ট Titus অপেরার অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্য প্রাগ যাবার প্রস্তুতি করেন সময় একটি আগন্তুক এসে তাঁকে মৃত ব্যক্তির জন্য শোকসঙ্গীত রচনা করার ভার দেন মৃত আত্মার কল্যাণ কামনায় শোকগীতি রচনা করার কাজে নিমগ্ন হলেন তিনি অপরের মৃত আত্মার কথা চিন্তা করে করে তিনি নিজের মৃত্যুছায়াও যেন দেখতে পেলেন সব সময় তার মনে এক ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হল যে, কেউ যেন তাঁকে বিষ প্রয়োগ করেছে মোৎসার্টের শিল্পী জীবনের সমগ্র শক্তি নিঃশেষ করে তিনি রেকয়ায়েম রচনা করলেন আর সেটাই হয়ে রইলো পৃথিবীর সংগীত পিপাসু মানুষের অমূল্য সম্পদ মোৎসার্ট সঙ্গীত রচনাকালে বলেছিলেন-

I am writing this pequien for myself. সেটা ছিল ১৭৯১ সাল সে বৎসর মোৎসার্ট ছত্রিশ বছরে পদার্পণ করেন

 মোৎসার্টের প্রধান রচনা:

                        নৃত্যনাট্য - ১১টি

                        যন্ত্রসংগীত (সিম্ফনি) - ৪টি

                        পিয়ানো কনসার্তো - ১৬টি

                        ভায়োলিন কনসার্তো - ৫টি

                        বাসুন কনসার্তো - ১টি

                        ক্লারিনেট কনসার্তো - ১টি

                        ফ্লুট কনসার্তো - ১টি

                        হর্ন কনসার্তো - ১টি

                        নৃত্য সঙ্গীত - ২টি

                        সান্ধ্য সঙ্গীত - ৪টি

                        পিয়ানো সঙ্গীত - ১৯টি

                        কণ্ঠ সঙ্গীত - ৭টি

                        গীত - ৭টি

                        ঘরোয়া সঙ্গীত - ৩৭টি

১৭৯১ সালের সেপ্টেম্বর প্রাগে, অপেরা la clemenza di Tito উন্মোচনের সময় মোৎসার্ট অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর রাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন তিনি সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে অন্য এক সুরলোকে সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর দৃষ্টি অতীত, বর্তমান ভবিষ্যৎকে অতিক্রম করে শাশ্বত আলোকে আনন্দে উদ্ভাসিত ছিল মোৎসার্টের অন্তর আনন্দলোকের সুরের উৎসের খোঁজ পেয়েছিল বলেই তিনি সুখ, দুঃখ জন্ম-মৃত্যুর অতীত অতীন্দ্রিয় জগতে পৌঁছতে পেরেছিলেন মোৎসার্ট পৃথিবীতে অমর হয়ে রয়েছেন তার সঙ্গীতের মাঝে

 


 লেখক পরিচিতি:



ড. সাবরিনা আক্তার টিনা
সহকারী অধ্যাপক, সঙ্গীত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 



ক্যাটেগরিঃ বিনোদন,
সাবক্যাটেগরিঃ মিউজিক,