
ড. সাবরিনা আক্তার টিনা
ভোলফগাং আমাদেউস মোৎসার্ট ছিলেন পাশ্চাত্য সংগীত জগতের এক বিখ্যাত সংগীতকার ও ও সুরকার। অস্ট্রিয়ায় সালৎসবার্গ শহরে ১৭৫৬ সালের ২৭ জানুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন লিওপোল্ড, সেখানকার আর্চ বিশপের সঙ্গীত শিক্ষক। শৈশবকাল থেকেই মোৎসার্টের মধ্যে সঙ্গীতপ্রীতি দেখতে পাওয়া যায়। আর তাই লিওপোল্ড মোৎসার্টকে সঙ্গীত শেখানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং সঙ্গীতে প্রথম পাঠ দেন।
মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই মোৎসার্ট পিয়ানো বাজানোর চেষ্টা করতেন এবং সেই বয়স থেকেই তিনি পিতার কাছে পিয়ানো শিক্ষায় তালিম নিতে আরম্ভ করেন। মোৎসার্ট এতো ক্ষিপ্রগতিতে শিক্ষা আয়ত্ত করতে থাকেন যে, সবাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে গিয়েছিলেন। মাত্র চার বছর বয়সে মোৎসার্ট তার প্রথম পিয়ানো সঙ্গীত রচনা করেছিলেন, তাঁর বড় ভাই নানারেল বয়সে পাঁচ বছরের বড় হওয়া সত্ত্বেও মোৎসার্টের সঙ্গে পেরে উঠতেন না।
ইওরোপ ভ্রমণ
১৭৬৩ সালে বাবা লিওপোল্ড তার ছোট দুই ছেলেকে নিয়ে ইওরোপের বিভিন্ন শহরে পরিভ্রমণ করেন। ভিয়েনার রাজপ্রসাদে তাদের সঙ্গীতের কনসার্ট অভিজাত মহলে বিশেষভাবে আদৃত হয়। সেখানে প্রখ্যাত রাজকুমারী মারি তাঁতোনিয়েৎ এবং স্বয়ং সম্রাট উপস্থিত থেকে বালক মোৎসার্টকে আদর ও প্রশংসা করেন। ভিয়েনার সঙ্গীতাভিযানে উৎসাহিত হয়ে লিওপোল্ড অর্থ ও যশের আকাক্সক্ষায় জার্মানি, ফ্রান্স, হল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের রাজধানীগুলোতে ভ্রমণ করেন। তাদের এই সফর আরম্ভ থেকে শেষ পর্যন্ত সাফল্যম-িত ছিল। বিশেষ করে বালক মোৎসার্টের নাম ডাক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ঐ সময় মোৎসার্টের বেহালাবাদন সমগ্র সঙ্গীতানুরাগী মহলকে চমৎকৃত করে। অতি অল্প বয়সেই তিনি হারপসিকর্ড, অর্গ্যান, বেহালা প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র অতি নিপুণভাবে বাজাতে পারতেন। স্বরলিপি দেখে যে কোনো সঙ্গীত বাজাতে পারতেন। কিশোর বয়সেই তার সোনাটা, সিম্ফনি ও নানা সাঙ্গীতিক রচনার অদ্ভুত ক্ষমতা দেখে সঙ্গীত সমালোচকগণ তাঁকে প্রডিজি বা বিস্ময় বালক রূপে আখ্যায়িত করেন।
ভদ্র ও বিনম্র স্বভাবের জন্য মোৎসার্টের এক বিপুল বন্ধুগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। তাঁদের মধ্যে অভিজাত সম্প্রদায় থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকও ছিলেন। সুরশিল্পী ছাড়া অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। রাজদরবারে তাঁর যথেষ্ট প্রতিপত্তি ছিল। সেই সময় সাধারণত রাজপরিবার বা উচ্চবিত্ত সমাজের মধ্যেই সঙ্গীতানুরাগ সীমাবদ্ধ ছিল। আর্থিক দিক থেকে খুব সুবিধা করতে না পারলেও ভিয়েনার সংগীত রসিকম-লীতে মোৎসার্টের নাম যশ হয়। সঙ্গীত ও অপেরা রচয়িতা হিসাবে তাঁর নাম সারা ইওরোপে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাগে ভ্রমণ ও রাজদরবারে সুরকারের পদ
জার্মানি, ফ্রান্স ও হল্যান্ড প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করে মোৎসার্টের কনসার্ট দল ১৭৬৩ সালে লন্ডন পৌঁছান। সেখানে মোৎসার্টের ক্লাডিয়ার ও বেহালা বাদনও খুব উচ্চ প্রশংসিত হয়। লন্ডনের সাঙ্গীতিক ভ্রমণ নানা দিক থেকে ফলপ্রসু হয়েছিল। এখানে পাশ্চাত্যের অন্যতম সুরস্রষ্টা দিকপাল সুরকার জোহান সেবাস্তিয়ান বাখের
ছোট ছেলে জোহান ক্রিশ্চিয়ান বাখের সঙ্গে মোৎসার্টের আলাপ ও পরিচয় ঘটে এবং এই পরিচয় ক্রমে বন্ধুত্বে পরিণতি লাভ করে। বাখের কাছ থেকে তিনি ইওরোপীয় সঙ্গীতের সর্বশেষ বিকাশ ধারার একটি সামগ্রিক পরিচয় লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি বলেছিলেন যে, ক্রিশ্চিয়ান বাখ ছাড়া অন্য কোনো সঙ্গীতবিদ থেকে তিনি এত বেশি সঙ্গীতের জ্ঞান আহরণ করতে পারেন নি।
লন্ডনের এক বিখ্যাত আইনবিদ, বিজ্ঞানী ও পুরাতত্ত্ববিদ আকৃষ্ট ও মুগ্ধ হন তরুণ সুরকার মোৎসার্টের প্রতিভায়। তার নাম ডেইনিজ বেরিংটন। মোৎসার্টের সাঙ্গীতিক পারঙ্গমতায় তিনি এতো আগ্রহী হলেন যে, মোৎসার্টের সঙ্গীতের একটি সার্বিক মূল্যায়ন না করে তিনি থাকতে পারলেন না। মোৎসার্টকে তিনি কতোগুলো পরীক্ষামূলক কাজ দিলেন। মোৎসার্ট অবলীলাক্রমে ঐ সকল কঠিন কাজগুলো সম্পন্ন করে দিলেন। এতে বিজ্ঞানী এতো সন্তুষ্ট হলেন যে, ইংল্যান্ডের রয়েল সোসাইটির কাছে মোৎসার্টের সঙ্গীত ও সঙ্গীত বিজ্ঞান সম্পর্কে এক বিস্তৃত রিপোর্ট লিখে পাঠান।

আমাদেউস মুভিতে
সঙ্গীত রচনায় ব্যস্ত মহান সুরস্রষ্টা
১৭৬৩-৬৬ সালে বৃহৎ কনসার্ট টুর সমাপ্তির পর মোৎসার্ট অনেকগুলি সাঙ্গীতিক রচনার কাজ শেষ করেন। তার মধ্যে মাসেস, সিম্ফনী, এরিয়াস, সেরিনাডাস, ডাইভারটিম্যান্টি এবং তার প্রথম দুটি অপেরা। অপেরা দুটি যথাক্রমে La Finta Semplice এবং
Bastien and Bastienne । যদিও মোৎসার্টের এই অপেরাগুলো কৈশোরে রচিত তবুও এদের মধ্যে শক্তিমত্তার অবশ্যই পরিচয় পাওয়া যায়। প্রথম অপেরাটিতে ইটালীয় অপেরা এবং দ্বিতীয় অপেরাটিতে জার্মান অপেরার সুস্পষ্ট ছাপ রয়েছে।
ইটালি ও সালজবুর্গ শহরে অবস্থান
১৭৬৯ সালে মোৎসার্ট ও মোৎসার্টের পিতা ইটালি যান। সেখানে তদানীন্তন প্রখ্যাত সংগীততত্ত্ববিদ পাদ্রে মার্টিনির কাছে মোৎসার্ট কাউন্টার পয়েন্টের তালিম নেন। ইটালিতে কয়েক বৎসর থাকার পর তিনি