
মুস্তাকিম আহমেদ
পর্ব-১
“চিরদিনই তুমি যে আমার
যুগে যুগে আমি ….”
অমরসঙ্গী চলচ্চিত্রের এই বিখ্যাত গানটি শোনেন নি এমন বাঙালি কমই আছেন। প্রেমে মানুষ তার সঙ্গীকে চিরদিনের জন্য চায়, নিজেদের “অমর সঙ্গী” ভাবতে ভালবাসে। কিন্তু “হীরা চিরদিনের”এমন আষাঢ়ে গল্প বিদেশি হীরা বেনিয়ারা ফাঁদলেন কীভাবে? এই গানটি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কি!
হোক সে বাংলা কিংবা মার্কিন মুল্লুক, সবখানেই বুঝি প্রেমের “মরা” জলে ভাসে,ডোবে না! প্রেমিক,
প্রেমিকার যুক্তিহীন এই অলিক মানসিক সময়ের ফায়দা লোটে ব্যবসায়ীরা।
প্রেম অথবা বিয়েতে হীরার মতো সাদামাটা খনিজ পদার্থকে তারা সুযোগ বুঝে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে।
গ্রিক শব্দ “অ্যাডামাস” অর্থ “অজেয়” আর “অ্যাডামাস” থেকেই ডায়ামন্ড শব্দটির উৎপত্তি।
হীরা এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে শক্ত পদার্থ যা নিখাদ কার্বনের তৈরি।
হীরা বলতেই আমাদের মনে আসে একটি নাম, “কোহিনূর”(আলোর পাহাড়)।

১৮৬ ক্যারেটের কোহিনূর হীরা নিয়ে একটা অদ্ভুত কথা প্রচলিত আছে।
শোনা যায় ষোড়শ শতাব্দীতে অর্ধেক পৃথিবীর প্রতিদিনের খরচ এই হীরা দিয়ে চালানো সম্ভব ছিল।
হীরা কি সত্যি এত মূল্যবান? কোথায় পাওয়া যায় হীরা?
এই সব প্রশ্নের উত্তরই আমরা খুঁজবো।
চলুন তাহলে শুরু করা যাক!
শুরুর কথা
“ভারতবর্ষ, মনুষ্যজাতির দোলনা।”-মার্ক টোয়েন।
প্রায় দুই হাজার চারশো বছর আগের ভারতবর্ষ।
কৃষ্ণা নদীর কাছে (আজকের হায়দ্রাবাদ) অগভীর গর্ত থেকে সেই সময় পৃথিবীর বেশীরভাগ হীরা পাওয়া যেত।
১৭২৫ সালে ব্রাজিলের জঙ্গলে হীরা আবিষ্কৃত হয়।
তখনকার সময়ে বেশিরভাগ হীরার খনির মালিক ছিলেন ইংরেজ।
১৮৭০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশাল বিশাল হীরার খনির সন্ধান মেলে।
হঠাৎকরে এতো হীরার খোঁজ পেয়ে খুশি না হয়ে খনির মালিকেরা চিন্তিত হয়ে পড়লেন।
তারা জানতেন দুষ্প্রাপ্যতাই হীরার উচ্চমূল্য নির্ধারণ করে। বাজারে হীরার জোগান বেড়ে গিয়ে দাম কমে যাবে বুঝে তারা নিজেদের বিনিয়োগ
নিয়ে বিচলিত হয়ে উঠেন।
বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারেন সঙ্ঘবদ্ধ না হলে এই ব্যবসায় ইতি টানতে হবে।
সবাই মিলে “একটা”প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলে “হীরা দুষ্প্রাপ্য”বলে সহজে মিথ্যা রটানো যাবে।
তাদের সুদূরপ্রসারী চিন্তার ফসল হিসেবে ১৮৮৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠিত হয়, ডি বিয়ারস কনসলিডেটেড মাইন্স, লি:, ইনকর্পোরেটেড।
গত শতাব্দীর প্রায় পুরোটা জুড়ে হীরার বাজারে ছিল ডি বিয়ারস-এর একচেটিয়া আধিপত্য। কেউ খনি কিনতে ব্যর্থ হলে সেসব খনির সমস্ত হীরা বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য ডি বিয়ারস কিনে নিত।
বিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর ৯০% হীরা ব্যবসা ছিল এই কোম্পানির দখলে।
হীরার অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যের জন্য একমাত্র দায়ী ডি বিয়ারস।
এই স্ফটিক কার্বনের জন্য অস্বাভাবিক দাম হাঁকাতে দুনিয়া জুড়ে একে ক্ষমতা, প্রতিপত্তি আর প্রেমের প্রতিকে পরিণত করা প্রয়োজন ছিল।
ডি বিয়ারস কীভাবে এই অসাধ্য সাধন করলো?
মিথ্যার বেসাতি
সেপ্টেম্বর ১৯৩৮।
জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ইতালি, স্পেনে তখনো বাগদানে হীরা উপহার দেয়া শুরু হয় নি।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সে এ ছিল ধনীদের রত্ন। তার ওপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল।
এ
অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠে তাদের কাঙ্ক্ষিত ঠিকানা। ১৯৩৮ সালে সমস্ত পৃথিবীর ৭৫ ভাগ হীরা যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রিত হীরা ইওরোপের মতো মান সম্মত ছিল না। দামও ছিল কম-একটি হীরা ৮০ ডলার।
ডি বিয়ারস কর্তৃপক্ষ মার্কিনীদের দামি হীরা কিনতে উৎসাহী করার জন্য প্রচারণার প্রয়োজন অনুভব করলেন।
দৃশ্যপটে আবির্ভূত হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত বিজ্ঞাপনী সংস্থা, এন ডাব্লিউ এয়ার।
আমেরিকানদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করে এন ডব্লিউ এয়ার যে উপসংহারে পৌঁছল তা হচ্ছে – “নর ও নারীর প্রেমে হীরা অপরিহার্য”, এই ধারণা সবার মনে ঢুকিয়ে দিতে হবে।
যেমন ভাবা তেমন কাজ
৯০% এর-ও বেশি এনগেইজমেন্ট রিং পুরুষরা কেনেন বিধায় তাদের বোঝানো হলো হীরা যত বড় আর দামি হবে তত প্রবল হবে প্রেমের প্রকাশ!
নারীদের বোঝানো হল বিয়েতে হীরা থাকবে এটাই নিয়ম।
বিজ্ঞাপনী কৌশল বাস্তবায়নে এয়ার মাঠে নামলো।
কৌশলের অংশ হিসেবে তারকারা যত্রতত্র তাদের হীরা দেখানো শুরু করলেন।
সচেতন ভাবে নির্বাচিত পত্রিকা এবং ম্যাগাজিনে হীরা নিয়ে প্রকাশিত হতে থাকল নানান মুখরোচক গল্প আর স্থিরচিত্র।
বেতার অনুষ্ঠানে ফ্যাশন ডিজাইনাররা হীরা নিয়ে সবাই আগ্রহী হচ্ছে বলে মিথ্যা মতামত দিতে থাকলেন।
সবখানে সূক্ষ্মভাবে একটা কথাই বারবার বলা “প্রেমে, বিয়েতে হীরা অপরিহার্য।”
সালটা ১৯৪৭।
মুনাফার লোভে উন্মত্ত ডি বিয়ারসকে এ বছর এন ডব্লিউ এয়ার দিল আরেকটি মারাত্মক কৌশল।
আমেরিকান নারীদের অবচেতনে হীরাকে পাকাপাকি ভাবে গেঁথে দেয়ার জন্য এই পদক্ষেপ ছিল প্রায় অব্যর্থ।
যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে বিভিন্ন হাইস্কুলে হাজার হাজার ছাত্রীদের জন্য অ্যাসেম্বলিতে, শ্রেণীকক্ষে “ আলোচনা”-র আয়োজন করা হলো।
আলোচনার বিষয় “হীরা”, আয়োজক “ডি বিয়ারস”!

সেই স্লোগান ও তারপর
ডি বিয়ারস এমন একটা স্লোগান চাচ্ছিল যা দিয়ে হীরাকে প্রেম এবং কর্তৃত্ব উভয়ের প্রতীক বোঝানো
যায়।
১৯৪৮ সালে এন ডব্লিউ এয়ারের কপি রাইটার ম্যারি ফ্র্যান্সেস গেরেটি সৃষ্টি করলেন সেই বিখ্যাত স্লোগান,“এ ডায়মন্ড এজ ফরএভার”।
“একটি হীরা চিরদিনের”।
হীরা ভেঙে যেতে পারে, টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে, রঙ হারাতে পারে এমনকি পুড়লে ছাই হয়ে যেতে পারে।
এতকিছুর পরেও হীরার সাথে “চিরদিন” -এর তকমা এয়ার, এই স্লোগান দিয়ে সেঁটে দিল।
৫০-এর দশকের শেষের দিয়ে এয়ার, ডি বিয়ারসের কাছে তাদের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরে।
বিশ বছর ধরে মার্কিনিদের মগজ ধোলাই ফল দিতে শুরু করেছে।
১৯৩৯-এর টিন এজ প্রজন্ম
৫০-এর দশকের শেষে বিয়ের বয়সে পৌঁছে গেছে।
এই প্রজন্মের কাছে ততদিনে বাগদান