English
ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২১-০৫-২৬ ০১:১০:৫২
আপডেটঃ ২০২৬-১০-২৩ ০৩:১৮:৫১


অচল প্রেমের পদ্য এবং অতৃপ্ত প্রজেক্টের গল্প

অচল প্রেমের পদ্য এবং অতৃপ্ত প্রজেক্টের গল্প



রাশেদ জামান

 

আশির দশক। আমি ক্লাস ফোরে পড়ুয়া হাফপ্যান্ট পরা  ক্ষুদে ফুটবলার।

আমাদের বাসার ঠিক পেছনে খিলগাঁও বিশ্বরোডটা তখন ছিল সবুজ মাঠ। ফুটবল পাগল পাড়ার সব বন্ধুরা আর পাশের শাহী মসজিদ মাদ্রাসার ছেলেরা সকাল বিকাল সেখানে ফুটবল খেলতাম।

মাঠের একপাশে রেললাইন আর ঠিক অপর পাশে খিলগাঁও পোস্টঅফিস। মাঝখানে খেলার মাঠে এক ভোরে আমি আর পাশের বাড়ির ছেলে সুখা দুজনে ফুটবল দিয়ে গোলকিপিং প্রাকটিস করছিলাম। আমার তখন একমাত্র স্বপ্ন - বড় হয়ে ছোট মামার মতো গোলকিপার হবো।

পোস্টঅফিসের দোতলায় পোস্টমাস্টারের বাংলো। তার বড় মেয়ে পুতুলের সেদিন বিয়ের নিম্ন- মধ্যবিত্ত আয়োজন চলছে - অজানা মন খারাপের এক সকালে, দুটো মাত্র ঘরের সামনে খোলা ছাদে।

 

আশির দশকে মধ্যবিত্তের খিলগাঁওয়ে - বাড়ির ছাদে, আঙ্গিনায় অথবা পাড়ার ছেলেদের তত্ত্বাবধানে গলিতে প্যানডেলের ভেতর বরযাত্রীকে আপ্যায়ন করা হতো। আমরা ভেন্যু শব্দের সাথে তখনো পরিচিত না। পাড়ার মুদি দোকান থেকে কেনা সস্তা লাল নীল হলুদ কাগজ, বরফির মতো তিন কোণা করে কেটে পাটের রশিতে ভাতের আঠা দিয়ে একের পর এক লাগানো হতো। একটা খুঁটির মাথা থেকে অনেকগুলো এরকম রশি টানা দিয়ে ঝোলানো হতো।

ওইদিন ভোরবেলায় কুয়াশাও ছিল। লক্ষ করলাম পোস্টঅফিসের একদম উল্টোদিকে একজন যুবক রেললাইনের উপর ঠায় দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে পোস্টমাস্টার সাহেবের বাংলোর দিকে তাকিয়ে আছে। দু’হাত পেছনে দিয়ে দাঁড়িয়ে, তা প্রায় অনেকক্ষণ। একচুলও নড়েনি সে যুবক।

আমি ট্রেন লাইনের প্রায় লাগোয়া এক বাড়িতে বড় হয়েছি। খেলাতে ব্যস্ত থাকা অবস্থায়ও আওয়াজ শুনে বুঝতে অসুবিধা হয়নি ময়মনসিংহের ভোরের ট্রেন কমলাপুর থেকে রওনা হয়ে শাহজাহানপুর রেলক্রসিং পার হয়ে প্রায় চলে এসেছে কাছে।

চলন্ত ট্রেনের প্রতি অদ্ভুত এক মোহ আজও কাটেনি আমার। এখনো ট্রেনের শব্দ  শুনলে মনে হয় আমি বেঁচে আছি। ট্রেন লাইনের পাশে বেড়ে ওঠা আমি জীবনে যতোগুলো ট্রেন সামনে দিয়ে গিয়েছে, দূরে মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত অপলক তাকিয়ে দেখেছি। এর কারণ ব্যাখ্যা করা কঠিন।

সেদিন ভোরে ফুটবল খেলা থামিয়ে আমি ঘাড় ঘুরিয়ে যখনই আমাদের দিকে ধেয়ে আসা ট্রেনটার দিকে তাকিয়েছি, অবাক হয়ে দেখলাম ট্রেন লাইনের উপর এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যুবক দুহাতে লুকানো গামছা দিয়ে পুরো মাথা ঢেকে ফেলছে।

হতভম্ব আমি নিজের চোখে দেখলাম এক অভিমানী ব্যর্থ প্রেমিক যুবক, ট্রেনের সামনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ঝাঁপ দিলো। সত্যি সত্যি ঝাঁপ দিলো। তখনও ঠিকমতো ভোর হয় নি। একটা কাকও ডাকেনি। পোস্টমাস্টার সাহেবের বড় মেয়ে ট্রেনের আওয়াজে টেরও পেল না, এই মাত্র তার একমাত্র মায়াবী “অতীত” জীবন থেকে না চাইতেও কাঁটা পড়ে গেল - “শেষ পর্যন্ত মেনে নেয়া” বিয়ের দিন, কুয়াশা ঢাকা এক শীতের সকালে।

 

আমার সদ্য কেনা সবচাইতে দামি সম্পদ ফুটবলটার কথা ভুলেই গেলাম। আমি আর সুখা দৌড় দিলাম ট্রেন লাইনের দিকে। মনে ক্ষীণ আশা যদি মানুষটা বেঁচে থাকে। আমি ততোদিনে একবার ট্রেনের ধাক্কায় আহত একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছি। মনে তাই ক্ষীণ আশা।

শীতের খুব সকালে একটা মানুষও আশেপাশে নাই। আমি যুবকের মাথাহীন বোকা অসাড় শরীরটা ট্রেন লাইনের পাশে পড়ে থাকতে দেখলাম। কুয়াশার ভেতর থেকে সুখা চুলের মুঠি ধরে যুবকের কাঁটা পড়া তখনো অভিমানী চেহারার মাথাটা নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বললো- “হালায় সুইসাইড খাইছে।''

রেল লাইনের পাশে বেড়ে ওঠা সুখা অভিজ্ঞতার আলোকে তার মতামত দিলো।

আমি তখনো বাকরুদ্ধ। আমার ফুটবল খেলার বন্ধু মাদ্রাসার ছাত্র কামরুল, আমার চেয়ে বয়সে বড়, ততোক্ষণে দৌড়ে চলে এসেছে। হাতে মেসওয়াক করার একটা ডাল। ও নিশ্চয়ই ঘটনাটা রেল লাইনের পাশে খিলগাঁও শাহী মসজিদ মাদ্রাসার ছাদ থেকে দেখেছে। খুব মন খারাপ করে বললো, “আমি ওনারে কিন্তু ভালোভাবে চিনি। পুতুল আপার সাথে লাইন আছিলো, পাগলের মতো দুইজন দুইজনরে ভালোবাসতো। কিন্তু তাতে কী - এখনতো অনেক বড় ঝামেলা হইবো।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম -“কী ঝামেলা?”

অন্যমনস্ক কামরুল চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা করে বললো, “আত্মহত্যা করলেতো জানাজা হয় না।”

আমি ভালোবাসা ও আত্মহত্যার মানে পুরোপুরি না বুঝেই ভয়ে ভয়ে বললাম, “তুই তো হুজুর। তুই পারবি না?”

চিন্তিত পিচ্চি হুজুর কামরুল মেসওয়াকের ঢাল কামড়াতে কামড়াতে বললো, “দুইজন ওজু করা মুসুল্লি তো অন্তত লাগবো। তুই হাফপ্যান্ট পরা, আর সুখা তো হিন্দু।''

 

আমি নিজেকে সামলে হাফ প্যান্ট পরা বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিপক্ক এক বুদ্ধি দিলাম, ‌‌‌‌''আমরা তিনজন কিছু দেখি নাই বললেই তো এটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেল।”

 

আশির দশকে সেদিনের সকাল বেলা আমার জীবনের ভয়ঙ্কর একটি অভিজ্ঞতা লাভ করলাম।

 

আমার ছোট মামার কাজের সুবাদে তার খাটের নীচ ভর্তি “গোলাপী এখন ট্রেনে” সিনেমার রাশ প্রিন্ট অথবা ইন্টার পজিটিভ ছিল। যার প্রায় পুরোটা আমাদের জুতার বাক্সে তৈরি করা প্রজেক্টরে হাত দিয়ে পজিটিভ টেনে টেনে মামাতো ভাই মাহমুদের সাথে একসাথে দেখেছি।


ইতিমধ্যে নায়িকা ববিতার গভীর প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে, মোটামুটি প্রেম ভালোবাসা ব্যাপারটা কী এবং নায়ক ফারুকের প্রেমিকা হারানোর কষ্ট কতোটা তীব্র হতে পারে - সেটা বেশ কিছুটা অনুধাবন করা শিখে গেছি।

আমি সেইদিন মৃত যুবকের লাশের পিছু পিছু রেল লাইনের ঐ পাড়ে শাহজাহানপুরে তার বাড়িতে গেলাম। মাত্র সন্তান হারানো এক মাকে দেখলাম। জীবনে প্রথম অকালে সন্তানহারা মায়ের আহাজারী বিলাপ নিজ চোখে দেখলাম। বেশীক্ষণ থাকতে পারলাম না। সহ্য করাটা কঠিন লাগলো।

ছুটে রেললাইনের এই পাড়ে পোস্টমাস্টারের বাংলোর বিয়ে বাড়িতে এলাম। সবাই নির্বিকার, কিন্তু ভেতরে আতংকিত। খুব ভালো বর নাকি পাওয়া গেছে।