
আবদুল্লাহ আল মোহন
আমাদের শোকের মহাসাগরে ভাসিয়ে দিয়ে গত ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় পরলোকগমন করে বন্ধু সৌরভ (সৈয়দ শওকত ইমাম)। পরদিন ফজরের নামাজের পর জানাজা শেষে তাজমহল রোড কবরস্থানে চিরশায়িত করা হয়। সৌরভ আর নেই, হাসপাতালে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছে- বন্ধু আজাদের কাছ থেকে এই চরম দু:সংবাদটি শোনার মুহূর্তে স্তব্ধতা-শোক-বেদনা জাপটে ধরে।
দীর্ঘদিনের পরিচয়ের-আলাপের-আড্ডার নানা স্মৃতি ভেসে ওঠে মানসপটে। মৃত্যু অনিবার্য সত্য। মৃত্যুকে এড়ানোর পথ নেই। সৌরভের মৃত্যু অকালমৃত্যু। সৌরভ নাই মানি না, সৌরভ আছে আমাদের অন্তরে-অনুভবে গভীর প্রত্যয়ে। যদিও ‘মৃত্যু মানে নতুন পথে যাত্রা।’ আসলে মানুষ কোথাও কোথাও খুব অসহায়। যেখানে মানুষের করার কিছুই থাকে না। মানুষ জন্মটা যেমন দেখতে পায় না, নিজের মৃত্যুটাও মানুষ দেখতে পায় না। মানুষের মৃত্যুটা যে খুব অনিশ্চিত। মানুষ যতই বড় হোক না কেন এখানটাতে তার কোনো হাত নেই।

২.
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশতম ব্যাচের, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সতীর্থ ছিলাম আমরা। প্রাণের সবুজ প্রাঙ্গণে আমাদের অবুঝ মনের উচ্ছলতা ভরা দিন-রাত্রিগুলি ছিলো আমোদে ভরা, স্বপ্নে গড়া। বন্ধুটির সঙ্গে আরও কত স্মৃতি আছে, সব আজ আর মনেও নেই। আসলে আমাদের প্রায় তিন দশকের পথচলার স্মৃতিচারণা স্বভাবতই আমাকে গভীরভাবে বেদনাহত করে, শোকে কাতর করে। ভাবনাগুলো অস্পষ্ট হয়ে যায়, ভাষা ও শব্দ সৌরভের মতোই হারিয়ে যায়।
স্মৃতিচারণার এই অবকাশে সহযাত্রীবান্ধব সৌরভের উদ্দেশে আমার হৃদয় নিংড়ানো যত শ্রদ্ধার, ভালোবাসার উৎসর্গ। স্মৃতিচারণে কম্পিউটারের কিবোর্ডে শব্দঘর তৈরিতে চোখ ভিজে আসে ভালোবাসায়, প্রীতির স্মৃতির মেঘবৃষ্টি জলে। ভাবনার মেঘমালা ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। সৌরভের সঙ্গে সম্পর্ক-ঘনিষ্ঠতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হৃদয়ের টানের যে দায়বদ্ধতা, তাও তো এড়ানোর নয়। ওকে নিয়ে এই বেদনাকাতর লেখাটিও অন্তরের তাগিদ থেকেই।
৩.
গভীর ও প্রগাঢ় নৈকট্য ছিল সহপাঠী বন্ধুটির সাথে, পাঠ্যক্রমের বৃত্তের বাইরের আলোকিত চিন্তা চর্চায়, সপ্রতিভ বিতর্কে, প্রদীপ্ত মনন-সৃজনীভাবনায়। সৌরভের বন্ধুত্ব যেমন আমাকে নানাভাবে প্রাণিত করেছিলো, তেমনই নির্মাণ করতে সহযোগিতা করে গেছে গভীর সংবেদী এবং শক্তিশালী চিন্তা ও মননের জগৎ সৃষ্টিতে। স্পষ্টভাষী সৌরভের ব্যক্তিত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সাহিত্যবোধ এবং রুচি আমাদের সখ্যকে আরো দৃঢ়, আনন্দময় করে তুলেছিল। আমৃত্যু আমাদের মধ্যে অটুট ছিল গভীর বন্ধুত্ব, শৈল্পিক হৃদ্যতা।
বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন থেকেই হিটো, আজাদ, সাঈদ, শাকিল, মিঠু, সৌরভসহ আমরা হয়ে উঠেছিলাম অভিন্নহৃদয় বন্ধু, শিল্পসহযাত্রী। আমাদের সৃষ্টিশীলতায়, সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে এই বন্ধুত্বের বন্ধন সহযোগিতায় উঠে এসেছে নানা ভঙ্গিমায়। যার ফলাফল-প্রমাণ পাই পরবর্তীকালে প্রত্যেকের জীবন সাধনায়। সৌরভ ছিলো আজন্মের মুগ্ধ পাঠক ও গভীর বিশ্লেষক। ফলে শিল্পসাহিত্য-সমাজ-শিক্ষাসহ নানা বিষয়ে আলোচনায় পরিচয় পেয়েছি গভীর প্রাজ্ঞতা, পাঠ ও জীবন অভিজ্ঞতার নির্যাস।
৪.
অতিমারী করোনাকালে অনন্তধামে পাড়ি দিলো সৌরভ (জন্ম: ২৬ মে ১৯৭১ – প্রয়াণ : ২৭ মার্চ ২০২১)। আর করোনাজনিত নানাবিধ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রভাবে বাসার বাইরে বের হওয়ার মতোন শারীরিক অক্ষমতায় আমি প্রিয়তম বন্ধুকে শেষ দেখা দেখতে পেলাম না, জানাজাতে উপস্থিত থাকতে পারিনি, এই বেদনার ভারও অসীম, আমৃত্যু আমাকে বহন করতে হবে সেই অপরাধবোধ। যেমন বহন করছি করোনাকালে প্রয়াত (১৭ মে ২০২০) আমার পিতাকেও শেষ দেখা দেখতে যেতে না পারায়। অতিমারী করোনাকালের সময়টা কি খুবই ট্র্যাজিক যাচ্ছে? সব প্রিয়জনেরা আকস্মিকভাবে বিদায় নিচ্ছেন। যেন বা একে একে মিলিছে দেউটি। আমাদের এমনতরই দুর্ভোগ্য, কী যে অতল শূন্যে অবস্থান আমাদের! বড় অসহায় লাগে! এমনটা কখনো ভাবতেই পারিনি- কতশত প্রিয়মুখ দেখতে পারছি না, দেখতে পাবো না আর কোনদিন।
৫.
করোনায় গৃহবন্দিতে, নি:সঙ্গকালে স্বভাবতই একান্ত করে স্মৃতিচারণায় পেয়ে বসে আমাকে। হা-হুতোশ করব, না স্মৃতিচারণা করব, কিংবা মূল্যায়ন করব সেই বন্ধুত্বটাকে- বুঝে উঠতে পারছি না। কেমন যে লাগছে সৌরভকে হারিয়ে, বলে বোঝাতে অক্ষম-আমি, আমরা অনেকেই। প্রায় তিন দশকের মতো কাল আমরা কাটিয়েছি একসঙ্গে- একুশের অনেকের সাথে। এখন সৌরভ হারিয়ে গেলো আরেক ধামে, এর আগেও অচেনালোকে চলে গেছে সরকার ও রাজনীতির, একুশের আরেক বন্ধু কবীর। এরপরে কে তালিকায় আছে- অজানা। আগে চলে যাবার কথা তো আমারই ছিলো, অথচ চলে গেলো সৌরভ। করোনায় আমিও সপরিবারে আক্রান্ত হয়ে জানুয়ারির