
-মাসুদ খান
বাংলাদেশের কর্পোরেট সেক্টরে একটি পরিচিত নাম মাসুদ খান এফসিএ। সিএ প্রফেশনালদের কাছে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন অভিভাবক হিসেবে বিবেচিত হন। মাসুদ খান ক্যারিয়ার শুরু করেন ১৯৭৯ সালে চা কোম্পানি জেমস ফিনলে দিয়ে। সেখানে তিন মাস থাকার পর চলে আসেন বৃটিশ-আমেরিকান টোবাকো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। কস্ট ম্যানেজমেন্ট, ইন্টার্নাল অডিট, অ্যাকাউন্টস এবং ফাইন্যান্স বিভাগে বিভিন্ন পদে সেখানে দীর্ঘ দুই দশক চাকরি করেন। তারপর চলে আসেন একদম ভিন্ন আরেকটি সেক্টরে। সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট কোম্পানি সবে বাংলাদেশে এসেছে। এই কোম্পানিতে যোগ দেন ১ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে। এখানে যদিও তিনি অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগে ছিলেন কিন্তু এর থেকে তার কাজের পরিধি ছিলো আরো ব্যাপক। তিনি এখানে থাকা অবস্থায়ই লাফার্জ-এর সাথে হোলসিম কোম্পানি মার্জ করে। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন মাসুদ খান। লাফার্জ-হোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেড-এ ছিলেন ৩১ অক্টোবর ২০১৭ পর্যন্ত। এখান থেকে তিনি আরেক সিমেন্ট কোম্পানি ক্রাউন সিমেন্ট-এ যোগ দেন। বর্তমানে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বোর্ডের চিফ অ্যাডভাইজার। এর পাশাপাশি তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে মারিকো বাংলাদেশ, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশসহ কিছু প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন- জিএসকে বাংলাদেশের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। কিছুদিন আগে জিএসকে বাংলাদেশ কোম্পানিকে অধিগ্রহণ করে ইউনিলিভার বাংলাদেশ। এর পেছনেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মাসুদ খান সদ্য গঠিত ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রথমে লাফার্জ-হোলসিম এবং পরে জিএসকে-ইউনিলিভার মার্জ অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন-এর সাথে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কারণে বাংলাদেশে তিনি মার্জ অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন এক্সপার্ট হিসেবে পরিচিত। তিনি পঁচিশ বছর বয়স থেকেই এসব বিষয় পড়াচ্ছেন সিএ ছাত্রদের। এখনো তিনি পড়াচ্ছেন। তরুণ বয়সে শিক্ষক থাকা অবস্থায়ই জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সেই জনপ্রিয়তা এখনো ধরে রেখেছেন। বর্তমানে তার ছাত্ররা বিভিন্ন সেক্টরে লিড দিচ্ছেন। যাদের তিনি পড়িয়েছেন, এখন তাদের মধ্যে থেকেই আবার অনেকে আইসিএবি-তে পড়াচ্ছেন। সম্প্রতি বিপরীত স্রোতের পক্ষ থেকে সম্পাদক মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান এবং চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্ট ও ট্যাক্স কনসালটেন্ট জসীম উদ্দিন রাসেল তার সাথে কথা বলেন। আলাপচারিতায় উঠে এসেছে নানা দিক। পাশাপাশি এখনকার তরুণদের করণীয় বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে।
বিপরীত স্রোত: আপনার কর্ম জীবনের
বড় একটি অংশ কেটেছে
সিমেন্ট শিল্পে এবং এখনো আপনি এই শিল্পের
সাথে কাজ করছেন। আপনি এর আগে টোবাকো
কোম্পানির সাথে দীর্ঘ দিন ছিলেন। সেখান থেকে কেন সিমেন্ট
শিল্পে এলেন?
মাসুদ খান: প্রথম আমার চাকরি জীবন শুরু হয় ১৯৭৯ সালে জেমস ফিনলে চা কোম্পানি দিয়ে। সেখানে তিন মাস ছিলাম। তারপর চলে আসি বৃটিশ-আমেরিকান টোবাকোতে। সেখানে ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউনটেন্ট হিসেবে যোগ দিই। তারপর বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছি। এক বছর দেশের বাইরেও কাজ করেছি বৃটিশ-আমেরিকান টোবাকোর হয়ে। এভাবে করতে করতে আমি অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের দ্বিতীয় পদে চলে আসি। কিন্তু কোম্পানি আমাকে আর প্রথম পজিশনে দিচ্ছিল না। যখনই পদ খালি হয় তখন আবার বিদেশি কাউকে স্থলাভিষিক্ত করা হয়। আমি কোম্পানিকে বিষয়টি জানাই। কিন্তু তারা দেরি করছিল। পরে এক সময় আমি বুঝে যাই তারা আমাকে কোনোদিনই এই পদে দেবে না। বৃটিশ-আমেরিকান টোবাকো এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশিকে সিএফও পদে নিয়োগ দেয় নি। আমি সিদ্ধান্ত নিই চলে আসার। সেখান থেকে ১৯৯৯ সালে লাফার্জ সিমেন্ট কোম্পানিতে চলে আসি। আমার সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল বলে মনে করি।
বিপরীত স্রোত: প্রায় বিশ বছর একটা সেক্টরে
থেকে একদম ভিন্ন আরেকটা
সেক্টরে চলে এলেন। এটাতো খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল!
মাসুদ খান: হ্যাঁ, অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল। একটা লাইফ-টাইম অভিজ্ঞতা। একটা
উদাহরণ দিতে পারি। আমাদের কাজ করতে হয়েছিল
বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশ মিলিয়ে। ইনডিয়াতে
প্রায় ১৮ কিলোমিটার কনভেয়র তৈরি করতে হয়। এটা তৈরি করতে গিয়ে একের পর এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। যেখানে আমরা কনভেয়ার করতে গেলাম সেই জমি ছিল স্থানীয় আদিবাসীদের। নিয়ম হলো আদিবাসী ছাড়া বাইরের কারো কাছে জমি বিক্রি করা যাবে না। সেখানে আমরা ভিন্ন আরেকটি দেশের কোম্পানি।
দ্বিতীয়
যে সমস্যাটি হলো, সেখানে কোনো ম্যাপ ছিল না। কেউ কারো জমির সীমানা সম্পর্কে জানেও না। কাউকে যদি বলতাম আপনার জমি কতোটুকু, তখন তিনি হাত দিয়ে দেখাতেন ‘ওই পাহাড় পর্যন্ত’!
তৃতীয় সমস্যা হলো, তাদের মধ্যে থেকে একজনও যদি বলেন জমি বিক্রি করবেন না তাহলে কেউ জমি বিক্রি করতে পারবেন না। এই ধরনের সমস্যা একে একে আসতে লাগলো। এজন্য তখন প্রায়ই আমাকে সেখানে যাতায়াত করতে হয়েছে।
এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠার পর দেখা দিলো নতুন আরেক সমস্যা। জমি বিক্রি করার কয়েকটা ধাপ রয়েছে, প্রথম আদিবাসীরা রাজি হলেন। পরে এটা গেল মেঘালয় জেলা অফিসে। সেখান থেকে মেঘালয় রাজ্য সরকার। তাদের রাজ্যসভায় আলোচনা উঠলো। তারা বেঁকে বসলেন। বাংলাদেশের কোনো কোম্পানির কাছে তারা জমি বিক্রি করবেন না। ততোদিনে আমাদের চার বছর এর পেছনে ব্যয় হয়ে গিয়েছে। পরে মেঘালয় সরকার শর্ত দিল সেখানে কোম্পানি করতে হলে বাংলাদেশ থেকে ক্যাপিটাল পাঠাতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে তখন ক্যাপিটাল পাঠানো যেতো না। বাংলাদেশ ব্যাংকও বেঁকে বসলো। তাদেরকে বোঝালাম,
এটা যদি আমরা করতে পারি তাহলে আমাদের দেশে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ