English
ঢাকা, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রকাশঃ ২০২৬-০৭-২১ ১৯:৩৮:২০
আপডেটঃ ২০২৬-০৭-২২ ০০:২৯:১৪


ইরান: আঞ্চলিক শক্তি থেকে নতুন পরাশক্তির পথে

ইরান: আঞ্চলিক শক্তি থেকে নতুন পরাশক্তির পথে



খালেদ ইমতিয়াজ

 

মধ্যপ্রাচ্যের বদলে যাওয়া শক্তির ভারসাম্যে তেহরানের উত্থান

কাইহান বারজেগার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের আলোকে

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি যুদ্ধ কেবল সামরিক সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা বদলে দেয় পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য। সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি সংঘাত তেমনই একটি ঘটনা। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে এবং ইরানকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে এসেছে, যেখানে দেশটিকে আর শুধু একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়।

তেহরান এখন এমন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাব-নিকাশে পৌঁছে গেছে।

তবে প্রশ্নটি থেকেই যায়ইরান কি সত্যিই একটি নতুন আঞ্চলিক পরাশক্তি হয়ে উঠছে? নাকি এটি কেবল সাম্প্রতিক সংঘাতের সাময়িক ফল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বর্তমান যুদ্ধের বাইরে তাকাতে হবে। কারণ ইরানের শক্তির ভিত্তি শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এর পেছনে রয়েছে আড়াই হাজার বছরের সভ্যতার স্মৃতি, একটি শক্তিশালী জাতীয় পরিচয়, কৌশলগত ভূগোল, বিপুল মানবসম্পদ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রচিন্তা।


সাইরাসের সাম্রাজ্য থেকে আধুনিক ইরান: শক্তির দীর্ঘ ইতিহাস

ইরানের বর্তমান উচ্চাকাঙ্ক্ষা বোঝার জন্য ফিরে যেতে হয় খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকেপারস্যের রাজা সাইরাস দ্য গ্রেটের যুগে।

সাইরাস যখন ব্যাবিলন জয় করেন, তখন তিনি শুধু একটি সামরিক বিজয় অর্জন করেননি; তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এমন এক সাম্রাজ্যের ভিত্তি, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।

পারস্য সাম্রাজ্যের বিশেষত্ব ছিল কেবল ভূখণ্ড বিস্তার নয়। এর শক্তি ছিল প্রশাসনিক দক্ষতা, সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে একটি রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে ধরে রাখার ক্ষমতা।

সাইরাসের সময় থেকেই পারস্য রাষ্ট্র নিজেকে শুধু একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দেখেনি; বরং বৃহত্তর সভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করেছে।

এই ঐতিহাসিক স্মৃতি আধুনিক ইরানের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বেও গভীরভাবে কাজ করে। অনেক ইরানি মনে করেন, তাদের দেশ তার প্রকৃত ঐতিহাসিক অবস্থানের তুলনায় বর্তমানে একটি সীমিত ভূমিকায় রয়েছে।

রাজনৈতিক মতাদর্শ পরিবর্তিত হলেওরাজতন্ত্র থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র পর্যন্তএকটি বিষয় ধারাবাহিক থেকেছে: ইরানের একটি বড় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।


ভূগোল: ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভূগোল অনেক সময় সামরিক শক্তির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইরানের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে সত্য।

ইউরেশিয়ার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ইরান মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, ককেশাস এবং ভারতীয় উপমহাদেশের সংযোগস্থলে রয়েছে।

পশ্চিমে জাগরোস পর্বতমালা, উত্তরে আলবোরজ পর্বতমালা এবং পূর্বে মরুভূমি পাহাড়ি অঞ্চল ইরানকে একটি প্রাকৃতিক দুর্গে পরিণত করেছে।

ইরানের ভূগোলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ এই সংকীর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি বড় অংশ তাই সরাসরি ইরানের কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত।

এই বাস্তবতা তেহরানকে একটি অসাধারণ দরকষাকষির ক্ষমতা দিয়েছে।

সাম্প্রতিক সংঘাতেও ইরান দেখিয়েছে, প্রয়োজনে সে তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কূটনৈতিক সামরিক হাতিয়ারে পরিণত করতে পারে।


যুদ্ধের পর নতুন ইরান: প্রতিরোধের প্রথম রেখা দেশের ভেতরেই

দীর্ঘদিন ধরে ইরানের নিরাপত্তা কৌশলের মূল ভিত্তি ছিল দেশের সীমান্তের বাইরে একটি প্রতিরোধ বলয় তৈরি করা।

লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়া, ইরাক এবং ইয়েমেনের বিভিন্ন মিত্র গোষ্ঠীকে নিয়ে গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্ককে বলা হয়প্রতিরোধ অক্ষ

তেহরানের যুক্তি ছিলশত্রুকে নিজের ভূখণ্ডে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার আগেই তাকে মোকাবিলা করতে হবে।

কিন্তু সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি সংঘাত ইরানের কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে।

যুদ্ধ দেখিয়েছে, আঞ্চলিক মিত্রদের পাশাপাশি নিজস্ব ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে ইরানের প্রতিরক্ষা ধারণা দুটি স্তরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে:

প্রথমত, নিজস্ব ভূখণ্ডভিত্তিক প্রতিরোধ।

দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনে আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তা।

এই পরিবর্তন ইরানের কৌশলগত চিন্তায় একটি বড় রূপান্তর।


ইসরায়েলের একক আধিপত্যের ধারণায় ধাক্কা

গত কয়েক বছর ধরে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে নিজের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে আরও সুসংহত করার চেষ্টা করেছে।

বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবরের ঘটনার পর তেল আবিব মনে করেছিল, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য তার অনুকূলে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

কিন্তু ইরানের সঙ্গে সংঘাত সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

ইসরায়েলের আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বিমান শক্তি এবং পশ্চিমা সমর্থন থাকা সত্ত্বেও ইরান দেখিয়েছে যে তাকে সহজে উপেক্ষা করা যাবে না।

ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ কৌশলের মাধ্যমে তেহরান একটি কার্যকর পাল্টা ভারসাম্য তৈরি করেছে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির সমীকরণে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছেইসরায়েল আর একক প্রভাবশালী শক্তি নয়।


সামরিক শক্তি: দুর্বলতা থেকে নতুন কৌশলের জন্ম

ইরানের সামরিক শক্তির মধ্যে একটি বড় বৈপরীত্য রয়েছে।

একদিকে দেশটির প্রচলিত অস্ত্রভাণ্ডারের বড় অংশ পুরোনো। অনেক যুদ্ধবিমান, ট্যাংক সামরিক সরঞ্জাম শাহ আমলের অথবা ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়কার।

অন্যদিকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং অসমমিত যুদ্ধকৌশলে ইরান উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।

এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি।

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর গঠিত এই বাহিনী শুধু সামরিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি ইরানের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কাঠামোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও আইআরজিসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তবে এই কাঠামোর দুর্বলতাও রয়েছে। নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মধ্যে ক্ষমতা মর্যাদার প্রতিযোগিতা ইরানি রাষ্ট্রের একটি অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ।


অর্থনীতি: সম্ভাবনার সঙ্গে সংকট

ইরানের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্পদ হলো তেল গ্যাস।

১৯০৮ সালে তেল আবিষ্কারের পর থেকে জ্বালানি খাত দেশটির অর্থনীতির ভিত্তি।

শাহ আমলে তেলের আয় ব্যবহার করে শিল্পায়নের চেষ্টা করা হয়েছিল। ইস্পাত, রাসায়নিক শিল্প, তামা এবং পারমাণবিক শক্তির মতো খাতে বড় বিনিয়োগ করা হয়।

কিন্তু ইসলামি বিপ্লব, দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ইরানের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

বর্তমানে ইরানের অর্থনীতির প্রধান সমস্যা:

  • তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা,
  • আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের অভাব,
  • নিষেধাজ্ঞাজনিত সীমাবদ্ধতা,
  • এবং দক্ষ জনশক্তির বিদেশমুখী প্রবণতা।

তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ইরান নিজস্ব শিল্পভিত্তি গড়ে তুলেছে।

গাড়ি উৎপাদন, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেশটি উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা দেখিয়েছে।


চীন, ভারত নতুন আন্তর্জাতিক ভারসাম্য

আন্তর্জাতিকভাবে ইরান দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা চাপের মুখে রয়েছে।

তবে এই বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও তেহরান নতুন অংশীদার তৈরি করেছে।

চীন এখন ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। বিপুল পরিমাণ ইরানি তেল ক্রয় করে চীন দেশটির অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

২০২১ সালে দুই দেশ ২৫ বছরের কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে।

ভারতও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে, বিশেষ করে চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের সুযোগের কারণে।

এই সম্পর্কগুলো দেখায় যে ইরান কেবল পশ্চিমের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি বহুমুখী আন্তর্জাতিক অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছে।


 

ইরানকে আর উপেক্ষা করা যাবে না

ইরান হয়তো এখনো যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা রাশিয়ার মতো বৈশ্বিক পরাশক্তি নয়।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির মানচিত্রে দেশটি এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে তাকে বাদ দিয়ে কোনো বড় কৌশল তৈরি করা সম্ভব নয়।

সাইরাসের সাম্রাজ্যের স্মৃতি, আধুনিক ভূরাজনীতি এবং সামরিক সক্ষমতার সমন্বয়ে ইরান একটি নতুন পরিচয় নির্মাণ করছে।

আগামী দিনে ইরান সত্যিকারের পরাশক্তি হবে কি না, তা নির্ভর করবে তারা তাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে কি না এবং আরো কিছু ফ্যাক্টরের ওপর।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত:

ইরান এখন আর কেবল মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ নয়; এটি এমন এক শক্তি, যার সিদ্ধান্তের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতিতেও অনুভূত হবে।

 

 

 লেখক পরিচিতি:

খালেদ ইমতিয়াজ: কলামিস্ট  

 


ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি,
সাবক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক,


আরো পড়ুন