
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান
তারা জানে আপনার নাম, ফোন নাম্বার, কোথায় আপনি থাকেন, আপনার কেনার ক্ষমতা ও আগ্রহের বিষয় এমনকি আগামীতে আপনি কোন জিনিসগুলো কিনতে চাইবেন- যা হয়তো এখনো আপনি নিজেই ভাবেন নি!
‘অ্যাকজিওম’ নামটি হয়তো আপনার কাছে অজানা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আপনার নাম-পরিচয় কিন্তু তাদের জানা! অ্যাকজিওম সম্পর্কে বলা হয়, ‘সবচেয়ে বড় কোম্পানি যার নাম আপনি জানেন না’। অ্যাকজিওম হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ডেটা ব্রোকারিং ফার্ম। যাদের কাজ মূলত সোশাল মিডিয়া এবং অন্যান্য মাধ্যম থেকে আপনার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে তার বিশ্লেষণ ও ফলাফল বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের কাছে বিক্রি বা সরবরাহ করা। অ্যাকজিওমের মতো এমন একশোর ওপর প্রতিষ্ঠান আছে; যারা আপনার ব্যক্তি জীবন সম্পর্কে সব তথ্য সংগ্রহ করছে। আপনার চলাচল এবং কর্মকাণ্ডকে নজরদারি করছে।
অ্যাকজিওমের এক
বছরের আয় এক
বিলিয়ন ডলারের বেশি। এই আয় করেছে তাদের ‘অ্যানালিটিকাল সার্ভিস’ বাবদ। যার মাধ্যমে ১৪৪ মিলিয়ন বাড়ির খবর তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করেছে। এটা একটি খণ্ডিত হিসাব। সারা বছরে এই তথ্য কেনাবেচা হয় ৩০০ বিলিয়ন ডলার এবং এই ব্যবসায় এখন শুধু আমেরিকাতে ত্রিশ লাখ মানুষ কর্মরত আছেন। ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইন্সটিটিউট সেই হিসাবই জানাচ্ছে।
অ্যাকজিওমের চিফ একজিকিউটিভ অফিসার স্কট হাও কথা বলেন সিএনএনের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘আমাদের মতো কোম্পানিগুলো কাঙ্খিত মানুষটি কেমন, তার বিস্তারিত তথ্য, তিনি কোন বিষয়ে আগ্রহী হবেন বা কী কিনতে চাইবেন- সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করি। এরপর আমরা তাকে বিশ্লেষণ করে ঠিক করি তাকে কোন ধরনের প্রডাক্টের অফার পাঠাবো এবং কোন জিনিস কিনতে তিনি ভবিষ্যতে আগ্রহী হবেন। আমরা যে তথ্য সংগ্রহ করি তা যথাযথ, নিরাপদ এবং বৈধ।’
স্কট জানান ফরচুন ঘোষিত সেরা ৫০০ কোম্পানি থেকে শুরু করে ছোট কোম্পানি পর্যন্ত সবাইকেই তারা তথ্য সরবরাহ করেন। এই সব বিগ ডেটা কোম্পানিগুলো তাদের ক্লায়েন্টদের কাছে ব্যক্তির সকল তথ্য বিক্রি করেন যাতে তাদের বিজ্ঞাপন দিতে কোনো অনুবিধা না হয়। তিনি মনে করেন না পৃথিবীতে ‘এমন কোনো ব্যক্তি আছেন’ যিনি ডেটা ব্যবহার করে ‘জনগণ ও ব্যবসার এই যৌথ উপকার’ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলবেন।
স্কট আরো বলেন, এসব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এক ধরনের শিক্ষার বিস্তার ঘটছে। বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করে তারা ব্যবসার প্রাণ রক্ষা করছেন বলে তিনি মনে করেন। তিনি অবলীলায় জানান, ‘আমরা বিভিন্ন কনটেন্টের তথ্য, স্থান কাল এবং কাঙ্খিত ব্যক্তির সকল কর্মকাণ্ড থেকে তথ্য সংগ্রহ করি। তারপর এই সব তথ্যের বিশ্লেষণ করে একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি করি যাতে ক্রেতা কী চায় তা পরিপূর্ণভাবে ফুটে ওঠে।
এই ধরনের ডেটা ব্রোকারিং কোম্পানিগুলোর সমালোচকরা বলেন, সাধারণ মানুষরা বুঝতেই পারেন না তাদের কতো গোপন তথ্য হাতিয়ে নিয়ে এই কোম্পানিগুলো ব্যবসা করছে। নিজস্ব গোপনীয়তা বলতে কিছুই থাকছে না।
গোপনীয়তা
বিশেষজ্ঞ সারাহ ডোনি বলেন, ‘মুদ্রার অপর দিকটি হলো, তারা আপনার ভার্চুয়াল জগতের সকল তথ্য নিয়ে বাস্তব জগতের আপনাকে পরিচালিত করছে।’
ডেটা ব্রোকাররা যে সব তথ্য সংগ্রহ করে তার মধ্যে আছে:
নাম, বয়স, লিঙ্গ
ছবি
জন্মদিন
বর্তমান
ও আগের ঠিকানা
মোবাইল
নাম্বার
ইমেইল
বৈবাহিক
অবস্থা
সন্তানের
নাম ও বয়স
মালিকানাধীন সম্পদের বিবরণ
বাড়ি ভাড়া না নিজের মালিকানধীন
ফ্ল্যাটের
মাপ
রাজনৈতিক
কর্মকাণ্ড
আয়ের বিবরণ
শিক্ষা
ও অন্যান্য তথ্য
আরো যেসব তারা সংগ্রহ করে তার মধ্যে বিয়ে, ডিভোর্স, সন্তান, সম্পর্কসহ নানা তথ্য।

গোপনীয়তার নেই মালিকানা
ব্যক্তির
তথ্য সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে- ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, জিমেইল, ইয়াহুসহ বিভিন্ন সোশাল মিডিয়া। পৃথিবী জুড়েই ফেসবুকের গ্রাহক ছড়িয়ে আছে। এ কারণে গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য ফেসবুক সব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পছন্দ! ২০১৮ সালের এক হিসাব অনুসারে দুই বিলিয়নের বেশি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করছেন। প্রতিদিন একশ পনের কোটি মানুষ তাদের মোবাইল ফোনে ফেসবুক ব্রাউজ করছেন; যা মোবাইলে প্রদর্শিত বিজ্ঞাপন আয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৮ সালের প্রথম তিন মাসে ফেসবুকের বিজ্ঞাপন বাবদ আয় হয়েছে ১১ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার। ২৪ থেকে ৩৪ পর্যন্ত বয়সীরা সবচেয়ে বেশি ফেসবুক ব্যবহার করেন। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের শতকরা ৫০ জনই ঘুম থেকে উঠে প্রথম যে কাজটি করেন তা হলো ফেসবুক ব্রাউজ করা। ব্যবহারকারীরা প্রতিবার ফেসবুকে লগইন করলে গড়ে ২০ মিনিট করে সময় কাটান। ফেসবুকে প্রতি ৬০ সেকেন্ড বা এক মিনিটে ৫,১০,০০০ কমেন্টস পোস্ট করা হয়, ২,৯৩,০০০ স্ট্যাটাস আপডেট হয় এবং ১,৩৬,০০০ ছবি পোস্ট করা হয়। ৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন কনটেন্ট প্রতিদিন শেয়ার করা হচ্ছে। ফেসবুকে কমপক্ষে আট কোটি ত্রিশ লাখ অ্যাকাউন্ট জাল বা ভুয়া। যে ব্যক্তিদের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। সংখ্যার হিসাবে জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশের জনসংখ্যার চেয়েও ফেসবুকের ভুয়া অ্যাকাউন্টধারীর সংখ্যা বেশি।
এতো তথ্য যাকে এখন ‘বিগ ডেটা’ বলা হয়, এই সব তথ্য নিয়েই নানামুখী ব্যবসা করছে ফেসবুক। ব্যক্তি