
ডা.
আতাউর রহমান
[সুস্থ ও তারুণ্যদীপ্ত দেহ-মনের জন্যে বহুলাংশে প্রয়োজন একটি জোরদার ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা। আর এই দেহ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তুলতে চাই আমাদের সচেতন প্রচেষ্টা। দৈনন্দিন জীবনঅভ্যাসে নিতান্তই ছোট ছোট কিছু পদক্ষেপ আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে করে তুলতে পারে অধিকতর কার্যকরী। তেমনই কিছু করণীয় ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হবে স্বাস্থ্যবিষয়ক এই রচনায়।]
পর্ব:
৩

৭. কফি : চুমুকে চুমুকে তৃপ্তি যত, ক্ষতিও কিছু কম নয়
কফির জনপ্রিয়তা বিশ্বজোড়া। পৃথিবীজুড়ে দিনে কত কোটি কাপ কফি পান করা হয়, সে হিসেব মেলাতে ঝানু পরিসংখ্যানবিদের সহযোগিতা লাগবে নিশ্চিত; তবে আপতত এটুকু জেনে রাখুন—এই পানীয়টি আপনার দেহ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে ততটা অনুকূল নয়। তাই কফি পানের পরিমাণ সীমিত রাখুন।
কফি আপনাকে সাময়িকভাবে চাঙ্গা করে ও আপনার কর্মতৎপরতা বাড়ায়, হয়তো বাড়ায় কিছুটা মনোযোগও। সদ্য নিঃসরিত ডোপামিন হরমোনের প্রভাবে দেহ-মনে একটা ভালো লাগাও তৈরি হয় বটে, কিন্তু স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, কফির মূল উপাদান হলো ক্যাফেইন, যা একদিকে যেমন আসক্তি সৃষ্টিকারী, অন্যদিকে তেমনি সুস্বাস্থ্যের জন্যে ভিটামিন-মিনারেল্সের মতো দরকারি কোনো উপাদানও নেই এতে। উপরন্তু, ক্যাফেইন আপনার শরীরকে পানিশূন্য করে। সেইসাথে হাড় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ক্যালসিয়াম এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কিছু প্রয়োজনীয় উপাদানও শরীর থেকে বের করে দেয়!
অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণের দরূন নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আপনার স্বাভাবিক দেহ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সত্যি বলতে কী, মাত্রাতিরিক্ত ক্যাফেইন নানা শারীরিক জটিলতারও কারণ, যেমন : উচ্চ রক্তচাপ, ভঙ্গুর হাড়, ব্রণ, ওজনাধিক্য, বুক ধড়ফড়, ঘুমের সমস্যা এবং অকারণ বিরক্তি ও অস্বস্তি।
অতএব, কফি পান যদি পুরোপুরি বাদ দিতে না চান কিংবা না পারেন, সেক্ষেত্রে দিনে এক কাপ চলতে পারে। দু-কাপের বেশি তো কখনোই নয়। তবে দিনে যত কাপ কফি পান করছেন, হিসেব করে ঠিক তত গ্লাস অতিরিক্ত পানি পান করুন। কফি পান-জনিত ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা রোধে এটি জরুরি। এ-ছাড়াও গর্ভধারী মহিলা, শিশু, হৃদরোগী, পেপটিক আলসারের রোগী ও বয়োবৃদ্ধদের জন্যে কফি পানে বিশেষ সতর্কতা বাঞ্চনীয়। আর সারা দিনে হয়তো সবমিলিয়ে এক কাপ কফিই পান করলেন, কিন্তু কাপের আকার ও কফির পরিমাণের ব্যাপারে সচেতন থাকুন।
মাত্রাতিরিক্ত কফি পানে অভ্যস্ত হয়ে থাকলে এর পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনাই হবে আপনার জন্যে বুদ্ধিমানের কাজ। এটা করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রথমদিকে কিছুটা অস্বস্তি-অসুবিধা বোধ হতেই পারে, যেমন : মাথাব্যথা কিংবা আবার ঘুম ঘুম ভাব ইত্যাদি। নিশ্চিত থাকুন, ক্যাফেইন উইথড্রল ইফেক্টজনিত এসব উপসর্গের স্থায়িত্ব বড়জোর দুই কী তিন দিন। সুতরাং ভয় নেই।
মনে রাখা দরকার, দুনিয়াজুড়ে বহু মানুষের কাছে চা-কফিই হয়তো ক্যাফেইনের প্রধান উৎস, কিন্তু ক্যাফেইনসমৃদ্ধ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য ও দাওয়াই, যেমন : কোমল পানীয়, চকলেট, ঠাণ্ডা-সর্দি কিংবা মাথাব্যাথার ওষুধ সেবনও আপনার দৈনিক ক্যাফেইন গ্রহণের মাত্রা অনেকখানি বাড়িয়ে দিতে পারে। এক্ষেত্রেও সচেতনতা জরুরি।

৮. চিনিকে ‘না', না মানে না :
সামনে রাখা আছে একটি লোভনীয় চকলেট বার কিংবা কোমল পানীয়ের একটি ক্যান, নয়তো ভরপুর চিনিতে তৈরি কোনো খাবার। মুখে পুরে দেয়ার অপেক্ষা শুধু। একটু থামুন! তার বদলে হাতে তুলে নিন কোনো একটা তাজা মৌসুমী ফল। নয়তো প্রাকৃতিক যে-কোনো খাবার।
তথ্যটা এখন স্বাস্থ্যসচেতন মানুষদের বেশ ভালোই জানা যে, শরীরে (এমনকি মনের ওপরও) চিনির রয়েছে বহুবিধ নেতিপ্রভাব। চিনি মানে সোজাসাপ্টা ‘বিষ! শরীরের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপরই চিনির নির্মম আগ্রাসনের ব্যাপারে স্বাস্থ্যবিদরা আজ নিঃসন্দেহ। আরো জেনে রাখুন, আপনার ইমিউন সিস্টেমের ওপর চিনির ক্ষতিকর প্রভাবটা বেশ আশঙ্কাজনক। ধরুন, এক বোতল/ ক্যান কোমল পানীয় আপনি পান করছেন দারুণ তৃপ্তিসুখে, কিন্তু চিনির পরিমাণ এতে কতটা জানেন? কমপক্ষে ১০০ গ্রাম, যা প্রায় আট চামচ চিনির সমপরিমাণ! হলোই বা, ক্ষতি কী? দাঁড়ান, বুঝিয়ে বলছি।
আমাদের রক্তের শ্বেতকণিকার অন্যতম প্রধান কাজ হলো, দেহাভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা বিভিন্ন প্রাণঘাতী জীবাণুর বিরুদ্ধে একটি শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আর কৃত্রিম খাবার ও পানীয়তে থাকা এই বিপুল পরিমাণ চিনি রক্তের শ্বেতকণিকার কর্মক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে শতকরা ৪০ ভাগ পর্যন্ত! ফলে আপনার রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে বহুগুণে।
এ-ছাড়া চিনি খাওয়ার আধঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তা আপনার দেহ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আক্রমণ করে। আর এ আগ্রাসন বলবৎ থাকে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অবধি। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার, উচ্চ চিনিযুক্ত খাবার গ্রহণে রক্তে শর্করার স্বাভাবিক ভারসাম্য এলোমেলো হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাতে ব্যাহত হয় আপনার মানসিক উদ্যম। বাড়ে অবসাদগ্রস্ততা। এর ফলশ্র