ডা. নিজামউদ্দিন আহমদ
ছেলেবেলা থেকেই আগ্রহ ছিল চিকিৎসক হওয়ার। যদিও মায়ের অনাগ্রহে আরেকটি শখ পাইলট হওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে তার পড়াশোনা। বিভিন্ন কাজের জায়গা ঘুরে দায়িত্ব পান সে সময়ের পিজি হসপিটাল, বর্তমান শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়- বিএসএমএমইউ-এর এনেসথেসিয়া বিভাগে। এই বিষয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন, এমডি, এফসিপিএস করেন। চার বছর ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিটের কনসালটেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালে প্যালিয়েটিভ কেয়ার বিষয়ক একটি বই পান এক বিদেশি বন্ধুর কাছ থেকে। বিষয়টি সম্পর্কে তার আগে ধারণা ছিল না। সেই বন্ধু তাকে প্যালিয়েটিভ কেয়ারে অভিজ্ঞ কয়েকজনকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এই ঘটনা তার জীবন চিন্তা বদলে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি কেরালায় ছয় সপ্তাহের একটি কোর্স করেন ২০০৫ সালে। সেই শুরু। তারপর থেকে তার ধ্যান জ্ঞান হয়ে পড়ে প্যালিয়েটিভ কেয়ার। আরোগ্য অযোগ্য মরণঘাতী রোগাক্রান্ত মানুষ, যার পরিণতি নিশ্চিত মৃত্যু- সেই মানুষটির সেবা, যত্ন করাই হলো প্যালিয়েটিভ কেয়ার। ডা. নিজামউদ্দিন-এর উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিট। যা বর্তমানে সেন্টার ফর প্যালিয়েটিভ কেয়ার নামে একটি পূর্ণাঙ্গ বিভাগে পরিণত হয়ে। তিনি এই বিভাগের প্রথম অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান । পাশাপাশি প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটি অফ বাংলাদেশ (পিসিএসবি) নামে যে সামাজিক সংগঠনটি গড়ে উঠেছে তার উদ্যোক্তা তিনি। বান্দরবানের লামায় কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন পরিচালিত হসপিটাল ‘শাফিয়ান’-এ প্যালিয়েটিভ কেয়ার ওয়ার্ডের যে কার্যক্রম তার নামকরণ হয়েছে ডা. নিজামউদ্দিন আহমদের নামে। ‘মমতাময় নারায়ণগঞ্জ’, ‘মমতাময় কড়াইল’ সহ বিভিন্ন এলাকায় প্যালিয়েটিভ কেয়ার সুবিধা পৌঁছে দিতে নিরলস কাজ করছেন ডা. নিজামউদ্দিন আহমদ। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে ডা. নিজামউদ্দিন -এর সংসার। বিপরীত স্রোত সম্পাদক মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামানের সঙ্গে আলাপচারিতার উঠে এসেছে জীবন ও কাজ নিয়ে নিয়ে তার ভাবনার কথা।

আমি যখন পেছন ফিরে তাকাই তখন আমার ছেলেবেলার পরিবারের সঙ্গে আমার এখনকার পরিবারের মূল্যবোধ, ভালো লাগা, আনন্দ সব কিছুতেই বেশ অনেকটা পার্থক্য খুঁজে পাই। সেই দিনগুলোর কথা মনে করতেই বেশি আনন্দ পাই। আমার বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। মা, ছয় বোন এবং আমি এক ভাই। তখন হয়তো সপ্তাহে একদিন মাংস রান্না হতো, কখনো তাও নয়। বাবা যেদিন বেতন পেতেন সেদিন জিলাপি বা অন্য কিছু নিয়ে আসতেন। তখন চিন্তায় থাকতাম কীভাবে একটি জিলাপি একটু বেশি পাওয়া যায়! তখন আমাদের অনেক কিছুই ছিল না। কিন্তু আনন্দ ছিল।
আমার বাবা একজন সাধারণ সৎ মানুষ ছিলেন। তখন বিষয়টি আমাদের কাছে তেমন তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না। কারণ বাবা সৎ থাকবেন এবং সে জন্য আমাদের কিছুটা অভাব থাকবে, কিছু আনন্দ থাকবে- বিষয়টি আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক ছিল। মনে আছে, একবার আমার বাবা ঢাকায় এসে গুলিস্তানে চৌ চিন চো-তে চায়নিজ খবার খেয়ে গিয়েছিলেন। সেটা আমাদের পরিবারে আলোচনার বিষয় ছিল। এখন আমার মেয়েদের যখন চায়নিজ খাবারের কথা বলি তারা যেতে আর আগ্রহী হয় না। কারণ এটা তাদের কাছে সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
এখন সমাজে এতো কিছু ঘটছে যেখানে আমরা প্রতিবাদও করি না, আবার ভালো মতন আনন্দও করতে পারি না। কোথাও যেন গুণগত পার্থক্য আছে। এখনো হয়তো সব ঠিক আছে। কিন্তু তখন এতো মানসিক চাপ ছিল না। মূল্যবোধ ভিন্ন ছিল। কাজের জন্য ছুটোছুটি ছিল না। কোথায় যেন একটা স্বস্তি ছিল। হয়তো তখন অর্থ কম ছিল। মানবিক মূল্যবোধ ও মানবিক সম্পর্কের জায়গাটিতে কেমন যেন একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
প্যালিয়েটিভ কেয়ার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মানবিক বিষয়টি আবার প্রধান হয়ে ওঠে। ভারতের কেরালায় ছয় সপ্তাহের কোর্স করতে গিয়ে গভীর পরিচয় ঘটে ইনস্টিটিউট অফ প্যালিয়েটিভ মেডিসিনের ডিরেক্টর সুরেশ কুমারের সঙ্গে। সেখানে প্রথমে আমি অনেক কিছুই বুঝতে পারেন নি। কারণ এভাবে কেউ কখনো কথা বলেন নি, কেউ কখনো ভাবতে বলেন নি!
কেরালায় প্যালিয়েটিভ কেয়ার একটি সামজিক আন্দোলন হিসাবে শুরু হয় ১৯৮৫ সালে। এর অন্যতম উদ্যোক্তা ড. সুরেশ কুমার। তিনি সামাজিক আন্দোলন হিসাবে এই ধারণাটিকে দাঁড় করালেন। যা এখন ‘কেরালা মডেল’ হিসাবে সারা পৃথিবীতে পরিচিত। তিনি শুরুতে স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করে তাদের মাধ্যমে কাজটি করতে চাইলেন। তিনি বললেন এটি একটি সামাজিক সমস্যা। সমাজ এই সমস্যার দায়িত্ব নেবে। চিকিৎসক এবং নার্সরা এর চিকিৎসার ভাগটি দেখবেন। স্বেচ্ছাসেবকরা দেখবেন রোগীদের কী প্রয়োজন। তার কি অর্থ সংকট। না সঙ্গীর সংকট। কেরালার বিভিন্ন জায়গায় দুশো আড়াইশ ক্লাবের মতো করে তারা কাজ করেন যেখানে সাধারণ মানুষ বিষয়টি বোঝে, লালন করে এবং এগিয়ে নিয়ে যায়।
যারা এই ধারণার জন্ম দিয়েছেন তারা সব সময় বলেন, একটি মমতাময় নগরের কথা যেখানে মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের সেবায় সবাই দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসবে। এর মৌলিক নীতিমালা মেনে চলবে। বিষয়টি দৈনন্দিন কাজের অংশ। এখানে বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন ততোটা জরুরি নয়।
২০০৫-এ আমি দেশে ফিরে আসার পর যখন মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের স্বজনদের প্রতি আমার সহকর্মীদের বলতে শুনতাম, ‘আর কিছু করার নেই, বাড়ি নিয়ে যান’, তখন আমার মধ্যে কাজ করতো আরো অনেক কিছু আসলে করার আছে। যদিও আমি নিজেও আগে এমনটাই বলতাম।

এক ধরনের অস্থিরতা নিয়ে এই ধরনের রোগী দেখা শুরু করলাম। তখন ভেতর থেকে তাড়না বোধ করলাম। মনে আছে, প্যালিয়েটিভ কেয়ারের মানসিকতা নিয়ে আমার প্রথম রোগী ছিলেন একজন ৪০/৪৫ বছরের বস্তির মহিলা। তার ব্রেস্ট ক্যান্সার। সেখানে ঘা হয়ে গিয়েছে। তার স্বামী একজন সবজি বিক্রেতা। তিনি শুনেছেন দুই তিন হাজার টাকা দিতে পারলে একটা ইনজেকশন দেয়া যায় যেটাতে তার স্ত্রীর কেমোর কাজ হবে। তিনি