বাংলাদেশে টেলিভিশন জগতে মোস্তাফা কামাল সৈয়দ (৭৪) একটি স্থায়ী অবস্থান তৈরি করে নেন। সম্প্রতি ৩১ মে ২০২০ ঢাকায় করোনা আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রায় জন্মলগ্ন থেকে তিনি এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। ঢাকায় টিভি স্টেশন শুরুর কাছাকাছি সময় থেকেই ক্যারিয়ার হিসাবে বেছে নেন টেলিভিশনকে। বিভিন্ন সময় তিনি প্রডিউসার, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, জেনারেল ম্যানেজার, ডিরেক্টর-ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস এবং ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল (প্রোগ্রাম) পদে দায়িত্ব পালন করেন। টিভির আগে রেডিওতে নিয়মিত অনুষ্ঠান এবং নাটকে অভিনয় করতেন তিনি। মোস্তাফা কামাল সৈয়দ মৃত্যুর আগে পর্যন্ত জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল এনটিভির অনুষ্ঠান প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। একজন পারফেকশনিস্ট এবং কাজের বিষয়ে তার সিনসিয়ারিটির জন্য তিনি সব মহলেই সম্মানিত। বিটিভির ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার অংশ তিনি ছিলেন। সাত বছর আগে ২০১৩ সালে তার এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান। আজো এটি সমান ভাবে অর্থবহ মনে করায় নতুন করে বিপরীত স্রোতে প্রকাশ করা হলো।
আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করা উচিত
-মোস্তাফা কামাল সৈয়দ
ছবি: লেখক
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান:
টেলিভিশনের সঙ্গে আপনি জড়িয়ে আছেন প্রায় পাঁচ দশক। এর আগে রেডিওতে কাজ করেছেন। সেই সময়টায় আপনার প্রস্তুতি সম্পর্কে কিছু বলুন।
মোস্তাফা কামাল সৈয়দ: ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে এদেশে টেলিভিশন আসে। আমি দর্শক হিসাবে প্রথমে টেলিভিশন দেখি ছাত্র অবস্থায়। তবে ছাত্র অবস্থাতেই বেতারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। আমি তখন ভয়েস কাস্ট করতাম এবং বেতার নাটকে অভিনয় করতাম। টেলিভিশনে কখনো কাজ করবো সেটা কিন্তু তখনো ভাবিনি। টেলিভিশনকে ক্যারিয়ার হিসাবে নেয়ার সময়ও টেলিভিশন সম্পর্কে যে খুব ভালো ধারণা ছিল, তা নয়।
তখন রেডিও ছিল প্রধান বিনোদনের মাধ্যম। আমার বাবা বেতারে কাজ করতেন। আমি নিয়মিত রেডিও শুনতাম। রেডিওতে যে ঘোষণাগুলো হতো সেটা বাংলা বা হিন্দি যে ভাষাতেই হোক আমার খুব ভালো লাগতো। আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম, এটা আমি করতে পারি কিনা। তখনো টেপ রেকর্ডার আসে নি। অডিও ক্যাসেটের আগের ভার্সন একটু বড় আকারের সেভেন অ্যান্ড হাফ ইঞ্চি স্পুন দিয়ে রেকর্ড করা হতো। আমি তাতে নিজে নিজে রেকর্ড করে দেখতাম কেমন লাগে। আমি প্রতি সকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পাঠ করতাম, রেকর্ড করে শুনতাম কেমন হচ্ছে।
উচ্চারণের বিষয়ে আমি সব সময় সচেতন থাকার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন সময় সংবাদ পাঠের পাশাপাশি অনেক ধারা বর্ণনা দিয়েছি। তখন সবসময় প্রডিউসারকে বলে রাখতাম কোনো উচ্চারণে ভুল করে ফেললে যেন তা ঠিক করে দেয়া হয়। এখন আমার মেয়ে রেহনূমা কামাল আহমেদ বেতারে, টেলিভিশনে এবং বিবিসিতে খবর পড়ে। আমার ভালো লাগে। তার সঙ্গে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করি।
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান:
রেডিওতে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল।
মোস্তাফা কামাল সৈয়দ: আগ্রহের কারণেই ছাত্র অবস্থাতে রেডিওতে অডিশন দিলাম। বেতারে শিক্ষামূলক একটি অনুষ্ঠানে কথিকা পাঠ করে আমার ক্যারিয়ার শুরু করি। বেতারে অভিনয় করা যায় কিনা - এরপর এই চিন্তা কাজ করলো। তখন নিয়ম ছিল অডিশনে টিকলে সরাসরি নাটকে অংশ নেয়ার আগে ‘জীবন্তিকা’-তে অভিনয় করতে হবে। এটি ছিল দশ মিনিটের উন্নয়নমূলক বিষয় নিয়ে নাটিকা। এগুলো ছিল লাইভ। প্রথম জীবন্তিকা যেটাতে অংশ নিলাম সেখানে অভিনয় করেন লায়লা হাসান এবং কাফি খান। এরপর প্রথম নাটক করি হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের গল্প নিয়ে নাটক ‘অসুন্দর’। আমার বিপরীতে অভিনয় করেন হেনা কবীর। এরকম অসংখ্য নাটকে অভিনয় করি। এগুলো টেলিভিশনে চাকরি নেয়ার আগের ঘটনা।
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান:
টেলিভিশনে চাকরি নেয়ার আগেই আপনি সেখানে সংবাদ পাঠ করতেন। শুরুর সময়টা সম্পর্কে কিছু বলুন।
মোস্তাফা কামাল সৈয়দ: ঢাকায় টেলিভিশন যখন আসে তখন সংবাদ পাঠের অডিশন দিই এবং পাশ করি। সেসময় হুমায়ূন চৌধুরী কাজ করতেন। বেশ কয়েকদিন টেলিভিশনের মূল খবর পাঠ করি। এটা অবশ্য অনেকে জানেন না। তখন মুস্তাফা মনোয়ার, আবদুল্লাহ আল মামুন ছিলেন। তাদের সঙ্গে আগে থেকে পরিচয় ছিল। এই সময়টায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের পক্ষ থেকে প্রডিউসার চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলে বাবার অনুপ্রেরণায় আবেদন করি। ইন্টারভিউ বোর্ডে জামিল চৌধুরী, কলিম শরাফী, কাইয়ূম চৌধুরী ও তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কলিমুল্লাহ সাহেব ছিলেন।
১৯৬৬ সালের নভেম্বরে নির্বাচিত হয়ে প্রশিক্ষণ নিতে আমাদের রাওয়াল পিন্ডিতে সেন্ট্রাল টেলিভিশন ইন্সটিটিউট পাঠানো হয়। এটা ছিল তখন জার্মান অর্থায়নের প্রজেক্ট। আমার সঙ্গে মোস্তাফিজুর রহমানও ছিলেন। চার মাস ট্রেনিংয়ের পর ১ এপ্রিল ১৯৬৭ সরাসরি প্রোডিউসার হিসাবে নিয়োগ পাই। ইসলামাবাদ স্টেশন প্রতিষ্ঠার পর সেখানে ‘পূর্ব পাকিস্তান সংবাদ’ নামে প্রতিদিন বাংলায় পাঁচ মিনিটের খবর হতো। আমি সেটা নিয়মিত পাঠ করি। সেখানে এক মাস কাজ করার পর আমাদের অপশন দেয়া হলো সেখানে থেকে যাবো, না ঢাকায় আসবো। আমি ঢাকায় চলে আসি।

৭০-এর নির্বাচনে ফলাফল ঘোষণায় মোস্তাফা কামাল সৈয়দ
মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান:
ঢাকায় কাজের শুরুটা কীভাবে হলো?
মোস্তাফা কামাল সৈয়দ: আমার প্রথম টেলিভিশন প্রডাকশন ছিল একটি কুইজ প্রতিযোগিতা। তখন এটি উপস্থাপনা করতেন এনামুল হক। যিনি পরে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক হন। এ সময়টায় আমি বেশি গানের অনুষ্ঠান করেছি।

বরেণ্য শিল্পী রবিশঙ্কর যখন ঢাকায় বিটিভির অনুষ্ঠানে। মুস্তাফা মনোয়ারসহ মোস্তাফা কামাল সৈয়দ
আমি নিজে গান গাইতে না পারলেও গানের প্রতি আগ্রহ সবসময়। একবার কোনো সুর শুনলে সেটা মনে রাখতে পারি দীর্ঘ সময়। ‘সুরবিতান’অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে অনেক জনপ্রিয় গান দর্শকদের উপহার দিতে পেরেছি। এই অনুষ্ঠানের<