আবদুল্লাহ আল মোহন
নিজ লেখনীতে উদ্ভাসিত বরেণ্য
কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক। একজন আলোকিত মানুষ ও বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী কথাশিল্পী
আনোয়ারা সৈয়দ হক, যিনি সাহিত্য সৃষ্টিতে এক অনন্য জগৎ তৈরি করেছেন- যে অভিজ্ঞতা
আমাদের চেতনাকে শানিত করে। তার রচনা ভাবনাকে জাগিয়ে তোলে,
বিষণ্ণতাকে দূর করে, মানসিক সাহস বাড়িয়ে দেয়। বাংলা কথাসাহিত্যের ধীমান ও বিকল্প
চিন্তার এই সাহসী কথক কথাসাহিত্যের প্রায় সকল প্রাঙ্গনেই হেঁটেছেন। উপন্যাস,
ছোটগল্প, ভ্রমণসাহিত্য ছাড়াও শিশুকিশোরদের জন্য লিখেছেন প্রচুর। স্বতন্ত্র
স্বাক্ষরেই পাঠকের মনে আপন আসন দখল করে থাকা তার প্রকাশিত
গ্রন্থের সংখ্যা একশত ত্রিশটিরও অধিক মতোন। পেশায় তিনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং
সেখানেও খ্যাতিমান। তবে নিজের অস্তিত্বের জানান দিতেই যেনো হাতে তুলে নিয়েছিলেন
কলম। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের সহধর্মিণী হয়েও, নিজের একটি আলাদা ভুবন তৈরি
করেছেন তিনি লেখালেখিতে। ক্রমাগত নিজেকে অতিক্রম করার বাসনা আনোয়ারা সৈয়দ হকের। এই
চেষ্টাই একজন লেখকের আজীবনের সাধনা; এমনটাই মনে করেন তিনি। ফলে নিজের প্রতিটি
লেখাই আনোয়ারা সৈয়দ হকের কাছে সন্তানের মতো।
২.
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রী আনোয়ারা বেগম চৌধুরী সেই ষাটের দশকে সৈয়দ হকের প্রেমে পড়েন (তার একটি গল্প পড়েই), পরিণতিতে পরিণয়। তখন থেকেই তিনি আনোয়ারা সৈয়দ হক নামে পরিচিত হয়েছেন।

বিয়ের দিন সৈয়দ শামসুল হক ও আনোয়ারা সৈয়দ হক
কথাশিল্পের নানান শাখা গল্প,
উপন্যাস, প্রবন্ধ-গবেষণা, ভ্রমণকাহিনী, শিশু-কিশোর সাহিত্য, নারীবিষয়ক এবং
মনস্তত্বমূলক রচনায় অনন্যতার পরিচয় দিয়েছেন আনোয়ারা সৈয়দ হক। একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
হিসেবে তার রচনায় মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো তুলে ধরেছেন। সাহিত্যে বিশেষ
অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন নানা পুরস্কার ও সম্মাননা। মন ও মননের জীবনশিল্পী
আনোয়ারা সৈয়দ হক ১৯৪০ সালের ৫ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। প্রিয় সৃজনী কথাসাহিত্যিককে
জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে স্বজনদের কণ্ঠে সুর মিলিয়ে বলি, আপনি আরো অনেক পথ
হাঁটুন পৃথিবীর পথে। সর্বদা সচল থাকুক আপনার কলম। আপনি বেঁচে থাকুন আপন বৈভবে,
আমৃত্যু লেখালেখিতে আরও সমৃদ্ধ করুন বাংলা সাহিত্য।
৩.
অত্যন্ত কর্মঠ, হাসিখুশি প্রাণচাঞ্চল্যের ব্যক্তিত্ব
আনোয়ারা সৈয়দ হক। তার পরম সান্নিধ্যে প্রতিনিয়ত আলোড়িত, প্রাণিত হই। তার ভ্রমণকাহিনিও আমাকে তীব্র
টানে। এক্ষেত্রে সম্প্রতি পঠিত তার ‘ভ্রমণে আত্মকথন ও কবি এমিলি
ডিকিনসন’ অনবদ্য জীবনাদর্শের
স্মৃতিময় বইটির কথা বলতেই হয়। বাংলা কথাসাহিত্যের পরিচিত নাম আনোয়ারা সৈয়দ হকের
একটি কথা একজন শিক্ষক হিসেবে আমার ভীষণই পছন্দের, ‘ছেলেমেয়েদের
গাছের মতোন বড় হতে দিতে হবে। গাছের মতোন শিশুকে বেড়ে উঠতে দিলে সে প্রকৃত মানুষ
হিসেবে বড় হয়ে উঠবে। নীতিবোধকে গভীর প্রত্যয়ে মনে গেথে স্বাধীন মানুষ হিসেবে বড়
হতে সুযোগ দিতে হবে।’ মনোরোগ বিদ্যার প্রতি তার প্রবল মনোযোগও সাহিত্য
সাধনার নিবিড় নিবেদনের জন্যেই। সেই অভিজ্ঞতারই পরিচয় মেলে তার রচনাশিল্পে, সৃষ্টিতে। একজন গর্বিত বাঙালি হিসেবে
নিজস্বতা, স্বকীয়তাকে অন্তরে অকৃত্রিমভাবে লালন-পালন করেন, বিকাশে নিরলসও আছেন।
গভীর অসহায় এক নিঃসঙ্গতা আচ্ছন্ন করে ফেলা আমাদের কাছে তিনি আশাবাদের প্রদীপ
জ্বালান সৃজনী শব্দঘরে। নিজের
জীবনকে সাহিত্যে ব্যবহার করা, একজন
লেখকের ব্যক্তিজীবন তার সাহিত্যের বিষয় হয়ে ওঠা নিয়ে আনোয়ারা
সৈয়দ হক বলেছেন, সাহিত্য একটি সম্পূর্ণ
ভিন্ন উপাদানে তৈরি হয় বলে আমার ধারণা। জগৎ ও জীবন, বাস্তব অভিজ্ঞতা, বই পড়ার
অভিজ্ঞতা, নিজের ব্যক্তিগত শৈশবের অভিজ্ঞতা, প্রেম, ভালোবাসা, ঈর্ষা, ক্ষয়, ক্ষোভ,
মনোমালিন্য, রাজনীতি, যুদ্ধ- সবই লেখার উপজীব্য। তবে সাহিত্যে এর উপস্থাপন লেখকের
হাতের জাদুর ওপর নির্ভর করে।
৪.
আনোয়ারা সৈয়দ হক যশোরে জন্মগ্রহণ
করেন। তার বাবা প্রয়াত গোলাম রফিউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একজন
ব্যবসায়ী ও মা প্রয়াত আসিয়া খাতুন চৌধুরী একজন গৃহিনী। তার দূরন্ত শৈশব ও কৈশোর কাটে যশোরে। তার পাঠদানের
হাতেখড়ি হয় মায়ের কাছে। মোহনগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন
করেন। মধুসূদন তারাপ্রসন্ন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৭ সালে মাধ্যমিক ও ১৯৫৯ সালে
মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্কুল ও কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৫৯ সালে আনোয়ারা
ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে পড়তে চাইলেও তার বাবার আগ্রহে তাঁকে মেডিকেলে ভর্তি হতে হয়। ১৯৬৫ সালে তিনি এমবিবিএস পাস
করেন। পরে ১৯৭৩ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্য গমন করেন। তিনি সেখান থেকে ১৯৮২
সালে মনোবিজ্ঞানে এমআরসি (সাইক) ডিগ্রি লাভ করে দেশে ফিরে আসেন।
৫.
ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন দূরন্ত,
ডানপিটে, দুর্বিনীত এবং পরিবেশের প্রতি অন্যমনস্ক এক শিশু। অর্থহীন জীবনের অর্থ
খোঁজার প্রয়াসে তিনি পিছু নিতেন বেদে, হিজড়া, ফকির, ইরানী বেদে, সাপুড়ে এবং
কাবুলিওয়ালার। লেখাপড়ায় ছিলেন অমনোযোগী। তবে গল্পের বইয়ের ছিলেন পোকা। তা সত্ত্বেও
তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অনেক বছর ধরে শিক্ষকতা
করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ, মাদকাসক্ত নিরাময় হাসপাতাল এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য
ইনস্টিটিউটে। আর এই পেশাগত দক্ষতার কারণেই বুঝি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
হিসেবে তার রচনাগুলোতে মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো গভীর প্রত্যয়ে
সঠিকভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। নারী বিষয়ক এবং মনস্তত্ত্বমূলক রচনায় অনন্যতার পরিচয় দিয়েছেন আনোয়ারা সৈয়দ হক। এ বিষয়ে
তিনি অকপটে বলেছেন, নারীর মনস্তত্ত্ব নিয়ে আমি লিখেছি বটে, তবে পুরুষের মনস্তত্ত্ব
নিয়েও কম লিখিনি। যেহেতু আমি অনেক লিখেছি এবং নারীর কথা প্রায়ই লিখেছি, তাই এই লেখা
বেশি হয়েছে। আমি ছেলেবেলা থেকে নারীর দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, হতাশা এবং অহেতুক মারধরের
সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত, তাই এই সব লেখা বেশি হয়েছে। নারীর জীবনের অনেক হতাশা আছে,
যা শুরু হয় তার শৈশব থেকে, যখন সে দেখে সে বয়সে বড় হওয়া সত্ত্বেও
তার খাবারের পরিমাণ তার ছোট ভাইয়ের চেয়ে অনেক কম, তার হাত খরচের
পরিমাণ তার চার বছরের ছোট ভাইয়ের চেয়ে অনেক কম, তখন তার মনে প্রশ্ন জাগে, কেন? সেসব হতাশার ভেতর দিয়ে সাঁতার কেটে একজন মেয়েশিশুকে জীবনের পথে অগ্রসর হতে হয়। এসব অভিজ্ঞতা আমার লেখার ভেতরে
হয়তো জারিত হয়ে আমাকে নারীদের বিষয়ে বেশি মনোযোগী করে তুলেছে।
৬.
তার সাহিত্য শুধু সাহিত্য নয়, ব্যাপক অর্থে বাঙালির
জাতীয় ও ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন পর্বের আখ্যান। তিনি তার সাহিত্যে যেমন মুক্তিযুদ্ধ, নারী স্বাধীনতা, বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক
বিশ্লেষণ, বিদেশি সাহিত্যর আলোকধারা, শিশুদের বিকাশ তত্ত্ব প্রভৃতি এনেছেন বিচিত্র
ভাবনায়, যা ইতিপূর্বে বাঙালি সাহিত্যে তেমন ভাবে চোখে পড়ে না বলেই স্বীকার করে
থাকে সাহিত্য শিল্পসমালোচকগণ। ক’বছর আগে একটি বইমেলার উদ্বোধনী দিনে
কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক পাঠকের মুখোমুখি হয়ে তার
সহাস্য উত্তর ছিলো, ‘২৪-২৫ বছর বয়সে যখন সঙ্গে সৈয়দ শামসুল হকের দেখা হয়
তখন আমার ব্যক্তিত্ব পরিপূর্ণ বিকশিত এবং তখন আমি এক স্বকীয় সত্তা। ১৩-১৪ বছর বয়স
থেকেই আমি লিখি এবং তখন থেকেই আমার লেখা কচিকাঁচার আসরে পাঠ করা হতো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশুতোষ রচনাকারীর মধ্যে আমার নাম বলা হতো। সৈয়দ শামসুল হক আমার
স্বামী বটে। আমরা ঘর-সংসার করি, ঝগড়া করি কিন্তু লেখার ভুবনে একক এবং অনন্য আমরা
দুজন। আমাদের দুজনের লেখার মধ্যে আকাশপাতাল তফাত।’
একসময় তার নাম ছিল আনোয়ারা বিবি চৌধুরী। তিনিই হলেন আনোয়ারা
সৈয়দ হক। নামের একটি অংশ বদলের প্রশ্ন ‘‘নামের
শেষে ‘সৈয়দ হক’
ব্যবহার করছেন, এটি কি আপনার স্বকীয়তা ব্যাহত করে না?’’ সহাস্য তার জবাব ছিলো, ‘যাঁরা
আমার এই জোরালো কণ্ঠ শোনেন, এই একটি প্রশ্ন দিয়েই তাঁরা আমাকে ঘায়েল করতে চান।’ অকপটে বলেছিলেন লেখিকা, ‘বিয়ের পর যখন বোকার মতো আমার
স্বামীকে জিজ্ঞেস করি আমার লেখা লোকজন তেমন পড়ে না কেন? তখন তিনি বললেন, তোমার
নামটি বড়ই প্রগৈতিহাসিক, তুমি এখন থেকে লিখবে আনোয়ারা সৈয়দ হক। এখন তার এই কথার পেছনে যে কী ষড়যন্ত্র লুকিয়ে ছিল তা বুঝতে পেরে আমি ছুটে বেরিয়ে
এসেছি।’ ‘লেখাই মূল্যবান পরিচয়- একজন লেখক
ডাক্তার হতে পারেন, ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেন, শিক্ষক হতে পারেন, কিন্তু তিনি যখন
লেখেন তিনি কেবল লেখকই।’ নিজের পরিচয় প্রকাশের স্বাচ্ছন্দ্য বোঝাতে এভাবেই
উত্তর দিলেন মনোচিকিৎসক, কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক। রসিক ও উৎসাহী পাঠকের নানা
প্রশ্ন ছিলো সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে তার
বিয়ে নিয়ে। উত্তরে বলেছিলেন, ‘বিয়ের প্রসঙ্গে এলে চিন্তায় পড়ে যাই
প্রফেসরের সঙ্গে রাগ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়া একজন আইএ পাস যুবকের সঙ্গে বাবা
বিয়ে দেবেন কি না? আমি তার বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা নিলাম। কঠিন কঠিন শব্দের বানান
জানতে চাই। তিনি সব নির্ভুল উত্তর দেন এবং আমি বুঝতে পারি তার পেটে বিদ্যে আছে।’
৭.
সংস্কৃতিজন মফিদুল হক লিখেছেন, ‘আনোয়ারা সৈয়দ হক, ঝকঝকে নামের ধারালো ব্যক্তিত্বের মানুষটি বহু গুণের
অধিকারী। সেটা যেমন তার যোগ্যতা, তেমনি তার
দায়ভারও বটে। বাংলাদেশের নারীদের অর্জনের একটি মাপ সমাজ নির্ধারণ করে রেখেছে। সেই
লক্ষণরেখা যাঁরা পেরিয়ে যান তাঁরা সাফল্যের পাশাপাশি নিজেদের জন্য বিপদও তৈরি
করেন। সেই সাফল্য ও বিপদ দুই-ই আনোয়ারা সৈয়দ হককে সর্বদা অনুসরণ করে চলেছে। ফলে
তাঁকে বুঝতে কিংবা জানতে সমাজ অনেক ভুল করেছে। অন্যদিকে নানা সাফল্যের আড়ালে
বহুমাত্রিক বহুবর্ণিল মানুষটিকে সঠিকভাবে জানা কখনো হয়ে ওঠেনি।’ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা ‘আনোয়ারা
সৈয়দ হক: মানবিকতার কথাকার’
শিরোনামের রচনায় অকপটে লিখেছেন, ‘আনোয়ারা সৈয়দ হক তার নিজের কলমের জোরেই বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে স্বকীয় অবস্থান তৈরি করতে
পেরেছেন বলে আমার ধারণা। যদিও আমাদের প্রচারমাধ্যম ও সাহিত্য-পরিমন্ডলের নানা ‘কুসংস্কার’ ও সীমাবদ্ধতার
কারণে তার লেখার ক্ষমতা কিংবা বিস্তারের বিষয়টি সেভাবে
সাধারণ্যে পৌঁছেছে বলে মনে হয়নি। অবশ্য ভালো লেখার শক্তি এমনই, শত অর্গলও তাঁকে প্রকৃত
পাঠকের থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে না।’
কথাশিল্পী মনি হায়দার লিখছেন, ‘আমাদের দেশের শিশুসাহিত্য খুবই
অনালোচিত এবং অবহেলিত। অথচ প্রত্যেক লেখক পার করে এসেছেন দুরন্ত শৈশব। সেই শৈশবের
দিনগুলোর স্মৃতি বড় লেখকের মনে রেখাপাত করেই না। ব্যতিক্রম আনোয়ারা সৈয়দ হক। তিনি,
শিশুসাহিত্যেও নিজেকে নিবেদন করেছেন নিষ্ঠা ও মমতায়। … আনোয়ারা সৈয়দ হক, আমাদের কালে, আমাদের স্নেহের নিবিড় সুতোয় গ্রন্থিত করে
রেখেছেন- এই পরম পাওয়া।’ জনপ্রিয় গল্পকার ও ঔপন্যাসিক জাকির তালুকদার
লিখেছেন- ‘তার যুগপৎ সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য যে, তিনি ছিলেন সৈয়দ শামসুল হকের জীবনসঙ্গী।
নিজে প্রায় সার্বক্ষণিক লেখক তিনি। সাহিত্যের সব শাখায় কাজ করেছেন ব্যস্ততম
চিকিৎসকদের একজন হয়েও। গল্প-উপন্যাস- কবিতা-প্রবন্ধ- কলাম-শিশুসাহিত্য সবকিছুতেই তার সিদ্ধি শিল্পের মানদণ্ডে পরীক্ষিত। কিন্তু তার
পরেও তাঁকে ঢাকা পড়ে থাকতে হয়েছে সৈয়দ শামসুল হকের কর্মকাণ্ডের ছায়ায়। আর
তিনিও সেটা মেনে নিয়েছেন। চিকিৎসা ও লেখালেখির পাশাপাশি সামলে গেছেন এবং যাচ্ছেন
সংসার-পরিবার। আর সেইসঙ্গে প্রিয়তম স্বামীর সকল অর্জনে সহযোগিতা করেছেন সম্পূর্ণ
সামর্থ্য দিয়ে। নিজের লেখাগুলো লিখে গেছেন নীরবে। তবে সেগুলোকে প্রচারের আলোয় বা
আলোচনায় আনার জন্য কোনোদিন ব্যতিব্যস্ত হননি। আর আমাদের হ্রস্বদৃষ্টির
সাহিত্যবোদ্ধাদের দৃষ্টি যেহেতু সবসময় সীমাবদ্ধ থাকে নিজেদের নাকের ডগায় বসে
থাকা মাছিটিকে দেখার মধ্যেই, তাই আনোয়ারা সৈয়দ হক রয়ে গেছেন তাদের আলোচনাসীমার
বাইরেই। অনেকগুলো স্মরণীয় গল্প লিখেছেন তিনি। উপন্যাসেও আনতে চেষ্টা করেছেন নতুন
মাত্রা। শিশুসাহিত্যে ছানার নানাবাড়ি তো একটি অসাধারণ সংযোজন।’
৮.
নানা নিষেধের বেড়াজাল এড়িয়ে তার লেখালেখির হাতেখড়ি শিশুকাল থেকেই। স্বপ্ন দেখতেন উচ্চশিক্ষার। মায়ের উদার ভালোবাসার
দৃঢ়তায় নানা বাধাকে অতিক্রম করে একসময় পিতার
সহযোগিতাও লাভ করেন তিনি। তাঁদের কথা কৃতজ্ঞতার
সাথে স্বীকার করেন সবসময়। ফলে ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় লেখালেখির পাশাপাশি
তিনি কলেজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়তে ভয় ও দ্বিধা
কাটিয়ে সক্রিয় হন। নিজেকে বিকশিত করার সুযোগ খোঁজেন এবং কাজে লাগাতে নিরন্তর
সচেষ্ট থাকেন। তার একাগ্রতার
পরিচয় পাই জীবনের নানা পর্বে। আমরা তাই দেখতে পাই প্রবল প্রতিকূলতার মাঝেও আনোয়ারা সৈয়দ হকের প্রথম ছোটগল্প ‘পরিবর্তন’ ১৯৫৪ সালে দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয়। ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তিনি
নিয়মিত দৈনিক ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরে লিখতেন। মাইকেল মধুসূদন কলেজে পড়াকালীন ‘দৈনিক আজাদ’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’ ও ‘গুলিস্তা’
পত্রিকায় তার লেখা গল্প, কবিতা প্রকাশিত হত। গুলিস্তা পত্রিকায়
লিখে তিনি পুরস্কৃতও হয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াকালীন লেখালেখির পাশাপাশি তিনি
কলেজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়েন। এই সময়ে ঢাকা থেকে
প্রকাশিত প্রথম শ্রেণির পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন মেডিকেল জার্নালে তার লেখা ছাপা হত। চট্টগ্রাম থেকে এখলাসউদ্দিন আহমদের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘টাপুর টুপুর’ পত্রিকায় লিখেছেন নাটিকা ‘চাঁপাগাছের সন্ধানে’। তার প্রথম উপন্যাস ‘তৃষিতা’ ১৯৬৮ সালে সচিত্র সন্ধানীতে প্রকাশিত হয়। তার সাহিত্যকর্ম ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। সহিত্যসূত্রে ভ্রমণ করেছেন বেশকিছু
দেশ। তার গল্প ‘স্রোত’, ‘পাহারা’, ‘মিতি সোহেলকে খুঁজতে গিয়েছিল’, ‘টুটুলের মা-গাছ’ ইত্যাদি অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে টেলিছবি ও নাটক।
৯.
আনোয়ারা সৈয়দ হক এমবিবিএস পাস করার
পর ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে মেডিকেল কোরে ইমার্জেন্সি কমিশনে
লেফটেন্যান্ট পদে যোগদান করেন। একমাস পরে তাঁকে বিমানবাহিনীতে ফ্লাইং অফিসার হিসেবে
পদায়ন করা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৪ সালে তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর চাকরি
থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করে উচ্চ শিক্ষার্থে যুক্তরাজ্যে গমন করেন এবং সেখানে
কয়েকটি হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য তিনি পাকিস্তান এবং
বাংলাদেশ বিমানবহিনীর প্রথম বাঙালি নারী কমিশন্ড অফিসার। লন্ডন থেকে উচ্চতর ডিগ্রি
নিয়ে দেশে এসে ১৯৮৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মনোরোগ বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে
যোগ দেন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের
পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ছিলে জাতীয় মানসিক
স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও অধ্যাপক। ১৯৯৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে অবসর
নেন। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্য ও স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন
হাসপাতালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সাল তেকে তিনি ঢাকার
বারডেম হাসপাতালের মনোরগ বিভাগের অধ্যাপক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত
আছেন। তিনি লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব সাইকিয়াট্রিস্ট-এর সদস্য।
১০.
১৯৬৪ সালে সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং ১৯৬৫ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি সৈয়দ হকের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ
হন। সৈয়দ হক ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত
হন। এই দম্পতির দুই সন্তান। মেয়ে বিদিতা সৈয়দ-হক যুক্তরাজ্যের একটি স্কুলের
শিক্ষক। ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ-হক একজন লেখক, গীতিকার এবং আইটি বিশেষজ্ঞ। আনোয়ারা সৈয়দ
হকের দৌহিত্রী লামিয়া সৈয়দ-হক এবং পৌত্র এজরা সৈয়দ-হক।
১১.
আনোয়ারা সৈয়দ হক রচিত ছোটগল্প
গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: পারুলীর উড্ডয়ন, হেলাল যাচ্ছিল রেশমার সাথে দেখা করতে, গলে
যাচ্ছে ঝুলন্ত পদক, অন্ধকারে যে দরোজা, শূন্যতার
সাথে নৃত্য, গ্রামগঞ্জের গভীরে, তাম্রচূড়ের লড়াই, পূর্ণিমায় নখের আঁচড়, আয়নার
বন্দী, রক্তের দাগ ও অন্যান্য গল্প, অন্ধকারের পা, চান্দের আলো কদ্দুর, প্রেমের
গল্প, গল্পসমগ্র, The annihilation and other stories. তার রচিত উপন্যাস হলো : তৃষিতা, সোনার হরিণ, সেই প্রেম সেই সময়, বাজিকর,
জলনুড়ি, তারাবজি, হাতছানি, উদয় মিনাকে চায়, অস্থিরতার
কাল-ভালোবাসার সময়, ভালোবাসার লাল পিঁপড়ে, বাড়ি ও বনিতা, কর্নিশে ঝুলন্ত গোলাপ,
নিঃশব্দতার ভাঙচুর, সেইসব দিন, ঘুম, খাদ, আহত জীবন, আকাশ ভরা,
দুই রমণী, ব্যবহৃত, নখ, সন্দেহ, ঘুমন্ত খেলোয়াড়, রূপালী স্রোত, গুজরিপঞ্চম,
চেমনআরার বাড়ি, উপন্যাস সমগ্র ১-৪ । তার
উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ: ল্যু সালোমে : সাহিত্যভুবনের অগ্নিশিখা, পিকাসোর
নারীরা, রবীন্দ্রনাথ ও বিজয়া, যোগাযোগ-এর মধুসূদন ও অন্যান্য প্রবন্ধ। আত্মজীবনী ও
স্মৃতিকথার মধ্যে রয়েছে : আমার স্কুল, নরক ও ফুলের কাহিনী, অবরুদ্ধ, ক্ষুব্ধ
সংলাপ, স্মৃতির নক্ষত্রে সৈয়দ হক। লিখেছেন ভ্রমণকাহিনী : উড়ে যাই দূরে যাই, যোজন
দূরের স্বজনেরা। তার রচিত কবিতাগ্রন্থ হলো: মেয়ে হয়েছি বেশ করেছি, কিছু কি
পুড়ে যাচ্ছে কোথাও, তুমি আগে যাবে না আমি, স্বপ্নের ভেতর, তুমি এক অলৌকিক বাড়িঅলা,
আমার শয্যায় এক বালিশ-সতীন, কাল খুব কষ্টে ছিলাম। নারী বিষয়ক গ্রন্থ : নারীর কোনো
কথা নেই, নারীর কিছু কথা আছে, নারী : বিদ্রোহী। মনস্তত্ব বিষয়ক গ্রন্থ : মানসিক
সমস্যার গল্প, তুমি এখন বড় হচ্ছো, কিশোর-কিশোরীর মন ও তার সমস্যা, Drugs and abusers, Handbook on mental ilness (edited).
কলামগ্রন্থ হলো : আনোয়ারা সৈয়দ হকের কলাম ১ ও ২, যেমন আমাদের জীবন, সর্পরাজের
যাদু, রকমারি রচনা। শিশু-কিশোর সাহিত্য বিষয়ক গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: ছানার
নানাবাড়ি, বাবার সাথে ছানা, ছানা এবং মুক্তিযুদ্ধ, পথের মানুষ ছানা, সেই ভাষণটি
শোনার পর, ই-কো-সি-বু, একজন মক্তিযোদ্ধার ছেলে, আমাদের মুক্তিযোদ্ধা দাদাভাই,
মন্টির বাবা, সবুজ পশমি চাদর, মুক্তিযোদ্ধার মা, তুমি এখন বড় হচ্ছ, সূর্য ওঠার
গল্প, কত রকমের গল্প, তোমাদের জন্য এগারোটি, উল্টো পায়ের ভূত, আমি ম্যাও ভয় পাই,
আমি বাবাকে ভালোবাসি, হানাদার বাহিনী জব্দ, ছোটখেলের বীর, আমার মা সবচেয়ে ভালো,
তোমার কথা, গা শিরশির, ভয়ঙ্কর সে রাত, মা-ভূতের গল্প, গা ছমছম ভূতের গল্প,
মুক্তিযোদ্ধার মা, টুটুলের মা-গাছ, উদাসী বালক, তপনের মুক্তিযুদ্ধ, কাঠের পা,
আগুনের চমক, দশ রঙের ছড়া, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার
ছড়া, ছোটদের কাহিনীসমগ্র, তিনটি কিশোর উপন্যাস, কিশোর উপন্যাসসংগ্রহ- ১-৩, ছোটদের
জন্য মুক্তিযুদ্ধের পাঁচটি উপন্যাস, ছোটদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্প।
১২.
খ্যাতনামা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক
ও কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য আড্ডা ‘অশ্রুপাত সাহিত্য আসর’ (প্রতিষ্ঠা-২০০৮)
শিল্পী-সাহিত্যিকদের চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ-বিকাশে সবিশেষ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে।
সাহিত্য সাধনার পাশাপাশি আনোয়ারা সৈয়দ হক সম্পাদনাও করেছেন। তার সম্পাদিত সাহিত্যপত্র : কে তুমি, শাদা মেঘের ভেলা, দেশ জাগে শাহবাগে।
আনোয়ারা সৈয়দ হকের রচনা অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র : বাদল রহমান নির্মিত ছানা ও
মুক্তিযুদ্ধ। আনোয়ারা সৈয়দ হক সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের জন্য পেয়েছেন নানা পুরস্কার ও
সম্মাননা। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো: একুশে পদক ২০১৯, বাংলা একাডেমি পুরস্কার-২০১০,
পদক্ষেপ পুরস্কার-২০১০, কবীর চৌধুরী শিশুসাহিত্য পুরস্কার-২০০৭, ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০০৬,
অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার, অনন্যা শীর্ষদশ পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার, শিশু
একাডেমি পুরস্কার, চাঁদের হাট পুরস্কার, ইউরো সাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক
শিশুসাহিত্য পুরস্কার-১৯৭৬।
১৩.
আনোয়ারা সৈয়দ হকের লেখা যেমন
সুখপাঠ্য তেমনি চিন্তাকেও আলোড়িত করে। এবার তার
রচিত আমার প্রিয় বইটির কথা উল্লেখ করতেই হয়। বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য ও নিরলস
সংগ্রামী সাহিত্যব্যক্তিত্বকে নিয়ে আনোয়ারা সৈয়দ হকের গবেষণামূলক জীবনীগ্রন্থ ‘ল্যু সালোমে’। ল্যু সালোমের জীবন ছিল ঘটনাবহুল, সেই কথা জানতে পারি
বলেই আগ্রহ বাড়ে তার সাথে জড়িয়ে পড়া বিখ্যাত আরো অনেককে নিয়ে। বইটিতে ল্যু
সালোমের জীবনীর সাথে সাথে তার সাথে সম্পৃক্ত ফ্রেডরিখ নিৎসে, রাইনার মারিয়া রেলিক,
সিগমুন্ড ফ্রয়েডের জীবন সম্পর্কেও একটি সাম্যক ধারণা পাওয়া যায়, তাদের বিষয়ে আরো
জানার আগ্রহও বাড়ে। সবকিছু মিলিয়ে, ‘ল্যু
সালোমে’ মনে দাগ কাটা একটি জীবনী গ্রন্থ বলেই বিবেচনা করি।
মন:সমীক্ষণের জীবনাভিজ্ঞতা ও শিল্পীর মমত্বের যুগলবন্দি ফুটিয়ে তুলতে দারুণভাবে
সফল হন তিনি ‘ঘুমন্ত খেলোয়াড়’-এর
মতোন উপন্যাসের কাহিনি সৃষ্টিতে। ফলে উপন্যাসটি হয়ে ওঠে আমাদের পাথর সময়ের
অস্থিতরতা আর আদর্শহীনতার সমাজের দর্পণ। ফলে আমার মনে হয়েছে সমকালের আয়না
হিসেবে ‘ঘুমন্ত খেলোয়াড়’-
খুবই প্রয়োজনীয় একটি বই। নিঃসন্দেহে ‘ঘুমন্ত
খেলোয়াড়’ বইটি আমাদের বইয়ের জগতে একটি উজ্জ্বল সংযোজন হয়ে
থাকবে। তবে বইটি শুধু তরুণ আর তাদের অভিভাবকদের জন্য নয় বলেও আমি মনে করি। একজন শিক্ষক
হিসেবে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদেরও এই বইটি পাঠ করা উচিত বলে গভীরভাবে বিশ্বাস করি।
কারণ পরিবারের পরে যে প্রতিষ্ঠানটিতে কিশোর-কিশোরীরা, তরুণেরা পরম যত্নে লালিত হয়
সেটা হলো তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সারা দেশে সে অজস্র স্কুল-কলেজ ছড়িয়ে আছে সেই সব
স্কুল-কলেজে বইটির ব্যাপক পাঠ, আলোচনা ও প্রচার হওয়া খুব জরুরি বলে বিবেচনা করি।
সমাজের সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় ভাবনা নিয়ে মূল্যবান উপন্যাস ‘ঘুমন্ত খেলোয়াড়’ পাঠকদের উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
করছি।
১৪.
বইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিবিড়, একান্তই আত্মিক। সাহিত্যের ভুবনে যে কটি বই তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে, নাড়িয়ে দিয়েছে ভেতর থেকে, তাদের মধ্যে পাঁচটির নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। যদিও তিনি বলেছেন, বই নিয়ে কিছু বলা খুবই বিপজ্জনক। হয়তো কোনো প্রিয় বই বাদ পড়বে, আবার অনেক প্রিয় কোনো বইয়ের নাম স্মৃতির প্রতারণায় বলা হবে না। তবে পাঁচটি বইয়ের নাম বললে প্রথমেই আসে এরিখ মারিয়া রেমার্কের ‘থ্রি কমরেডস’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানির পটভূমিতে তিন বন্ধুর বন্ধুত্ব, প্রেম আর মৃত্যুর গল্প- এ যেন মানবিক সম্পর্কের এক মহাগাথা। রেমার্কের ভাষা এতটাই সরল অথচ গভীর যে, পড়তে পড়তে নিজেকেই আমি মাঝে মাঝে গল্পের ভেতরে হারিয়ে ফেলি। এরপর রাখা যায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’কে। অপু-দুর্গার শৈশব, নিশ্চিন্তপুরের পথ-ঘাট-মাঠ, সর্বজনীন দারিদ্র্যের মধ্যে প্রকৃতির অকৃপণ সৌন্দর্য- এ উপন্যাস যেন বাঙালির চিরন্তন জীবনের আখ্যান। বিভূতিভূষণের বর্ণনাভঙ্গি আমাকে প্রতিবà¦