প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
ইতিহাসের গতিপথ কখনোই কোনো নির্দিষ্ট সমান্তরাল রেখা ধরে এগিয়ে চলে না; এটি অত্যন্ত জটিল, রূপান্তরশীল এবং স্থান-কাল-পাত্রের জটিল মিথস্ক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের মৌলিক নীতি আমাদের শেখায় যে, সময় ও পরিস্থিতির আবর্তে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা, জনগণের আবেগ এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি চরমভাবে রূপান্তরিত হতে পারে। ইতিহাসের পাতায় এমন অসংখ্য নজির রয়েছে, যেখানে কোনো এক নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক মুহূর্তে যে গোষ্ঠী বা ব্যক্তিত্ব জনমানুষের সর্বোচ্চ পূজনীয় আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, পরবর্তীকালে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান, অনভিপ্রেত আচরণ কিংবা নৈতিক বিচ্যুতির কারণে সেই আস্থার শক্ত প্রাচীর তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণ করলেও এই নির্মম সত্যটিই বারবার আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়।
আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহত্তম অধ্যায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। বীর মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের স্বাধীন অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্বের চিরন্তন প্রতীক হিসেবে সর্বজনশ্রদ্ধেয় ছিলেন এবং থাকবেন। কিন্তু ইতিহাসের এক ট্র্যাজিক বাস্তবতায় দেখা যায়, পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কায়েমি স্বার্থে ব্যবহারের অপচেষ্টা এবং ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা’র মতো সংবেদনশীল বিষয়কে বৈষম্যমূলক ও সুযোগ-সন্ধানী হাতিয়ারে পরিণত করার মধ্য দিয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠী এই মহান গৌরবকে চরম বিতর্কের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ফলস্বরূপ, সাধারণ জনমানুষের মনে যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষোভ ও বঞ্চনার সৃষ্টি হয়েছিল, তা একপর্যায়ে ফ্যাসিবাদের পতন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও সামাজিক নিয়ামকে পরিণত হয়।
পরবর্তী সময়ে, ২০২৪-এর ফ্যাসিবাদবিরোধী গণআন্দোলনের রাজপথে যারা রক্তের ঝুঁকি নিয়ে সম্মুখসারিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সেই তরুণরা রাতারাতি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক এবং গণমানুষের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মূর্ত রূপ হয়ে উঠেছিলেন। জাতি তাদের মধ্যে এক নতুন, বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু ইতিহাসের অন্যতম চিরন্তন শিক্ষা হলো- জনগণের বিপুল প্রত্যাশা এবং উদীয়মান নেতৃত্বের রাজনৈতিক আচরণের মধ্যকার ভারসাম্য যখন নষ্ট হয়, তখন মোহভঙ্গ ঘটতে খুব বেশি সময় লাগে না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেকোনো গণবিপ্লব বা গণআন্দোলন-পরবর্তী উত্তরণকালীন সময়ে উদীয়মান রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর নৈতিক মানদণ্ড ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বজায় রাখার দায়িত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সমাজমনস্তত্ত্বের নিয়মানুসারে, জনমানুষ কাউকে কতটা শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা অর্পণ করবে, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্বের বাচনভঙ্গি, রাজনৈতিক সংযম এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনুশীলনের ওপর। স্বৈরাচার-পরবর্তী গণতান্ত্রিক সমাজে বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির মূল শর্ত, তবে সেই স্বাধীনতা যখন দায়িত্বশীলতার সীমানা অতিক্রম করে চরম অশ্রদ্ধা ও অশালীন রাজনৈতিক বিষোদগারে পর্যবসিত হয়, তখন তা সামাজিক বিভাজন ও নেতিবাচক মেরুকরণকে অনিবার্য করে তোলে।
সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টি'র (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতা নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর উসকানিমূলক রাজনৈতিক বক্তব্য এবং তাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া অপ্রীতিকর পরিস্থিতি একটি গভীর অনুসন্ধানী প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ধারা এবং কোটি কোটি মানুষের আবেগের প্রতীক ‘জিয়া পরিবার’ ও এর নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে বারবার লাগামহীন, রূঢ় ও অসংবেদনশীল মন্তব্য প্রদান সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌলিক ভিত্তিকে আঘাত করেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো উদীয়মান রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নীরবতা যখন এই জাতীয় আচরণকে প্রকারান্তরে মৌন সমর্থন যোগায়, তখন জনপরিসরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের তীব্র সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটে।
এরই ফলশ্রুতিতে দেখা যাচ্ছে, নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জনগণের তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং অনভিপ্রেতভাবে শারীরিক আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজেদের ক্রমাগত প্রাসঙ্গিক রাখতে বা মিডিয়ার মনোযোগ ধরে রাখতে বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়াকে 'পপুলিস্ট প্রোভোকেশন' বা জনতুষ্টিবাদী উসকানি বলে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু এই কৌশল যখন সামাজিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন রাজনীতির গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়।
তবে একজন মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশ্লেষক হিসেবে আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই—নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর বক্তব্য যতই অগ্রহণযোগ্য, অপ্রীতিকর বা উসকানিমূলক হোক না